সর্বশেষ আপডেট : ১৩ মিনিট ৫১ সেকেন্ড আগে
বুধবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

আগর শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষায় প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা

barlekha-agor-news-logo-lead-copyজালাল আহমদ::
টিলায় টিলায় সারি সারি করে সৃজিত গাছের চারা। নাম তার আগর। সবুজ অরণ্যে একাধারে চলছে পূর্ণ হওয়া গাছগুলো কর্তন এবং নতুন চারা রোপণের কাজ। সুনিপুণ হাতে এ কাজটি সম্পাদন করতে রয়েছেন কয়েক হাজার দক্ষ শ্রমিক। সবার প্রচেষ্টায়-ই গড়ে উঠেছে প্রকৃতিনির্ভর আগর শিল্প। বিশ্বের প্রাচীন শিল্প হওয়া সত্ত্বেও বড়লেখার আগর শিল্পটি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে না। প্রায় ৬শ বছর ধরে চালু রয়েছে এ শিল্প। আগর শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছেন দেড় লক্ষাধিক নারী ও পুরুষ। এ শিল্প নিয়ে আশাবাদের সাথে হতাশার দিকও আছে- এখানে নারী শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হন প্রতিনিয়ত।
বৈদেশিক আয়ের উৎস হিসেবে আগর শিল্প একটি স্বকীয় অবস্থান দীর্ঘ দিন থেকে তৈরি করেছে। কিন্তু প্রাচীন এ শিল্প হালে শিল্পের মর্যাদা পাচ্ছে না। এর জন্য সংশ্লিষ্টরা সরকারের উদাসীনতাকেই দায়ী করেছেন। এ শিল্পের সাথে জড়িতদের অভিযোগ, অনেক আবেদন-নিবেদনের পর চুলোয় গ্যাস সংযোগ পাওয়া গেলেও গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিল্পের মর্যাদা পাচ্ছে না। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গ্যাসের বিল পরিশোধ করতে হয়। ফলে ইউনিটপ্রতি প্রায় ১০ টাকা বাড়তি বিল গুনতে হয় ব্যবসায়ীদের।

আগর শিল্প গড়ে উঠায় বড়লেখার সুজানগর আগর গ্রাম হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেছে সেই কবে থেকে। এ সুখ্যাতির অংশীদার দক্ষিণভাগ এলাকাও। সারা বিশ্বে বড়লেখার আগর ছড়িয়ে পড়ায় ব্যবসায়িকভাবে শিল্প সংশি¬ষ্টরা প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লি¬ষ্ট অধিদপ্তর এ শিল্পকে নিয়ে তেমন আগ্রহী হয়ে উঠেনি এতো বছর পরও। ফলে আর্থিক দিক দিয়ে কারখানা মালিকপক্ষ লাভবান হলেও সরকারের সম্পৃক্ততা না থাকায় বছরে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ। জাতীয় সংসদের হুইপ ও স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব শাহাব উদ্দিন জানান, দেশে প্রায় ৮০ লক্ষাধিক যুবক বেকার রয়েছে। বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের একটি বড়ো খাত হতে পারে আগর শিল্প। ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠা এসব কারখানায় প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক কাজ করছে। এ শিল্পের জন্য বড়লেখায় একটি নির্দিষ্ট একটি শিল্পনগরী গড়ে তোলা হলে আরও অনেক শ্রমিকের কর্মসংস্থান অনায়াসে করা সম্ভব। এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠিত এ শিল্পের উন্নতির জন্য সকল প্রকার চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকারও আন্তরিক এটি নিয়ে। বর্তমান সরকার এটিকে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের মর্যাদা দিয়েছে।

আগর-আতর কুটির শিল্প রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কবির আহমদ জানান, প্রায় ৬০০ বছর ধরে আমাদের এ অঞ্চলে আগর থেকে আতর উৎপন্ন করা হচ্ছে। সুজানগরের আগর এখন ভারতবর্ষ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্তু বিস্তৃত। বিশ্বে সর্বোৎকৃষ্ট মানের আতর একসময় একমাত্র সুজানগর এলাকায় উৎপন্ন হলেও এখন সুজানগরসহ বড়লেখার বিভিন্ন এলাকায় এবং পার্শ্ববর্তী বিয়ানীবাজারেও তা ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, পরিতাপের বিষয় হচ্ছেÑজালালাবাদ গ্যাস এ শিল্পকে শিল্প হিসেবে গণ্য করছে না। ফলে প্রতি মাসে দ্বিগুণ গ্যাস বিল দিতে হয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মজুরির বিষয়টি শুধু নারী শ্রমিক নয়- সবার ক্ষেত্রেই একই নিয়ম। কেজি প্রতি ২০ টাকা পারিশ্রমিক। এর চেয়ে কম পারিশ্রমিকে কেউ কাজ করলে সেটা তার নিজস্ব ব্যাপার।

unnamed
নারী শ্রমিক : নার্সারিতে বীজ বুনা, আগর গাছের চারা উত্তোলন ও বিক্রি থেকে শুরু করে কারখানার চুলোয় যাওয়ার আগ পর্যন্ত এ শিল্পের সাথে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক জড়িত রয়েছে। এর মধ্যে নারী শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার। বিবাহিতা ও মধ্যবয়সি এসব নারী শ্রমিক পারিবারিক কাজের ফাঁকে কারখানায় কাজ করে থাকেন। শিল্প হিসেবে বিশ্বে সুখ্যাতি অর্জিত এবং আর্থিক দিক থেকে লাভবান হওয়া সত্ত্বেও হাড় খাটানো পরিশ্রম করে দিনের শেষে নারী শ্রমিকের হাতে ধরিয়ে দেয়া হয় টাকা নামক কাগজের নামেমাত্র মূল্যবান টুকরো। অথচ একই কাজ করে একজন পুরুষ শ্রমিককে দেয়া হয় নারী শ্রমিকের দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পারিশ্রমিক। উপজেলার দক্ষিণভাগ এলাকার আব্দুল হক মেম্বারের কারখানার শ্রমিক রাহেলা আক্তার আক্ষেপের সুরে জানা, “হারা দিন খাম খরিয়া মাত্র একশো টেখা পাই, এই টেখা তনে খামের সময় খাওয়াও লাগে, বাজারো হখলতার দাম বাড়ে তয় মোর ঘামের দাম বাড়ে না।”

unnamed-1

আগর শিল্প : পরিত্যক্ত ঝোঁপ-ঝাড়বেষ্ঠিত টিলা ও উঁচু সমতলভূমি একসময় বন্যপ্রাণির আবাসস্থল থাকলেও আজ তা শিল্প কারখানার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ দু’ইউনিয়নের এমন বাড়ি খুঁজে পাওয়া যাবে না যে, বাড়ির লোকজন আগর শিল্পের সাথে জড়িত নন। এ শিল্পের সাথে জড়িত ব্যবসায়ীরা আগাম টাকা দিয়ে গাছ ক্রয় করে রাখেন। অভাব-অনটনে পড়ে দরিদ্র এলাকাবাসী ১/২ বছরের চারা গাছও হাজার টাকায় বিক্রি করে থাকেন। অনেকটা ব্যাংকে গচ্ছিত টাকার মতো। গাছের বয়স ৩ বছর হলেই গুড়া থেকে সুনিপুণ হাতে লোহা ঢুকানো হয়। কঁচিগাছে আগর ধরাতে এ পদ্ধতির জন্য আলাদা শ্রমিক রয়েছে। এদের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। গাছপ্রতি লোহাসহ ৩০০/৪০০ টাকা তাদের দিতে হয়। অনেক সময় গাছের মালিক নিজেই এ কাজ করে থাকেন। ৫ বছরের একটি আগর গাছ ৫/৬ হাজারে অনায়াসে বিক্রি করে দেয়া যায়। পূর্ণবয়স্ক আগর গাছের মূল্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে লক্ষাধিক টাকাও ছাড়িয়ে যায়।

unnamed-2

আগর উত্তোলন পদ্ধতি : গাছ থেকে নির্দিষ্ট মাপে আগর আলাদা করতে হয়। এই কাজগুলো নারী শ্রমিকরা করে থাকেন। তবে এখন পুরুষরাও এ কাজ করছেন। এ পদ্ধতির নাম ‘ধুম’। কয়েক পদ্ধতিতে ধুম করার পর কচি কাঠের টুকরো ঢেঁকি দিয়ে গুঁড়ো করা হয়। এরপর পানিভর্তি চৌবাচ্চায় ২০ দিন ভেজানোর পর ছায়ায় শুকাতে হয়। শুকনো কাঠের গুঁড়ো পুনরায় ৭/৮ দিন চৌবাচ্চায় ভিজিয়ে রাখার পর চুলোয় রাখা পানিভর্তি গরম পাত্রে কাঠ ঢালা হয়। এভাবে ১৫ দিন আগুনের তাপে সিদ্ধ দেয়ার পর একটি পাত্র থেকে প্রায় ৫ তুলা আতর উৎপন্ন হয়। এ রকম দু’টি পাত্র প্রতিবার বসাতে খরচ পড়ে ৫০ হাজার টাকা।

unnamed-3
আগর থেকে আতর : নির্দিষ্ট দিন শেষে পাত্রের ফুটন্ত পানির উপর দুধের সরের মত তৈলাক্ত পদার্থ ভাসতে থাকে। আলতো হাতের ছোঁয়ায় ভেসে থাকা তেল ঝিনুক দিয়ে উত্তোলন করা হয়। অনেকেই এ সময় ফোম ব্যবহার করেন। উত্তোলিত এ পদার্থের নামই আতর। কাঠের ফুটন্ত পানি থেকে আতর উত্তোলনের পর আবারও এ পানিতেই নতুন কাঠ সিদ্ধ দেয়ার কাজ শুরু হয়। এভাবেই আতর উৎপাদনের কাজ চলে সারা বছর।
আগর প্রস্তুতের বিস্তারিত তুলে ধরেন বাংলাদেশ আগর অ্যান্ড আতর ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টাস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আনছারুল হক। তিনি জানান, প্রথমে বাগান থেকে গাছ সংগ্রহ করা হয়। পরে লোহাগুলো সরিয়ে লাকড়ির মতো কেটে তা কুচি কুচি করে পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। নূন্যতম ১৫ দিন থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত ভিজিয়ে এগুলো নির্দিষ্ট পাত্রে জ্বাল দেওয়া হয়। এরপর প্ল্যান্টের চুল্লিতে দিয়ে একই তাপমাত্রায় জ্বাল দেওয়া হয় আরও অন্তত ৮ থেকে ১২ দিন। এ কাজের পর সংযোগ দেয়া হয় আরেকটি সিলিন্ডারে, সিলিন্ডারটিকে আরেকটি বড়ো প্রবাহমান পানিভর্তি পিপা’র মধ্যে রাখা হয়। এখানে আগর তেলমিশ্রিত বাষ্পপানি অন্য পাত্রে গিয়ে পড়ে। আর পানি থেকে আগর তেল আলাদা হয়ে পানির ওপর ভেসে থাকে। অপর একটি পাইপ দিয়ে অতিরিক্ত পানি বের করে দেওয়া হয়। প্ল্যান্টটিতে জ্বাল দেওয়া শেষ হলে ওই পিপা থেকে সংগ্রহ করা হয় আতর।
বিজ্ঞান বলছে, অ্যাকুইলারিয়া ম্যালানেসিস গোত্রের সুগন্ধি প্রদায়ক উদ্ভিদ আগর গাছ। চিরসবুজ দ্রুতবর্ধনশীল এ গাছ সাধারণত ১৫-৪০ মিটার পর্যন্ত লম্বা এবং ০.৬-২.৫ মিটার ব্যাসের হয়। এর ফুলটি সাদা রঙের। ফলও হয় গুঁটির মতো।

এ গাছ থেকে সংগৃহিত জাইলেম বা কাস্টল ভেতরে প্রাকৃতিকভাবে পতঙ্গের সহায়তায় ছত্রাকের সংক্রমণের ফলে গাছ রেজিনযুক্ত গাঢ় বর্ণ হয়, যা কেটে কুচি কুচি করে রাখা হয়। এটিই অতি মূল্যবান, যাকে বলা হয় আগর উড।

আগর গাছ চাষী ও ব্যবসায়ী আনছারুল হক বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটিই গাছের ভেতরে হয়, ফলে আগর উডের উপস্থিতি বাইরে থেকে অনেক সময় বোঝা যায় না। তবে গাছের এই জিনিসটাই সবচেয়ে দামি। এক কেজি আগর উড দেড় থেকে দুই লাখ টাকায় বিক্রি হয়। বাইরে এর দাম হয় ১০ হাজার মার্কিন ডলার। ‘‘আমাদের এখানে তাড়াতাড়ি ফল পেতে পেরেক পদ্ধতি ব্যবহার করেন চাষীরা। তবে পেরেক মারা ‘উড’ গুণসম্পন্ন নয়।’’ তিনি বলেন, আগর গাছের ডাস্টটিও (ছোটো টুকরা) বিদেশে রফতানি করা হয়। এটি প্রসেসিং করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশ আরও ২০-২২টি আইটেম তৈরি করে।

রফতানি প্রসঙ্গে এই ব্যবসায়ী জানান, এক তোলা ভালোমানের আতরের দাম ৮-১০ হাজার টাকা। তবে স্থানীয় বাজারে তা সর্বোচ্চ ৬ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়। এর সর্বনিম্ন দাম পড়ে সাড়ে ৩ হাজার টাকা। আতরের উৎপাদন বিষয়ে আনছারুল হক বলেন, এক ডেকচির (জ্বাল দেওয়ার পাত্র) প্রতিটি প্ল্যান্ট থেকে এক থেকে দেড় তোলা আতর আসে। আর এ ধরণের ৩০টি প্ল্যান্টে প্রতিমাসে সর্বোচ্চ ১০০ তোলা আতর পাওয়া যায়। আগর খাতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারের সহযোগিতা পেলে অদূর ভবিষ্যতেই সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে আতর রফতানির মাধ্যমে।

অন্যান্য ব্যবসায়ীদের কথা : সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতার জোর দাবি জানিয়েছেন সুজানগর আগর-আতর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আনছার আহমদ। এ ব্যবসার প্রসারে প্রশাসনিক সার্বিক সহযোগিতা, কাস্টমস সহজিকরণ ও শিল্পের বিকাশে অভিভাবকদের এগিয়ে আসার কথা বললেন সুজানগরের রহিম বক্ত মুসা।

আগর শিল্পের উন্নয়নে সরকারকে প্রশাসনিক ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুকরণ, বন কর্মকর্তা কর্তৃক হয়রানি দূরীকরণ, শিল্পের নীতিমালা নির্ধারণ, সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ প্রদান করার কথা বললেন তরুণ ব্যবসায়ী আরেফ আহমদ।

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: