সর্বশেষ আপডেট : ৩ মিনিট ২৮ সেকেন্ড আগে
বুধবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

রক্তাক্ত খুলিয়াটুলা : খুনোখুনির নেপথ্যে একটি বাসা ও আধিপত্য

dailysylhetnewsshipuনুরুল হক শিপু ::
নগরীর খুলিয়াটুলায় চার দশমিক ১০ শতক জমির উপর একটি বাসা। নম্বর নীলিমা ৫২/৩। এই বাসা এবং আধিপত্য বিস্তার নিয়ে চলছে খুনোখুনির হোলিখেলা । সর্বশেষ খুন হয়েছেন সাবেক নারী কাউন্সিলর শাহানা বেগম শানুর স্বামী স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা তাজুল। এর আগে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হত্যা করা হয় শানুর ছেলে সোহানকে। কুপিয়ে ও চোখে চুন লাগিয়ে চিরদিনের জন্য দৃষ্টিশক্তিহীন করা হয়েছে শানুর বড় ছেলে রায়হানকে। আধিপত্যের আরেক বলি হন খুলিয়াটুলার নীলিমা-২৩ নম্বর বাসার মরহুম সুরুজ আলীর ছেলে কামাল আহমদ। ২০১২ সাল থেকে এভাবে চলছে একের পর এক হত্যা, হামলা ও মামলা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, খুলিয়াটুলায় খুনোখুনি ও হিংস্র প্রতিশোধের যাত্রা শুরু হয় ২০১২ সালে। প্রথম বিষয় ছিল দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল চালানো। পরবর্তীকালে এর সঙ্গে যুক্ত হয় নীলিমা ৫২/৩ নম্বর বাসার দখল নিয়ে বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তার।

২০১২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সিলেট সিটি কর্পোরেশনের তৎকালীন নারী কাউন্সিলর শাহানা বেগম শানুর বাসায় বেড়াতে আসেন তাঁর বড় ভাই বেলাল আহমদ। রাত ৮টার দিকে শানুর বড় ছেলে রায়হান তার মামা বেলাল আহমদকে মোটারসাইকেলে পৌঁছে দিতে যায় তালতলার মাছুদিঘিরপার প্রবাহ-৪ নম্বর বাসায়। দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল চালনায় রায়হানকে গালিগালাজ করেন খুলিয়াটুলার নীলিমা-২৩ নম্বর বাসার মরহুম সুরুজ আলীর ছেলে কামাল আহমদ। এই গালিগালাজ রায়হান না শুনলেও খবর চলে যায় তাঁর বাবা তাজুলের কানে।

শাহানা বেগম শানু জানান, রায়হান মামা বেলালকে দিয়ে বাসায় ফেরার পথে স্থানীয় কয়েক যুবক তার গতিরোধ করে ছিনিয়ে নেন মোবাইলফোন ও সাথে থাকা ৬শ’ টাকা। রায়হান বাসায় ফিরে বিষয়টি জানান বাবা তাজুল ইসলামকে। তাজুল ওই যুবকদের দুই মদদদাতাকে বিষয়টি জানান। ওই রাতেই কামালের সাথে দেখা হয় তাজুলের। তাজুল কামালকে বলেন, তার ছেলেকে এভাবে গালিগালাজ না করে বাবা হিসেবে তাঁকে বিষয়টি জানালে তিনি রায়হানকে দ্রুত মোটরসাইকেল চালাতে নিষেধ করতেন। এ নিয়ে কথা কাটাকাটি হয় কামাল ও তাজুলের।

11-359x300 copyঅনুসন্ধানে জানা গেছে, বিরোধের মূল বিষয় দ্রুত মোটরসাইকেল চালানো ছিল না। এর পেছনে ছিল আধিপত্য ও স্থানীয় মসজিদের এক শতক জমি প্রদানের বিরোধ। খুলিয়াটুলাস্থ শেখ নাসির আলী জামে মসজিদের নামে দেওয়া এক শতক ভূমি প্রদান নিয়ে তাজুল ও কামালের বিরোধ ছিল দীর্ঘদিনের। তাজুলদের দাবি, ওই জায়গা তাদের বাবা মরহুম আব্দুল মুকিত দিয়েছেন। আর নিহত কামালের দাবি ছিল ওই এক শতক জায়গা তাদের পরিবার দিয়েছে। রায়হানের মোটরসাইকেল দ্রুত চালানো নিয়ে বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। ২০১২ সালের ১৪ ডিসেম্বর তাজুলের উপর হামলা করা হয়। তখন গুরুতর আহত অবস্থায় তাজুলকে ভর্তি করা হয় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এ ঘটনায় তাজুলের স্ত্রী শানু কোতোয়ালি থানায় বাদি হয়ে ১০ জনের নামোল্লেখসহ অজ্ঞাত ১০/১২ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। মামলায় যাদের নামোল্লেখ করা হয় তারা হচ্ছেন, টিটু, জনি, আব্দুর রহিম, তোফায়েল, তামিম, নূরু, সবুজ, রিপন, রাজিব ও রুমন।

শাহানা বেগম শানু জানান, তাদের ৫২/৪ নম্বর বাসার ঠিক বিপরীতে ৫২/৩ নম্বর বাসা নিয়ে বিরোধের নতুন বিষয় যুক্ত হয় ২০১৩ সালে। ওই বছর ৫২/৩ বাসার ৪ দশমিক ১০ শতক ভূমি ৩৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করে ১০ লাখ টাকা দিয়ে ১ দশমিক ৬৫ শতক জমি কেনেন তাজুল ইসলাম। যথারীতি এই জমি রেজিস্ট্রারি করা হয়। জমির বিক্রেতা ছিলেন খুলিয়াটুলার নিলীমা ৫২/২ নম্বর বাসার গোফরান আহমদ খোকন। একই দিন একই বাসার আরো ২ দশমিক ৮৫ শতক ভূমি বায়নামা রেজিস্ট্রারি করেন এবং জায়গা বাবদ বাকি ১৫ লাখ টাকা দেন গোফরানকে। বাকি টাকা পরিশোধ করলে সম্পূর্ণ জায়গা রেজিস্ট্রারি করে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অসুবিধার কারণে তাঁরা বাকি টাকা পরিশোধ করতে পারেননি। শানু বলেন, ইত্যবসরে গোফরান আহমদ খোকন বায়নামাকৃত জমি বিক্রি করে দেন খুলিয়াটুলার নীলিমা-৫১ নম্বর বাসার সৈয়দ মো. হাফিজের কাছে। এরপর থেকেই ৫২/৩ বাসা নিয়ে শুরু হয় নতুন বিরোধ।

৫২/৩ নম্বর বাসা নিয়ে কামাল আহমদের সঙ্গে তাজুল-শানুদের কোনো বিরোধ ছিল না। এরই মধ্যে ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি খুলিয়াটুলা এলাকায় কামালের ওপর ঘটে হামলার ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় কামালকে ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায়ই তাজুল ইসলাম, তার স্ত্রী শাহানা বেগম শানু, ছেলে রায়হান ইসলাম এবং তাজুল ইসলামের ভাই নুরুল ইসলামকে আসামি করে কামাল আহমদ কোতোয়ালি থানায় অভিযোগ করেন। এর দু দিন পরই ২৬ জানুয়ারি লামাবাজার পুলিশ ফাঁড়ির সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় তাজুল-শানুর দ্বিতীয় ছেলে সোহানকে। এ ঘটনায় মা শানু ১০ জনের নামোল্লেখসহ অজ্ঞাত ৪/৫ জনকে আসামি করে কোতোয়ালি থানায় দায়ের করেন হত্যা মামলা। ওই মামলায় শাকিল, টিপু, জামাল ওরফে টাইগার জামাল, আমীর, রিপন, জামাল আহমদ, গুলজার, সাকিব, রিয়াজ, ও কামরুলকে আসামি করা হয়।

এরপর একই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে আবারো হামলার শিকার হন কামাল আহমদ। আশঙ্কাজনক অবস্থায় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক কামালকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় কামালের স্ত্রী হেপী বেগম বাদি হয়ে তাজুলের ছেলে রায়হান, তাজুল, তাজুলের ভাই নুরুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম, তাজুলের স্ত্রী শানু, তাজুলের ভাইয়ের ছেলে ইমরান হোসেন, দরগাহ মহল্লার রিপন এবং শানুর গৃহকর্মী জোছনা বেগমের নামোল্লেখসহ অজ্ঞাত ৪/৫ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। পাল্টা আঘাত আসে ২০১৫ সালের ২০ ডিসেম্বর। তাজুল ইসলামের বড় ছেলে রায়হান ইসলামকে খুলিয়াটুলায় গরম দেওয়ানের মাজারের সামনে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে দুর্বৃত্তরা। কোপানোর পর রায়হানের চোখে ঢেলে দেওয়া হয় চুন। রায়হান হয়ে যান অন্ধ। এখনো তিনি শঙ্কামুক্ত নন। এ ঘটনায় ফের শানু বাদি হয়ে ২১ জনের নামোল্লেখসহ ৫/৬ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে কোতোয়ালি থানায় এজাহার দাখিল করেন। এজাহারে আসামি হিসেবে আলা উদ্দিন, জামাল উদ্দিন, রাইয়ান, তুফায়েল, গুলজার আহমদ, রিপন, রুমন, সবুজ, বিক্রম, পাপ্পু, শাকিল, শিহাব আহমদ, স্বপন আহমদ, তামিম, অর্জুন, মনিন্দ্র, কাইয়ুম, হেপী বেগম, সেলিনা বেগম, শাকিব, নূরুর নাম ছিল।

এরপর ২০১৬ সালে সেই ৫২/৩ বাসার ৪ দশমিক ১০ শতক ভূমির জন্য সিলেট মহানগর মুখ্য হাকিম আদালতে মামলা করেন শানু। এবার ভূমির মামলায় বিবাদি করা হয় খুলিয়াটুলার ৫২/২ বাসার মো. গোফরান আহমদ খোকন, বিশ্বনাথের আব্দুল কুদ্দুস, খুলিয়াটুলার নীলিমা ৫১ নম্বর বাসার সৈয়দ মো. হাফিজ, কুয়ারপারের জসিম উদ্দিন, ওলিউর রহমান চৌধুরী এবং ডা. এ.কে.এম মনিরুজ্জামানকে।

সর্বশেষ গত ২০ আগস্ট রাতে গরম দেওয়ান মাজারের সামনেই কুপিয়ে এবং চোখে চুন ঢেলে গুরুতর আহত করা হয় তাজুলকে। হামলার কিছু সময় পরই সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাণ হারান তাজুল। এ ঘটনায় স্ত্রী শানু বাদি হয়ে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ১১ জনের নামোল্লেখের পাশাপাশি ৩/৪ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। মামলায় নামোল্লেখকৃত আসামিরা হচ্ছেন, শাকিল, সৈয়দ হাফিজ, সৈয়দ আজির, গুলজার আহমদ, রিপন আহমদ, সবুজ, আল আমিন, তোফায়েল, টিপু, বিক্রম ও কৃষ্ণ।

এ ব্যাপারে নিহত তাজুলের স্ত্রী সাবেক নারী কাউন্সিলর শাহানা বেগম শানু বলেন, ৫২/৩ বাসাকে কেন্দ্র করেই আমার স্বামীকে হত্যা করা হয়। এই বাসাকে কেন্দ্র করে আমার বড় ছেলের উপর হামলা করা হয়। বড় ছেলে রায়হানের উপর হামলার এক মাস পর হত্যাকারীরা আমার বাসার নিচে এসে হুমকি দেয়। এর ভিডিও ফুটেজ আমাদের কাছে রয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার দ্বিতীয় ছেলে সোহানকে হত্যা করা হয়েছে বড় ছেলে রায়হান দ্রুত মোটরসাইকে চালানোকে কেন্দ্র করে। স্বামী হত্যা, ছেলে হত্যা এবং এক ছেলেকে অন্ধ করে দেওয়ার ঘটনার বিচার চাই। ওরা আমার পুরো পরিবার ধ্বংস করে দিল। আমি কী এর বিচার পাব না?

তবে পুলিশ বলছে, নেপথ্যের মূল কারণ হচ্ছে আধিপত্য বিস্তার। ভূমি নিয়ে নয়। মহানগর পুলিশের উপকমিশনার মোহাম্মদ রহমত উল্লাহ বলেন, খুলিয়াটুলায় যত ঘটনা ঘটেছে প্রত্যেক ঘটনায় মামলা হয়েছে। হামলা ও হত্যার ঘটনায় পৃথক মামলা পুলিশ নিয়েছে। আসামিও গ্রেপ্তার হয়েছে। আসামিরা জামিনে মুক্তি পেয়ে ঘটনা ঘটাচ্ছে। এখানে পুলিশের কোনো গাফিলতি নেই। তিনি বলেন, প্রত্যেকটি মামলায় পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। অভিযোগপত্রে কারণও উল্লেখ করা হয়েছে।

কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহেল আহম্মেদ বলেন, তিনটি হত্যা ও রায়হানকে অন্ধ করে দেওয়ার পেছনে রয়েছে আধিপত্য বিস্তার। মূলত আধিপত্য বিস্তার নিয়েই খুলিয়াটুলায় একের পর এক ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, ভূমি নিয়ে কোনো বিরোধ আছে কিনা তা পুলিশ খতিয়ে দেখছে। তবে পুলিশ প্রত্যেকটি ঘটনাই গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করেছে, আসামিও গ্রেপ্তার করেছে।

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: