সর্বশেষ আপডেট : ১০ মিনিট ১২ সেকেন্ড আগে
শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

তিন বন্ধুর একই পরিণতি

f55baeb67793fd69ee0f2382a7bf351e-31নিউজ ডেস্ক : তারা তিন বন্ধু। একই দিনে বাড়ি ছাড়েন, নিরুদ্দেশ হন। তারপর পাঁচ থেকে সাত মাসের মাথায় একে একে তিনজনই নিহত হয়েছেন। তারা হলেন নিবরাস ইসলাম, শেহজাদ রউফ ওরফে অর্ক ও তাওসিফ হোসেন। তাঁরা তিনজন গত ফেব্র“য়ারিতে শাহবাগ থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা একটি মামলারও আসামি।

তাদের মধ্যে নিবরাস গত ১ জুলাই গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলায় অংশ নেন এবং পরে যৌথ বাহিনীর অভিযানে অন্য জঙ্গিদের সঙ্গে নিহত হন। শেহজাদ নিহত হন ২৬ জুলাই ঢাকার কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানে। ওই অভিযানে মোট নয়জন নিহত হন। সর্বশেষ গত শনিবার সকালে নারায়ণগঞ্জে পুলিশের অভিযানে নিহত হন তাওসিফ।
নারায়ণগঞ্জের অভিযানে বহুল আলোচিত জঙ্গিনেতা তামিম চৌধুরীসহ তিনজন নিহত হন। বাকি দুজনের পরিচয়ের বিষয়ে গতকাল পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি পুলিশ। মরদেহের ছবি দেখে ফজলে রাব্বি নামের একজনকে শনাক্ত করেছেন তাঁর বাবা। অপরজনের আঙুলের ছাপ মিলিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে তাওসিফ হোসেনের পরিচয় পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র।

পুলিশ, পরিবার ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সূত্র থেকে জানা গেছে, নিবরাস, শেহজাদ ও তাওসিফ—তিনজনই চলতি বছরের ৩ ফেব্র“য়ারি বাসা ছাড়েন। সবাই একটি ছোট ব্যাগ নিয়ে বের হন, তাতে তাঁদের কাপড়চোপড় ছিল। ওই দিন দুপুর ১২টার দিকে উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হন নিবরাস। বেলা একটা থেকে দেড়টার দিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসা থেকে বের হন শেহজাদ।
‘আমি নিবরাসের সঙ্গে যাচ্ছি’মাকে এ কথা বলে সন্ধ্যা ছয়টায় ধানমন্ডির ১৫ নম্বর বাসা থেকে বের হন তাওসিফ। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ ছিল না। এর পাঁচ মাস পর থেকে তাঁরা একে একে ভয়ংকর জঙ্গি হিসেবে আবির্ভূত হন। পুলিশ বলছে, তাঁরা সবাই ‘নব্য জেএমবি’র সদস্য ছিলেন।

নিবরাস ও তাওসিফ দুজনই ছিলেন মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মালয়েশিয়া ক্যাম্পাসের ছাত্র। দুজনই এক দিনে একই ফ্লাইটে দেশে ফেরেন। আর শেহজাদ ছিলেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্র। নিবরাস মালয়েশিয়ায় যাওয়ার আগে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছিলেন, তখন থেকে শেহজাদের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব।

তাওসিফ ধানমন্ডির ম্যাপললিফ স্কুল থেকে ‘ও’ লেভেল এবং ‘এ’ লেভেল পাস করেন। এরপর ২০১১ সালের ৫ জানুয়ারি তিনি মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মালয়েশিয়া ক্যাম্পাসে পড়তে যান। তিন ভাইবোনের মধ্যে তাওসিফ সবার ছোট। তাঁর বাবা চিকিৎসক, মা গৃহিণী। তাওসিফের দুই বোনই বিবাহিত। একজন কানাডাপ্রবাসী, অন্যজন ঢাকায় থাকেন।

গতকাল রোববার দুপুর ১২টায় তাওসিফদের ধানমন্ডির ১৫ নম্বর সড়কের বাসায় গিয়ে তাঁর মা-বাবা বা পরিবারের কাউকে পাওয়া যায়নি। তাঁদের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। বাসার তত্ত্বাবধায়ক মো. শহীদ বলেন, শনিবার সন্ধ্যা সাত-আটটার দিকে তাঁদের কয়েকজন আত্মীয় আসেন। এরপর তাওসিফের মা-বাবা তাঁদের গাড়ি নিয়ে বের হন, আর ফেরেননি।
বাসার নিরাপত্তারক্ষী নান্নু মিয়া বলেন, ‘তাওসিফ যেদিন সন্ধ্যায় বাসা ছাড়ে, তখন তার হাতে কালো রঙের একটি ব্যাগ ছিল। রাতে তার বাবা ইন্টারকমে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করেন যে তাওসিফকে দেখেছি কি না। এরপর তাওসিফ আর বাড়ি ফেরেনি।’
তাওসিফদের বাসায় ছুটা কাজ করেন গৃহপরিচারিকা সাহানা বেগম। বাসার নিচতলায় গতকাল তাঁর সঙ্গে প্রথম আলোর প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি বলেন, ‘তাওসিফ খুবই চুপচাপ ছেলে ছিল। নিয়মিত নামাজ পড়ত। সে চলে যাওয়ার পর থেকে তার মা খুব মনমরা হয়ে থাকতেন। প্রায়ই কান্নাকাটি করতেন।’

তাওসিফ বাসা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর ওই রাতেই (৩ ফেব্র“য়ারি) তাঁর বাবা আজমল হোসেন ধানমন্ডি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। জিডিতে উল্লেখ রয়েছে, ‘তাওসিফ মালয়েশিয়ায় মোনাশ ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নরত এবং ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে ছুটিতে দেশে আসে। ১৫ ফেব্র“য়ারি ২০১৬ তারিখে তার মালয়েশিয়া চলে যাওয়ার কথা ছিল। তার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু নিবরাসও মালয়েশিয়ায় একই ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নরত এবং বর্তমানে ছুটিতে বাংলাদেশে অবস্থানরত।’
জিডিতে আজমল লিখেছেন, ‘আমার ছেলের সন্ধান না পাওয়ায় আমরা নিবরাসের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারি যে নিবরাসও বাসায় ফিরে আসেনি এবং পাসপোর্ট ও হালকা কিছু কাপড় নিয়ে সে দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে ঘর থেকে বের হয়ে গেছে। আমরা দ্রুত আমার ছেলের পাসপোর্ট খুঁজি, কিন্তু তা বাসায় পাইনি। আমাদের ধারণা, আমাদের ছেলে এবং তার বন্ধু নিবরাসও পাসপোর্ট নিয়ে নিখোঁজ হয়েছে।’

জিডিটি তদন্ত করেন ধানমন্ডি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. হেলাল উদ্দিন। গতকাল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জিডির পর বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করা হয়, কিন্তু তাওসিফের খোঁজ পাওয়া যায়নি। র্যা ব তাঁর মুঠোফোন নম্বর ট্র্যাক করে। ফোন বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁর অবস্থান ছিল ধানমন্ডি এলাকায়।

৩ ফেব্র“য়ারি নিবরাস একটি চিরকুট লিখে বাসা ছাড়েন। ওই চিরকুটে মা-বাবার উদ্দেশে লেখেন, ‘মাফ করে দিয়ো। গত এক মাস আমি তোমাদের কষ্ট দিয়েছি। আমি দুঃখিত। বাইরে বাইরে থেকেছি। তোমাদের সঙ্গে কথা বলিনি। তোমাদের সঙ্গে থাকলে আমাকে যেখানে যেতে হবে, সেখানে আর যেতে পারব না।’ এরপর ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলায় ভয়ংকর জঙ্গি হিসেবে আবির্ভূত হন নিবরাসসহ পাঁচজন। চালান নৃশংস হত্যাযজ্ঞ। পরে যৌথ বাহিনীর অভিযানে তাঁরা নিহত হন।

শেহজাদ অর্ক (২৪) নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক পাস করার পর এ বছরই এমবিএ করতে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা ছিল। শেহজাদের ব্যবসায়ী বাবা তৌহিদ রউফ গত ৬ ফেব্র“য়ারি রাজধানীর ভাটারা থানায় ছেলের ছবিসহ নিখোঁজ জিডি করেন। গত ২৬ জুলাই ভোরে কল্যাণপুরে একটি জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানে নিহত হন শেহজাদ।
ভাটারা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মিজানুর রহমান শেহজাদের নিখোঁজ জিডির তদন্ত করেন। তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ৩ ফেব্র“য়ারি সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার দিকে শেহজাদ বাসা থেকে বের হন। তাঁর মুঠোফোনের কল রেকর্ড থেকে সর্বশেষ অবস্থান বাসার কাছেই দেখা যায়। এরপর ফোন বন্ধ ছিল।
শেহজাদদের বাসার দারোয়ান আশরাফুল বলেন, বেরিয়ে যাওয়ার সময় শেহজাদের সঙ্গে একটি ব্যাগ ছিল। পরনে ছিল শার্ট ও জিনসের প্যান্ট।

নিবরাসের এক নিকটাত্মীয় বলেন, নিবরাস, তাওসিফ ও শেহজাদ তিনজনই বন্ধু ছিলেন। শেহজাদের বাবা তৌহিদ রউফ গতকাল বলেন, ‘হয়তো তারা একে অন্যকে চিনত। মিউচুয়াল ফ্রেন্ড হতে পারে। কিন্তু নিবরাস বা তাওসিফকে আমি আগে দেখিনি। তাদের সঙ্গে শেহজাদের বন্ধুত্বও খুব বেশি দিনের ছিল বলে মনে হয় না।’
তিন বন্ধু এক মামলার আসামি: গত ৯ ফেব্র“য়ারি শাহবাগ থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে পুলিশের করা মামলায় অন্যান্য আসামির সঙ্গে এই তিন বন্ধুর নাম রয়েছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ৯ ফেব্র“য়ারি সন্ধ্যা পৌনে ছয়টায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের মূল ভবনের বিপরীতে ফুট ওভারব্রিজের নিচে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে রাইয়ান মিনহাজ ওরফে রাইজু ওরফে আরমিন (২৪), আহমেদ শাম্বুর রায়হান ওরফে চিলার (২৩) ও তৌহিদ বিন আহমেদ ওরফে রিয়াজ ওরফে কাচ্চিকে (২৪) গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে ওই তিনজন পুলিশকে জানান, তাঁদের সঙ্গে আরও আট-নয়জন ছিলেন। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পলাতক ব্যক্তিরা হলেন নিবরাস ইসলাম ওরফে শিমু (২৪), শেহজাদ রউফ ওরফে অর্ক ওরফে মরক্কো (২৪), তাওসিফ হাসান (২৪), সাবাব সালাউদ্দিন ওরফে হক ওরফে হনু, সালভি আলী ওরফে মালাভি (২৫), রিফাত, তুরাজ (২৮), ইয়াসিন তালুকদার ও গালিব (২৭)।
পুলিশ ও পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রেপ্তার হওয়া তিনজন বর্তমানে জামিনে আছেন। তাঁদের মধ্যে রাইয়ান মালয়েশিয়ায় মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়তেন। রায়হান ছিলেন মালয়েশিয়ার লিমককউইং ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজির ছাত্র। রায়হান আবার শেহজাদের আত্মীয়। তৌহিদ নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্র।
ওই মামলায় পলাতক বাকি ছয়জনের পুরো পরিচয় পাওয়া যায়নি। তবে মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ও ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিটের একজন কর্মকর্তা জানান, অন্যদের মধ্যে কারও কারও পরিচয় তাঁরা পেয়েছেন, তাঁরাসহ জামিনে থাকা তিনজন তদন্তে পুলিশকে সহযোগিতা করছেন।

জামিনে থাকা তিনজনের মধ্যে একজনের পরিবার প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলতে রাজি হয়নি। অপর দুজনের অভিভাবক পত্রিকায় নাম প্রকাশ করতে চাননি। তাঁরা দাবি করেন, তাঁদের ছেলেরা জঙ্গিবাদে জড়িত নন। নিবরাস, তাওসিফ ও শেহজাদের সঙ্গে তাঁদের বন্ধুত্ব ছিল। এ কারণে ওই তিনজন নিখোঁজ হওয়ার পর ৭ ফেব্র“য়ারি রাতে বাসা থেকে তাঁদের ছেলেকে একটি সংস্থার লোকজন তুলে নিয়ে যান। পরদিন তাঁদের ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরদিন ৯ ফেব্র“য়ারি তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়। তাঁরা ২৪ এপ্রিল জামিনে বের হন। তাঁদের মধ্যে একজন চাকরি করছেন। একজন বাসায় থাকেন, খুব একটা বের হন না। এই দুজনের বাসা মগবাজার এলাকায়। অপরজনের বাসা বনানীতে, তিনিও বাসা থেকে কম বের হন বলে বাড়ির নিরাপত্তারক্ষী প্রথম আলোকে জানিয়েছেন।
জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইসফাক এলাহী চৌধুরী বলেন, ‘নিবরাস, শেহজাদ ও তাওসিফ এই তিন বন্ধু যেভাবে একই দিনে একইভাবে বাড়ি ছেড়েছে, তা দেখে মনে হচ্ছে যারা রিক্রুটমেন্টের কাজ করছে তারা খুবই সংগঠিত ও সুসংহতভাবে কাজ করছে। এ কাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও থাকতে পারেন আবার তামিমের মতো বড় ভাইও থাকতে পারে।’ তিনি বলেন, তিন বন্ধুর এই পরিণতি থেকে শিক্ষা হলো, নিজের বন্ধুকে খুবই সতর্কতার সঙ্গে বাছাই করতে হবে। অভিভাবক, শিক্ষক ও গণমাধ্যমকে তরুণদের জীবনের ইতিবাচক দিক সম্পর্কে বলতে হবে, বোঝাতে হবে। প্রথম আলো

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: