সর্বশেষ আপডেট : ১ মিনিট ৪৮ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

পাহাড়ের চূড়ায় অবিশ্বাস্য হ্রদ; দেশের মধ্যেই অপরূপ প্রকৃতি

full_797450878_1473168864পর্যটন ডেস্ক:: বগাকাইন হ্রদ বা বগা হ্রদ বা স্থানীয় নামে বগা লেক বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উচ্চতার স্বাদু পানির একটি হ্রদ। বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে বগাকাইন হ্রদের অবস্থান কেওকারাডং পর্বতের গা ঘেষে, রুমা উপজেলায়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ২,৪০০ ফুট (কিওক্রাডাং-এর উচ্চতা ৩,১৭২ ফুট)। ফানেল বা চোঙা আকৃতির আরেকটি ছোট পাহাড়ের চুড়ায় বগা লেকের অদ্ভুত গঠন অনেকটা আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের মতো।

অবস্থান:
রুমা উপজেলার পূর্ব দিকে শঙ্খ নদীর তীর থেকে ২৯ কিলোমিটার অভ্যন্তরে অবস্থিত একটি মৌজার নাম ‘নাইতং মৌজা’। এই মৌজার পলিতাই পর্বতশ্রেণীর অন্তর্গত একটি পাহাড়ের চূড়ায় হ্রদটি অবস্থিত।[১]

উৎপত্তি ও গঠন:
বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিকগণের মতে বগাকাইন হ্রদ মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ কিংবা মহাশূন্য থেকে উল্কাপিণ্ডের পতনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে আবার ভূমিধ্বসের কারণেও এটি সৃষ্টি হতে পারে বলে মত প্রকাশ করেছেন। এটি ভুবন স্তরসমষ্টির (Bhuban Foundation) নরম শিলা দ্বারা গঠিত। বাংলাপিডিয়ায় এর পানি বেশ অম্লধর্মী এবং একারণে এতে কোনো শ্যাওলা বা অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ নেই, এবং কোনো জলজ প্রাণীও এখানে বাঁচতে পারেনা বলা হলেও ২০০৯-এর তথ্যসূত্রে জানা যায় বগা লেকের পানি অত্যন্ত সুপেয়, এবং লেকের জলে প্রচুর শ্যাওলা, শালুক, শাপলা ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ এবং প্রচুর মাছ এমনকি বিশালাকার মাছ রয়েছে।

ইতিহাস:
বগালেকের পাশে একটি বম পাড়া (বগামুখপাড়া) এবং একটি মুরং পাড়া আছে। স্থানীয় আদিবাসীরা বম, মুরং বা ম্রো, তঞ্চংগ্যা এবং ত্রিপুরাসহ অন্যান্য আদিবাসী। স্থানীয় আদিবাসীদের উপকথা অনুযায়ী, অনেক কাল আগে পাহাড়ের গুহায় একটি ড্রাগন বাস করতো। বম ভাষায় ড্রাগনকে “বগা” বলা হয়। ড্রাগন-দেবতাকে তুষ্ট করতে স্থানীয়রা গবাদী পশু উৎসর্গ করতেন। কিন্তু একবার কয়েকজন এই ড্রাগন দেবতাকে হত্যা করলে চূঁড়াটি জলমগ্ন লেকে পরিণত হয় এবং গ্রামগুলোকে ধ্বংস করে ফেলে। যদিও এই উপকথার কোনো বাস্তব প্রমাণ নেই, তবুও উপকথার আগুন উদগীরণকারী ড্রাগন বা বগা এবং হ্রদের জ্বালামুখের মতো গঠন মৃত আগ্নেয়গিরির ধারণাটির সাথে মিলে যায়।

Image result for বগা লেক

সাধারণ বর্ণনা:
এই হ্রদটি তিনদিক থেকে পর্বতশৃঙ্গ দ্বারা বেষ্টিত। এই শৃঙ্গগুলো আবার সর্বোচ্চ ৪৬ মিটার উঁচু বাঁশঝাড়ে আবৃত। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪৫৭ মিটার ও ৬১০ মিটার উচ্চতার মধ্যবর্তী অবস্থানের একটি মালভূমিতে অবস্থিত। এর গভীরতা হচ্ছে ৩৮ মিটার (১২৫ ফুট)। এটি সম্পূর্ণ আবদ্ধ হ্রদ— এ থেকে পানি বের হতে পারে না এবং কোনো পানি ঢুকতেও পারে না। এর আশেপাশে পানির কোনো দৃশ্যমান উৎসও নেই। তবে হ্রদ যে উচ্চতায় অবস্থিত তা থেকে ১৫৩ মিটার নিচে একটি ছোট ঝর্ণার উৎস আছে যা বগা ছড়া নামে পরিচিত। হ্রদের পানি কখনও পরিষ্কার আবার কখনওবা ঘোলাটে হয়ে যায়। কারণ হিসেবে অনেকে মনে করেন এর তলদেশে একটি উষ্ণ প্রস্রবণ রয়েছে। এই প্রস্রবণ থেকে পানি বের হওয়ার সময় হ্রদের পানির রঙ বদলে যায়।

পর্যটন:
স্থানীয় অধিবাসীদের ধারণা এই হ্রদের আশেপাশে দেবতারা বাস করে। এজন্য তারা এখানে পূজা দেন। তবে রহস্যময় উপকথা এবং অকল্পনীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য বগাকাইন হ্রদকে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রেকিং এবং ক্যাম্পিং এলাকায় পরিণত করেছে। বিশেষ করে কিওক্রাডাং যেতে হলে বগাকাইন হ্রদে যাত্রাবিরতি ছাড়া গত্যন্তর নেই। তবে এখানকার যাতায়াত ব্যবস্থা বেশ দুর্গম; অত্যন্ত দুর্গম পথে পায়ে হাঁটা ছাড়া গত্যন্তর নেই। অতি সম্প্রতি (২০১০) রুমা থেকে সরাসরি বগামুখপাড়ায় জীপ (চান্দের গাড়ি বা চাঁদের গাড়ি) চালু হয়েছে। তবে এ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য আর বুনো জীবনের লোভে ঝিরির পথ নামের আরেকটা পথ ব্যবহার করে থাকেন। বগাকাইন হ্রদে একটি সেনা ক্যাম্প এবং দুটি থাকার জায়গা রয়েছে, যার একটি স্থানীয় বমদের দ্বারা চালিত, আর অন্যটি সরকার-চালিত। রয়েছে একটি স্কুল ও একটি গির্জাও। বর্তমানে পর্যটকদের যথেচ্ছ আচরণে হ্রদটির প্রাণবৈচিত্র্য এবং নিকট-অরণ্যের প্রাণবৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখিন।

বগাকাইন হ্রদ প্যনোরামা

যেভাবে যাবেন বগা লেক এবং কেওক্রাডাং:

# ঢাকা থেকে সরাসরি বান্দরবন যাওয়ার বাস রয়েছে। এছাড়া ট্রেনে করে চট্টগ্রাম পৌঁছে সেখান থেকে বাসে করে চট্টগ্রাম যেতে পারবেন। চট্টগ্রাম থেকে গেলে বহদ্দারহাট থেকে বাসে চড়তে হবে। ভাড়া ৭০ টাকা। সময় লাগবে প্রায় আড়াই ঘন্টা।

# বান্দরবন পৌঁছানোর পর রিকশা/টমটম করে চলে যাবেন রুমা বাস স্ট্যান্ডে। সেখান থেকে কাইক্ষ্যংঝিরি যাওয়ার বাসে চড়বেন। ভাড়া ৭০ টাকা। চাঁদের গাড়ি রিজার্ভ করেও যেতে পারবেন। ভাড়া পড়বে দুই হাজার টাকার মত। আরো বেশিও লাগতে পারে। কাইক্ষ্যংঝিরি পৌঁছুতে সময় লাগবে আড়াই থেকে তিন ঘন্টা। পাহাড়ী রাস্তা হওয়ায় এসব জায়গায় সন্ধ্যার পর কোন বাস চলাচল করেনা। ক্ষেত্র বিশেষে চাঁদের গাড়ি চলাচল করে। তবে সেটা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই দিন থাকতেই কাইক্ষ্যংঝিরি চলে যাওয়া উত্তম।

# কাইক্ষ্যংঝিরি নেমে সাঙ্গু নদী পার হওয়ার জন্য চড়তে হবে নৌকায়। ভাড়া মাথাপিছু ত্রিশ টাকা। সময় লাগবে এক ঘন্টার মতো।

# নৌকা করে পৌঁছে যাবেন রুমা বাজারে। সেখানে হোটেল হিলটন সহ কমদামি কিছু হোটেল পাবেন। রাত কাটানোর জন্য যে কোন একটায় উঠে পড়তে পারেন। হোটেল ভাড়া মৌসুমের উপর নির্ভরশীল। তবে তা খুব বেশি নয়।

# রুমা বাজার পৌঁছে প্রথম কাজ হচ্ছে গাইড ঠিক করা। রুমা বাজার থেকে বগা লেক বা কেওক্রাডং বা আরও দূরে গেলেও দিনপ্রতি গাইড ভাড়া তিনশত টাকা। তাছাড়া গাইড আপনার সঙ্গে থাকাকালীন তার যাবতীয় খরচ আপনাকেই বহন করতে হবে। বিভিন্ন পর্যটন অফিস সেনাবাহিনীর রেজিস্টার্ড গাইড সরবারহ করে। আপনি সেখান থেকে গাইড নিয়ে নিবেন। সাধারনত সিরিয়ালে যে গাইড থাকে তাকেই নিতে হয়। পাহাড়ী গাইড পেলে ভালো।

# পরদিন ভোরে বগা লেক রওয়ানা হওয়ার আগে অবশ্যই সেনাবাহিনীর কাছে আপনার নাম ঠিকানা নিবন্ধন করে নিবেন।

Image result for বগা লেক

# বগা লেক চাঁদের গাড়ি করে যেতে পারবেন। রিজার্ভ গাড়ি ১৫০০ টাকা। আর মৌসুমের সময় লোকাল গাড়ি পাওয়া যায়। মাথাপিছু ভাড়া ১০০ টাকা। বর্ষায় গাড়ি করে যাওয়ার পরও কিছুটা পথ হাঁটতে হয়। সময় লাগবে প্রায় দেড় ঘণ্টা। আর যদি হাঁটতে চান তবে দু’টো পথ। গাড়িতে যাওয়ার পথেই হাঁটতে পারেন। সময় বেশি লাগবে, ঝুঁকি কম আর তেমন কোন সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন না। আর একটা আছে ঝিলের পথ বা ঝিরিপথ। এ পথে হাঁটলেই প্রায় পঞ্চাশবারেরও বেশি ঝর্ণা আর ঝিলের পথ পার হতে হবে। সময় লাগবে ৬ থেকে ৭ ঘন্টা।

# বগা লেক ও কেওক্রাডাং যাওয়ার জন্য কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়ে নিতে পারেন। দলের সবাই ঘাড়ে একটি করে ব্যাগ নিবেন। ব্যাগ যথাসম্ভব হালকা হওয়া ভালো। ব্যাগে প্রয়োজনীয় ঔষধ পাতি যেমন পেইনকিলার, স্যাভলন, স্যালাইন, ব্যান্ডেজ ও কিছু শুকনা খাবার ইত্যাদি নিয়ে নিবেন। ছোট বোতলে পানি নিবেন। আরেকটি ছোট বোতলে গ্লুকোজ বা স্যালাইন বানিয়ে রাখতে পারেন। পানি নিয়ে চিন্তা করবেন না। পথে অনেক ঝর্ণা পাবেন যেখান থেকে বোতল ভরে নিতে পারবেন। অনেকটা পথ হাঁটতে হবে তাই রুমা বাজার থেকে রবারের জুতো কিনে নিবেন। মোজা নিয়ে যাবেন। বেশ ভালোই কাজে দিবে জুতোগুলো। দাম পড়বে ১০০-১৫০ টাকা।

# এ জায়গাগুলোতে যাওয়ার প্রধান দুই আতংকের নাম মশা ও জোঁক। জোঁক থেকে বাঁচার জন্য ব্যাগে লবণ রাখবেন। আর মশা থেকে বাঁচার জন্য চট্টগ্রাম বা ঢাকা থেকে ‘অডোমস’ কিনে নিবেন। রুমা বাজারেও অডোমস পাবেন।অভিযানের শুরুতে সবাই ‘অডোমস’ শরীরে মেখে নিবেন। প্রায়ই এ অভিযানে গিয়ে অনেকে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়। মাঝে সাঝে সাঁপের দেখাও পেতে পারেন। তবে শীতকালে গেলে সাপ আর জোঁকের ভয় একবারেই কমে যায়।
Image result for বগা লেক

# বগা লেক পৌঁছে এক রাত ওখানে থাকতে পারেন। ঐদিনই কেওক্রাডং যাওয়ার শারীরিক শক্তি সাধারনত থাকার কথা নয়। তাছাড়া সন্ধ্যা হয়ে গেলে যেতেও পারবেন না।

# বগা লেক এ রেষ্ট হাউজ রিজার্ভেশন-এই নাম্বারে যোগাযোগ করতে পারেন (লারাম-বম-০১৫৫২৩৭৬৫৫১)। তবে নেটওয়ার্ক স্বল্পতার কারনে বেশীরভাগ সময়ই নাম্বাটিতে সংযোগ করানো যায় না।

# পরদিন ভোরে কেওক্রাডাং রওয়ানা হবেন। যেতে লাগবে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘন্টা। ফিরতে দুই ঘন্টা। এখানে জোঁকের ভয় একটু বেশি। কিন্তু বগা লেকের চেয়ে রাস্তা কম ঝুঁকিপূর্ণ।

# রুমা বাজার ফেরার সময় আবার হেঁটে হেঁটে ফিরতে পারেন। চাইলে চাঁদের গাড়ি করেও ফিরতে পারেন। সেজন্য গাইডকে বলবেন চাঁদের গাড়ি ঠিক করতে।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: