সর্বশেষ আপডেট : ৩১ সেকেন্ড আগে
রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

স্থায়ীত্বশীল উন্নয়নের ভিত্তি গড়তে কৃষিতে নারীর অবদানের সার্বজনীন স্বীকৃতি চাই

special-nrf-620150505115316মোঃ মোজাহিদুল ইসলাম নয়ন::
বাংলাদেশে তথা এই অঞ্চলে ঐতিহ্যগতভাবে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে নারীর অবদান সর্বাধিক। বিশেষ করে কৃষি উৎপাদন উৎপাদন কৌশল, বীজ ও পণ্য সংরক্ষণ এবং ফসল আহরণ সর্বপর্যায়ের সাথে নারীর রয়েছে নিবিড় যোগাযোগ। আর কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তথা জীবিকায়নে এখনও কৃষির ভূমিকাই সর্বাধিক বলা যেতে পারে তা আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। ফলে কৃষি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং টেকসই জীবিকায়নে নারী ও কৃষির সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি পরিসংখ্যান দেখি তাহলে দেখবো যে, এখনও কৃষিতে মানুষের সর্বাধিক কর্মসংস্থান, গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে আছে কৃষির সাথে। প্রাকৃতিক বা অন্য যে কোনো কারণে কৃষিতে ক্ষয়ক্ষতি হলে এদেশের বেশীরভাগ মানুষের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পরিহার করা যায় না।

1বিদ্যমান সমাজকাঠামো, প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং কৃষিতে নারীর অবদানকে অবহেলা করার যে সাধারণ প্রবণতা তার ফলেই কৃষিতে নারীর বিপুল অবদানকে সর্বজনীন স্বীকৃতি দিতে দ্বিধা করে আবার অনেক সময় স্বীকারও করে না। অনেকেই বলে থাকেন- জিডিপিতে কৃষির অবদান কমে আসছে; যার অর্থ কোনোভাবেই এই নয় যে, তাতে নারীর অবদান কমছে বরং উপরোক্ত পরিসংখ্যান বলছে- কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বাড়ছে। মূলতঃ কৃষিতে নারীর অবদানকে অস্বীকার করার একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে নারীর অবদানকে সাধারণ অর্থে মূল্যহীন মনে করা এবং আর দশটা পারিবারিক কাজকে যেভাবে যুগের পর যুগ অবহেলা করা হয়েছে তেমনি কৃষিতে তাদের অবদানকেও অস্বীকার করা হচ্ছে। কিন্তু একটি টেকসই উন্নয়ন বুনিয়াদ বিনির্মাণে কৃষিতে নারীর অবদানকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দেয়ার কোনো বিকল্প হতে পারে না।

উন্নয়ন প্রচেষ্টায় নারীকে অগ্রাধিকার কেনো?
বাংলাদেশে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংগঠনসমূহ একটি সমতাভিত্তিক উন্নয়ন বাস্তবতা তৈরির জন্য কাজ করছে যাতে নারীরা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় সকল ক্ষেত্রে তাদের জীবনের কার্যকরভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হন। নারীদের মধ্যে দৃঢ় বিশ্বাস তৈরি করা যাতে পারিবারিক ও সাধারণ সম্পদে তাদের অধিকারভিত্তিক অভিগম্যতা তৈরি হয়, যে কোনোরকম সহিংসতা থেকে মুক্ত থাকতে পারে এবং সর্বপরিসরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে। সেখানে পৌঁছানোর জন্য নারীর প্রতি বিদ্যমান সকল বৈষম্য দূর করার কোনো বিকল্প হতে পারে না। পাশাপাশি নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রে অনুকুল পরিবেশ তৈরিকরাসহ নারীবান্ধব নীতি ও আইন প্রনয়ন এবং এ সংক্রান্ত কর্মসূচি গ্রহণ করা যাতে তারা স্বেচ্ছায় নিজস্ব উন্নয়নের পরিচালক হতে পারে। নারী-পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান অসমতা দূর করতে নারীর ট্রান্সফরমেশনাল চেইঞ্জ-কে একটি কার্যকর এ্যাপ্রোচ হিসেবে গ্রহণ করার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসতে হবে। যা শুধুমাত্র তার অবস্থার নয় বরং অবস্থানের গুণগত পরিবর্তন নিশ্চিত করে। আর এই ট্রান্সফরমেশনাল চেইঞ্জ এর জন্য নারী হবেন একজন পরিবর্তনের রূপকার, শুধু সুবিধাভোগী নয়।

2কেনো কৃষিতে নারীর অবদানের স্বীকৃতি প্রয়োজন?
এদেশের অর্থনীতি কৃষি নির্ভর হলেও নানা কারণে এবং নানা পর্যায় থেকে অবহেলার শিকার এই খাতে কৃষি এবং কৃষকের নানাবিধ সমস্যা এখনও অনেক বেশি। এখনও প্রকৃত কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পায় না, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে বছরের পর বছর উৎপাদিত ফসল নষ্ট হয়ে যায়, কৃষি উপকরণের দুষ্প্রাপ্যতা, ভাল বীজের সংকট ও কৃষিতে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও বিনিয়োগ না থাকায় খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টিও ক্রমশ অগ্রাধিকার হারাচ্ছে। এছাড়া বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাতও কৃষি এবং কৃষকের সমস্যাকে আরো গুরুতর করে তুলেছে এবং ইতিমধ্যেই এর প্রভাব দেখা দিতে শুরু করেছে বিশেষ করে নারী কৃষকের জন্য।বাংলাদেশের নারী বিশেষ করে গ্রামীণ নারীরা গৃহস্থলি কর্মকান্ডে ও কৃষিশ্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। খাদ্য উৎপাদনের সাথে নারীর সম্পর্ক প্রত্যক্ষ। বীজ সংরক্ষণ, বীজতলা উৎপাদন, জমিতে ব্যবহারের উপযোগী প্রাকৃতিক সার তৈরি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ সবক্ষেত্রেই নারীরা নিরলস ভূমিকা পালন করে থাকে।অর্থাৎ দরিদ্র নারীরা তাদের পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তার মূল ব্যবস্থাপক। ঐতিহ্যগতভাবে নারীরা জলবায়ু সহিষ্ণু ধান ও অন্যান্য ফসলের বীজ সংরক্ষণে ভূমিকা পালন করে থাকে। এছাড়া ফসল তোলার পর শুকানো ও সংরক্ষণের দায়িত্বও তাদেরই থাকে। এ কাজগুলো পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যথেষ্ঠ প্রভাব বিস্তার করে। নারীরা তাদের হাজার বছরের লোকায়াত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে ফসল উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। বিদ্যমান কৃষি ব্যবস্থাপনায় নারী কৃষকেরা নানাভাবে উপেক্ষিত। জমির মালিকানা না থাকায় কৃষাণীরা রাষ্ট্রীয় প্রণোদনার বাইরে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। বিদ্যমান সরকারি সুযোগ-সুবিধার বাইরে থাকায় তুলনামূলকভাবে নারীকে বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ভার বহন করতে হয়। মজুরি ক্ষেত্রেও রয়েছে নারী কৃষকদের জন্য বৈষম্য। নারী কৃষকদের জন্য পণ্য বিপণনে বিশেষ কোন সুবিধা না থাকায় বাজারে তাদের প্রবেশগম্যতা থাকে না ফলে তুলনামূলক কমমূল্যে পণ্য বাজারজাত করতে বাধ্য হয়। যদিও সরকার নারী কৃষকদের কৃষিকার্ড দিয়েছে তথাপি তারা কৃষি উপকরণ ভর্তুকিসহ সরকারি বিভিন্ন সুবিধা থেকে অনেক ক্ষেত্রেই বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি, গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়ন ও তার অবদানের স্বীকৃতি ছাড়া দারিদ্র্য বিমোচন ও খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন সম্ভব নয়।

নারী কৃষকদের অবদানের স্বীকৃতির লক্ষ্যে আমাদের দাবিসমূহ

বাংলাদেশের সংবিধানে মূলনীতি অংশের ১০ম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জাতীয় জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্র সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করিবে’। নারী কৃষককের অবদানকে স্বীকৃতি প্রদান ও তাঁদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে একটি টেকসই উন্নয়ন বুনিয়াদ তৈরির লক্ষ্যে আমরা নিন্মোক্ত দাবিসমূহ তুলে ধরছি-
* কৃষিক্ষেত্রে ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা ও নারী কৃষকদের অবদান এবং তাদের অধিকারের স্বীকৃতি দিতে হবে
* কৃষি ও উৎপান ব্যবস্থায় তাঁর অবদানকে স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে সম্পদে অগ্রাধিকারভিত্তিক অভিগম্যতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কার্যকর অংশগ্রহণের নিশ্চিয়তা দিতে হবে
* প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী নারীদের কন্ঠস্বর এবং নারী কৃষকদের দাবি-দাওয়া সম্পর্কে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে বিস্তারিতআলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে।
* লেখক একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংগঠনে কর্মরত

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: