সর্বশেষ আপডেট : ৪ মিনিট ৫৯ সেকেন্ড আগে
বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

শিরিন সুলতানার ভাগ্যবিপর্যয় ঘটলো যেভাবে

imagesনিউজ ডেস্ক:
কাউন্সিলের পর প্রথমধাপের ঘোষণায় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক পদে পদোন্নতি পান দুই নারী। অপেক্ষাকৃত তরুণ এ দুই নারীর অতিমূল্যায়ন পাল্টে দেয় জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি। জ্যেষ্ঠতাজনিত কারণে অস্বস্তির মধ্যে পড়েন সংগঠনটির সিনিয়র নেত্রীরা। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের সিদ্ধান্ত নেন মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা ও যুগ্ম সম্পাদক রেহেনা আক্তার রানু। খালেদা জিয়ার কাছে জানতে চান সংগঠনটির সিনিয়র নেত্রীদের অবস্থান কোথায় হতে পারে। শিরিনকে মহিলা দলের সভাপতি পদে পদোন্নতির আশ্বাস দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। এক পর্যায়ে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদমর্যাদা ও অন্য নেত্রীদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়ার দাবি জানান তিনি। কিন্তু এটিই কাল হয় তার। হঠাৎ রেগে যান খালেদা জিয়া। দলে প্রভাববলয় ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরেই শিরিনের বিরুদ্ধে এ ধরনের একটি সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন বিএনপি ও মহিলা দলের একাংশ। পদমর্যাদা সংক্রান্ত বিষয়ে চেয়ারপারসনের রাগের সুযোগটি তাই হাতছাড়া করেননি তারা।

কেবল বিএনপিই নয়, কৌশল আঁটা হয় তাকে মহিলা দল থেকেও সরিয়ে দেয়ার। প্রথমেই তাকে বিএনপির গুরুত্বহীন এক সম্পাদক পদে পদায়ন করা হয় অপেক্ষাকৃত তরুণ নেত্রীদের পরে। তার মতামত সমর্থন করায় কাঙিক্ষত পদ বঞ্চিত করা হয় আরো কয়েকজনকে। চেয়ারপারসনের আশ্বাসে মহিলা দলের সভাপতি পদের আশায় বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক পদ থেকে পদত্যাগ করেন শিরিন। দলের প্রভাববলয় ইস্যুতে আগে থেকেই বিএনপির নীতিনির্ধারক ফোরামের দুই সদস্যের ইঙ্গিতে শিরিনের ব্যাপারে খালেদা জিয়ার কান ভারি করা হচ্ছিল। বিএনপির পদ ছেড়ে দেয়ার বিষয়টিকেও তারা খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্ত অমান্য হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করে। চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পদমর্যাদায় মহিলা দলের সভাপতি হিসেবেই ছিল শিরিনের নাম। শেষ মুহূর্তে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তার বিরোধিতা করেন নীতিনির্ধারক ফোরামের ওই দুই সদস্য মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। পাশাপাশি শিমুল বিশ্বাসের সহায়তায় কৌশলে অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিকল্প হিসেবে প্রস্তাব দেয়া হয় নীতিনির্ধারক ফোরামের এক নেতার স্ত্রী ও চেয়ারপারসনের পছন্দের এক নেত্রীর নাম। সে প্রস্তাব সমর্থন করেন গয়েশ্বর রায় ও শিমুল বিশ্বাস। মুহূর্তেই পাল্টে যায় সব। মহিলা দল থেকেও বাদ পড়েন শিরিন সুলতানা। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কার্ফু ভাঙার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যিনি। খালেদা জিয়ার স্নেহভাজন ও বিশ্বস্ত হিসেবে যার খ্যাতি ছিল দলে। চেয়ারপারসন কার্যালয় বা সমাবেশ মঞ্চে সবখানেই যিনি খালেদা জিয়ার হাত ধরতেন। ২০১৫ সালে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালেও যিনি খালেদা জিয়ার সঙ্গেই অবরুদ্ধ ছিলেন ৯২ দিন। বিএনপি ও মহিলা দলের একাধিক নেতা এবং বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়ের একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। তবে বার বার যোগাযোগ করা হলেও এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন শিরিন সুলতানা।

নির্বাচন কমিশনের বিধি ও আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীর সংখ্যা বাড়ানোর আলোচনা চলছিল বেশ কিছুদিন ধরে। কাউন্সিলের পর পদপ্রত্যাশী নেত্রীরা শুরু করেন জোরালো লবিং-তদবির। তখন একজন ভাইস চেয়ারম্যানের পরামর্শে খালেদা জিয়ার কাছে বিএনপিতে পদোন্নতির ব্যাপারে সিনিয়রিটির ভিত্তিতে নেত্রীদের একটি তালিকা দেয়া হয় মহিলা দলের পক্ষে। প্রথম ধাপের ঘোষণায় তার প্রকাশ না দেখে হতাশা তৈরি হয় মহিলা দলে। এমন পরিস্থিতিতে রিজভী আহমেদকে নিয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার রাজনৈতিক কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করেন মহিলা দলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা ও যুগ্ম সম্পাদক রেহেনা আক্তার রানু। তারা নারী নেত্রীদের জ্যেষ্ঠতার বিষয়গুলো তুলে ধরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে সেটা বিবেচনার অনুরোধ জানান। মহিলা দল সূত্র জানায়, শিরিন সুলতানা বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছে আবদার করে জানতে চান, ‘ম্যাডাম, আমরা কোথায় থাকবো?’ খালেদা জিয়া হাসিমুখে বলেন, ‘কেন, মহিলা দলের সভাপতি হবে।’ এ সময় তরুণ নেত্রীদের পদোন্নতির কথা তুলে ধরে নিজের একটা পদমর্যাদা চান শিরিন সুলতানা। মহিলা দলের সভাপতি পদটিকে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা বা যুগ্ম মহাসচিব পদমর্যাদা দেয়ার কথা বলেন। রাজনীতিতে নারীদের সক্রিয় ও দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা অটুট রাখতে সিনিয়র নেত্রীদের উপযুক্ত মূল্যায়নের দাবি জানান। তখন রেহেনা আক্তার রানু অনুযোগের সুরে এক তরুণ নেত্রীর পিতা-মাতার বিতর্কিত ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তাকে পদোন্নতি দেয়ার সমালোচনা করেন। দীর্ঘদিনের স্নেহভাজন হিসেবে তারা খালেদা জিয়ার কাছে আবদার ও অনুযোগের সুরেই তুলে ধরছিলেন তাদের দাবিগুলো। স্নেহভাজন দুই নেত্রীর কথা শুনে খালেদা জিয়া বলেন, ‘মহিলা দলে যারা এমপি হয়েছিলেন তারা বড় পদ পাবে না।’ এ নিয়ে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে প্রতিবাদ জানান রানু। এক পর্যায়ে তারা খালেদা জিয়াকে বলেন, মহিলা দল নেত্রীদের প্রত্যাশার কথা আপনার কাছে উত্থাপনের জন্য রিজভী আহমেদকেও জানানো হয়েছিল। এ সময় খালেদা জিয়া ক্ষুব্ধ কণ্ঠে রিজভীর কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি পরে বিস্তারিত জানাবেন বলে এড়িয়ে যান। এতে শিরিন-রানুর ওপর রেগে গিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, তোমাদের অনেক কিছুই দিয়েছি।

প্রতিবাদ করে দুই নেত্রী বলেন, ‘বেশির ভাগ সময় বিশ্বাসঘাতক ও নিষ্ক্রিয়রাই পেয়েছেন সে সুবিধা।’ শিরিন বলেন, ‘এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিশ্বস্ত ও সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়েছিলাম আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনই। কিন্তু বারবার আমরা বঞ্চিত হয়েছি। নির্বাচনে মনোনয়ন কিংবা সরকারে থাকাকালে কোনো সুযোগ-সুবিধাই আমরা পাইনি। আপনি কি জানেন, কিভাবে আমাদের সংসার চলে?’ পুরো ঘটনার সাক্ষী হন চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, ঘোষিত কমিটি নিয়ে খালেদা জিয়ার কাছে দল ও দেশবাসীর ইতিবাচক মনোভাবের কথাই জানিয়েছিলেন রিজভী। তাই শিরিন-রানুর ক্ষোভের পর খালেদা জিয়া বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। কমিটি নিয়ে শিরিন-রানুর অবস্থান নিজেদের বিরুদ্ধে যাচ্ছে দেখে পরদিন বাসভবনে গিয়ে শিমুল বিশ্বাসকে নিয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন রিজভী। তারা খালেদা জিয়াকে বুঝান যে, শিরিন-রানুর মনগড়া প্রতিবাদ আমলে নিলে সারা দেশে কমিটি প্রশ্নের মুখে পড়বে। সেদিন রাতে খালেদা জিয়া গুলশান কার্যালয়ে গেলে অন্যদিনের মতো সালাম দিয়ে সামনে যান রানু। কিন্তু সাড়া দেননি খালেদা জিয়া। এ ঘটনা নতুন অস্বস্তির পরিবেশ তৈরি করে মহিলা দলে। পরে বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ব্যাপকভাবে সিনিয়রিটি লঙ্ঘনের ঘটনায় স্থবিরতা নিয়ে আসে মহিলা দলে। বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, ওয়ান ইলেভেনের সময় গ্রেপ্তারের পর মামলা ও সাজার কারণে ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। তখন চেয়ারপারসনের নির্দেশে তার দুই আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন শিরিন সুলতানা ও হাবিব-উন-নবী সোহেল। কিন্তু বিষয়টি সহজভাবে নিতে পারেননি মির্জা আব্বাস।

কারামুক্তির পর চেয়ারপারসনের সঙ্গে দেখা করে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার দুইটি আসনে কাউকে প্রার্থী না করলে কি বিএনপির অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যেতো?’ সেখানে উপস্থিত বিএনপি সরকারের একজন সাবেক উপদেষ্টা (মাহমুদুর রহমান) পরে তার এক লেখায় সেটা উল্লেখও করেছিলেন। নিজের আসনে প্রার্থী হওয়ার পর থেকেই ওই নেতার রোষানলে পড়েন শিরিন ও সোহেল। আব্বাসের হরিহর আত্মাখ্যাত স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়েরও অকারণ বিরোধিতার শিকার হন তারা। অন্যদিকে সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আলোচনায় আসেন মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস। আর পরিবারের সদস্যদের (ভ্রাতৃবধূ) কারণে চেয়ারপারসনের নেক নজরে ছিলেন রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ডহীন মহিলা দলের আরেক নেত্রী সুলতানা আহমেদ। চেয়ারপারসনের একজন ঘনিষ্ঠ নেতার (মোসাদ্দেক আলী ফালু) হাত ধরে এই নেত্রী বিএনপিতে এসেছিলেন ১৯৯৯ সালে। চার বছরের মাথায় সংরক্ষিত মহিলা এমপি পদ ও সাত বছরের মাথায় কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য থেকে একলাফে যিনি পদোন্নতি পেয়েছিলেন ঢাকা মহানগর সভানেত্রী পদে। যার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে বিএনপিতে। অবশেষে আফরোজা-সুলতানার হাতেই দেয়া হয় মহিলা দলের নেতৃত্ব। চেয়ারপারসন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ কারাগারে যাওয়ার পর কমিটি সংক্রান্ত বিষয়ে একচ্ছত্রভাবেই প্রভাব খাটাচ্ছেন শিমুল বিশ্বাস। তারই এক উদাহরণ বিএনপির রাজনীতি থেকে শিরিন সুলতানার পতন। জাতীয়তাবাদীর আদর্শের দীর্ঘ তিন দশকের পরীক্ষিত নেত্রী ও আন্দোলনে ৪২ মামলার আসামি শিরিন সুলতানা কোন পদে নেই। কিন্তু রাজনৈতিক মামলার কারণে বাসায়ও ঘুমাতে পারছেন না তিনি। মানবজমিন

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: