সর্বশেষ আপডেট : ৩ মিনিট ১৪ সেকেন্ড আগে
বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

করুণ মৃত্যু

kঅনলাইন ডেস্ক:
মিরপুর ১ নম্বর ওভারব্রিজের পূর্ব পাশে কলওয়ালা পাড়ায় অবস্থিত ডা. আমানত খান হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সিজারিয়ান সেকশানে অপারেশনের মাধ্যমে ফুটফুটে এই নবজাতকটি পৃথিবীতে আসে গত মঙ্গলবার (১১-১০-২০১৬) বেলা এগারোটায়। ময়মনসিংহ থেকে আসা ৩৪ সপ্তাহের গর্ভবতী মায়ের অপারেশনের পরই নবজাতকটিকে লাইফসাপোর্টের জন্য নেওয়া হয় ঢাকা শিশু হাসপাতালে। সেখানে আইসিইউতে বেড খালি না পাওয়ায় এবং পরিবারের সামর্থ না থাকায় লাইফসাপোর্ট দেওয়া সম্ভব হয়নি। খবরটি জেনেই আমি হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মনজুর হোসেন স্যার ও নবজাতক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. একে আজাদ চৌধুরী স্যারকে অনুরোধ করে হাসপাতালে জেনারেল বেডেই ভর্তি করালাম। উনারাও তখন মহররমের ছুটিতে। এরপর মুখে অক্সিজেন মাস্ক নিয়ে নীচতলার এক নম্বর ওয়ার্ডেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল নবজাতকটিকে। গতকাল বিকেলের দিকে হঠাৎ অবস্থার অবনতি হলো। আমি তখন হাসপাতালেই উপস্থিত। দেখলাম, শরীর হলুদাভ হয়ে একরকম নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। ফোন করলাম অধ্যাপক আজাদ স্যারকে। উনার পরামর্শে তিনদিন বয়সী এই নবজাতকের মুখে টিউব লাগিয়ে সিপিআর করাতে করাতে দ্রুত নেওয়া হলো এনআইসিইউতে। সেখানেও কোন উন্নতি নেই। এদিকে আইসিইউতে বেড আছে কিন্তু মেশিন নেই। ডাক্তারদের পরামর্শ, এই মুহূর্তে অন্য হসপিটালে নিয়ে গিয়ে হলেও তাকে আইসিইউতে দ্রুত লাইফসাপোর্ট দিতে হবে। মনকে সান্ত্বনা দিতে পারছি না। সারাদিন রোজা ছিলাম। হাসপাতাল মসজিদে মাগরিব ও এশার নামাজ পড়ে নবজাতকটির জন্য আল্লাহর কাছে অনেক কান্নাকাটি করলাম। কিছু দান করলাম।

হঠাৎ জানলাম, আইসিইতে একটা সিট খালি হয়েছে। কিন্তু তিনদিনের ভাড়া বাবদ ১৫-২০ হাজার টাকা জমা দিতে হবে এক্ষুণি। কিন্তু গরিব রোগীর লোকজনের পক্ষে সেটা দেওয়ার সামর্থ নেই। হাসপাতালের সিনিয়র জনসংযোগ কর্মকর্তার হাকিম ভাইকে রিকয়েস্ট করলাম- একটা কিছু করতে। রাত তখন সাড়ে ৮টা। উনি তখনো হাসপাতালে। তিনি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে দুই বা একদিনের ভাড়া জমা দিতে বললেন। সিদ্ধান্ত নিলাম ভাড়া বাবদ ১০-১২ হাজার টাকা আশপাশের কোনো এটিএম বুথ থেকে তুলে আমি নিজেই দিয়ে দেব। তবুও আল্লাহপাক নবজাতকটিকে বাঁচিয়ে রাখুন। এদিকে পরিচালককেও ফোনে পাচ্ছি না। হঠাৎ পরিচালক মহোদয় আমাকে ফোন ব্যাক করলেন। উনাকে সব বুঝিয়ে বলায় উনি কোনো টাকা ছাড়াই আপাতত আইসিইউতে নিয়ে দ্রুত চিকিৎসা নেবার নির্দেশ দিলেন সংশ্লিষ্টদের। তাৎক্ষণিক নেওয়া হলো আইসিইউতে। এরপর অপেক্ষার পালা। অবশেষে চিকিৎসকদের শেষ চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে রাত ১০টার দিকে ক্ষণিকের জন্য আসা এই নবজাতকটি বিদায় নিলো। একটা গাড়ি ভাড়া করে টাকা-পয়সা দিয়ে লাশসহ তাদেরকে ময়মনসিংহ পাঠিয়ে বিষণ্ন মন নিয়ে গভীর রাতে বাসায় ফিরলাম।

২.

ওপরের ঘটনার চেয়েও আরো মর্মান্তিক ঘটনা হলো- সিজারিয়ান অপারেশনের পর ওইদিন সন্ধ্যায় নবজাতকের মা ২৭ বছর বয়সী খাদিজা বেগম মারা যায় মিরপুরের সেই ডা. আমানত খান ক্লিনিকে। সামান্য একলাম্পশিয়ার (খিচুনি) সমস্যা থাকায় ময়মনসিংহ মেডিকেল থেকে রেফার্ড করা হয়েছিল ঢাকা মেডিকেলে। বলা হয়েছিল, যেহেতু Preterm birth (নির্ধারিত সময়ের পূর্বে জন্ম) তাই আইসিইউ এবং ইনকিউবেটর সাপোর্ট আছে এমন জায়গায় অপারেশন করান। নইলে রোগী বা নবজাতকের ক্ষতি হবে। রোগীর লোকজন দালালের পাল্লায় পরে গর্ভবতীকে ভর্তি করালো মিরপুর ১ নম্বরে কলওয়ালাপাড়ায় অবস্থিত ডা. আমানত খান হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে (এর আগে নামই শুনিনি কোনোদিন)। ১৭ হাজার টাকায় সিজার করা হবে বলে কন্ট্যাক হলো। যেদিন ভর্তি করা হলো সেদিনই সকাল এগারোটায় সিজার হলো। এরপর নবজাতকের অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় নেওয়া হলো ঢাকা শিশু হাসপাতালে। নবজাতকের বাবা মাসুম জানান, শুধু প্রেশার (রক্তচাপ) পরীক্ষা করেই অপারেশন করেছে তারা। অন্য কোনো পরীক্ষা নিরীক্ষা কিছুই করেনি। এমনকি সিজারের পর রোগীর অবস্থা ভালো বলেও তাদের জানিয়েছিল। রোগীকে দেখতে যেতেও দেয়নি। হঠাৎ সন্ধ্যার দিকে হাসপাতাল থেকে জানায়- রোগীর অবস্থা খারাপ। তাড়াতাড়ি অন্য কোথাও নিয়ে যান। রোগীর লোকজন অ্যাম্বুলেন্সে রোগী ওঠাতেই মৃত্যু হয় হতভাগা সেই মহিলার। এরপর লাশ নিয়ে চাপাইনবাবগঞ্জে ছুটে মরহুমের স্বামী ও দুই ভাই। সেখানে দাফন-কাফন শেষ করেই ঢাকা শিশু হাসপাতালে ভিড় জমায় পুরো পরিবার। আশা- যদি নবজাতকটি বেঁচে যায়। কিন্তু সে আশাও পূরণ হলো না।

সব শোনার পর দুর্ঘটনার পরদিন আমি ফোন করি ওই হাসপাতালের 01708309900 নম্বরে। ওখানকার জিএম পরিচয়ধারী নেয়ামত উল্লাহ আমাকে জানালো- রোগীর নাকি কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট (হার্ট অ্যাটাক) হয়েছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই ধরনের রোগীর অপারেশনের পূর্বে তো আইসিইউ, ইনকিউবেটর সাপোর্ট লাগে। আপনাদের ক্লিনিকে তো এ ধরনের সাপোর্ট নেই- তাহলে এত রিস্ক নিলেন কেন? তাছাড়া কী এমন পরিস্থিতি হয়েছিল যে সময়ের আগেই সিজার করাতে হবে?’ সে বললো, ‘রোগীর লোকজন তো অপারেশনের জন্য রাজী হয়েই সাক্ষর করেছে।’ আমি বললাম, ‘সব অপারেশনের আগেই তো সাক্ষর নেওয়া হয়।’ আমি আবারো প্রশ্ন করলাম, ‘অপারেশনের পূর্বে কি ইসিজি, সিরাম ক্রিয়েটিনিন, আরবিএস, সিবিসি, বিটি, সিটি ইত্যাদি পরীক্ষা করানো হয়েছিল?’ আর যখন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছিল তখন আপনারা কী কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন? তিনি জানালেন, ডাক্তার এসব ভালো বলতে পারবেন। আমি ক্লিনিকের কোনো ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে বা তার নম্বর চাইলে তিনি দিতে অপারগতা প্রকাশ করে জানায়, ডা. নুরুন নাহার নিপা নামের এক ডাক্তার ওই নারীর অপারেশন করেছেন। তিনি অন্য ক্লিনিকের, ওখানকার চিকিৎসক নন। গুগলে সার্চ দিয়ে দেখলাম, ওই নারী চিকিৎসক মিরপুরের মেডিনেট, বুশরা, সেলিনা জেনারেল হাসপাতাল, সেবা ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হেলাল ডায়াগনস্টিকসহ অনেকগুলো ক্লিনিকে রোগী দেখেন এবং অপারেশন করান!!!

৩.

গত তিনদিন থেকে আমি স্বাভাবিক হতে পারছি না। নবজাতকের অল্পবয়সী মায়ের অস্বাভাবিক মৃত্যু এবং শেষে নবজাতকটিরও মৃত্যু! ঘটনাটা আমার পরিবারের না হলেও বিষয়টাকে আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। যতটুকু পারি আমি মানুষের বিপদে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করি। কিন্তু এত পরিচিতি, চিকিৎসার এত এত ভালো অপশন থাকার পরও এই হতভাগ্যদের জন্য কিছুই করতে পারলাম না। ওই নারীর রেখে যাওয়া ৫/৬ বছর বয়সী ছেলেটিকে গতকালও দেখলাম- শিশু হাসপাতালে খেলা করছে। মা হারানোর ব্যথা বোঝার ক্ষমতা হয়তো এখনো হয়নি তার।

আমরা সবাই মিলে কি ওই নারী ও নবজাতটিকে হত্যা করিনি? আমরা কি ৫/৬ বয়সী ওই সন্তানটিকে এতিম বানাইনি? গর্ভে সন্তান ধারণ করাই কি ছিল ওই নারীর অপরাধ? এভাবেই কি খাদিজারা অপমৃত্যুর শিকার হবে? আর এভাবে অপচিকিৎসা দিয়ে, মানুষ মেরে টাকা কামাই করা ক্লিনিক/হাসপাতাল মালিকগুলোর কি কোন বিচার হবে না? নাকি এসব দেখার কেউ নেই?

এই ঘটনাটি যখন লিখছি, তখন আমার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। কোনো পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়াই অপারেশন করা- এটা রীতিমতো ক্রাইম। সকল সাংবাদিক বন্ধুদের প্রতি অনুরোধ, সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে প্রকৃত ঘটনা মিডিয়ায় তুলে ধরুন। সব কাগজপত্র আমার কাছে আছে। এতে অন্তত সচেতনতা তৈরি হবে, হয়তো অন্য খাদিজারা বেঁচে যাবে।

আতাউর রহমান কাবুল
(ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে)

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: