সর্বশেষ আপডেট : ৭ মিনিট ৫৪ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

ভালো নেই ‘মুক্তিবেটি’ কাঁকন বিবি

photo-kakonbibi-biswanath-sylhet-17-09-2016ডেইলি সিলেট ডেস্ক:
ভিটেমাটি-ঘর হয়েছে। হয়েছে মাথা গুজার ঠাঁই। দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের জন্যে এখন আর অসুস্থ শরীর টেনে হিঁচড়ে ভিক্ষে করতে হয় না তাকে। একটু বিশ্রামের জন্যে কারো গোয়াল ঘর কিংবা হাঁস-মুরগির পরিত্যাক্ত ঘরে রাত কাটাতে হয় না আর। তবুও ভালো নেই একাত্তরের সেই অসম সাহসী নারী, বীরমাতা, মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবি (বীরপ্রতীক)। ভালোবেসে এই মাকে মানুষ ‘মুক্তিবেটি’ নামে ডাকেন। ঘর-বাড়ি, সাহায্য-সম্মাননা তাকে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার সুযোগ করে দিলেও দুর্বিসহ কষ্ট পিছু ছাড়েনি তার। শত বছর বয়সি শরীরে বাসা বেধেঁছে নানাবিধ রোগ। চোখের জ্যোতিও কমে গেছে অনেকটা। বর্তমানে বহু কষ্টে চিকিৎসা সেবা চলছে তার।

কাঁকন বিবির সন্ধানে ভাটির জেলা সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার লিপুর ইউনিয়নের জিরার গাঁও গ্রামে যাওয়া হয়। উদ্দেশ্য তাঁর খোঁজখবর নেয়া। তাঁর মুখে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনা। গিয়ে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া জমিতে ঘর করে বসবাস করছেন তিনি। বাড়ির উঠোনে কাজ করছিলেন তার মেয়ে সখিনা। খবর পেয়ে লাঠি ভর দিয়ে বেরিয়ে আসেন। পরিচয় জেনে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন বীরমাতা। পরে দেশ ও মানুষের মঙ্গল কামনা করে মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলেন দীর্ঘ সময়। তার কথায় উঠে আসে যুদ্ধের বীরগাঁথার স্মৃতি, পাকবাহিনীর অত্যাচার-যন্ত্রণার লোমহর্ষক বর্ণনা। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে পাকবাহিনীর অসভ্যতার চিহ্ন-ই যেনো নির্মম নির্যাতনের স্বাক্ষী। পরে কথা হয় তার সহযোদ্ধা উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান ও ফয়েজ মাস্টারের সাথে। তারা তুলে ধরেন কাঁকন বিবি’র বীরত্বের কথা।

কাঁকন মুক্তিযুদ্ধে যেমন অস্ত্র হাতে সম্মুখ যুদ্ধে লড়েছেন- তেমনি যুদ্ধাহতদের সেবাও দিয়েছেন পরম মমতায়। রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের গোপনে পৌছে দিতেন অস্ত্র ও খাবার। জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে পাকবাহিনীর ক্যাম্প ঘুরে ঘুরে তথ্য সরবরাহ করতেন মুক্তিবাহিনীকে। পাকবাহিনী পাকড়াও করে তাকে। টানা সাতদিন আটকে রেখে চালায় অমানুষিক অত্যাচার। বিকৃত উল্লাসে জলন্ত সিগারেট দিয়ে ছ্যাঁক দেয় উরু ও তলপেটে। লোহার রড গরম করে ঝলসে দেয় হয়া শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। মৃত্যুর অধিক যন্ত্রনা সহ্য করেও প্রাণে বেঁচে যান তিনি। নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েও নৈতিকভাবে পরাজিত হননি। মরনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও স্বীকার করেননি, তিনি মুক্তিবাহিনীর গুপ্তচর।

কাঁকন বিবির জন্ম বৃটিশ ভারতের মিজোরাম প্রদেশে মেঘালয়ের কোল ঘেঁষা খাসিয়া গ্রাম নত্রাইয়ে। বাবা নাম গিসয় ও মা মেলি তার নাম দেন কাকেট হেনইঞ্চিতা। যৌবনে ভালোবেসে ধর্মান্তরিত হয়ে তিনি পাঞ্জাবী সৈনিক আবদুল মজিদ খানকে বিয়ে করেন। তাদের সংসার জীবনের কিছুদিন পর অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয় দেশে। এরপর মুক্তিযুদ্ধ। তখন স্বামীর সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয় তার। স্বামীর সন্ধানে পাকবাহিনীর বিভিন্ন ক্যাম্পে গিয়ে তিনি দেখেন বাঙালী নারীদের উপর বর্বরতার চিত্র। ফিরে এসে ৫নং সেক্টর কমান্ডার মেজর মীর শওকত আলীর পরামর্শে নিজের পাঞ্জাবী স্বামীর পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে মুক্তিবাহিনীর সোর্স হিসেবে কাজ শুরু করেন। কখনও ভিক্ষুক, কখনও স্বামী খোঁজার অজুহাতে তিনি পাকবাহিনীর ক্যাম্প গিয়ে তাদের অবস্থা, সংখ্যা ও অস্ত্রের ধরণ জেনে মুক্তিবাহিনীকে জানালে তারা সফল অপারেশন পরিচালনা করতেন। বেশিরভাগ সময় তিনিই শত্রু এলাকায় গ্রেনেড বহনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি করতেন। এছাড়া জর্ডিয়া ব্রীজ ধ্বংসে সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব তার। গভীর রাতে যখন মুক্তিবাহিনী ব্রীজ ধ্বংসের সিদ্ধান্ত নেয় তখন কাঁকনই কলাগাছের ভেলায় করে বোমা ও অন্ত্র নিয়ে একাই জার্ডিয়া সেতুর কাছে পৌছান। পরে আরো ক’জন মুক্তি মিলে উড়িয়ে দেন ব্রীজ। তিনি মহব্বতপুর, কান্দাগাঁও, বসরাই, টেংরাটিলা, বেটিরগাঁও, নুরপুর. দোয়ারাবাজার, টেবলাই, সিলাইরপাড়াসহ অনেক সফল অপরেশনে যুদ্ধ করেছেন, বহন করেছেন গ্রেনেড, গোলা-বারুদ।

দেশ স্বাধীন হলে তার খবর রাখেনি কেউ। জীবনধারনের জন্যে আশ্রয়হীন কাঁকন ভিক্ষাবৃত্তি শুরু করেন। স্থানীয় এক কৃষকের পরিত্যাক্ত ঘরে ঠাঁই হয় তার। স্বাধীনতার ২৫ বছর পর ১৯৯৬ সালে মিডিয়ায় উঠে আসে তার করুণ কাহিনী। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে এক একর জমি দান করেন। সেখানে ঘর করে দেয় জনতা ব্যাংক। দেয়া হয় বীরপ্রতীক উপাধি। এছাড়াও কয়েকটি পত্রিকা, নারী সংগঠন ও প্রবাসী বাঙালি সংগঠন এই অকুতোভয় যোদ্ধাকে নানাভাবে সম্মানিত করে।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: