সর্বশেষ আপডেট : ৯ মিনিট ২৮ সেকেন্ড আগে
বুধবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

বেদে পল্লীতে পরিবর্তনের ছোঁয়া

B-1নিউজ ডেস্ক : এক সময় তারা আজন্ম ভেসে বেড়াতো। জন্ম, মৃত্যু ও বিয়ে সবকিছুই হতো জলের ওপর। একেক দলে ২৫/৩০টি সারিবদ্ধ নৌকায় পরিবার নিয়ে একেকস্থানে ৭ থেকে ১০দিন অবস্থান করে গ্রামের মেঠোপথে ঘুরে পুরুষ সদস্যরা সাপ ধরা ও খেলা এবং নারীরা সিংগা লাগিয়ে ঝাড়ফুঁক দেয়াসহ তাবিজ-কবজ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

কালের বির্বতনে গত ৩০ বছর ধরে জল ছেড়ে ওরা গৃহস্থের কাছ থেকে জমি ক্রয় করে স্থায়ী বসবাস শুরু করেছেন জেলে সম্প্রদায়ের লোকজন। এরইমধ্যে পরিবর্তন করেছেন পূর্ব পুরুষদের পেশা। পুরুষ সদস্যরা স্থায়ী ব্যবসা বাণিজ্য, নদীতে মাছ ধরা ও দিনমজুরের কাজের সাথে নিজেদের জড়িয়ে নিয়ে সমাজের অন্যসব মানুষের মতো বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছেন। নারীরা ছেড়ে দিয়েছেন তাদের পূর্বের পেশা। উচ্চ শিক্ষার আশায় ছেলে-মেয়েদের ভর্তি করেছেন বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে। যুবকদের অনেকেই আবার পাড়ি জমিয়েছে প্রবাসে। ইতোমধ্যে গৃহস্থের ছেলেদের কাছে মেয়ে বিয়ে কিংবা গৃহস্থের মেয়েদের বউ করে এনেছেন ছেলেদের জন্য।
আড়িয়াল খাঁ নদীর শাখা পালরদী নদীর তীরবর্তী বরিশালের গৌরনদী পৌর এলাকার ২নং ওয়ার্ড টরকীচর এলাকার স্থায়ী বেদে পল্লীর অবস্থান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৩০ বছর ধরে নদীর তীরবর্তী ওই এলাকায় জমিক্রয় করে স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছেন শতাধিক বেদে পরিবার। এসব পরিবারে সদস্য সংখ্যা প্রায় সহস্রাধিক।
স্থায়ী বেদে পল্লীর সর্দার মো. নান্নু সরদার (৮০) জানান, তাদের এ পল্লীর শিশু-কিশোরদের স্কুলমুখী করার জন্য দীর্ঘদিন থেকে নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে টার্গেট পিপলস্ ফর ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (টিপিডিও) নামের একটি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী এনজিও। এ এনজিওর সহযোগিতায় পল্লীর প্রায় অর্ধশতাধিক শিশুরা স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত রয়েছে। এছাড়াও প্রায় বিশজন ছেলে-মেয়ে বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে পড়াশুনা করছে।
স্থায়ী বেদে পল্লী সর্দার আক্ষেপ করে জানান, তাদের এ পল্লীতে ভোটার সংখ্যা ৩৫০ জন। প্রতিবার ভোটের আগে প্রার্থীরা ভোট নেয়ার জন্য স্থায়ী বেদে পল্লী বাসিন্দাদের জীবনমান উন্নয়নে অসংখ্য প্রতিশ্রুতির ফুলঝুঁড়ি দিলেও ভোটে বিজয়ী হওয়ার পর আর তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না।

টরকী বন্দরের সাথে বেদে পল্লী যোগাযোগ ব্যবস্থাই প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একমাত্র রাস্তার অভাবে এ পল্লীর কোমলমতি শিশু-কিশোরদের স্কুল-কলেজে যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে কোমড় সমান পানি সাতরিয়ে শিক্ষার্থীসহ পল্লী বাসিন্দাদের যাতায়াত করতে হয়। এছাড়াও বেদে পল্লীতে বিশুদ্ধ পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে। প্রায় দশ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা স্থায়ী বেঁদে পল্লীর শতাধিক পরিবারের জন্য রয়েছে একটি মাত্র গভীর নলকূপ। যা ব্যবহার করতে ওই পল্লী বাসিন্দাদের সব সময়ই লাইনে দাঁড়াতে হয়। পল্লীর বাসিন্দাদের নিজস্ব অর্থে নির্মিত মসজিদটি রয়েছে জরার্জীন অবস্থায়। এ পল্লীতে নেই স্থায়ী কোন কবরস্থান। অথচ এ বেদে পল্লী পাশে সরকারি অসংখ্য খাস জমি রয়েছে। পল্লীর বাসিন্দারা সেখানে সরকারিভাবে একটি কবরস্থান নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন দীর্ঘদিন থেকে।

এ পল্লীর প্রতিবন্ধী, বয়স্ক ও শিক্ষার্থীরা সরকারের সকল প্রকার ভাতা থেকে ও দরিদ্র বাসিন্দারা ভিজিএফ, ভিজিডি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অথচ এ পল্লীর বাসিন্দাদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ থাকা সত্বেও অজ্ঞাত কারণে সরকারের সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বেঁদে পল্লীর বাসিন্দারা।

সূত্রমতে, সম্প্রতি স্থানীয় সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর হস্তক্ষেপে এ পল্লীর বাসিন্দাদের বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত করার জন্য বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থাপন করা হলেও এখ নপর্যন্ত মিটার সংযোগ দেয়া হয়নি।
এ পল্লীর বাসিন্দা লালন খানের স্ত্রী তমা বেগম জানান, নৌকায় বসবাসরত অবস্থায় গত ১৫ বছর পূর্বেও তিনি গ্রামঘুরে সিংগা লাগিয়ে তাবিজ-কবজ বিক্রি করেছেন। টরকীচরে তার স্বামী তাদের নিয়ে স্থায়ী বসবাসের পর সে (লালন) স্থানীয়ভাবে ব্যবসা শুরু করেন। এরপর থেকেই তিনি (তমা) পূর্বের পেশা ছেড়ে দিয়ে এখন সন্তানদের শিক্ষিত করার স্বপ্ন দেখছেন। তার বড়পুত্র আহাদ এবছর তৃতীয় শ্রেনীতে পড়াশুনা করছে। গৃহবধূ নাসরিন বেগম জানান, তার একমাত্র পুত্র অপূর্বকে শিক্ষিত করতে পারলে তাদের আর কোন কষ্ট থাকবে না।

বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে অধ্যায়নরত এ পল্লীর বাসিন্দা পান্নু সরদার, সরকারি গৌরনদী কলেজে দ্বাদশ শ্রেনীতে অধ্যায়নরত মনির হোসেন, টরকীবন্দর বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যায়নতর মহিমা আক্তার, বাঁধন খানমসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীরা বলেন, আমার উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে চাই।
বেদে পল্লীর বাসিন্দা রব সরদার (৬৫), লিটন হাওলাদার (২৪), উজ্জল বালী (৩০), ইলিয়াস খান (৩২), মহিউদ্দিন হাওলাদার (২৬) জানান, তাদের পূর্ব পুরুষরা বেদে সম্প্রদায়ের হলেও যুগের স্রোতধারায় বর্তমানে তাদের বহু পরিবার মৎস্যজীবী, দিনমজুর ও ব্যবসায়ী পরিচয় ধারণ করেছেন। আগে তারা সাপ ধরা, সাপ খেলা দেখানো, বিভিন্ন তাবিজ-কবজ বিক্রি, সিংগা দেয়ার কাজ করলেও এখন আর তারা ওইসব কাজের সাথে যুক্ত নেই।

এ ব্যাপারে গৌরনদী উপজেলা সমাজ সেবা অফিসার হিসেবে নবযোগদানকারী আবুল কালাম বলেন,‘টরকীচরে যে একটি স্থায়ী বেদে পল্লী রয়েছে এবং সেখানকার প্রতিবন্ধী, বয়স্ক এবং স্কুলগামী শিশুরা যে ভাতা থেকে বঞ্চিত সেটি আমার জানা ছিলো না। এ ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জেলা প্রশাসক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান বলেন,‘বর্তমান সরকার সর্বক্ষেত্রে দলিত ও বেদে সম্প্রদায়ের জন্য বিশেষ কোঠা বরাদ্দ করেছেন। সেই কোঠা থেকে টরকীচরের স্থায়ী বেদে পল্লীর বাসিন্দারা কেন বঞ্চিত হচ্ছেন সে বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: