সর্বশেষ আপডেট : ৫ ঘন্টা আগে
শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

সিলেটে ব্যবসায়ী মামুন হত্যাকাণ্ড : ‘তানরে মারবা না, গরিব মানুষ, মাফ করি দিলাউকা।’

mamunhottakandoনুরুল হক শিপু ::
নগরীর জল্লারপারের ব্যবসায়ী করিম বক্স মামুন বিদেশের সুখ-শান্তির জীবন ফেলে ছুটে এসেছিলেন দেশের মাটিতে। উদ্দেশ্য ছিল, ব্যবসা-বাণিজ্য করে দেশেই থাকবেন। বিয়ে করেছিলেন মাত্র ১৩ মাস আগে। মাত্র তিন মাস পূর্বে ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু সংসারজীবন পুরোদমে শুরু করা এবং ব্যবসা জমে ওঠার আগেই ঘাতকরা কেড়ে নিয়েছে তাঁর জীবন। ঘোর অমানিশা নেমে এসেছে তাঁর নববধূর জীবনে। শোকে নির্বাক পরিবারের সবাই। পাড়া প্রতিবেশী ও বন্ধুমহল সবাই শোকে মোহ্যমান। ঘটনার পর পেরিয়ে গেছে পনেরো দিন। এখনো ধরা পড়েনি ঘাতকরা।
জল্লারপারের আনোয়ার বক্স স্ত্রী নিয়ে ১৯৭৭ সালে চলে যান দুবাই। তিনি দুবাইয়ে একটি ব্রিটিশ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। দুবাইয়ে জন্মগ্রহণ করেন আনোয়ার বক্সের তিন ছেলে। স্ত্রী আর তিন সন্তান নিয়েই সাজানো সংসার চলছিল তাঁর। বড় ছেলে আকবর বক্স মাহবুব দুবাইয়ে রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বড় ছেলেকে হারিয়ে সুখী সংসারে নেমে আসে দুঃখ। এরপরও সংসারকে ঠিকঠাক চালাচ্ছিলেন আনোয়ার বক্স। তাঁর দ্বিতীয় ছেলে করিম বক্স মামুন দুবাইয়ে বিবিএ শেষ করে লন্ডনে এমবিএ পড়তে একটি কলেজে ভর্তি হন। তিনবছর আগে দুবাই থেকে সপরিবারে দেশে ফিরেন আনোয়ার বক্স। খবর পেয়ে লন্ডন থেকে ছেলে করিম বক্স মামুনও ফিরে আসেন দেশে। বাবা আনোয়ার বক্সকে জানান, তিনি দেশেই ব্যবসা করবেন।
নগরীর জিন্দাবাজারের এলিগ্যান্ট মার্কেটে নিজেদের দুটি দোকানের একটিতে ব্যবসা শুরু করেন মামুন। দোকানের নাম দেন ‘সিম্ফনি মোবাইল’। দোকান খোলার এক বছর আগে বিয়ে করেন দক্ষিণ সুরমার লাউয়াই গ্রামের সাতঘরের আহসানাকে। স্ত্রী আহসানার বাবার পরিবার বর্তমানে কানাডায় বসবাস করলেও তাদের আরেকটি বাড়ি আছে নগরের শাহী ঈদগাহের হাজারিবাগে। আফসানা কানাডায় উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন। আহসানার বাবার ইচ্ছে ছিল, একজন ধার্মিক ছেলের সাথে মেয়েকে বিয়ে দেবেন। সেই ইচ্ছে থেকেই করিম বক্স মামুনের সাথে আফসানার বিয়ে হয়। কারণ মামুন ছিলেন খুব ধার্মিক ছেলে।
চলতি বছরের মে মাসে জিন্দাবাজারের এলিগ্যান্ট মার্কেটে দোকান খুলেন মামুন। নামাজের সময় মামুন অন্য ব্যবসায়ীদের ডেকে নামাজে নিয়ে যেতেন। এলাকাও নম্র-ভদ্র মামুনের সুনাম ছিল। তিনি ছিলেন গরিবের সুখ-দুঃখের সাথি। আর সেই গরিবের উপর হামলা না করতে অনুরোধ করাই কাল হয় তাঁর জীবনে। এলিগ্যান্ট মার্কেটের গার্ড কাছা মিয়ার উপর হামলার সময় মামুন বলেছিলেন ‘তানরে মারবা না, গরিব মানুষ, মাফ করি দিলাউকা।’ আর এই কথা বলার পরই গত ১৬ আগস্ট তাঁকে নির্মমভাবে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। গতকাল বৃহস্পতিবার মামুনের বাবা ও এলিগ্যান্ট মার্কেটের ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে এমন তথ্য।
মামুনের বাবা আনোয়ার বক্স বলেন, ‘ছেলে মামুন ছিল খুব বিনয়ী। সে গরিবের কষ্ট সহ্য করতে পারত না। গরিব-দুঃখী মানুষকে সব সময় সাহায্য করত। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত মামুন। সে নিয়মিত তাহাজ্জুুদের নামাজও পড়ত-এ কথা বলেই তিনি কন্যায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ১৩ মাস আগে ছেলেকে বিয়ে দিয়েছি। সংসারজীবন শুরু করেছে মাত্র। তিনি বলেন, বিশ্বাস করুন আমার মামুন কোনো অপরাধ করেনি। আমার মামুন কোনো অপরাধ করতে পারে না। তাকে নির্মমভাকে হত্যা করা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা করছে। তবে তা খুব গতিশীল নয়।
গতকাল মামুনের দোকানে বসে থাকা তাঁর ছোটভাই মূসা বকস বলেন, ভাইকে হত্যার পর দোকান বন্ধ ছিল। গত ২৩ আগস্ট থেকে দোকান খোলা হয়েছে।
মামুন হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী এলিগ্যান্ট মার্কেটের ব্যবসায়ী আব্দুল আজিজ বলেন, মার্কেটের সামনে গাড়ি পার্কিং করে হত্যাকারীরা। এ সময় গার্ড কাছা মিয়া (৫৫) তাদেরকে গাড়ি মার্কেটের সামনে না রেখে পার্কিংয়ের নির্ধারিত স্থানে নিয়ে রাখার অনুরোধ করেন। তখন কাছা মিয়ার ঘাড়ে ধরে মার্কেটের সামনে ফেলে মারতে শুরু করে ঘাতক ও তার সহযোগীরা। এর আগে গার্ডের সাথে কথা কাটাকাটির সময় হত্যাকারী মোবাইলেফোন করে ৪ থেকে ৫ জনকে নিয়ে আসে। ওই ৪/৫ জন পাশের কোনো মার্কেটেই ছিল। গার্ড কাছা মিয়াকে মারা সময় করিম বকস মামুন দৌড়ে গিয়ে কাছা মিয়াকে ধরেন। তিনি হামলাকারীদের বলেন, ‘গরিব মানুষ ওকে ক্ষমা করে দিন।’ ওই সময় ক্ষিপ্ত হয় হামলাকারীরা। সে মামুনের বাম বগলের নিচে ধারালো ছুরি দিয়ে আঘাত করে। মামুন সাথে সাথে দৌড় দেন। তিনি গ্যালারিয়া শপিং মহলের সামনে একটি রিকশার সাথে ধাক্কা খান। ওই সময় পিছন থেকে হামলাকারীরা ফের ছুরিকাঘাত করে। মামুন দৌড়ে আকেটু সামনে চলে যান। পরে আরেক ব্যবসায়ী তাঁকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানেই তিনি মারা যান।
এদিকে ব্যবসায়ী মামুন খুনের ঘটনায় তাঁর বাবা আনোয়ার বকস বাদি হয়ে গত ১৮ আগস্ট জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি (আজীবন বহিষ্কৃত) সুলেমামান হোসেনকে প্রধান আসামি করে মামলা করেন। সে কানাইঘাট উপজেলার দিঘিরপার ইউনিয়নের দর্পনগর গামের নূর উদ্দিনের ছেলে। মামলার অপর আসামি জকিগঞ্জ উপজেলার কামালপুর গ্রামের মঈন উদ্দিনের ছেলে জাবেদ আহমদ। মামলায় অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে আরো ৪ থেকে ৫ জনকে।
জল্লারপারের বাসিন্দা বাবর বক্স বলেন, একটি ভালো ছেলেকে অকারণে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। তিন বলেন, মামলায় যেন কোনো নিরীহ মানুষকে হয়রানি করা না হয়। প্রকৃত আসামিদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রদান এলাকাবাসীর প্রাণের দাবি। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের প্রায় সকল নেতাকর্মী এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করতে মামুনের বাড়িতে ছুটে আসেন। কিন্তু সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এখনো আসেননি। তিনি এ এলাকার জনপ্রতিনিধি। তিনি এলে অসহায় পরিবার একটু হলেও ন্যায়বিচার পাবে সেই ভরসাটুকু পেত।
মামুন খুনের পর ঘাতকদের গ্রেপ্তারের দাবিতে সর্বস্তরের ব্যবসায়ীরাও হত্যার বিচার দাবিতে মাঠে আন্দোলন করছেন। এলাকার মানুষ আন্দোলনে নেমেছেন। মামুন হত্যাকান্ডের বিচার দাবিতে জল্লারপারের প্রতিটি বাসার গেইটে ঘাতকদের ছবি সংবলিত পোস্টার লাগানো হয়েছে। একই পোস্টার লাগানো হয়েছে নগরীর বিভিন্ন স্থানে।
কোতোয়ালি থানার সহকারী কমিশনার (এসি) নূরুল হুদা আশরাফী বলেন, মামলাটি আমাদের কাছে ছিল, গত সপ্তাহে মামলা ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে আমরা তাদেরকে সব ধরনের সহযোগিতা করছি। খুর শীঘ্রই ভালো একটি ফলাফল পাব বলে আশা করছি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক গৌছুল হোসেন বলেন, ‘আমরা সব ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছি। গতকালও ডিবি পুলিশের ডিসি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: