সর্বশেষ আপডেট : ৩৭ সেকেন্ড আগে
শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

ভারতে গরু হত্যার বদলা মানুষ হত্যা?

151019054004_india_beef_protest_640x360_bbc_nocredit-550x309নিউজ ডেস্ক : ভারতে গরু ‘হত্যার’ বদলা নিতে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। ধর্মের নামে প্ররোচনা দিয়ে কীভাবে একদল মানুষকে উন্মত্ত করে তোলা যায় ‘দাদরি’-র ঘটনা তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। ‘দাদরি’তে স্রেফ গুজব রটনা হয়েছিল যে, বাড়িতে ফ্রিজে গরুর মাংস রাখা আছে! হিমাচল প্রদেশে ‘‘ট্রাকে গরু আর মানুষ একসঙ্গে কেন’’ এই অপরাধে কয়েকটা লোকের প্রাণ গেল।
গ্রেপ্তার বা শাস্তি দেওয়া হোক না হোক যারা খুন করেছে ভারতীয় আইনে তারা অপরাধী। ধর্মের জিগির তুলে এই ধরনের মানুষ হত্যা চালাচ্ছে, আইনের চোখে তারা অবশ্যই অপরাধী। যারা ধর্মের নামে এই উন্মত্ততা তৈরি করছে তাদের অপরাধ কিছু কম নয়। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বি জে পি অর্থাৎ আর এস এস এবং তাদের শাখা-প্রশাখা সারা ভারতে রাজনৈতিক স্বার্থেই এই উন্মত্ততা তৈরি করছে।
স্বাভাবিক মৃত্যুর দিন পর্যন্ত যদি সব গরুকে বাঁচিয়ে রাখা হয় তাহলে কী পরিণত হবে? ২০০০ সালের একটি হিসাবে দেখা যায় যে, মাংসের জন্য ২ কোটি ৪৩ লক্ষ গবাদি পশু হত্যা করা হয়। এর শতকরা ৪০ ভাগই হলো গরুর মাংস। যদি গরু হত্যা বন্ধ হয় তবে ১ কোটি গরু-মহিষ আরও অন্তত ৫ বছর বাঁচবে। তার মানে সংখ্যাটা যে-কোন সময়েই ৫ কোটি দাঁড়াবে। এর অর্থ হলো বোঝা বাড়বে ২০ হাজার কোটি টাকার। সংঘ পরিবার বড়জোর ১০ লক্ষের দায়িত্ব নেবেন। বাকিদের কী হবে?

ইন্ডিয়ান ভেটেরেনারি কাউন্সিলের হিসাব অনুযায়ী ভারতে মাত্র ৬০ ভাগ গবাদি পশুকে খাওয়ানোর মতো সঙ্গতি আছে। বাকিরা নির্মমভাবে পরিত্যক্ত হয়। তাদের ভবিষ্যৎ, অনাহারে মৃত্যু, পথ দুর্ঘটনায় অথবা বিষাক্ত খাবার অথবা খিদের তাড়নায় অখাদ্য খেয়ে। (আউটলুক, মার্চ ১০, ২০০৩)। গবাদি পশুর জন্য দরকার চারণভূমি অথবা গো-খাদ্য সংগ্রহ। ঝাঁসিতে অবস্থিত ‘ইনস্টিটিউট অব গ্রাসল্যান্ড’-এর হিসাব অনুযায়ী-এখনই প্রয়োজনের তুলনায় চারণভূমি শতকরা ৪৫ ভাগ। এবং পশুখাদ্যের অভাব শতকরা ২৫ ভাগ। ইতিমধ্যেই ভারতে ৫০ কোটি গবাদি পশু আছে। এই ৫০ কোটি গবাদি পশুর জন্য দেশে চারণভূমি আছে মাত্র ৫০ লক্ষ হেক্টর। আরও ৫ কোটি বাড়লে অবস্থা কতটা খারাপ হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। যে দেশ সারা বিশ্বে মানবসম্পদ উন্নয়নের মাপকাঠিতে সর্বনিম্ন হবার প্রতিযোগিতা করছে তারা অকেজো গরু রক্ষার জন্য এতো উদগ্রীব কেন!

তবে এটাও ১৩ বছরের আগেকার হিসাব। মানবসম্পদ উন্নয়ন দপ্তরের মহারথীরা এক নতুন আবিষ্কারে বলিয়ান ‘‘গরু-হত্যার জন্যই নাকি ভূমিকম্প হচ্ছে।’’ (আউটলুক, মার্চ ১০, ২০০৩)। যে বিজ্ঞানী এমন যুগান্তকারী আবিষ্কার করেছেন, তিনি ভারতীয় গো-রক্ষণ পরিষদের একজন কর্মকর্তা। একটি লিখিত পুস্তিকায় এমন সুভাষিতাবলি লিপিবদ্ধ করেছেন। মিত্তাল দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের এক অজানা গবেষণাপত্র থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন ‘যখন মা বসুন্ধরা দেখেন তাঁর সন্তানদের (গরু) নির্মমভাবে খুন করা হচ্ছে, তখন তিনি তীব্র যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে ছটফট করে ওঠেন। ওটাই হলো ভূমিকম্প।’’

বেশ তো! মানা গেল। কিন্তু বোঝা গেল না পশ্চিমবাংলা কিংবা কেরালায় গো-হত্যা হয় অথচ সেখানে ভূমিকম্প না হয়ে গুজরাট, মহারাষ্ট্র বা উত্তর প্রদেশের উত্তর কাশীতে হয় কেন? যেখানে গো-হত্যা বে আইনি। কেনই বা কেরালা, পশ্চিমবঙ্গে হয় না? বাংলাদেশে এতো গরু হত্যা হয়, ভূমিকম্প সেখানে হয় না কেন? ভি এইচ পি একটা গো-বিজ্ঞান অনুসন্ধান কেন্দ্র তৈরি করেছিল। এটা নাকি দৃঢ় ‘‘বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত গরু কেন্দ্রিক অর্থনীতি’’। (সূত্র-আউটলুক, মার্চ ১০, ২০০৩) এরা গো-মূত্র, গোবর ইত্যাদির মিশেলে দৈব ওষুধ তৈরি করেছেন। এরকম ৩২টা ওষুধ এদের আছে। এর মধ্যে শ্যাম্পু, সাবান, কাশির সিরাপ, হজমের ওষুধ, অর্শ, গ্যাসট্রিক, আলসার, চর্মরোগ- প্রায় সর্বরোগের ওষুধের তালিকা (আউটলুক, ১০ মার্চ, ২০০৩)

এখনও পর্যন্ত আমাদের দেশে-পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা, আসাম এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের কয়েকটি রাজ্য বাদ দিয়ে ২২টি রাজ্যে গো-হত্যা বে আইনি। এখন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং সংঘপরিবার সারা ভারতেই গো-হত্যা বে আইনি করবার কথা বলছে। সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুযায়ী ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত গো-হত্যা করা যাবে না। বয়সের সর্বোচ্চসীমা ১৪ বছর করা হয়েছে এইজন্য যে গরু ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত দুধ দিতে পারে। তারপর গরু গৃহস্থের কাজেও লাগে না, দেশের কাজেও লাগে না। তাকে কী গৃহস্থ ‘মা’ বলে পুজো করে এবং ভোগ দেয়? গরু নাকি জীবন্ত দেবী!

যে দেবতা বা দেবী মূর্তি হয়ে ভোগ খান তাকে একটা বাতাসা দিলেই সন্তুষ্ট। কিন্তু যে দেবী বা দেবতা জীবন্ত ‘তার ক্ষুধা মিটাইবো আমি, এমন ক্ষমতা নাই স্বামী’ বলে তাকে বেচে দেবে। তখন এই গরুকে কে দেখাশোনা করে-কেউই না। কারণ যে গরু দুধ দেয় না গৃহস্থ তাকে পুষবে কেন; হয় বিক্রি করে দেয় অথবা মাঠে-ঘাটে ছেড়ে দেয়। অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে মরে। অনেক চাষি আগে বলদ রাখতো। সেই বলদেরও আদর ছিল ততদিন যতিদন ‘গতর থাকতো। তারপর হয় গো-হাটায় বেচে দিত নয় ছে‍ড়ে দিত। এখনতো ট্রাক্টর ভাড়া করে চাষ করা হয়। কয়েক বিঘে জমির জন্য-সারা বছরে ধরে বলদকে খাওয়াবে কেন? তা‍ই বলদও কাজ ফুরোলে কিষেনজী।

আর বাড়িতে ষাঁড় জন্মালেতো কথাই নেই। জন্মানোর পরেই কপালে সিঁদুর দিয়ে ধর্মের নামে ছেড়ে দেওয়া হয়। বড় হয়ে ষাঁড়গুলো হয়ে যায় তোলাবাজ। হাটে-বাজারে কলাটা-মুলোটা তোলা তুলে খায়। খাবার না পেলে গরু মড়ক লাগবে।
কিছু কিছু জায়গায় কেউ কেউ ‘গো-শালা’ তৈরি করেছে। অর্থাৎ পরিত্যক্ত গরু থাকার জায়গা। সেখানে আর কটা গরুই বা থাকতে পারে। বেশিরভাগ গরুরই ‘‍ভোজনং যত্রতত্র শয়নম হট্ট মন্দিরে’।

ফলে ভারত থেকে গরু চলে যায় পাকিস্তানে অথবা বাংলাদেশে। অনেক সীমান্ত আছে যেখান দিয়ে গরু চলে যায় অন্য দেশে। তারা শুধু গরুর মাংস খায়ই না, মূল্যবান ডলার উপার্জন করে গরু মাংস রপ্তানি করে। গরুর চামড়াসহ গরুর দেহের বিভিন্ন অংশ মূল্যবান রপ্তানিযোগ্য পণ্য।

ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সূত্র থেকে জানা যায় গরুর চামড়া থেকে যে নানা ধরনের জিনিস তৈরি হয়, তাতে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা হয়, চামড়া ছাড়ানোর কাজ থেকে শুরু করে ট্যানারি কারখানাগুলোতে বিশাল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হয়। গরুর চামড়া থেকে মাংস ছাড়িয়ে নিয়ে শুকনো করার জন্য তামিলনাডুর থেকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয় এবং চামড়া শিল্পে কাজে লাগানো হয়। এই আধাসমাপ্ত চামড়া নিয়ে যাওয়া হয় তামিলনাডুর অম্বুৎ, ভেনিয়াম বাড়ি ও রানীপটে আর কলকাতায়। প্রায় চার হাজার ট্যানারি এবং প্রান্তিক, ছোট, মাঝারি চামড়াজাত দ্রব্যের কারখানায় লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কাজ করে জীবনধারণ করে থাকে। এই শিল্পে প্রায় পঁচিশ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হয় এর মধ্যে তিনভাগের একভাগ মহিলা। চামড়া রপ্তানিকারকদের হিসাব এই শিল্পের কাঁচা চামড়ার শতকরা আট ভাগ আসে স্লটার হাউস থেকে, তিরিশ ভাগ আসে মৃত পশুর চামড়া থেকে, দশ ভাগ আমদানি করা হয়। আমাদের দেশে কাঁচা চামড়া পাওয়া যায় প্রায় সাড়ে ছয় কোটি টুকরো আর চামড়া পাওয়া যায় আড়াই কোটি টুকরো, দু-কোটি ২২ লক্ষ মোষের চামড়া, আট কোটি ৮০ লক্ষ ছাগলের চামড়া। গরুর চামড়া প্রায় পঁচিশ বর্গফুট হয়। ছাগল বা ভেড়ার চামড়া পাওয়া যায় চার বর্গফুট। চামড়া ‍শিল্পের শতকরা তিরিশ ভাগ প্রাথমিক মেটিরিয়াল পাওয়া যায় গবাদি পশু থেকে। এর অর্ধেক অবদান গরুর ও ষাঁড়ের।

রপ্তানিকারকদের মতে গো-হত্যা বন্ধ হলে রপ্তানির উপর ভয়ঙ্কর প্রতিকূল প্রতিক্রিয়া পড়বে। গত ২০০২-০৩ সালে চামড়া শিল্প একাশি কোটি টাকার উপর আয় করেছে। এছাড়াও তাদের দেওয়া তথ্যে জানা যায় যে, ভারতীয় চামড়া শিল্পে বছরে ৭৭ কোটি ৬০ লক্ষ জোড়া জুতো, ১ কোটি ৮০ লক্ষ পোশাক, ৬ কোটি অন্যান্য চামড়াজাত দ্রব্য এবং ৫ কোটি ২০ লক্ষ শিল্পে ব্যবহৃত গ্লাভস উৎপাদনের ক্ষমতা আছে এবং তারা ২ বিলিয়ন ডলার (দু’শো কোটি টাকা) রপ্তানি করে আয় করে, এর শতকরা ষাটভাগই হলো ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প থেকে। রপ্তানিকারকদের মতে ইউরোপের গবাদি পশুর চামড়া থেকে ভারতীয় পশুদের চামড়া অনেক উন্নতমানের। আবার স্লটার হাউসে মেরে ফেলা গবাদি পশুর চামড়া মৃত পশুর চামড়া থেকে ভালো। কারণ সাধারণত মৃত পশু অসুস্থ বা সংক্রামিত থাকে। তাতে গুণমান কমে যায়। (ফ্রন্ট লাইন-১২ই সেপ্টেম্বর ২০০৩)

গো-মাংস খাওয়ার সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক আছে কী?

প্রাচীনযুগে ব্রাহ্মণরাও গো-মাংস খেতেন। ঋক্বেদ সংহিতায় অগ্নির কাছে প্রার্থনায়
‘‘গাভীদের খ- খ- করে ছেদন’’ করবার উল্লেখ করা হয়েছে।
ইন্দ্রের কাছে প্রার্থনা করা হয়েছে, তুমি আমার জন্য পনের-কুড়িটি বৃষ রান্না করে দাও, আমি তা খেয়ে আমার উদরের দু’দিক পূর্ণ করি, আমার শরীর স্থূল করি। (ঋগ্বেদ সংহিতা ১০-৭-৬, ১০-৮৪-১৪) অগ্নির কাছে প্রার্থনায় বলদ, ষাঁড় এবং দুগ্ধহীনা গাভী বলিদানের উল্লেখ আছে। (ঋগ্বেদ সংহিতা, ১/৬২/১১-১৩, ৬/১৭/১১, ১০/৯১/১৪)
ঋগ্বেদ সংহিতায় ‘বিবাহসূক্তে’ কন্যার বিবাহ উপলক্ষে সমাগত অতিথি অভ্যাগতদের গো-মাংস পরিবেশনের জন্য একাধিক গরু বলি দেওয়ার বিধান আছে (ঋগ্বেদ সংহিতা, ১০/৮৫/১৩) ঋগ্বেদ ছিল বৈদিক যুগের প্রাথমিক পর্যায়। উপনিষদ বৈদিক যুগের শেষ পর্যায়। উপনিষদের সময়েও গোমাংস খাওয়া ভারতে বহুল প্রচলিত ছিল।

বৃহদারণ্যক উপনিষদ-এর একটি শ্লোকে বলা হয়েছে, ‘‘কোন ব্যক্তি যদি এমন পুত্র লাভে ইচ্ছুক হন, যে পুত্র হবে প্রসিদ্ধ প-িত, সভাসমিতিতে আদৃত, যার বক্তব্য শ্রুতিসুখকর, যে সর্ববেদে পারদর্শী এবং দীর্ঘায়ু, তবে তিনি যেন বাছুর অথবা বড় বৃষের মাংসের সঙ্গে ঘি দিয়ে ভাত রান্না করে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে আহার করেন।’’ (বৃহদারণ্যকোপনিষদ, ৬/৪/১৮) মনে রাখা দরকার বৃহদারণ্যক উপনিষদ অন্যতম প্রধান উপনিষদ। বৈদিক সাহিত্যের অন্তর্গত গৃহ্যসূত্রগুলিতেও গরু বলি এবং গো-মাংস ভক্ষণের সুস্পষ্ট নির্দেশ আছে। অধিকাংশ গৃহ্যসূত্রে ব্রাহ্মণ, আচার্য, জামাতা, রাজা, স্নাতক, গৃহস্থের প্রিয় অতিথি, অথবা যে কোন অতিথির জন্যেই মধুপর্ক অনুষ্ঠানের বিধান আছে। আর সেই অনুষ্ঠানে গো-মাংস পরিবেশন করাই ছিল সাধারণ বিধান ও রীতি। (উদাহরণস্বরূপ দেখুন, পারস্কর গৃহ্যসূত্র, ১/৩/২৬-৩১; শাংখ্যান গৃহ্যসূত্র, ২/১৫; গোভিল গৃহ্যসূত্র, ৪/১০/১৮-২৬; খাদির গৃহ্যসূত্র, ৪/৪/১৭-২৩; হিরণ্যকেশী গৃহ্যসূত্র, ১/৩/১৩-১৯; আপস্তম্ভ গৃহ্যসূত্র ৫/১৩/১৫-১৬, আশ্বলায়ন গৃহ্যসূত্র, ১/২৪/৩০-৩০) এই লোকাচার এমন ব্যাপক বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, আশ্বলায়ন গৃহ্যসূত্র-এর বিধান অনুযায়ী বাড়িতে অতিথি এলে গরুদের বাঁচাবার জন্যে ছেড়ে দেওয়া হতো (যাতে অতিথিরা মনে করে যে বাড়িতে গরু নেই।) ‍(আশ্বলায়ন গৃহ্যসূত্র, ১/২৪/২৫)। আশ্বলায়ন গৃহ্যসূত্র-তে বলা হয়েছে বৃষ বলি দেবার এবং সে বলির মাংস ভক্ষণ করলে নানাভাবে ভাগ্যোদয় হবে — বিত্ত, জমি, পবিত্রতা, পুত্র, গবাদি পশু, দীর্ঘ আয়ু এবং ঐশ্বর্য লাভ হবে। (আশ্বলায়ন গৃহ্যসূত্র, ৪/৮) গরু বলির এবং গরু মাংস খাওয়া সম্বন্ধে প্রায় হুবহু বিস্তারিত বিধান আছে পারস্কর গৃহ্যসূত্রে, ৫/১৩/১৫-২০; আপস্তম্ভ গৃহ্যসূত্রে এবং হিরণ্যকেশী গৃহ্যসূত্রে, ২/৫/১-১৩) ‍হিরণ্যকেশী গৃহ্যসূত্রতে গরু বলি দিয়ে সে মাংস রোস্ট করে ঘি এবং ভাতের সঙ্গে মিশিয়ে প্রয়াত পূর্বপুরুষদের উৎসর্গ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে বিস্তারিত বিধান দেওয়া হয়েছে। (হিরণ্যকেশী গৃহ্যসূত্র, ২/৫/১-১৩)

বিভিন্ন স্মৃতিশাস্ত্রেও গো-মাংস ভক্ষণের দ্বিধাহীন সমর্থন পাওয়া যায়। বশিষ্ঠ স্মৃতিতে বলা হয়েছে : (বশিষ্ঠস্মৃতি, ৪/৮) ব্রাহ্মণ, রাজা অভ্যাগতদের জন্য বড় ষাঁড় কিংবা বড় পাঁঠার মাংস রান্না করে আতিথেয়তা করা বিধেয়। মনু অবশ্য কোন কোন প্রাণীর মাংস খেতে বারণ করেছেন। কিন্তু তার মধ্যে গরু পড়ে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যে সব প্রাণী এক ক্ষুর বিশিষ্ট, তাদের মাংস খাওয়া বিশেষ বিধান ছাড়া বারণ। (মনুস্মৃতি, ৫/১২)। সকলেই জানেন, এই শ্রেণিতে গরু পড়ে না। আবার যেসব প্রাণীর শুধু এক পাটি দাঁত অছে তাদের মাংস খাওয়া যেতে পারে। (মনুস্মৃতি, ৫/১৮)। বলা বাহুল্য, গরু এই শ্রেণিতে পড়ে। অতিথিদের খেতে দেবার জন্য, পোষ্যদের প্রতিপালনের জন্য, অথবা ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য প্রয়োজনে যেকোন মাংসই বিধিসম্মত। (মনুস্মৃতি, ৫/২২, ৯০/০৪-১০৮)
মনুস্মৃতি-র মতো কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র-তেও‍ গরু মাংস খাবার সুস্পষ্ট বিধান আছে। কৌটিল্য বিধান দিয়েছেন যে, রাজ্যের গবাদি পশুর তত্ত্বাবধায়কের পদে একজন সরকারি কর্মচারী থাকবেন। তিনি গরুতে ছাপ দিয়ে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করবেন, যথা দুগ্ধবতী গাভী, হালটানা বা গাড়িটানা বলদ, প্রজননের উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত ষাঁড় এবং মাংসের জোগানের জন্য অন্যান্য গরু। (কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, ২/২৯/১২৯) গোপালকেরা মাংসের জন্য ছাপ দেওয়া গরুর মাংস কাঁচা অথবা শুকিয়ে বিক্রি করতে পারে। (কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, ২/২৯/১২৯) মাংসের জন্য ছাপ মারা গরু ছাড়া অন্য কোন শ্রেণির গরু হত্যা নিষিদ্ধ। (কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, ২/২৬/১২২)
রামায়ণ-এ গরু মাংস খাবার কিছুটা প্রত্যক্ষ এবং কিছুটা পরোক্ষ উল্লেখ আছে। বনগমনের পথে রাম-সীতা- লক্ষ্মণ ভরদ্বাজ মুনির আশ্রমে উপস্থিত হলে মুনিবর বৃষ এবং ফলমূল দিয়ে তাদের ভোজনের ব্যবস্থা করেছিলেন। (বাল্মীকি রামায়ণ, ২/৫৪) পৌরাণিক যুগে গরু মাংস খাবার প্রত্যক্ষ এবং বিস্তারিত প্রমাণ রামায়ণ-এর চেয়ে মহাভারত-এ অনেক বেশি।
প্রাচীন বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ সুত্তনিপাত-এ তৎকালীন কোশলরাজের এক যজ্ঞের বর্ণনা আছে। তাতে বলা হয়েছে যে, যজ্ঞে পাঁচশ’ বলদ, পাঁচশ’ গাভী বলির জন্যে বেঁধে রাখা হয়েছিল, আর রাজার ভৃত্যেরা বলির ব্যাপারে ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের আদেশ অশ্রুপূর্ণ নয়নে পালন করছিল।
(সূত্র : অধ্যাপক জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায়- মহাকাব্য ও মৌলবাদ)

খ্রিস্টপূর্ব ১ম সহস্রাব্দে লোহার আবিষ্কার এবং প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপকভাবে কৃষি বিস্তার হতে শুরু করলো। মগধ নামে একটি বিশাল রাষ্ট্র জন্ম নিলো। ফলে গরু প্রয়োজন বহুগুণ বেড়ে গেল। এই প্রয়োজনকে ধর্মীয় তত্ত্বের আবরণের আড়ালে ঢাকবার চেষ্টা করা হয়েছে। তাই এখন ধর্মের নামে চলছে। এছাড়া সেইসময় বৌদ্ধধর্ম ব্যাপকভাবে এবং জৈন ধর্মের অহিংসা নীতি বেশ প্রভাব বিস্তার করেছিল। এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে ব্রাহ্মণ্য সমাজকে অনেকরকম আপস করতে হয়েছিল। আর্থিক কারণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই সাংস্কৃতিক কারণও গো-হত্যা নিষেধাজ্ঞার শক্তি জুগিয়েছিল। চরক সংহতি এবং সুশ্রুত সংহিতায় প্রমাণিত যে, প্রাচীন ভারতে রোগের উপশমের জন্য গরু মাংস খাবার দ্ব্যর্থহীন নির্দেশ আছে। চরক সংহিতায় ১/২৭/৬৫, ২/২৭/৭৯, সুশ্রুত সংহিতায় ১/৪৬/৪৭, এটা স্পষ্টতই দেখা যাবে। এমনকি অনেক পুরাণেও গরু মাংস খাবার স্পষ্ট নির্দেশ আছে। ব্রাহ্মণদের পরিবেশন করার নির্দেশ আছে। এপ্রসঙ্গে বলা আছে ব্রাহ্মণদের গো-মাংস খাইয়ে হবিষ্য করালে পিতৃগণ ১১ মাস পর্যন্ত তৃপ্ত থাকেন। আর এই স্থায়িত্বকাল সবচেয়ে দীর্ঘ। (বিষ্ণুপুরাণ ৩/১৬)

মানুষ কী খা‍বে এটা মানুষের নিজস্ব অধিকার। রাষ্ট্র অথবা কোন রাজনৈতিক দল বা সামাজিক প্রতিষ্ঠান এই অধিকারে হস্তক্ষেপ করবে কেন? যুগ যুগ ধরে খাদ্য অভ্যাস তৈরি হয়। ফতোয়াজারি করে তা বন্ধ করা হবে কেন! গো-হত্যা বন্ধ হলে উত্তর-পূর্ব ভারতে ভয়ঙ্কর সমস্যার সৃষ্টি হবে। এখানে মাথাপিছু আয় এমনিতেই কম। মিজোরাম, মেঘালয় এবং নাগাল্যান্ডে শতকরা ৮০ ভাগ গরু মাংসের মতো সস্তার প্রোটিন তাদের পক্ষে জোগাড় করা কঠিন। এখনকার মানুষ গরু মাংস খেয়ে থাকে। দেশের মধ্যে কেরালা সব থেকে বেশি গরুর মাংস ভোজী। জনসংখ্যার শতকরা ৪৩ ভাগ মুসলিম এবং খ্রিস্টান। তারা সাধারণত গরুর মাংস খেয়ে থাকেন। এছাড়াও হিন্দুরাও ব্যাপকভাবে গরুর মাংস খান. কেরালায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ গরুর মাংস খেয়ে থাকেন।
গরুর মাংস নিয়ে স্বামী বিবেকানন্দ

স্বামী বিবেকানন্দ বেদান্তে বিশ্বাসী হলেও তিনি সমস্ত কুসংস্কারের বিরোধী ছিলেন।
এ বিষয়ে অনেক লেখায় ও বক্তব্যে স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, মানুষের পক্ষে যে খাদ্য পুষ্টিকর এবং বলবর্ধক, সে খাদ্যই গ্রহণ করা বিধেয়। (উদাহরণস্বরূপ দেখুন,  H Vol. V,pp. 477-498) আমেরিকা বাসের সময় তিনি নিজে গরুর মাংসসহ সব রকম আমিষ খাদ্যই গ্রহণ করতেন। বিদেশে বিবেকানন্দের প্রভাবে আতঙ্কিত হয়ে খ্রিস্টান মিশনারিরা একথা ফলাও করে প্রচার করেন। ফলে তাঁর ভারতীয় শিষ্যদের অনেকে উদ্বিগ্ন হয়ে এ বিষয়ে তাকে চিঠি লেখেন এবং সমালোচনা করেন। উত্তরে বিবেকানন্দ শুধু যে নিজ খাদ্যাভ্যাসকে জোরালো সমর্থন করেন তাই নয়, শিষ্যদের তীব্র ভর্ৎসনাও করেন। দুর্ভাগ্যবশত রামকৃষ্ণ মিশন এই চিঠি সম্পূর্ণ প্রকাশ করেনি। কিন্তু যেটুকু করেছে তার ভাষাও দ্ব্যর্থহীন।

বিবেকানন্দ বলেছেন : ‘‘ভারতবাসীরা যদি চায় যে, আমি একমাত্র হিন্দু খাবার খাই, তবে তারা যেন আমাকে একজন রান্নার লোক এবং তার জন্য অনেক টাকা পাঠায়।. . . আমি কারও আদেশে চলি না। আমি আমার জীবনের উদ্দেশ্য জানি এবং আমার কোন সংকীর্ণতা নেই আমি যতখানি ভারতীয়, ততখানি বিশ্বমানব।. . . কোন্ দেশের বিশেষ অধিকার আছে আমার উপর? আমি কি কোন জাতির ক্রীতদাস্ত . . . . তোমরা কি বলতে চাও যে, আমি ঐ জাতিভেদে জর্জরিত, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, নিষ্ঠুর ভ-, নাস্তিক ও কাপুরুষ শিক্ষিত হিন্দুদের মধ্যেই জীবন কাটাবার জন্য এবং মরবার জন্য জন্মেছি?’’ (আলসিংগা নামক মাদ্রাজী শিষ্যকে লন্ডন থেকে ১৮ই নভেম্বর ১৮৯৫ তারিখে লেখা স্বামী বিবেবকানন্দের এই পত্র বিভিন্ন সংকলনে পাওয়া যায়। আরও দেখুন, Romain Rolland The Life of Vivekananda, Adwaita Ashrama Calcutta 1975, p.44 লেখক কর্তৃক অনূদিত) (সূত্র : জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায় -মহাকাব্যে মৌলবাদ)

ব্রিটিশ আমলে এক সময় উত্তর ভারতে দুর্ভিক্ষে কয়েক হাজার লোক মারা যায়। ঠিক ঐ সময়তেই গো-রক্ষা আন্দোলন চলছিল। একদল লোক এক স্বামীজীর কাছে এসে বলেন, জনৈক মহারাজকে (তখন অনেক দেশীয় রাজ্য ছিল, তাই রাজা-মহারাজাও ছিলেন) দশ হাজার টাকা চাঁদার জন্যে একটি পত্র লিখতে। স্বামীজীর সঙ্গে কথাবার্তা হয়েছিল এই ধরনের :
স্বামীজী – আপনারা চাঁদা চাইছেন কেন?
আদায়কারী – আজ্ঞে, গো রক্ষার জন্য।
স্বামীজী -ওখানে দুর্ভিক্ষে কত মানুষ মারা গেছে তাদের জন্য আপনারা কিছু করেছেন?
আদায়কারী -আজ্ঞে না, তাদের জন্য ক‍রিনি।
স্বামীজী -কেন করেননি?
আদায়কারী – আজ্ঞে ওরা তো মানুষ, আমরা মানুষের জন্য কিছু করি না। গরু জন্য করি।
স্বামীজী- কেন? মানুষের জন্য করেন না – গরু জন্য করেন কেন?
আদায়কারী – আজ্ঞে গরু তো আমাদের মা। তাই
স্বামীজী- তাই হবে। অমন মা না হলে তার গর্ভে এমন সুপুত্রের জন্ম হয় কী করে?
এই সর্বনাশা রাজনৈতিক ও সামাজিক আক্রমণের বিরুদ্ধে বামপন্থীদের প্রধান ভূমিকা নিতে হবে। ধর্ম ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে যথা সম্ভব রাজনৈতিক, গোষ্ঠী এবং ব্যক্তিকে নিয়ে সর্বাত্মক প্রতিরোধে নামতে হবে। এ এক দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম। এই লড়াই আপস‍বিহীন।
লেখাটি কলকাতার দৈনিক গণশক্তি থেকে নেয়া।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: