সর্বশেষ আপডেট : ৪ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড আগে
বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

রিশার বাবাকে ঘাতক ওবায়দুল : ‘আপনার মেয়েকে ভালোবাসি, বিয়ে দেবেন কিনা বলেন’

full_256074523_1472447666নিউজ ডেস্ক:: বুধবার দুপুরে কাকরাইলে স্কুলের সামনের ফুট ওভারব্রিজের ওপর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী রিশাকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায় ওবায়দুল খান নামে এক বখাটে যুবক। এরপর থেকে ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি ছিল রিশা। কাল তার মৃত্যুর খবর শুনে ফুঁসে ওঠে সহপাঠীরা। প্রায় দেড় ঘণ্টা রাজপথ অবরোধ করে এ হত্যার প্রতিবাদ ও ঘাতকের বিচারের দাবি জানায় তারা।

এর আগে রিশার মৃত্যুর খবর জানার পর এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কান্নায় ভেঙে পড়েন রিশার মা-বাবা ও স্বজনরা। কাঁদতে কাঁদতে মা একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে কয়েকজন মিলে তাকে বাসায় নিয়ে যান। মেয়ের মৃতদেহ আঁকড়ে তখন বাবার আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে চারপাশ।

‘মা, আমি গেলাম’- রোজ এই কথা বলে আর স্কুলের পথে পা বাড়াবে না রিশা। স্কুলে কেন, কোত্থাও যাবে না আর। বেণি দুলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কখনও কোনো বায়না আর করবে না বাবার আদুরে মেয়েটা। খুনসুটিতে মেতে উঠবে না ভাইবোনদের সঙ্গে। রিশা এখন অন্যভুবনের বাসিন্দা। যেখানে মা নেই, বাবা নেই। নেই বন্ধু, স্বজন, শিক্ষক, স্কুলগেটের ঝালমুড়িওয়ালা

ফুলের মতো নিষ্পাপ মায়াভরা চোখের মেয়েটি শেষপর্যন্ত মৃত্যুর সঙ্গে টানা চার দিনের লড়াইয়ে হেরে গেছে। সবাইকে কাঁদিয়ে বিদায় নিয়েছে পৃথিবী থেকে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার সকাল পৌনে ৯টায় মৃত্যুর কোলে ঠাঁই নেয় উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সুরাইয়া আক্তার রিশা।

রিশার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে কাকরাইলের উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে হত্যার প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ করে। বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করে কাকরাইল মোড়ে তারা বিক্ষোভ করে।

জানা গেছে, মৃত্যুর আগে রিশা পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিয়ে গেছে। সেখানে রিশা বলেছে, টেইলার্সের কাটিং মাস্টার ওবায়দুল তাকে ছুরিকাঘাত করে। পুলিশ এখনও সেই ঘাতক ওবায়দুলকে গ্রেফতার করতে পারেনি। তবে তার অবস্থান সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ওই সূত্র আরও জানায়, ওবায়দুল এলিফ্যান্ট রোডের ইস্টার্ন মল্লিকা শপিংমলের একটি টেইলারিং শপে কাটিং মাস্টার ছিল। তার বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় ক্ষিপ্ত হয়ে বুধবার দুপুর ১২টার দিকে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের সামনের ফুট ওভারব্রিজের ওপর রিশাকে ছুরিকাঘাত করে ওবায়দুল। ঘটনার পরদিন এ ঘটনায় রিশার মা তানিয়া হোসেন বাদী হয়ে ওবায়দুলকে আসামি করে রমনা থানায় একটি মামলা করেন। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ধারায় এবং পেনাল কোডে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে এ মামলা করা হয়।

রিশার বাবা রমজান হোসেন রোববার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গের সামনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে থাকেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেল। আমার বুক খালি করে দিল ওই ঘাতক। আমার এতটুকু মেয়েকে কেন ওই পোলা মারল। আমি কাকে আদর করব। মা (রিশা) আমাকেও নিয়ে চল তোর সঙ্গে।’ তিনি জানান, রিশা প্লে গ্রুপ থেকেই উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে পড়ছে। ছোটবেলায় সে স্কুল ভ্যানে যাতায়াত করত। তবে এক পর্যায়ে তাকে কখনও বাবা, কখনও মা স্কুলে আনা-নেয়া করতেন। তবে সম্প্রতি তার মা বেশির ভাগ সময় অসুস্থ থাকেন। এ কারণে চলতি মাসের শুরু থেকে রিশাকে আবার স্কুলভ্যানে দেয়া হয়। এসব কথা বলতে গিয়ে আবার ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন রমজান হোসেন। আর্তস্বরে বলেন, ‘যদি মেয়েকে স্কুলভ্যানে যাতায়াত করতে না দিতাম তাহলে হয়তো এই পরিণতি দেখতে হতো না।’

জানা যায়, রিশার বাসা পুরান ঢাকার বংশালের সিদ্দিক বাজারে। বাড়ি নম্বর ১০৪। তার বাবা রমজান হোসেন ক্যাবল ব্যবসায়ী। রমজানের ২ মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে রিশা বড়। ছোট মেয়ে রোদেলা প্রথম শ্রেণীর ছাত্রী। ছেলে রবি হোসেন ৪র্থ শ্রেণীর ছাত্র। রিশা ও তার মা তানিয়া হোসেন এলিফ্যান্ট রোডের ইস্টার্ন মল্লিকা শপিংমলের তৃতীয় তলায় বৈশাখী টেইলার্সে পোশাক তৈরি করতে দিতেন। ওই টেইলার্সেই কাটিং মাস্টার ছিল ওবায়দুল। পোশাক তৈরির সময় রিশার মায়ের মোবাইল নম্বর ও বাসার ঠিকানা দেয়া ছিল টেইলার্সে। সেখান থেকেই মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে প্রায় ৬ মাস আগে ওবায়দুল ফোন করে রিশাকে চেয়েছিল। প্রায়ই ওবায়দুল ফোন দিয়ে বিরক্ত করত। রিশাকে বিয়ে করার প্রস্তাবও দেয় ওবায়দুল। একপর্যায়ে ফোনটি বন্ধ করে দেন রিশার মা। কয়েকদিন আগে রিশার বাসার সামনে ওবায়দুলকে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়।

রিশার মামা কামাল উদ্দিন মুন্না জানান, আনুমানিক ২ সপ্তাহ আগে ওবায়দুল রিশার বাবা রমজানের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ল্যান্ডফোনে ফোন করে এক কর্মচারীকে বলে, সে (ওবায়দুল) বাসায় ডিশ সংযোগ নেবে। এ জন্য রমজান হোসেনের সঙ্গে কথা বলবে। এই কৌশলে মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে রমজানকে ফোন করে হুমকি দেয় ওবায়দুল। সে বলে, ‘আপনার মেয়েকে ভালোবাসি। আমার সঙ্গে বিয়ে দেবেন কিনা বলেন।’ তার পরিচয় জানতে চাইলে রমজানকে বলেছিল, ‘সামনে এলেই দেখতে পাবেন, আমি কে।’ মুন্না বলেন, ‘এসব বিষয় রমজান আগে আমাদের কাউকে জানায়নি রিশা। যদি জানাত তাহলে আমার ভাগ্নিকে এভাবে মরতে হতো না।’

রিশার বাবা জানান, ঘটনার আগের দিন মঙ্গলবার স্কুলের সামনে রিশাকে উত্ত্যক্ত করেছিল ওবায়দুল। সে সময় রিশা দৌড়ে গিয়ে স্কুল ভ্যানে উঠে পড়ে। বাসায় পৌঁছে ঘটনাটি রিশা তার মাকে জানায়। তিনি বলেন, মেয়েটি সেদিন রক্ষা পেলেও পরদিন ওই বখাটের হাত থেকে আর রক্ষা পায়নি।

জানা গেছে, বুধবার স্কুলে রিশার পরীক্ষা ছিল। পরীক্ষা শেষে দুপুর ১২টার দিকে বাসায় ফেরার পথে স্কুলের সামনের ফুটওভারব্রিজের ওপর রিশাকে ছুরিকাঘাত করে ওবায়দুল। প্রত্যক্ষদর্শী ও উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র রাফি ঘটনার পর জানিয়েছিল, সে (রাফি) ফুটওভারব্রিজের ওপর দাঁড়িয়েছিল। এ সময় রিশা ফুটওভারব্রিজ পার হচ্ছিল। সে সিঁড়িতে নামার আগেই এক যুবক (ওবায়দুল) রিশার পেটে ছুরি মারার চেষ্টা করে। রিশা সেটি হাত দিয়ে ঠেকায়। এতে রিশার হাত কেটে যায়। সঙ্গে সঙ্গে আবারও তার পেটে ছুরি ঢুকিয়ে দেয় ওই যুবক। এ সময় রাফি ছুটে গিয়ে ওবায়দুলকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। তারপরও ওবায়দুল উঠে দাঁড়িয়ে আবার ছুরি মারে রিশার পেটে। এরপর ছুরি হাতেই সেখান থেকে পালিয়ে যায়। রিশা গুরুতর জখম হয়ে কাতরাতে থাকে। এ অবস্থায় রাফিসহ কয়েকজন রিশাকে উদ্ধার করে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হলে তাকে নেয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ইতিমধ্যে তার প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। বৃহস্পতিবার ভোরে রিশাকে আইসিইউতে নেয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার সকাল পৌনে ৯টার দিকে সেখানে তার মৃত্যু হয়।

রমনা থানার ওসি মশিউর রহমান এ বিষয় বলেন, গত শুক্রবার চিকিৎসাধীন রিশা জবানবন্দি দিয়েছে। সে বলেছে, ওবায়দুল তাকে বিরক্ত করত। সে তাকে ওভারব্রিজের ওপর ছুরিকাঘাত করেছে। ওসি জানান, শিগগিরই ওবায়দুলকে গ্রেফতার করা সম্ভব হবে। তার গ্রামের বাড়ি ঠাকুরগাঁও। বৈশাখী টেইলার্স থেকে দু’মাস আগে তার চাকরি চলে যায়।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: