সর্বশেষ আপডেট : ৩ ঘন্টা আগে
শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

সুনামগঞ্জের মরমী কবি আজিম উদ্দিন ও তার গানের ভূবন

unnamedআল-হেলাল : সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার মরমী সংস্কৃতির এক উজ্জল নক্ষত্রের নাম মরমী কবি আজিম উদ্দিন। তাঁর পিতার নাম জালাল উদ্দিন,মাতা জুলেখা বিবি। তিনি ১৮৬১ সালের ১লা মার্চ ভাটিপাড়া গ্রামের তালুকদার পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। মৃত্যুবরন করেন ১৯৫৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারী। মরমী কবি রাধারমন,হাছন রাজা,আব্দুর রাজ্জাক কালা শাহ এর সমসাময়িক বাউল শিল্পী ছিলেন তিনি। তার সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্র ছিল তৎকালীন ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চল। সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি তিনি রাজনীতিতেও সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। খেলাফতে রব্বানী পার্টির সক্রিয় নেতা হিসেবে তিনি সমগ্র আসাম প্রদেশে সাংগঠনিক কর্মকান্ডে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেন।

একই গ্রামের বিখ্যাত জমিদার খান বাহাদুর গোলাম মোস্তফা চৌধুরী ১৯৩৭ সালে আসাম প্রাদেশিক আইন পরিষদে এম.এল.সি নির্বাচিত হন। নির্বাচনে নিজ গ্রামের ও দলের প্রার্থী গোলাম মোস্তফা চৌধুরীর পক্ষে মরমী কবি আজিম উদ্দিন গণ সংযোগ পরিচালনাসহ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। নির্বাচনের পর কৃতজ্ঞতা স্বরুপ শপথ গ্রহন শেষে এমএলসি খান বাহাদুর গোলাম মোস্তফা চৌধুরী তাকে একান্ত সচিব (পিএস) পদে নিয়োগ দান করেন। এ সুযোগে তৎকালীন যুক্তরাজ্যে এমএলসি গোলাম মোস্তফার সাথে সরকারী সফরে যান কবি আজিম উদ্দিন। এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে সুনামগঞ্জ জজকোর্টের বিজ্ঞ আইনজীবী ও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ভাটিপাড়া নিবাসী এডভোকেট আব্দুল ফাতির চৌধুরী শিরীন মিয়া বলেন,জমিদার ও এমএলসি খান বাহাদুর গোলাম মোস্তফা চৌধুরী মরমী কবি আজিম উদ্দিনকে এতটাই সম্মান করতেন যে,নিজ খরচে তিনি তাকে বিলেতে নিয়ে যান।

ভাটিপাড়া গ্রাম ও কিছু কথা :

মরমী কবি আজিম উদ্দিন ও বাউল কামাল পাশা (কামাল-উদ্দিন) এই ২পিতাপুত্রের জন্মস্থান ভাটিপাড়া একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রাম। এ গ্রামের পূর্ব নাম ছিল আহমদপুর। বর্তমান ভাটিপাড়া গ্রামের দক্ষিনে উচুভিটা যেখানে কবরস্থান রয়েছে, সেই স্থানটিতে প্রথমে আহমদ আলী নামে এক ব্যক্তি বসবাস করতেন। তার নামানুসারে থাকবস্ত জরীপের প্রাক্কালে ঐ এলাকার নামকরন হয় আহমদপুর। পরে হাওড়ের ঢেউয়ের কবলে আহমদপুর বিলীন হয়ে ভাটিতে পতিত অবস্থায় যে পাড়া গড়ে উঠে তার নামই হয় ভাটিপাড়া। এ গ্রামেরই সুযোগ্য কৃতি সন্তান খান বাহাদুর গোলাম মোস্তফা চৌধুরী ১৯৩৭ইং সনে খেলাফত এ রব্বানী পার্টির মনোনয়নে আসাম প্রাদেশিক আইন পরিষদে এম.এল.সি নির্বাচিত হন। গোলাম মোস্তফা চৌধুরী,গোলাম সারোয়ার চৌধুরী কাচা মিয়া ও আবুবকর চৌধুরী প্রমুখ জমিদারদের প্রচেষ্ঠায় ১৯৫২ সালে ভাটিপাড়ায় বর্তমান হাইস্কুলটি স্থাপন করা হয়। মরমী কবি আজিম উদ্দিন ও বাউল কামাল উদ্দিন ছিলেন এর অন্যতম উদ্যোক্তা। প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক হিসেবে জামালগঞ্জ উপজেলার গোলাম কিবরিয়া পরবর্তীতে একই থানার জাল¬ালাবাদ গ্রামের হবিবুর রসুল চৌধুরী কাপ্তান মিয়া, রফিনগর ইউনিয়নের খাগাউড়া গ্রামের রাকেশ রঞ্জন তালুকদার, বলনপুরের গুরুদয়াল পুরকায়স্থ ও ভাটিপাড়া গ্রামের আব্দুল গাফফার চৌধুরী কোয়িল মিয়া সহ শিক্ষক হিসেবে এ অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন। পরে হায়দরিয়া দাখিল মাদ্রাসাও স্থাপন করা হয়। ১৯৫২ সালে মাতৃভাষা বাংলার দাবীকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে ভাটিপাড়া গ্রামের দুই কৃতি সন্তান যথাক্রমে অধ্যাপক আব্দুল মতিন ও আবুল হাশিম চৌধুরী সুনামগঞ্জের রাজপথে ছাত্র আন্দোলন গড়ে তুলেন। জমিদারদের প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে জমিদার বাড়ি, মসজিদ,তহশিল অফিস ও কাছারী ঘরের অস্তিত্ব এখনও বিদ্যমান।

পিতাপুত্র সম্পর্কে লোকগীতি সংগ্রাহকদের অভিমত :

হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট থানার আহমদাবাদ ইউনিয়নের বনগাঁও নিবাসী প্রখ্যাত গবেষক মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান ১৯৯৬ সালে ২৬ মার্চ প্রকাশিত তার “সিলেট বিভাগের পাচশ মরমী কবি” শীর্ষক গ্রন্থের ১৪২ পৃষ্টায় উল্লেখ করেছেন, কবি আজিম উদ্দিন সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই থানার ভাটিপাড়া গ্রামের অধিবাসী। গ্রামে তিনি টিয়ার বাপ নামে পরিচিত ছিলেন। মরমী মারফতি সঙ্গীত রচনা ছাড়াও তিনি নিজে তার রচিত গানে সুর সংযোজন করতেন। সঙ্গীতের ব্যাপারে আজিম উদ্দিন ওরফে টিয়ার বাপই ছিলেন ছেলে কামাল উদ্দিন সাহেবের ওস্তাদ। অধ্যাপক মোহাম্মদ আসাদ্দর আলী সাহেবের মাধ্যমে হবিবপুর নিবাসী জনাব এ,কে ওমর সাহেবের কাছ থেকে পিতা পুত্রের কতিপয় গান সহ এসব বিবরন আমি সংগ্রহ করতে পেরেছি। নমুনা হিসেবে নীচে আজিম উদ্দিন সাহেবের একটি মরমী সঙ্গীত উল্ল্যেখ করা হলো। যেমন-
জীবন মুক্তি হবে কিসে,বদ্ধ রইলে তুই অক্টোপাশে
চিনবে সে মানুষে কিসে চিনবে সে মানুষে ।।
মানুষে মানুষ চিনে থাকে যে পশুর স্থানে
আচারে আলাপনে নয়নে যে ভাসে।
শুদ্ধ জীবে রুদ্ধ মানুষ ভাগ্য গুনে আসে
কানে শোনা সোনার মানুষ ধরা দেয়না কোন বা দোষে ।।
যে মানুষও পরশমণি, নিকটে তার অষ্টোফনী
চিনে যারা জ্ঞানী গুনী উড়ে যায় তার পাশে।
কেউ যদি ধরিতে চায় সাহসের পরশে
অনায়াসে সাধূ সেজন হয়রে ভক্তির বিশ্বাসে।।
সময় থাকতে কথা ধরো নিজে নিজের বিচার করো
আছে সে নিজের ঘরো খুজলে পাবে শেষে।
অধম পাগল ঠেকে রইলাম মাকড়েরই আশেঁ
গুরু বলেন ঠেকলে আজিম অল্প একটু অবিশ্বাসে”।।

সিলেট বিভাগের পাঁচশ মরমী কবি” গ্রন্থের ৮০নং পৃষ্ঠায় লেখক, গবেষক মোঃ সিদ্দিকুর রহমান আরো উল্লেখ করেন “ বাউল কবি দুর্বীন শাহ, কামাল উদ্দিনকে শ্রদ্ধা করতেন কেবল অগ্রজ হিসেবে নয় স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী একজন শক্তিশালী কবি হিসাবেও। অসংখ্য গান তিনি রচনা করেছিলেন। তবে কোন গ্রন্থ না থাকায় তার অনেক গানকে অন্যেরা হজম করে নিয়েছে।”

১৯৯৫ সালের ১৪ এপ্রিল সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার লুদুরপুর নিবাসী প্রখ্যাত গবেষক ডঃ মোহাম্মদ আসাদ্দর আলী তার লোক সাহিত্যে জালালাবাদ শীর্ষক গবেষনা মূলক গ্রন্থের ১৭১ পৃষ্টায় উল্লে¬খ করেন, “বাউল কামাল উদ্দিন বাউল কবি রাধারমণ দত্তের ন্যায় অনর্গল গান রচনা করতে পারতেন । কবিত্ব শক্তির দিক থেকে তিনি অনেকের উর্ধ্বে ছিলেন। কত শত গান যে তিনি রচনা করেছিলেন সেটা বলা সম্ভব নয়। তিনি এখন ইহজগতে নেই এবং তার মুদ্রিত কোন গানের বইও আমি কখনো দেখিনি । তার বংশধরদের কাছে পান্ডুলিপি আকারের কোন সংগ্রহ জমা আছে কিনা সেটাও জানতে পারিনি। আমার জানামতে তার একজন যোগ্য শিষ্য ধল নিবাসী প্রখ্যাত লোক কবি শাহ আব্দুল করিম এখনও জীবিত আছেন একমাত্র তিনি প্রচেষ্টা চালালে কামাল সাহেবের অনেক গান সংগ্রহ করতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস”। বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম বলেন, “আমি কামাল উদ্দিনের শিষ্য নই। তবে তিনি আমি ও দূর্বীন শাহ এর সিনিয়র উচ্চ শিক্ষিত বাউল শিল্পী ছিলেন”।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সিলেট শুভাগমন কালে বিদ্রোহী কবির শুভাগমনকে স্বাগত জানিয়ে সঙ্গীত পরিবেশন করেন বাউল কামাল উদ্দিন। নুপুর পায়ে নজরুলের সাড়া জাগানো নৃত্যের দৃশ্য অনুসরন করে সর্বদাই গানের সাথে নুপুর পায়ে ঘাটু সাজিয়ে নৃত্য পরিবেশন করানোর পাশাপাশি গান গাইতেন কামাল পাশা। বিভিন্ন আসরে লাল শাড়ি পড়ে নেচে গেয়ে বেড়াতেন বলে কবি নজরুলকে অনেকে যেমন বেসরা ও নটরাজ বলতেও দ্বিধা করতেন না তেমনি একই অপবাদেও ভাগ্যবরণ করেন তিনি। পুরুষ হওয়ার পর মহিলা সাজিয়ে ঘাটু বানিয়ে গান গাওয়ার এই প্রাক প্রবনতা বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে সর্বপ্রথম কামাল উদ্দিনই পরিবেশন করার পান্ডিত্য প্রদর্শন করেন। এ ধরনের অঙ্গ ভঙ্গিমায় পরিবেশিত গানকে ভাটিবাংলায় ঘাটু গান এবং নৃত্যকে ঘাটুনাচ বলা হয়। বাউল স¤্রাট শাহ আব্দুল করিম তার সম্প্রীতির গানে,“গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান মিলিয়া বাউলা গান আর ঘাটু গান গাইতাম” বলে এই গানের কথাই বলে গেছেন। এ প্রসঙ্গে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম বলেছেন “কামাল উদ্দিনের ২টি বড় গুণ,মিছা কথা কয়না বড় সুন্দর নাচে এর লাইগ্যা সঙ্গ ধরছিলা আমার বাবার পাছে”(১৯৬০ ইং দিরাই থানার উমেদনগর গ্রামে পালা গানের আসরে কামাল-করিম)। ভাটিপাড়া গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত ইউনিয়ন পরিষদ সচিব ও গীতিকার আব্দুল ওয়াহিদ চৌধুরী লেদু মিয়ার কাছ থেকে বাউল কামাল উদ্দিনের পিতা আজিম উদ্দিনের নিম্নোক্ত গানটি পাওয়া যায়।
“কাজ করিলে মান যাবে তোর
কোন হাদিসে পাইলেরে ভাই মুসলমানের ছেলে ॥
ও ভাইরে ভাই নিজের কাজ নিজে করতে নাইরে কোন লাজ
মুয়াযযিনের আযান শুনিলে পড় গিয়ে নামাজ।
এক গোদাড়ায় সব-ই চড় উঠ দলে দলে
নিজের কাজে মানা করে বলো কোন পাগলে ॥
ও ভাইরে ভাই শ্রীসঙ্গ না করিলে হয়নারে সন্তান
নিজের ক্ষেতে কাজ না করলে ফলবেনারে ধান।
বৃক্ষরোপন করে যদি তত্ত্ব নাহি মিলে
বিনাতত্ত্বে বলো দেখি সেই বৃক্ষ কি ফলে।।
ও ভাইরে ভাই কাজের কথা কইতে কইতে গেলরে জীবন
কর্মধারকে ভালো পান সাই নিরাঞ্জন।
আমার কথা না মানিয়া কামালরে ঘুরাইলে
দেশ বিদেশে শুনি কত রসের গান গাওয়াইলে।।
ও ভাইরে ভাই মাখারু মাখারিন আল্লাহ বলেছেন কোরানে
মক্কর বুঝিতে সাধ্য নাহি কার ভূবনে।
আদমকে প্রথম কাজ শিখান জীব্রাইলে
আজিম বলে বিশ্বাস না হয় দেখো হাদিস খুলে”।।

আজিম উদ্দিন সাহেবের একটি গান তার নিজ গ্রামে এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছে যে,সুদুর আমেরিকা লন্ডন কানাডা মধ্যপ্রাচ্য এবং দেশের রাজধানী ঢাকা,বিভাগীয় শহর সিলেট,জেলা শহর সুনামগঞ্জ ও উপজেলা সদর দিরাইসহ বিশ্বের প্রায় সকল উন্নত শহরে কাজের সন্ধানে বসবাস করছেন ভাটিপাড়া গ্রামের সাধারন মানুষ। যারা কাজকেই নিজের ব্রত হিসেবে সহজে গ্রহন করে নিজেদেরকে স্বাবলম্বী করার প্রানান্তকর প্রচেষ্টা চালান উল্লেখ করে,খ্যাতনামা নাট্যকার গীতিকবি দেওয়ান মহসিন রাজা চৌধুরী (বর্তমানে মরহুম) বলেন, স্থানীয় শিল্পকলা একাডেমীর অন্যতম উদ্যোক্তা সুনামগঞ্জের সাহিত্য সাংবাদিকতায় কিংবদন্তী পুরুষ আব্দুল হাই ও মহকুমা এসডিও আব্দুল মোত্তালিব সাহেব এর উদ্যোগে ১৯৬৪ইং সনের ১৮ ফেব্র“য়ারী থেকে ২৪ ফেব্র“য়ারী সপ্তাহব্যাপী যে সাহিত্য ও সংস্কৃতি উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল সেই উৎসবে শিল্পী আব্দুল আলীম ওস্তাদ বাউল কামাল উদ্দিন এর সাথে সঙ্গীত পরিবেশন করেন। এবং বাউল কামাল পাশা তার ওস্তাদ পিতা মরমী কবি আজিম উদ্দিনের “জীবন মুক্তি হবে কিসে,বদ্ধ রইলে তুই অক্টোপাশে” গানটি পরিবেশন করেন। সপ্তাহব্যাপী এই সরকারী উৎসবে দেশের প্রায় অর্ধ শতাধিক প্রতিদ্বন্দ্বি বাউল শিল্পীকে পালা গানে হারিয়ে অনুষ্ঠানের শ্রেষ্ট সঙ্গীত শিল্পীর স্বীকৃতি পান বাউল কামাল উদ্দিন। সমাপনী অনুষ্ঠানে গানের স¤্রাট কামাল পাশা উপাধিতে ভূষিত করার পাশাপাশি সম্মাননা সনদ প্রদান করা হয় তাকে।

মরমী কবি আজিম উদ্দিনের উত্তরাধিকারী :

মরমী কবি আজিম উদ্দিন এর সুযোগ্য পুত্র বাউল কামাল পাশা (কামাল উদ্দিন) ১৯০১ সালের ৬ ডিসেম্বর তৎকালীন সুনামগঞ্জ মহকুমার দিরাই থানার ভাটিপাড়া গ্রামে তালুকদার বাড়িতে জন্মগ্রহন করেন। কবি আজিম উদ্দিনকে সকলে ডাকতো টিয়ার বাপ বলে। তার সহধর্মীনি আমেনা খাতুন ডাক নাম ঠান্ডার মা। ২ ভাই ২ বোনের মধ্যে কামাল উদ্দিন ছিলেন কবি আজিম উদ্দিনের জেষ্ঠ পুত্র। কামাল উদ্দিনের প্রথম স্ত্রীর নাম কার্ফূলি বেগম ওরফে রাবিয়া খাতুন। প্রতিবেশী তাগির উদ্দিনের কন্যা রাবিয়াকে ভালবেসে কামাল উদ্দিন পরিনয়ে আবদ্ধ হওয়ার পর তাদের ঔরসে একমাত্র কন্যা শাফিয়া খাতুনের জন্ম হয়। প্রথম কন্যার বিবাহ হয় একই গ্রামের উসমান মিয়ার সাথে। কন্যা শাফিয়ার এক যুগ পার হতে না হতেই রাবিয়া খাতুন জান্নাতবাসী হন। পরে স্ত্রী বিয়োগের শোকে শোকাহত কামাল দ্বিতীয়বারের মত একই গ্রামের মৃত কালা মিয়ার বিধবা স্ত্রী তহুরা খাতুনকে বিবাহ করেন। কালা মিয়ার অসহায় কন্যা জাকিয়া খাতুনকে সম্বল করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি অতিবাহিত করেন। পালিত কন্যা জাকিয়া খাতুন বৃদ্ধ বয়সে কামাল উদ্দিনকে সার্বিক সেবা শস্রষা করতেন। জীবদ্ধশায় ভাটিপাড়া গ্রামের মরহুম মতছিন বিল্লাহ তালুকদারের পুত্র জালাল ফকিরের কাছে বিবাহ দিয়ে যান। এবং পালিত কন্যা ও জামাতার সংসারেই বসবাস করেন।

প্রথম কন্যা শাফিয়া বেগম, প্রথম স্ত্রী রাবিয়া খাতুন ও কনিষ্ঠ ভ্রাতা জামাল উদ্দিন তার জীবদ্ধশাতেই লোকান্তরিত হন। ১৩৯১ বাংলায় ইষ্টার্ন ফিল্ম ক্লাব ২ জন সহকর্মী শিল্পীকে নিয়ে লন্ডন সফরের জন্য তাঁকে আমন্ত্রণ জানায়। কিন্তুুু শারীরিক অবস্থার ক্রমাবনতির কারণে তার যাওয়া হয়নি। পরে তার মনোনিত প্রতিনিধি হিসেবেই ক্লাবের আমন্ত্রনে ছাতকের দুর্বীন শাহ সহকারে লন্ডন সফর করেন বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম। ইংরেজী ১৯৮৫ সাল বাংলা ১৩৯২ সালের ২০ বৈশাখ শুক্রবার রাত ১২টায় নিজ বাড়িতে ইন্তেকাল করেন গানের সম্রাট বাউল কামাল পাশা। তাই প্রয়াত এই পিতাপুত্রের অবর্তমানে আজ তাদের কোন সুযোগ্য উত্তরাধিকারীও নেই।

প্রতিবেদকের আহবাণ :

পরিশেষে বলতে চাই শুধু সুনামগঞ্জ জেলা নয় সারা বাংলাদেশ তথা বিশ্বের সকল বাংলা ভাষাভাষি জনগোষ্ঠীর সামনে দ্বিলকী দয়া হয়না কিংবা প্রেমের মরা জলে ডুবেনাসহ হাজার হাজার মরমী গান রেখে গেছেন মরমী সংস্কৃতির উজ্জল নক্ষত্র হিসেবে চিহ্নিত পিতাপুত্র মরমী কবি আজিম উদ্দিন ও বাউল কামাল পাশা। তাদের উত্তরাধিকারী হিসেবে আজ কেউ ইহজগতে বেঁচে না থাকলেও মরমী ভূবনের বাসিন্দা হিসেবে আমরা গবেষক, সাহিত্যিক,লেখক,সাংবাদিক,চলচ্চিত্রকার,প্রযোজক, পরিচালক, বাউল গীতিকার,সুরকার ও লোকগীতি সংগ্রাহকরা যেন তাদের উপযুক্ত পৃষ্টপোষকতায় সাধ্যমতো ভূমিকা রাখি। পরিশেষে বাউল কামাল পাশার সুযোগ্য শিষ্য বাউল মজনু পাশার কাছ থেকে প্রাপ্ত নিম্নোক্ত গান দুটির মাধ্যমে প্রতিবেদনের ইতি টানলাম।

৩ ( মনশিক্ষা )
বেলা গেল সন্ধ্যা হলো বসে রইলো মন ঘুমানে।
একদিন তুমি পড়বে ধরা ধরে নিবে কাল সমনে।।
বেলা গেল রঙ্গরসে চেয়ে দেখ মন হৃদাকাশে
প্রমান পাই ইতিহাসে ঘোর বিপদ তোর সামনে।।
সঙ্গের সাথী যারা ছিল সকলি পলাইয়া গেল
কেউ ফিরে না আসিলো লুকি দিল গোপনে।।
৬ জনা হইয়া বাদী চালায় তোরে নিরবধি
টিয়ারবাপ কয় বিপদ নদী পাড়ি দেবো কেমনে।।

৪ (খাজা বাবার শানে)
খাজা মেহেরবান,দরবারেতে আমি এক নাদান
কি বলবো তোমার মহিমা আমার মতো নাই অজ্ঞান।।
ভিখারীর বেশেতে খাড়া আছি তব দরজায়
তারাইয়া দিলে বলো যাবো আমি আর কোথায়।
কিঞ্চিত দয়া করো যদি পাইবো আমি পরিত্রান।।
আমার মতো কত পাপি অকূলেতে বাসিলো
তোমার কৃপায় মুক্তি পাইয়া ফিরে আবার আসিলো।
অনেক মরা জিন্দা হইলো দেহেতে পাইয়া পরান।।
গরীবও নেওয়াজ খাজা বেফানাহরে দেও পানাহ
তোমার ধনে মহাধনী ভবে হয় কতজনা।
খালি হাতে কেউ ফিরেনা তোমার মতো আশিকান।।
পাগল আজিম উদ্দিন বলে ইচ্ছা নাই মোর ভোগ বিলাসে
চিরদিন থাকতে আশা দয়াল খাজা তোর পাশে।
একনজর দেখিবার আশে মন হইয়াছে পেরেশান।।

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: