সর্বশেষ আপডেট : ১ ঘন্টা আগে
রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস এবং কিছু কথা

01মোঃ কায়ছার আলী::
“বিদ্যা বড় অমুল্য ধন, সবার চেয়ে দামি। সকাল বিকাল পড়তে এসে জেনেছি তা আমি। মাষ্টার সাব আমি নাম দস্তখত শিখতে চাই। কোন দিন কেউ যেন বলতে না পারে তোমার কোন বুদ্ধি নাই, ও রহমত ভাই”। আজ থেকে প্রায় ৩০/৩৫ বছর আগে এদেশে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ছিল অশিক্ষিত সিনেমার এই কালজয়ী গানটি। দস্তখত শব্দের অর্থ স্বাক্ষর বা সই বা Signature যারা পড়তে ও লিখতে পারে সাধারণত তাদেরকেই Literate হিসাবে গন্য করা হয়। আজ ৮ ই সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার, আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। ১৯৬৫ সালের ইরানের তেহরানে ইউনেস্কোর উদ্যোগে ৮৯টি দেশের শিক্ষাবিদ, শিক্ষামন্ত্রী ও পরিকল্পনাবিদদের সমন্বয়ে একটি আন্তর্জাতিক শিক্ষা সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে আলোচনা করা হয় পৃথিবীর বর্তমান বিস্ময়কর সভ্যতা শিক্ষার অবদান।

শিক্ষা উন্নয়নের পূর্বশর্ত শ্রেষ্ঠত্বের নিয়ামক। মানব সম্পদ উন্নয়নে এর কোন বিকল্প নেই। আধুনিক বিশ্বে সকল আবিস্কার ও উন্নয়নের মূূলমন্ত্র হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষাহীন মানুষ আর পশুতে কোন তফাৎ নেই। যার শিক্ষা নেই বলা যায় তার কিছু নেই। সম্মেলনে বিশ্বের সাক্ষরতা পরিস্থিতির উদ্বেগজনক অবস্থা, শিক্ষা, শিক্ষাজীবন, জীবিকা ও বয়স্ক নিরক্ষরদের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।

শিক্ষা ও জীবিকা পরস্পর অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত বলে উল্লেখ্য করে নিরক্ষরতাকে উন্নয়নের প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করে তা দূরীকরণে জোর প্রয়াস নেয়ার আহ্বান জানানো হয়। মানব সম্পদ উন্নয়নে অব্যাহত শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে দিবসটি সারা বিশ্বের মত যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে আমাদের দেশেও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে (র‌্যালী, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও আলোচনা সভা) দিবসটি পালিত হচ্ছে। ইউনেস্কো পরবর্তী বছর থেকে সারা বিশ্বে জনগনের মধ্যে শিক্ষার আলো জ্বালানোর জন্য দিবা রাত্রী কাজ করে যাচ্ছে। এরপরেও বিশ্বের মোট অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যা নিরক্ষর (নারীদের মধ্যে বেশি)। এশিয়া ও আফ্রিকায় রয়েছে আটটি দেশ। এর মধ্যে বাংলাদেশও একটি। পৃথিবীর অনেক পিছিয়ে থাকা দেশ অভিযান আকারে সাক্ষরতা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। ইথিওপিয়া, তানজানিয়া, নিকারাগুয়া, লাওস ও ভিয়েতনামে ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে স্বাক্ষর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ উদ্যোগের ফলে আমাদের দেশেও পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। মানুষ সামাজিক ও শ্রেষ্ঠ জীব। সিগমন্ড ফ্রয়ড এর তত্ত্ব মতে” প্রতিটি শিশুই জন্ম নেয় একটি পরিস্কার শ্লেভ নিয়ে যার ওপর দাগ পরতে থাকে পরিবেশের প্রভাবে। এই পরিবেশ সাধারণত গড়ে উঠে শিক্ষার উপর ভিক্তি করে। সাধারণ অর্থে জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জনই হলো শিক্ষা। ব্যাপক অর্থে পদ্ধতিগত জ্ঞান লাভের প্রাক্রিয়াকেই শিক্ষা বলে। তবে শিক্ষা হলো সম্ভাবনার পরিপূর্ন বিকাশ সাধনের অব্যাহত অনুশীলন। অন্যভাবে বলা যায় শিক্ষা হলো বিকশিত ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ন বিকাশ। বাংলা শিক্ষার শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ শাস ধাতু থেকে যার অর্থ হচ্ছে শাসন করা বা উপদেশ দান করা।

শিক্ষার ইংরেজী প্রতিশব্দ Education শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ Educare বা Education থেকে যার অর্থ To lead out অর্থাৎ ভেতরের সম্ভাবনাকে বাইরে নিয়ে আসা। শিক্ষার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে দার্শনিক সক্রেটিস বলেছেন’ শিক্ষা হলো মিথ্যার অপনোদন ও সত্যের বিকাশ’। এরিষ্টটল বলেছেন ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরী করা হলো শিক্ষা’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে করেন ‘শিক্ষা হলো তাই যা আমাদের কেবল তথ্য পরিবেশনই করে না বিশ্ব সত্তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকে গড়ে তোলা’। তাই শিক্ষার জন্য চাই অক্ষর জ্ঞান। অক্ষর জ্ঞান না থাকলে মানুষ পড়বে বা শিখবে কিভাবে বা জ্ঞান অর্জন করবে কিভাবে? বাস্তববাদী ও যুক্তিবাদী প্রানী মানুষ অন্যের কাছে শোনার চেয়ে বা জানার চেয়ে নিজের চোখে পড়তে বা জানতে বা শিখতে বেশি পছন্দ করে।

প্রতিটি মানুষ শতভাগ নিজেকে বিশ্বাস করে। এক সমীক্ষায় জানা যায় ৩ ঘন্টা পর মনে থাকে দেখে ৭২% শুনে ৭০% দেখে ও শুনে ৮৫% আবার একই তথ্য ৩ দিন পর মনে থাকে দেখে ২৫% শুনে ১০% দেখে ও শুনে ৬৫%। এই সমীক্ষায় সহজেই অনুমান করা যায় মানুষ দেখে ও শুনে বেশি মনে রাখতে পারে। আর এজন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো মানুষকে দেখতে, পড়তে উৎসাহিত বা অনুপ্রানিত করা। গভীর বিশ্বাসের জন্য প্রয়োজনে প্রতিটি মানুষকে বাধ্যতামুলক ভাবে অক্ষর জ্ঞান দেয়া জরুরী। ১৯৭১ সালে এদেশে শিক্ষার হার ছিল ১৬.৮%, ২০০১ সালে মার্চ মাসে আদমসুমারীর রিপোর্ট অনুযায়ী শিখার হার ছিল ৫১.৮%, ১৯৯৬ সালে ৪৫%, ২০০৬ সালে ৪৪%, ২০১৩ সালে ৫৭.৯%, বর্তমানে ২০১৬ সালে ৭০%। এই হার আরো বাড়াতে হবে।

নিরক্ষরতা একটি জটিল ও ভয়াবহ সমস্যা। কোন জাতীর উন্নতির জন্য প্রথম এবং প্রধান উপকরন হচ্ছে শিক্ষা বা অক্ষর জ্ঞান। নিরক্ষর লোকেরা ভালোমন্দ সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, তাই দেশের উন্নতি ব্যাহত হচ্ছে। তারা ব্যক্তি জীবন ও জাতীয় জীবনেও অভিশপ্ত। এ অভিশাপ থেকে তাদের মুক্ত করতে না পারলে জাতীয় অগ্রগতি কিছুতেই সম্ভব নয়। নিরক্ষর লোকদের অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন করে তোলার জন্য আমাদের তাই বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে। বর্তমার সরকার আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে অ-নানুষ্ঠানিক এবং উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা চালু করেছে। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো সারাদেশের মানুষকে আলোকিত করা। স্কুল ও কলেজের বাইরে পাহাড়ী এলাকা, দুরবর্তী ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে হাওর, বাওর, চর, প্রাকৃতিক বিপর্যয় এলাকা, আদিবাসী, প্রতিবন্ধী, পথশিশু, অতি বঞ্চিত শিশু, শ্রমিক, ঝরে পড়া, পিতৃ পরিচয়হীন সন্তান, হরিজন বা নিচুবর্ণের শিশু এদের শিক্ষার জন্য ওয়ার্ড, এলাকায় অস্থায়ী ক্যাম্প বা হোষ্টেল নির্মান করে শিক্ষার দ্রুত ব্যবস্থা করতে হবে। যারা বয়স্ক ও বিধবা ভাতা গ্রহণ করছেন তাদেরকেও নিকটস্থ ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে স্বাক্ষর জ্ঞানের জন্য ছাত্র, শিক্ষক, সমাজকর্মী, গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে জোটবদ্ধ কমিটি গঠন করে শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের মানুষকে শিক্ষার উপকারীতা বোঝাতে হবে। সমাজের যে কোন অংশের নাগরিকদের বাইরে রেখে দেশের উন্নয়ন হয় না।

একজন ডাক্তারের Operation successfull যদি না হয় তবে একজন রোগী মারা যাবে। একজন বাস বা ট্রাক চালক, লঞ্চ চালক, বা রেলের চালকদের একটু অবহেলায় অনেক লোকের ভয়াবহ ক্ষতি হতে পারে। তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা শোচনীয় হতে পারে তা তাদের বোঝাতে হবে। সরকারী বা বেসরকারী সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষনের মাধ্যমে তাদের ঘুমন্ত বিবেককে জাগাতে হবে। বর্তমান সরকার বৃত্তি মুলক, কারিগরী এবং কর্মমূখী শিক্ষা (হাতে কলমে প্রশিক্ষিত) অর্থাৎ আত্বপ্রতিষ্ঠায় সহায়ক শিক্ষা চালু করেছে। এর ফলে ছাত্র ছাত্রীরা সে দিকে ধাবিত হচ্ছে। তারা বুঝতে পারছে সাধারণ শিক্ষার দ্বারা মানসিক বিকাশ ঘটলেও কর্ম ও জীবিকার নিশ্চয়তা থাকে না। কর্মমূখী শিক্ষা সেই নিশ্চয়তা বিধান করে জীবনকে হতাশা মুক্ত করে। প্রয়োজনের তুলনায় তবে তা অতি সামান্য, বর্তমানে এ শিক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করতে হবে এবং জনগনকে সচেতন করতে হবে। বিশ্ববাসী জানে আমারা বাঙালীরা ধ্বংসের মধ্যেও সৃষ্টি করতে পারি।

২০১৪ সালে এই দিনে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষ্যে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে নারী ও কন্যা শিশুদের শিক্ষার প্রসারে সরকার প্রধানের ভূমিকার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে “সাহসী নারী” আখ্যা দেন ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকাভা। শিক্ষা প্রসারের স্বীকৃতি বা বিশেষ অবদান রাখার জন্য ইউনেস্কোর দেওয়া স্মারক “Tree of Peace” “বা শান্তি বৃক্ষ” লাভ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখন তিনি এই শান্তি বৃক্ষ বিশ্বের সব নারী ও শিশুদের প্রতি উৎসর্গ করেন। আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসে আমি মনে করি, অক্ষর বা বর্ণমালার মাধ্যমে অর্জিত হয় শিক্ষা, শিক্ষা আনে চেতনা, চেতনা আনে বিপ্লব, বিপ্লব ঘটায় মুক্তি। অর্থাৎ জ্ঞানই শক্তি বা শিক্ষাই শক্তি।

লেখকঃ মোঃ কায়ছার আলী
সহকারী প্রধান শিক্ষক
ফরক্কাবাদ এন.আই স্কুল এন্ড কলেজ
বিরল, দিনাজপুর।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: