সর্বশেষ আপডেট : ৪০ সেকেন্ড আগে
শুক্রবার, ২৩ জুন, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ৯ আষাঢ় ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

স্বাধীনতার জন্য কাশ্মীরিদের চড়া মূল্য

154405_1-1আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বারামুল্লায় নিজ বাড়িতে বসে অধীর আগ্রহ নিয়ে রেডিও পাকিস্তানে টিউন করছেন ভারত-শাসিত কাশ্মীরের এক প্রবীণ। কাশ্মীরের জনগণের হতাশা বা কষ্টের মুহূর্তগুলোতে রেডিও স্টেশনটিই ভরসা। এটা ছিল চলতি বছরের জুলাই মাস এবং রেডিও থেকে মৃদু কণ্ঠস্বরে বলা হল, ‘চাঁদ দেখা গেছে। ৬ জুলাই বুধবার পাকিস্তানে পালিত পবিত্র ঈদুল ফিতর।’

তখনো ভারতের পূর্ব সীমান্ত জুড়ে চাঁদের দেখা মেলেনি। একারণে অল ইন্ডিয়া রেডিও ঘোষণা দিল বৃহস্পতিবার সেখানে ঈদুল ফিতর পালিত হবে। তৎক্ষনাৎ রাতের নীরবতা ভেঙে কয়েক ডজন মসজিদ থেকে একযোগে ঘোষণা দেয়া হল, পাকিস্তানের সঙ্গে কাশ্মীরেও পরের দিন অর্থাৎ বুধবার ঈদ উৎসব পালন করা হবে।

এটা ছিল কাশ্মীরের প্রতি ভারতের গভীর শত্রুতার যথার্থই প্রতিফলন এবং পাকিস্তানের জন্য তীব্র ভালবাসারও বর্হিপ্রকাশ। পাকিস্তানের সঙ্গে কাশ্মিরের মানুষের বিস্তৃত সংস্কৃতি ও দীর্ঘ বাণিজ্যিক ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ কাশ্মীরি জনগণের পছন্দ ভারত ও পাকিস্তান বলয় থেকে বেড়িয়ে এসে নিজস্ব স্বাধীনতা।

কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে  একত্রে উদযাপনের এই পছন্দের জন্য কাশ্মীরের জনগণকে বিশাল মূল্য দিতে হয়েছে এবং এখনো দিতে হচ্ছে। চলতি বছরের ৮ জুলাই সন্ধ্যায় শ্রীনগরের সত্তর মাইল দক্ষিণে হিজবুল মুজাহিদীনের জনপ্রিয় গেরিলা বিদ্রোহী নেতা মুজাফফর বুরহান ওয়ানি (২২) ভারতীয় সৈন্যদের গুলিতে মারা যায়।

হিজবুল মুজাহিদীন কাশ্মীরে পাকিস্তানের একটি কণ্ঠস্বর হিসেবে এবং পাকিস্তানের সঙ্গে কাশ্মীরের সংযুক্তির সমর্থনে ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। সংগঠনটির যোদ্ধাদের অনেকে মুসলিম ব্রাদারহুডের দক্ষিণ এশীয় সংস্করণ ডানপন্থী সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠন জামায়াত-ই-ইসলামীর মতাদর্শে অনুপ্রাণিত। হিজবুল মুজাহিদীন সৃষ্টি হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ভারতের বিরুদ্ধে কাশ্মীরি সশস্ত্র প্রতিরোধে আধিপত্য বিস্তার করেছে ‘জম্মু ও কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্ট’।

যাইহোক, এ অঞ্চলে তার কৌশলগত স্বার্থ শক্তিশালী করার জন্য ১৯৯০ এর দশকে পাকিস্তান কাশ্মীরি জাতীয়তাবাদী যোদ্ধাদের সহায়তা বন্ধ করে দেয়। পরিবর্তে হিজবুল মুজাহিদীনের মত বিদ্রোহী সংগঠনগুলোকে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে আসছে। কাশ্মীরে ঈদুল ফিতর উদযাপনের তৃতীয় দিনে ভারতীয় বাহিনী বুরহান ওয়ানির ওপর হামলা চালায়। পরের দিন খুব ভোরে বুরহানের সমর্থকরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাজার হাজার জনতা তাকে এক নজরে দেখার জন্য সমবেত হতে থাকে।

মাত্র ষোল বছর বয়সেই তিনি ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। তার দৃঢ়তার কারণেই কাশ্মীরের জনগণ তাকে নায়কের মর্যাদা দিয়েছিলেন। শিগগিরই ২,৫০,০০০ মানুষ সেখানে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। যা কাশ্মিরের সাম্প্রতিক ইতিহাসে বৃহত্তম জমায়েত। শহরের সংকীর্ণ রাস্তায়, খোলা মাঠে, এবং ফলের বাগান সর্বত্রই লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। নিরস্ত্র জনতার স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। শোকার্ত জনগণ প্রতিবাদী স্লোগান দিয়ে, পাথর নিক্ষেপ করে এবং কয়েকটি ফাঁড়িতে আগুন দিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে।

নিরস্ত্র জনতার প্রতি ভারতীয় বাহিনীর সাড়া ছিল খুবই দ্রুত এবং নিষ্ঠুর। দক্ষিণ কাশ্মিরের প্রধান শহরের জেলা হাসপাতালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই দিন বিকেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে চারজন বিক্ষোভকারী নিহত হয় এবং অনেক শিশু ও নারীসহ আরো কয়েক ডজন মারাত্মক আহত হয়। যাদের অধিকাংশই বুলেট এবং ছররা গুলিতে আহত হন।

বুরহানের জন্য শোক প্রকাশকারীদের ওপর ভারতীয় বাহিনীর নির্বিচার গুলিবর্ষণের ঘটনা এ বিক্ষোভকে কোনোমতেই দমাতে পারেনি বরং এ বিক্ষোভ বিশাল আকারে কাশ্মীরের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়েছে। তারপর থেকেই নিরস্ত্র জনতার বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে।

ভারতীয় বাহিনীও ক্রমবর্ধমানভাবে মরিয়া হয়ে ওঠেছে কাশ্মীরিদের এ বিক্ষোভকে যেকোনো মূল্যে দমন করার জন্য। সেখানে ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন সেবা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং জুলাই মাসে বেশ কিছু দিনের জন্য কাশ্মিরের সংবাদপত্র প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিল। যাতে বাইরের জগতের মানুষ জানতে না পারে কি নির্মমতা এখানে চালানো হয়েছে।

এ পর্যন্ত ৮৫ জন প্রতিবাদীকে হত্যা করা হয়েছে। আরো অন্তত ছয় হাজার বিক্ষোভকারী বুলেট ও ছররা গুলির আঘাতে নির্মম যন্ত্রনা ভোগ করছে। এতে অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ ও চিরতরে অন্ধ হয়ে গেছে।

শ্রীনগরের শ্রী মহারাজা হরি সিং হাসপাতালে সাম্প্রতিক এক সফরকালে দেখা গেছে হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা প্রতিটি মুখ মারাত্মক ক্ষত চিহ্ন বহন করছে। তরুণদের চোখের পিছনে গোপন কালো ছায়া লেগে আছে। ছররা গুলিতে চোখের জখম নিয়ে সেখানে প্রায় ছয় শতাধিক মানুষ চিকিৎসা নিচ্ছে।

হাসপাতালের চক্ষু বিশেষজ্ঞদের মতে,  শতাধিকেরও বেশি ভিকটিম আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে অন্ধ হয়ে গেছে। ছররা গুলির আঘাতে সেখানে ঠিক কতজন আহত হয়েছে তার নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও ধারণা করা হচ্ছে,  কাশ্মীরের সর্বত্র অন্তত কয়েক হাজার মানুষ এতে আহত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কোনো অঙ্গে এটি আঘাত করলে তা সহজেই প্রাণঘাতী হতে পারে।

কাশ্মীর উপত্যকার স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘদিন ধরে সেখানকার নিরীহ জনতাকে নানা নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। ‘কাশ্মীরের মানুষকে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ভবিষ্যত পছন্দের সুযোগ দেয়া হবে’- দশকের পর দশক ধরে ভারতীয় নেতাদের এরকম প্রতারণাপূর্ণ প্রতিশ্রুতিতে কাশ্মীরের মানুষ এখন ক্লান্ত। বছরের পর বছর ধরে চালানো নিপীড়ন, নির্যাতন, এবং রাজনৈতিক অধিকার প্রদানে অস্বীকৃতি ভারতের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়ে আছে এবং এটা কাশ্মীর জুড়ে তীব্র প্রতিবাদের সূত্রপাত করেছে।

বোস্টন রিভিউ অবলম্বনে মো. রাহুল আমীন

আরটিএনএন থেকে নেওয়া

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: