সর্বশেষ আপডেট : ৮ মিনিট ০ সেকেন্ড আগে
সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

পবিত্র কাবাঘর নির্মাণের ইতিহাস

kabaনিউজ ডেস্ক : পৃথিবীর সর্বপ্রথম ঘর বায়তুল্লাহ বা কাবাঘর। আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতারা এ ঘর নির্মাণ করেন। প্রতিবছর লাখ লাখ মুসলমান বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করতে মক্কা গমন করেন। সৃষ্টির সূচনাকাল থেকেই আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে এ পবিত্র ঘর দুনিয়ার মানুষের জন্য ইবাদতখানা হিসেবে নির্ধারিত হয়ে আসছে। এ মর্মে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্য নির্মিত হয়েছে তা মক্কা নগরীতে।’ [সুরা আলে ইমরান : ৯৬]

এই বায়তুল্লাহ নির্মাণে সুদূরপ্রসারী এক ইতিহাস রয়েছে। ইতিহাসবেত্তারা বলেন, পবিত্র ও সম্মানিত কাবা শরিফের নির্মাণ ও সংস্কার কাজ বিভিন্ন যুগে বিভিন্নভাবে সম্পাদিত হয়েছে। তাফসিরবিদ মুজাহিদ বলেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বায়তুল্লার স্থানকে সমগ্র ভূপৃৃষ্ঠ থেকে দুই হাজার বছর আগে সৃষ্টি করেন। মুসলিম শরিফের এক হাদিসে হজরত আবুজর গিফারি রাযি. হতে বর্ণিত আছে, বিশ্বের সর্বপ্রথম মসজিদ হলো মসজিদে হারাম তথা বায়তুল্লাহ।

হজরত আদম আ. কে সৃষ্টির অনেক আগেই মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের মাধ্যমে বায়তুল্লাহ নির্মাণ করেন। এরপর আদম আ. থেকে শুরু করে ইবরাহিম আ. পর্যন্ত বিভিন্ন নবী-রাসুলগণের সময়ে তা পুনঃনির্মিত হয়। ইবনে জারির তাবারির বর্ণনায় এসেছে, আরাফাতে ফেরেশতারা আদম আ. কে বলেন, ‘হে আদম! আমরা আপনার দু’হাজার বছর আগে এ ঘরে হজ আদায় করেছি।’
নি¤েœ স্তরে স্তরে বায়তুল্লাহ নির্মাণ ও সংস্কার বিষয়ক বিস্তারিত আলোকপাত করা হলো।

ফেরেশতাদের নির্মাণ : সর্বপ্রথম বায়তুল্লাহ শরিফ মহান আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের মাধ্যমে তৈরি করেন। ঐতিহাসিক আজরাকি বলেন, হজরত আদম আ. সৃষ্টির পূর্বে ফেরেশতাগণ এ ঘর নির্মাণ করেছিলেন। এ মতের পক্ষে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রযি.-এর একটি সহিহ বর্ণনা রয়েছে। ‘তাহজিবুল আসমা’ গ্রন্থে আল্লামা নববি রহ. ফেরেশতাদের নির্মাণকে সর্বপ্রথম বলে উল্লেখ করেন।
আদম ও হাওয়া আ. এর নির্মাণ : মানুষ হিসেবে হজরত আদম আ. সর্বপ্রথম বায়তুল্লাহ নির্মাণ করেন। বায়তুল্লার ইতিহাসে এ নির্মাণ দ্বিতীয় পর্যায়ের। হজরত আদম ও হাওয়া আ. এর পৃথিবীতে মিলন হলে তারা উভয়ে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ইবাদতের জন্য একটি মসজিদ প্রার্থনা করেন। আল্লাহ তাদের দু’আ কবুল করেন এবং বায়তুল মামুর আকৃতিতে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। হজরত আদম আ. তাতে আল্লাহর ইবাদত করেন। ইমাম বায়হাকি রহ. তার রচিত ‘দালাইলুন নবুওয়াহ’ গ্রন্থে একটি হাদিস উল্লেখ করেন, তা হলো, ‘মহান আল্লাহ ফেরেশতা জিবরাইল আ. কে আদম ও হাওয়া আ. এর কাছে পাঠিয়ে নির্দেশ দিলেনÑ তোমরা উভয়ে আমার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করবে। অতঃপর জিবরাইল আ. একটি ঘর নির্মাণের ছক করে দিলেন। হজরত আদম আ. খনন করেন এবং বিবি হাওয়া আ. মাটি স্থানান্তর করেন। এক পর্যায়ে গায়েবি আওয়াজ আসে, ‘হে আদম! যথেষ্ট হয়েছে।’ ঘর নির্মাণ শেষে আল্লাহ তাঁকে ওই ঘর তাওয়াফের নির্দেশ দিলেন। বলা হলো, আপনি প্রথম মানুষ এবং এটি প্রথম ঘর।

শীস আ. এর নির্মাণ : হজরত শীস আ.ও বায়তুল্লাহ নির্মাণের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি হজরত আদম আ. এর অসিয়তপ্রাপ্ত দায়িত্বশীল ছিলেন। তিনি যখন দেখলেন, কাবা ঘরটি জীর্ণ-শীর্ণ হয়ে আছে, তখন কাদামাটি ও পাথর জড়িয়ে শক্ত করে ঘরটি পুনঃনির্মাণ করেন। এ নির্মাণকাজ ছিল তৃতীয়বারের মতো।

ইবরাহিম আ. এর নির্মাণ : চতুর্থবারের মতো বড়সড় আকারে বায়তুল্লাহর পুনঃনির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন হজরত ইবরাহিম আ. ও তাঁর প্রিয়পুত্র হজরত ইসমাইল আ.। হজরত ইবরাহিম আ. এর নবী হওয়ার অনেক আগেই মানুষ মহান আল্লাহকে ভুলে গিয়েছিল। কাবাঘরটিও ধ্বংস হয়ে বালুর নিচে চাপা পড়েছিল। এমনটি ঘটেছিল হজরত নূহ আ. এর তুফানের সময়। তখন হজরত ইবরাহিম আ. তার উম্মতকে মহান আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিলেন এবং কাবাঘর পুনঃনির্মাণ করার নির্দেশ পেলেন। এ নির্দেশে হজরত ইবরাহিম আ. কাবা নির্মাণের কাজ হাতে নিয়েছিলেন এবং তাকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছিলেন তাঁর প্রিয়পুত্র হজরত ইসমাইল আ.। তুরে যাইতা, তুরে সাইনা, জুদি, লুবনান ও হেরা নামক পাঁচটি পাহাড় থেকে পাথর এনে এ নির্মাণ কাজ শুরু করেন। প্রথমবারের মতো পাথরের দ্বারা বায়তুল্লাহর নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়েছিল। এ নির্মাণে হজরত জিবরাইল আ.ও সহযোগিতা করেছিলেন।
নবী-রাসুল ব্যতীত বায়তুল্লাহ নির্মাণ : হজরত ইবরাহিম আ. এর পরও বিভিন্ন সম্প্রদায় বিভিন্ন সময় প্রয়োজনে বায়তুল্লাহ সংস্কারের খেদমত করেন। যেমন, পঞ্চমবার আমালিকা সম্প্রদায়, ষষ্ঠবার জুরহুম কাবিলার নির্মাণ এবং সপ্তমবার নির্মাণ করেন কুসাই ইবনে কিলাব। অবশ্য অষ্টমবার নির্মাণের কাজে হাত দেন কুরাইশ সম্প্রদায়। যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বয়স ছিল ৩৫ বছর।

আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইরের নির্মাণ : নবম পর্যায়ে কাবার নির্মাণ কাজ হাতে নেন আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর। ৬৪ হিজরিতে যখন ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া রাযি. হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর রাযি.কে মক্কায় আবদ্ধ করে ফেলেছিল তখন বাইরে থেকে মিনজানিকের মাধ্যমে মক্কার ভেতরে পাথর ও আগুন এসে পড়ার কারণে কাবা শরিফের দেয়াল ও ভিত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এ কারণে তিনি এর দেয়াল ভেঙ্গে ইবরাহিম আ. এর ভিত্তির উপর নির্মাণ করার ইচ্ছা পোষণ করেন। তিনি বিষয়টি হজ মৌসুমে সাধারণ লোকদের মতামতের ভিত্তিতে স্থির করলেন। হজের সময় তিনি সবাইকে একত্রিত করে বললেন, হে মানুষেরা! তোমরা আমাকে কাবা শরিফের ব্যাপারে পরামর্শ দাও। কাবাকে ভেঙ্গে নতুন করে হজরত ইবরাহিমের ভিতে নির্মাণ করবো, নাকি বর্তমান অবস্থায় সংস্কার করে দেবÑ সে ব্যাপারে সমর্থন ও পরামর্শ চাই। তখন হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বললেন, যে ঘরের ওপর মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে, যে পাথরের ওপর তারা ইসলাম নিয়েছে এবং যার ওপর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাসুল হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন, সেই ঘর ও পাথরকে ওই অবস্থায় ছেড়ে দাও।

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর রাযি. ইস্তেখারা করে সিদ্ধান্ত নিলেন ভেঙে ফেলার। সবশেষে অত্যন্ত আধুনিকতার ছোঁয়ায় কাবার ভিত্তিপ্রস্তর শুরু করেন। ঐহিহাসিক আজরাকি বলেন, তিনি হজরত ইবরাহিম আ. এর ভিত্তির ওপর বায়তুল্লাহ নির্মাণ করেছিলেন এবং কুরাইশরা যে অংশ অর্থাভাবে নির্মাণের বাইরে রেখেছিল তিনি তা বায়তুল্লাহর ভেতরে ঢুকিয়ে নির্মাণকাজ সম্পাদন করলেন। নির্মাণকাজ রুকন পর্যন্ত উঠে গেলে তিনিই নিজ হাতে হাজরে আসওয়াদ স্থাপন করলেন। জমিন বরাবর দুটি দরজা রাখলেন। একটি বর্তমানের, অপরটি তার বরাবর পশ্চিমদিকে। ভেতরে এক সারিতে তিনটি খুঁটি স্থাপন করলেন। ছাদে ওঠার জন্য রুকনে সামিতে একটি সিঁড়ি রাখলেন। ছাদের পানি নিষ্কাশনের জন্য সরু ড্রেনের ব্যবস্থা করলেন। ভেতরে আলো-বাতাসের জন্য ছোট ছোট ছিদ্র রাখলেন। ঘরের উচ্চতা রাখলেন সমতল থেকে ৯/১০ হাত। পুরো কাজ শেষ হয়েছে ৬৪ হিজরির ১৭ রজব।

হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের নির্মাণ : হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর রাযি. কে হত্যার পর হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ খলিফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানকে লিখে জানালেন, আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর কাবা শরিফের এমন পরিবর্তন করেছে যা পূর্বের ভিত্তি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এমন অংশকে ভেতরে ঢুকিয়েছে যা কাবার অংশ নয়। একটি দরজার স্থলে দুটি দরজা করে ফেলেছে। আমি চাই, কাবা তার পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসুক। তখন খলিফা তাকে আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইরের বর্ধিত অংশটুকু ভেঙ্গে ফেলতে, পশ্চিমমুখি দরজাটি বন্ধ করে দিতে নির্দেশ দিয়ে পাঠালেন। এ ঘটনাটি ঘটলো ৭৪ হিজরিতে। অবশ্য পরবর্তী সময়ে তিনি হজরত আয়েশা রাযি. এর একটি হাদিস শুনে লজ্জিত হন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘হে আয়েশা, তোমার কওম যদি জাহেলিয়াতের কাছাকাছি না হত, তাহলে আমি কাবাকে ভেঙ্গে জমিনের সঙ্গে মিশিয়ে দিতাম এবং হজরত ইবরাহিমের ভিত্তির ওপর নির্মাণ করে দিতাম। তার দুটো দরজা রাখতাম। একটি পূর্বে, অপরটি পশ্চিমে। আর ওই ছয় হাত বাড়িয়ে দিতাম, যা কুরাইশরা নির্মাণের সময় ছেড়ে দিয়েছিল। যদি আগামি বছর আমি বেঁচে থাকি তাহলে নিশ্চয়ই এ রকম করে দিব।’ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা করার সুযোগ পাননি, তার আগেই তিনি পরপারে চলে যান।

বাদশাহ আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইরের ভিত্তির ওপর পুনরায় কাবা নির্মাণের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিলেন, কিন্তু করেননি। পরবর্তী সময়ে খলিফা মানসুর ও হারুন-অর-রশীদ তা করতে চাইলেও ইমাম মালিক রহ. এ বলে নিষেধ করলেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি তোমাকে বলছি, আল্লাহর ঘরকে রাজা-বাদশাহদের খেলনা বানিওনা। এ টানাটানি ভালোর পরিবর্তে খারাপই বয়ে আনবে বেশি।’ পরে আর তা পুনঃনির্মাণ ও সংস্কার করা হয়নি।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: