সর্বশেষ আপডেট : ৬ মিনিট ৪৪ সেকেন্ড আগে
সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

৯ বছর আগে ফেলে যাওয়া শিশুটির বাবা-মা পাওয়ার গল্প

Kurigram20160824220744নিউজ ডেস্ক:
কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বেষ্টিত প্রত্যন্তপোড়ার চর গ্রামের মানুষ এক নির্মম ঘটনার সাক্ষী। প্রায় নয় বছর আগে এক ভারতীয় প্রতিবন্ধী মা তার কোলের শিশুকে এই চরে রেখে উধাও হয়ে যান। গত নয় বছরে একদিনও সেই মা তার শিশুটিকে দেখতে আসেননি। কিংবা শিশুটি আদৌ বেঁচে আছে না মারা গেছে তার খোঁজ রাখেননি।

সেদিনের শিশুটির নাম ইউসুফ। এপারের এক মুসলিম বাঙালি পরিবারের ছেলে পরিচয়ে বেড়ে উঠছে। পড়ছে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে। চলতি বন্যায় এই শিশুটির খবর বানভাসিদের সহায়তার জন্য আসা বিভিন্ন লোকজনের নজরে আসে। তাকে নিয়ে তৈরি হয় নানা গল্প। ছোট্ট কপালের লিখনটা ভালো ছিল বলেই হয়তো সেদিনের শিশুটি লাল-সবুজের এদেশে মা-বাবা খুঁজে পেয়েছে।

মঙ্গলবার ভোরে সরজমিন পোড়ার চরে গিয়ে শিশুটি, তার স্থানীয় অভিভাবক ও গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায় সেদিনের নেপথ্য ঘটনা।

কুড়িগ্রাম জেলা শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার পূর্বে যাত্রাপুর নৌঘাট। তিনদিকে ভারতীয় সীমানা। যাত্রাপুর নৌঘাট থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে দ্বীপচর গ্রাম পোড়ারচর। আশেপাশে রয়েছে আরো আট থেকে ১০টি চর। কোন কোন চর ভারতীয় চরের সঙ্গে সন্নিবেশিত।

জানা যায়, পোড়ার চরে আড়াই শতাধিক পরিবারের বসবাস। ব্রহ্মপূত্র নদের বুকে গড়ে ওঠা এই চরে যাত্রাপুর নৌঘাট থেকে শ্যালো নৌকায় যেতে সময় লাগে ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট। সোমবার ভোরে সেখানে গিয়ে কথা হয় স্থানীয়দের সঙ্গে।

তাদের একজন শরিফুল। তিনি জানান, ২০০৮ সালের কোন একদিন দুপুর বেলা। মাঠের কাজ শেষে তিনি বাড়ি ফিরছিলেন। বাড়ির সামনে এক মা কোলে দেড় বছরের এক শিশুসহ ৭-৮ বছরের আরেকটি শিশুকে নিয়ে ঘোরাফেরা করছিলেন। তাদের চোখ মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল তারা ক্ষুধার্ত।

কথা বলতে চাইলে ওই মা হিন্দি ভাষায় আবোল-তাবোলভাবে কথা বলতে থাকেন। সঙ্গে বড় ছেলেটি হিন্দিতে জানায় তার মা পাগোল, তারা ভীষণ ক্ষুধার্ত। শরীফুল তিনজনকে খাবার দিলে মা নিজে কোন কিছু মুখে না দিয়ে শুধু ছেলেদের খেতে দেয়।

সেদিন ছিল যাত্রাপুরের হাট। পোড়ার চরের অধিকাংশ মানুষ সেই হাটে যায়। শরীফুলও হাটে গিয়ে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের ঘটনাটি জানায়। হাট থেকে ফিরে এসে দেখে ওই মহিলা বাচ্চাদের নিয়ে চলে গেছে।

এরপর সন্ধ্যায় মহিলাদের চেঁচামেচিতে লোকজনের ঘুম ভেঙে যায়। সবাই উঠে ঘটনাস্থলের কাছে গিয়ে শুনতে পান শিশুর কান্না। বাড়ি-ঘরের পেছনে একটা ফাঁকা জায়গা থেকে শিশুর কান্না ভেসে আসছে। এ সময় চরের মাসুদ মৌলভী লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে দেখতে পান কাশিয়া খেতের নিচে দেড় বছরের একটি শিশু কাঁদছে। মাসুদ মৌলভী শিশুটিকে উদ্ধার করে গ্রামে নিয়ে আসেন।

এরপর শিশুটিকে দেখে সবাই বুঝতে পারেন শিশুটি সেই প্রতিবন্ধী মায়ের সন্তান। হয়তো ফেলে রেখে চলে গেছে ভারতীয় ওই মা। মুহূর্তে চারদিকে খোঁজাখুজি শুরু হয়। কিন্তু ওই মাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এরপর মাসুদ মৌলভী শিশুটিকে ওই চরের মৃত বাহেজ উদ্দিনের ছেলে সোহরাব মিয়ার কাছে রাখেন। পরদিন সকলে এক মাঝি এসে জানায়, শিশুটির মা সন্ধ্যার আগে তার বড় ছেলেকে নিয়ে পার্শ্ববর্তী নারায়ণপুরের নৌকা করে চলে গেছে। পরদিন নারায়ণপুরে গেলেও তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে ইউপি চেয়ারম্যান ও পুলিশের লোকজন সোহরাবের বাড়িতে শিশুটিকে রাখার সিদ্ধান্ত দেন। নাম রাখা হয় ইউসুফ। এই নামেই বড় হচ্ছে শিশুটি। বর্তমানে সে ওই চরে খেয়ার আলগা প্রি-অ্যান্ড কমিউনিটি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়াশুনা করছে।

বর্তমান শিশুটির অভিভাবক সোহরাব মিয়া জানান, ইউসুফকে আমি বাবার স্নেহে লালন-পালন করছি। অন্যান্য সন্তানদের মতো তাকেও দেখি। আমার সন্তানরা তাকে নিজের ভাইয়ের মতো আদর করে। চার ছেলে এক মেয়ের সংসারে সে খুব ভালো আছে। আমার তিন একরের মতো আবাদি জমি ছিল। গত ২-৩ বছরে সেগুলো নদীতে ভেঙে গেছে। বর্তমানে একবিঘা বসতবাড়ি ছাড়া আমার আর কিছু নেই।

তিনি জানান, অনেক কষ্টের মধ্যে থেকেও এই ছেলেকে আমরা কষ্ট দেইনি। অনেকেই ইউসুফকে চেয়েছিল। কেউ কেউ জোর করেছিল তাকে নিতে। কিন্তু আমি প্রতিজ্ঞা করেছি এর প্রকৃত অভিভাবক ছাড়া কাউকে দেব না। ইউসুফকে আমার নিজের ছেলের মতোই। দোয়া করবেন যেন তাকে মানুষের মতো মানুষ করতে পারি।

সোহরাব মিয়ার স্ত্রী আয়েশা বেগম জানান, পোলাডারে বুকে পেটে রেখে মানুষ করছি। হারাডা দিন মায়ের চারপাশে থাকে। হে বাবা-মায়েরে ছাড়া থাকতি পারে না।

জানতে চাইলে যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী সরকার বলেন, ২০০৮ সালে ছেলেটিকে ফেলে তার মা চলে যায়। পরে ইউনিয়ন পরিষদ ও থানার পুলিশসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গ্রাম্যভাবে বৈঠকে সোহরাব মিয়ার জিম্মায় শিশুটিকে রাখা হয়। সেদিন থেকেই শিশুটি তার কাছে বড় হচ্ছে। ছেলেটি তার কাছে ভালোই আছে।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: