সর্বশেষ আপডেট : ৫৪ সেকেন্ড আগে
বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

অনেকের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলায় গলা টিপে হত্যা করি : রানু রায়

159867_169নবীগঞ্জ প্রতিনিধি ::
পুলিশের হাতে ধরা দিয়েছেন নবীগঞ্জের আলোচিত কলেজছাত্রী তন্বী রায় হত্যা মামলার আসামি রানু রায়। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যার বিবরণ দিয়ে হত্যার কারণ বর্ণনা করেছেন। পরে পুলিশ তাকে আদালতে প্রেরণ করলে রানু রায় গত শনিবার হবিগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিশাত সুলতানার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দেন। রানু রায় নবীগঞ্জের জয়নগর এলাকার সবজি বিক্রেতা কানু রায়ের ছেলে।

স্বীকারোক্তিতে রানু জানান, নবীগঞ্জ পৌর এলাকার শিবপাশা আবাসিক এলাকার একটি বাসায় তন্বী রায়ের পিতা বিমল রায় ও তার পরিবার দীর্ঘদিন ভাড়াটে হিসেবে বসবাস করছেন। এই সুবাদে বিমল রায়ের কন্যা তন্বী রায়ের সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। ঘটনাটি পরিবারের লোকজনদের মধ্যে জানাজানি হলে রানুর পিতা কানু রায় তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অন্যত্র চলে যান। সেখানে যাওয়ার পর নিয়মিত তন্বীর সাথে রানু রায়ের মোবাইলফোনে কথা হতো এবং প্রায় সময় দু’জনের দেখা হতো। কিন্তু রানুকে ফাঁকি দিয়ে একাধিক ছেলের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন তন্বী এবং এসব প্রেমিকের কাছ থেকে বিভিন্ন উপহার সামগ্রী গ্রহণ করেন। সর্বশেষ তন্বীদের বাসার ভাড়াটে জনৈক শিক্ষকের সাথে তন্বীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। এ সম্পর্কের কথা জেনে যান রানু রায়। এতে তন্বীর প্রতি বিক্ষুব্ধ হন রানু। এ নিয়ে তন্বী রায়ের সাথে রানু রায়ের মোবাইলফোনে ঝগড়া হয়। গত ১৭ সেপ্টেম্বর বেলা ১টার দিকে রানু রায়ের অসুস্থতার খবর শোনে তন্বী তার বাসায় দেখা করতে যান। এ সময় রানুর মা, বাবা ও বোন বাসায় ছিলেন না। তারা এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। একপর্যায়ে রানু রায় তন্বীকে অন্য ছেলেদের সাথে প্রেমের সম্পর্কের বিষয় নিয়ে সন্দেহ করে কথাবার্তা বললে তন্বী উত্তেজিত হয়ে উঠেন এবং রানুর গালে থাপ্পড় মারেন। এতে রানু রায় উত্তেজিত হয়ে তন্বীর গলা টিপে ধরেন। কিছুক্ষণ গলা টিপে ধরে রাখার পর যখন গলা ছাড়েন, তখন দেখেন তন্বীর কোনো নড়াচড়া নেই। এ সময় রানু বুঝতে পারেন তন্বী মারা গেছে। এ পরিস্থিতিতে সে তন্বীর লাশ গোপন করার ফন্দি আঁটতে থাকেন। এক পর্যায়ে বাসার দরজার সামনে ব্যবহৃত বস্তার মধ্যে তন্বীর লাশ ঢুকিয়ে বাসায় ভেতরে লুকিয়ে রাখেন। যাতে তার মা, বাবা ও পরিবারের লোকজন এ ঘটনাটি জানতে না পারে। পরবর্তীকালে সন্ধ্যার দিকে তার মা, বাবা ও বোন বাসায় ফিরলে রানু তাদেরকে নজরে রাখেন। রাতে পরিবারের লোকজন ঘুমিয়ে পড়লে সুযোগ বুঝে রানু নিজের বাসার সামনে ইট থাকা সত্ত্বেও অন্য পাশের বাসায় থাকা বাহুবলের শামীম ব্রিক ফিল্ডের ইট এনে বস্তার ভেতর ঢুকিয়ে পার্শ্ববর্তী নদীতে লাশ ফেলে দেন।

স্বীকারোক্তিতে রানু রায় জানান, নিজের বাসার সামনের ইট ব্যবহার করলে তার ধরা পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই খুনের ঘটনার সাথে তার সম্পৃক্ততা যাতে না পাওয়া যায় সেজন্য সে অন্যত্র থেকে ইট এনে তন্বীর বস্তায় ঢুকিয়ে লাশ পানিতে ডোবানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু এরপরও তার শেষ রক্ষা হয়নি।

গত ২০ সেপ্টেম্বর নবীগঞ্জ-হবিগঞ্জ সড়কের নবীগঞ্জ পৌরসভার পাশে বরাক নদীর গড়মুড়িয়া সেতুর নিচে অজ্ঞাত এক মহিলার লাশ অর্ধগলিত ও হাত-পা বাঁধা বস্তাবন্দি অবস্থায় দেখে পুলিশকে খবর দেন স্থানীয় জনতা। খবর পেয়ে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে প্রেরণ করে। খোঁজাখুঁজি পর লাশের পরিচয় পাওয়া যায়। এর পূর্বে ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে তন্বীর বাবা বিমল রায় নবীগঞ্জ থানায় একটি জিডি করেন। পরে তন্বী হত্যার প্রধান টার্গেট প্রেমিক রানু রায়কে সন্দেহ করে পুলিশ তার বাসায় গিয়ে পরিবারের কাউকে পায়নি। এক পর্যায়ে পুলিশ ঘরের তালা ভেঙে হত্যায় ব্যবহৃত নানা আলামত উদ্ধার করে।

এ পরিস্থিতিতে রানু ও তার পরিবারের লোকজন বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান। পালিয়ে থাকতে থাকতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেন রানু রায়। তার অপরাধের কারণে তার পরিবারের লোকজনকেও পালিয়ে বেড়াতে হয়। এজন্য রানু পুলিশের হাতে ধরা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
পুলিশের হাতে ধরা পড়ার বিষয়ে গত শনিবার রাতে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার জয়দেব কুমার ভদ্র। তিনি বলেন, ঘটনার আগের দিন তন্বীর সাথে রানু রায় প্রায় ৪০ বার মোবাইলফোনে কথা বলেছেন। অধিকাংশ ফোনই তন্বী তার মোবাইল থেকে করেন। তাদের মোবাইলফোন খতিয়ে দেখে আরো অনেক তথ্য বের হয়ে আসছে। ধর্ষণের পর তন্বীকে হত্যা করা হয়েছে কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন- জিজ্ঞাসাবাদে ধর্ষণের বিষয়টি রানু স্বীকার করেননি। এমনকি যেভাবে লাশটি পচেছিল, ময়নাতদন্তে ধর্ষণের বিষয়টি বের হয়ে আসবে কি-না সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি। তবে হত্যার আগে তাদের মধ্যে চুমু বিনিময়সহ রোমাঞ্চ হওয়ার কথা রানু স্বীকার করেছেন। হত্যাকান্ডে আর কেউ জড়িত আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, স্বীকারোক্তিতে তন্বীকে সে হত্যা করতে চায়নি বলে জানায়। কিন্তু রাগে তার গলা চেপে ধরেছিল। এতেই তার মৃত্যু ঘটে। ‘একটি মেয়েকে একা কীভাবে খুন করল এবং ভারী লাশ একা কীভাবে নদীতে নিয়ে ফেলল এ নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে’ সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, তাকে আমরা ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। ঘটনার সাথে অন্য কারো জড়িত থাকার কথা সে স্বীকার করেনি। সে বার বার বলেছে, মেয়েটি হালকা গড়নের ছিল। যে-কারণে বস্তায় ভরে টেনে নদীতে ফেলা সম্ভব হয়েছে। পুলিশ সুপার আরো বলেন, এ ব্যাপারে আমরা রানুর মোবাইলফোনের কললিস্ট তদন্ত করে দেখছি। তিনি বলেন, তন্বী হত্যার পর তার মা, বাবা ও পরিবারের লোকজনদের মধ্যে তার জন্য কোনো সুহানুভূতি দেখা যায়নি। এতে মনে হয়েছে, পরিবারের লোকজন মেয়েটির আচরণে বিক্ষুব্ধ ছিলেন।
প্রেস ব্রিফিংকালে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আসম সামছুর রহমান, এএসপি সুদীপ্ত রায়, এএসপি সাজিদুর রহমান, ডিবির ওসি একে এম আজমেরুজ্জামান, এসআই সুদীপ রায়, এসআই আব্দুল করিম।

উল্লেখ্য, নবীগঞ্জ উপজেলার করগাঁও ইউনিয়নের পাঞ্জারাই গ্রামের বাসিন্দা বিমল রায় দীর্ঘদিন ধরে নবীগঞ্জের শিবপাশা শ্যামলী আবাসিক এলাকায় স্ত্রী, এক ছেলে ও নিহত কলেজপড়ুয়া মেয়ে তন্বীকে নিয়ে বসবাস করছেন। গত ১৭ সেপ্টেম্বর দুপুরে নবীগঞ্জ শেরপুর রোডস্থ নানু ভিলা-২ এর দ্বিতীয় তলায় ইউকে আইসিটি কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টারে যাওয়ার কথা বলে তন্বী রায় বাসা থেকে বের হন। নির্ধারিত সময় পার হলেও সে বাসায় ফিরে আসেননি। ওইদিন রাতে নবীগঞ্জ থানায় গিয়ে তার বাবা জিডি করেন। তিন দিন পর ২০ সেপ্টেম্বর নবীগঞ্জ-হবিগঞ্জ সড়কের গড়মুড়িয়া সেতুর নিচে বরাক নদী থেকে হাত-পা বাঁধা বস্তাবন্দি অবস্থায় তার লাশ পুলিশ উদ্ধার করে। ওই রাতে তার বাবা থানায় রানু রায়কে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। এরপর আসামিকে গ্রেফতারের দাবিতে নবীগঞ্জের সর্বস্তরের লোকজন বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচি পালন করেন।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: