সর্বশেষ আপডেট : ৩ মিনিট ১৪ সেকেন্ড আগে
রবিবার, ২০ অগাস্ট, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ৫ ভাদ্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

টিকে থাকার লড়াইয়ে অনিশ্চিত আদিবাসীদের জীবন ও জীবিকা

barlekha-news-logo-lead-u-copyনিজস্ব প্রতিবেদক::
সুপ্রাচীন কাল থেকেই জাতি, ধর্ম,বর্ণ, বাঙালি ও আদিবাসী সকলে একত্রে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা এবং সাহিত্যচর্চার এক অনন্য স্থান ছিলো মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলা। পাশাপাশি আদিবাসী সংস্কৃতি, জীবন পদ্ধতি, চা জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ, ধারণ ও বাহন করার সুযোগ ছিলো বৃহত্তর কুলাউড়াবাসীর। অথচ পরিতাপের বিষয় হলো, আদিবাসীদের চিন্তা চেতনা, জীবনাচরণ, মূল্যবোধ এবং সংস্কৃতিকে কখনও মূল্যায়ন করা হয়নি। বরং তাদের দেখানো হয়েছে বনভূমি দখলদার, বন বিনাশকারী এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক জাতিগোষ্ঠী হিসেবে। এই ধরণের ভ্রান্ত ধারণাই কতিপয় ব্যক্তিদের আদিবাসীদের উপর আক্রমণের ইন্ধন যুগিয়েছে। এখানকার গারো-খাসি জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০০৮-২০১৬ সাল পর্যন্ত শতাধিক ব্যক্তির উপর আক্রমণ ও পানগাছ কাটা হয়েছে। পাশাপাশি বনবিভাগের মিথ্যা মামলা, পান ও গাছ চুরি তো রয়েছেই। আজ পর্যন্ত এর সুষ্ঠু কোনো সুরাহা হয়নি। সূত্র জানায়, গত ৩০ সেপ্টেম্বর সকালে এসে স্থানীয় বনবিভাগের মুরইছড়া বিট কর্মকর্তা আতিয়ার রহমানের নেতৃত্বে ২০-৩০ জনের একটি দল পানপুঞ্জির জমি বনবিভাগের দাবি করে পান জুমের গাছ কাটার চেষ্টা করেন। এ সময় দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এরই জের ধরে ওইদিন সন্ধ্যায় পানজুমে দুষ্কৃতিকারীরা হামলা চালায়। এতে মেঘাটিলা পুঞ্জির এঞ্জেলুস খংলা (৪৫) জুয়েল স্নাল (১২) ও শেখর নাইয়াং (২৮) আহত হন। গুরুতর আহত শেখর নাইয়াংকে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইছলাছড়া পুঞ্জি, সিংগুর পুঞ্জি, এরলাছড়া পুঞ্জি, মুরইছড়া পুঞ্জি, নার্সারি পুঞ্জি, কুকিবাড়ী পুঞ্জি, পুঁথিছড়া পুঞ্জি, সাহেবটিলা পুঞ্জি, ঝিমাইপুঞ্জি, আমুলী পুঞ্জি, পানাই পুঞ্জি, ইছাছড়াপুঞ্জি, নুনছড়া পুঞ্জি, রাঙ্গিপুঞ্জি, মেঘাটিলা পুঞ্জি, লন্ডন পুঞ্জি, কুকিজুরি পুঞ্জি, বেলুয়া পুঞ্জি, বালাইমা পুঞ্জি এবং লুতিজুরি পুঞ্জিসহ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পুঞ্জিবাসীর জুমের পানগাছ কাটা হয়েছে। দুর্বৃত্তরা মনে করে, খাসি-গারোদের নির্যাতনের সহজ উপায় হলো জুমের পান নষ্ট করা। শক্রতার জের ধরে অনেক সময় দুর্বৃত্তরা রাতের আঁধারে জুমের শত শত পান গাছ কেটে আদিবাসীদের অর্থনৈতিক জীবনকে পঙ্গু করা হয়। অ-আদিবাসীদের পালিত হাতি, গরু ও মহিষের দ্বারাও জুমে উৎপাদিত অনেক ফলজ গাছসহ ফসলাদির বিনষ্ট করা হয়। সাহেবটিলা পুঞ্জিতে গত ২০১৪ সালের ১০ মে দুপুর সাড়ে ১২টায় বেনাসী বাঙালি সমিতির সদস্যগণ ৬০-৭০ লোক মিলে অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে পুঞ্জির ঘরবাড়ি ও পান বাগান তছনছ করে ফেলে। অন্তত ২০০০টি পানগাছ কাটা হয়। পানগাছ কর্তনের সাথে তারা রেমতি রংদি ও ফিলো বনোয়ারীকে মারধর করে। একই বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর দুপুর দেড়টায় ইছলাছড়া পুঞ্জির উইলফট বারে খাসিয়া নিজস্ব জুমে কাজ করার সময় কিছু দুষ্কৃতিকারী এলাকার বাঙালি দ্বারা গুরুত্বতরভাবে আহত হয়। এছাড়া ২০১৫ সালের ১১ মার্চ কমর্ধা ইউপি’র পুরাতন চলিতা পুঞ্জি এলাকায় আমুলী পুঞ্জির হেডম্যান প্রত্যুশ আশাক্রা, মোকামবাড়ি পুঞ্জির ডেভিড খাসিয়া, টমতর লামিণের জুমে সন্ধ্যায় ৩টি পানের পুঞ্জির আড়াই হাজারেরও অধিক পান গাছ কেটে ফেলে দুর্বৃত্তরা। ২০০৮ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ইছলাছড়া পুঞ্জিতে পানকাটা ও সিগুরপুঞ্জিতে করবস্থানের ওপর আক্রমণ করার ঘটনা ঘটে। যদি এইভাবে প্রতিটি ঘটনা তারিখসহ উল্লেখ করা হয় খাসিয়াদের ওপর হামলা, মামলা ও তাদের পানজুমের ক্ষতির পরিসংখ্যান দিয়ে শেষ করা যাবে না।

মানুষ কতো নিষ্ঠুর হয়েছে আজ, শত্রুতা কিংবা ক্ষতির জন্য কেটে ফেলে পানগাছ কিংবা অন্যান্য বৃক্ষাদি। আইনের তোয়াক্কা না করে মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নিয়েছে, যা আইনের শাসনের পরিপন্থী। সম্প্রতি আবার গাছ চুরিতে বাঁধা দেওয়ায় আমুলি পুঞ্জির তিনটি জুমের সাড়ে তিন হাজার পানগাছ কেটে ফেলে দুর্বৃত্তরা। সূত্র জানায়, গত ২৭ সেপ্টেম্বর নলডরি গ্রামের বাসিন্দা পলাশ মিয়া ও বাবুল মিয়ার নেতৃত্বে ১০-১৫ জন ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আমুলি পুঞ্জির পার্শ্ববর্তী মোকামবাড়ি পুঞ্জির পানজুমে ঢুকে একটি বড়ো গাছ করাত দিয়ে কেটে ফেলে। এ সময় মোকামবাড়িসহ আমুলি পুঞ্জির লোকজন গিয়ে বাঁধা দিলে দুর্বৃত্তরা তাদের হুমকি-ধামকি দিয়ে গাছ নিয়ে চলে যায়। যেখানে জীবন ও জীবিকার উপর সরাসরি আক্রমণ করা হয়-সেটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। পান চাষ ও পান উৎপাদন প্রক্রিয়া দীর্ঘ একটি সময়ের ব্যাপার। পানের ফলন ঘরে তুলতে সময় লাগে প্রায় ৪/৫ বছর। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পক্ষে এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। পানকে কেন্দ্র করেই পুঞ্জির মানুষ খাসি-গারোদের জীবন আচরণ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। পান উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনার সাথেই এখানকার খাসি আদিবাসীদের জীবন জড়িত।

আদিবাসী ও অ-আদিবাসীদের মাঝে পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থা স্থাপনের লক্ষ্যে স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীগণ ও আইপিডিএস ইউনিয়ন এবং উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সময় মতবিনিময় সভা, বৈঠক ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে মিডিয়ার ভূমিকা ছিলো গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি পঞ্চায়েত নেতা, আদিবাসী নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি, মানবাধিকারকর্মী, আদিবাসী সংগঠন, মিডিয়া, সুশীল সমাজ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে সন্মিলিত উদ্যোগই আদিবাসীদের জীবন ও জীবিকার উপর আক্রমণ বন্ধ করতে পারবে এবং সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: