সর্বশেষ আপডেট : ৩ মিনিট ৫৬ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

বিচূর্ণ আয়নায় বেকারের মুখ

1472739740নিউজ ডেস্ক : আয়নার দিকে তাকাতে ভয় পাই। আমার মতই আয়না দেখতে ভয় পায় এদেশের ২৬ লাখ ৩১ হাজার যুবক। অবশ্য যুবক না বলে মধ্য বয়সীও বলা যেতে পারে। কারণ ৩০ পেরিয়ে গেলেই নাকি কেউ আর যুবক থাকে না। আয়নার দিকে তাকালেই যে প্রতিচ্ছবিটি ভেসে ওঠে সেটা এক বেকার যুবকের প্রতিচ্ছবি। অবশ্য আয়নার দিকে তাকানোর প্রয়োজনও পড়ে না তাদের। কারণ চালচুলোহীন জীবনে আয়নায় মলিন মুখ দেখার মত বিলাসিতা ওই যুবক বা মধ্যবয়সীদের ভাগ্যেই লেখা নেই। আতিউতি করেও হয়তো তাই ঘরে একটা আয়না পাওয়া যাবে না।

ভাঙ্গা আয়নায় মুখ দেখলে নাকি অমঙ্গল হয়। কিন্তু ওই সব মানুষেরতো কোনো আয়নাই নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সম্প্রতি বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপের কাজ শেষ করেছে। সেই জরিপে দেখা গেছে দেশে বর্তমানে বেকার সংখ্যা ২৬ লাখ ৩১ হাজার। যারা সপ্তাহে এক ঘণ্টাও কাজ করার সুযোগ পায় না। এদের মধ্যে মাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন বেকারের সংখ্যা যথাক্রমে সাত লাখ ৭৬ হাজার এবং দুই লাখ ৯২ হাজার। উচ্চমাধ্যমিক পাস করাদের মধ্যে সাত লাখ ১৬ হাজার বেকার। আর স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বেকার হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ৯৪ হাজার মানুষ। ন্যূনতম জ্ঞান সম্পন্ন যে কেউ জানে এই জরিপ মোটেও ঠিক সেরকম নয়। অন্তত যারা চাকরির পরীক্ষা দিচ্ছেন তারা নিশ্চয়ই জানেন। একটা পদের বিপরীতে কয়েক লাখ আবেদন জমা পড়ছে যারা সবাই স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। তবে সরকার পক্ষের এ নিয়ে চিন্তার কোনো কারণ নেই। কারণ জরিপে যদিও বলা হয়েছে মোট ২৬ লাখ ৩১ হাজার বেকার আছে কিন্তু আদতে বাংলাদেশে একজনও বেকার নেই।

এটা কোনো দিবাস্বপ্ন নয় বরং এটাই সত্যি। বিশ্ব আজ অবাক চোখে তাকিয়ে দেখুক বাংলাদেশ শিশু মৃত্যুর হার কমিয়েছে, জিডিপিতে প্রবৃদ্ধির হার সন্তোষজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছে, পদ্মা সেতু করতে শুরু করেছে, বাল্যবিবাহ কমিয়েছে, জনসংখ্যা আনুপাতিক হারে কমিয়েছে এবং সর্বশেষ দেশ বেকার মুক্ত হয়েছে। এই যে বাংলাদেশে এতো এতো বেকার আছে বলে যেটা বলা হয়েছে তা নিয়ে মাথা ঘামাতে নিষেধ করেছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন আইএলও এর বেকারত্বের সংজ্ঞা।

আইএলও বেকারদের সংজ্ঞা দিয়েছেন বেশ ভালোভাবে এবং সেই সংজ্ঞা পড়ে দেশের সরকার এবং রাষ্ট্রযন্ত্র নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন এবং বাকিদের চোখের জল, বুকের হাতাশাকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারেন অনায়াসেই। আইএলওর সংজ্ঞা অনুযায়ী সপ্তাহে কেউ যদি অন্তত এক ঘণ্টা গৃহস্থালির কাজও করেন তবে তাকে আর বেকারের তালিকায় রাখা যায় না। সপ্তাহে এক ঘণ্টা মানে দিনে আট মিনিট করে পরিশ্রম করার কথা বলা হয়েছে। এই আট মিনিট গৃহস্থালির কাজ করে না এমন লোক এ দেশে একজনও নেই। সুতরাং আমাদের দেশে কোনোই বেকার নেই। যেহেতু আমাদের দেশে কোনো বেকার নেই সেহেতু কোম্পানিগুলো এখন থেকে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে শ্রমশক্তি আমদানি করতে পারে। দেশের সুনাম আরো বাড়বে। বহির্বিশ্ব জানবে বাংলাদেশ এতোটাই উন্নত হয়ে গেছে যে বিদেশ থেকে শ্রমিক কর্মচারী আমদানি করছে।

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আমরা কতরকম পদক্ষেপ নিয়েছি কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছুই হয়নি। অথচ মুখের একটি কথাই রাতারাতি জনসংখ্যাকে স্থির করে দিয়েছে। এখন বেকারত্বের বোঝা মাথায় নিয়ে বেঁচে থাকা ওই ২৬ লাখ ৩১ হাজার যুবক নামধারী মধ্যবয়সী দুই কূলই হারিয়েছে। সকালের সূর্য ওঠার আগেই তাদের বিয়ে ভেঙে গেছে, বান্ধবী ছেড়ে চলে গেছে। সংজ্ঞা অনুযায়ী ৩০ পেরিয়ে গেলে কেউ আর যুবক থাকে না। যেহেতু যুবক থাকে না তাই কোনো বাবা-মাই চায় না তাদের মেয়েকে কোনো মাঝবয়সীর সঙ্গে বিয়ে দিতে। অন্যদিকে যদি যুবক কারো সঙ্গে বিয়ে দিতে হয় তবে সে অবধারিত ভাবেই বেকার। কোনো বাবা-মা এটাও চায় না যে তাদের মেয়ের কোনো বেকারের সঙ্গে বিয়ে হোক।

বিচূর্ণ আয়নায় মুখ দেখলে অমঙ্গল হয় এই ভাবনাটুকু ভাবার আগে আপনা-আপনিই স্বপ্নভঙ্গ হয়। আর যেহেতু বিয়ে হচ্ছে না, যেহেতু মধ্যবয়সী হয়ে গেছে তাই সংসার সন্তান কোনোটাই আর হবে না। একই সঙ্গে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ হবে, বেঁচে যাবে বরাদ্দকৃত জন্মনিয়ন্ত্রণের সামগ্রী।

একজন বেকার অতঃপর মধ্যবয়সীর বিয়ের মত বিলাসিতাও সাজে না। এ ছাড়াও শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই এমন বেকারও আছে চার লাখ ১৩ হাজারের অধিক। কিন্তু এটা নিয়ে ভাবার সময় কোথায়? আইএলও যেখানে বলে দিয়েছে দিনে আট মিনিট কাজ করলেই তাকে আর বেকার বলা চলে না সেখানে আমরাতো প্রতিনিয়তই ঘণ্টা ধরে বেঁচে থাকার জন্য লড়ছি।
কোনো এক দায়িত্বশীল ব্যক্তি একদিন বলেছিলেন, এ দেশে কোনো বেকার নেই। কারণ চাকরি খোঁজাও একটা কাজ। সেই দিক বিবেচনা করলে তার কথাটা অকপটে স্বীকার করতেই হয়। “কি যাতনা বিষে বুঝিবে সে কিস্তে কভু আসিবিষে দংশেনি যারে” বেকারত্বের যন্ত্রণা যে কী ভয়াবহ তা কেবল বেকারেরাই জানে।

এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দরুন অধিকাংশই পাস করে বের হতে হতে বয়স পেরিয়ে যায়। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানো হবে না। যে বাবার কাঁধে বসে বেকার হয়ে খাচ্ছি, সে বাবার অবসরে যাওয়ার বয়স বাড়ানো হচ্ছে কিন্তু যে ছেলেটি বেকার হয়ে বাবার কাঁধে বসে খাচ্ছে তার চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ছে না। ফলে ভবিষ্যৎ আরো অনিশ্চিত হচ্ছে। ছেলেটির কর্মসংস্থান হলে শেষ বয়সে বাবা-মা তার ওপর নির্ভর করতে পারতো সেখানে হচ্ছে উল্টো। প্রবীণ বাবার ওপর বোঝার মত চেপে বসছি আমরা। যে বয়সে কাজ করে খাবার কথা আমরা সেই বয়সে বাবার কাঁধে আলাদীনের দৈত্যের মত চেপে বসেছি। আর যে বয়সে বাবার একটুখানি আরাম করার কথা সেই বয়সে বাবাকে চাকরি করতে হচ্ছে।

চাকরিদাতা কোম্পানিগুলো লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন সব অজুহাত দাঁড় করাচ্ছে যে অধিকাংশই খেই হারিয়ে ফেলছি। একটা চাকরির বিজ্ঞাপনে যতগুলো শর্ত থাকে তার একটা বাদে সবগুলোতে যোগ্য হওয়ার পরও সিংহভাগ মানুষ সেই চাকরিতে আবেদনই করতে পারছে না। সেই একটি শর্ত হলো সাবজেক্টের খক্ষ। যে যে বিষয়েই পড়ুক না কেন তাকে অন্তত প্রতিযোগিতার বিশ্বে একটুখানি প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়া উচিত। সেই প্রতিযোগিতায় যদি সে টিকে যায় তবে তাকে যোগ্য বলে মেনে নিতে সমস্যা কোথায় এ সমাজ ব্যবস্থার। প্রতিনিয়ত আমরাই নানা ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি করছি আবার আমরাই বলছি আমরা অসাম্প্রদায়িক, আমরা সমান অধিকারে বিশ্বাসী। এভাবে চলতে থাকলে নিশ্চিত একদিন এ শহর, এ আকাশ বেকারদের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠবে। সে ভার কি সইতে পারবে এ আকাশ এ জাতি।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: