সর্বশেষ আপডেট : ৪৪ মিনিট ১৮ সেকেন্ড আগে
রবিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

তথ্যপ্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকায় ওদের দলে টানছে জঙ্গিরা

024113jongi_kalerkantho-16-8-4নিউজ ডেস্ক: কিছুদিন আগেও অনেকের ধারণা ছিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাই শুধু জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত। তবে সাম্প্রতিক কিছু জঙ্গি হামলার ঘটনায় এ ধারণা পাল্টেছে। দেখা যাচ্ছে, নামিদামি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও জঙ্গি দলে ভিড়ছে। গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলা এবং সর্বশেষ কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে নিহত হয়েছে ১৫ জঙ্গি। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই ইংলিশ মিডিয়াম বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থী। এ অবস্থায় অভিভাবকরা উৎকণ্ঠায় ভুগছেন। তাঁরা সন্তানদের দেশের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল কিংবা বিদেশে পড়তে পাঠানো নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছেন। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা কেন জঙ্গিবাদে ঝুঁকছে—তা ভাবিয়ে তুলছে শিক্ষাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধবিজ্ঞানী, অপরাধ বিশ্লেষক ও মনোবিজ্ঞানীদেরও।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু-কিশোরদের মধ্যে দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টির শুরু হয় পরিবার থেকে। এরপর স্কুল থেকে। স্কুলেই শিশুরা জানতে পারে দেশ ও সমাজ সম্পর্কে। সেখানেই প্রস্ফুটিত হয় সুকুমারবৃত্তি ও তা চর্চার মানবিক এবং সৃজনশীল দিকগুলো। অধিকাংশ ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে এ বিষয়গুলোর তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বিদেশি কারিকুলামে পাঠদানের ফলে দেশের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা পায় না শিক্ষার্থীরা। শিশুকাল থেকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ না হওয়া এবং সাংস্কৃতিকচর্চা না থাকায় পরে অনেকে বিপথগামী হচ্ছে।

গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলায় অংশ নেওয়া পাঁচ জঙ্গির মধ্যে তিনজনই ছিল ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে রোহান ইবনে ইমতিয়াজ স্কলাস্টিকা স্কুল থেকে এ লেভেল শেষ করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। মীর সামেহ মোবাশ্বের স্কলাস্টিকা থেকে ও লেভেল পাস করেছিল। নিবরাস ইসলাম রাজধানীর উত্তরার টার্কিশ হোপ স্কুল থেকে পাস করে ভর্তি হয়েছিল নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে। সেখান থেকে সে পড়তে গিয়েছিল মালয়েশিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রসঙ্গত, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান হয় ইংরেজি মাধ্যমে।

শোলাকিয়ার ঈদগাহ মাঠের কাছে পুলিশের ওপর হামলায় অংশ নেওয়া জঙ্গি আবির রহমান বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টিউটরিয়াল (বিআইটি) থেকে এ লেভেল পাস করে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিল।

সম্প্রতি কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানে নিহত জঙ্গিদের মধ্য অন্তত দুজন ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থী। নিহত তাজ-উল-হক রাশিক একাডেমিয়া থেকে ও লেভেল পাস করে মাস্টারমাইন্ড স্কুল থেকে এ লেভেল করে। এরপর ভর্তি হয় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে। আকিফুজ্জামান টার্কিশ হোপ স্কুল থেকে ও লেভেল পাস করে ভর্তি হয়েছিল নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে।

গুলশান ও শোলাকিয়ার ঘটনার পর ইংরেজি মাধ্যমে পড়া শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা উদ্বেগে ভুগছেন। একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা সৈয়দা জিনাত আরা বলেন, ‘আমার ছেলে সম্প্রতি একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে এ লেভেল করেছে। এখন বাইরে পড়তে চায় সে। কিন্তু আমি ওকে দেশের বাইরে পাঠাতে চাই না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে চাই না। আমি চাই ও দেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুক। কিন্তু যদি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ না পায় তাহলে কোথায় পড়বে, এ নিয়ে তার চিন্তার শেষ নেই।’ জঙ্গি হামলার ঘটনার পর থেকে তিনি ছেলেকে আগের চেয়ে বেশি সময় দিচ্ছেন বলেও জানান।

রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা ব্যবসায়ী সাজ্জাদুল হাসানের একমাত্র ছেলে পড়ে টার্কিশ হোপ স্কুলে। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘টার্কিশ হোপ স্কুলের দুটি ছেলে জঙ্গি হয়ে মারা গেল। ওদের মা-বাবার সব স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল। এত টাকা খরচ করে ছেলেকে পড়াচ্ছি; কিন্তু চারপাশের নানা ঘটনার কারণে মনে শান্তি পাচ্ছি না।’

এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষার্থীর মধ্যে যদি দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধ না তৈরি হয়, তাহলে তো ওরা জঙ্গিবাদে ঝুঁকবেই। পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ ঘটাতে হবে। মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিতে হবে। ছোটবেলাতেই যদি তারা এসব না শেখে তাহলে ভবিষ্যৎ জীবনে তারা বিপথে চলে যেতে পারে।’

ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা কেন জঙ্গিবাদে ঝুঁকছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে পারদর্শী। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তারা ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পায়। এর মাধ্যমে তারা বিভিন্ন জঙ্গি গ্রুপ ও সাইটে যেতে পারছে। বিভিন্ন দেশের জঙ্গি নেটওয়ার্কে যোগাযোগ করতে পারছে। জঙ্গিরা এসব স্মার্ট তরুণকে দলে ভেড়াতে চেষ্টা করে।’

শিক্ষাবিদরা বলছেন, ইংলিশ মিডিয়ামের কারিকুলাম সম্পূর্ণ বিদেশি। সেখানে ‘বাংলাদেশ স্টাডিজ’ বিষয়টা থাকলেও গুরুত্বসহকারে পড়ানো হয় না। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়াদের বিপথগামিতা ঠেকাতে বিষয়গুলোর ওপর জোর দেওয়ার অভিমত দেন তাঁরা। ইংলিশ মিডিয়ামের কারিকুলামে বাংলাদেশ বিষয়ক নতুন পাঠ্য বই সংযুক্তি ও পাঠদানের পরামর্শও দেন তাঁরা।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, লেখক-গবেষক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘ইংলিশ মিডিয়াম তো কৃত্রিম শিক্ষাব্যবস্থা। মাতৃভাষা বাংলার সেখানে কোনো গুরুত্ব নেই। কারিকুলামে দেশের ইতিহাস নেই, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নেই। পাশাপাশি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে সুস্থ সংস্কৃতিচর্চাও নেই। ফলে ছেলেমেয়েরা দেশ সম্পর্কে কিছুই জানতে পারছে না। আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনা সম্পর্কে জানছে না। বস্তুত এই না জানার সুযোগটা নিচ্ছে জঙ্গিরা।’ তিনি আরো বলেন, ‘মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যম, দুটিই সংকীর্ণ মতাদর্শে পরিচালিত হয়। শিশু-কিশোররা যদি মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা না নেয়, তাহলে ওদের মধ্যে সৃজনশীলতার বিকাশ হবে না। বাঙালির ছেলেমেয়েকে আদর্শ বাঙালি হওয়া শেখাতে হবে। কিন্তু এ দুটি মাধ্যম তা শেখায় না।’

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজিকবিজ্ঞান, মানবিক ও ভাষা স্কুলের ডিন অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, ‘ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে কারা পড়াচ্ছেন, কারা শিক্ষকতা করছেন, তা তলিয়ে দেখতে হবে। শিক্ষকদের ভেতর যদি কেউ ধর্মীয় উগ্রবাদী ও সাম্প্রদায়িক থাকেন, তবে তিনি চান সেই মতবাদ ছড়িয়ে দিতে। ফলে শিক্ষকদের খুঁটিনাটিও খুঁজে বের করা উচিত।’ তিনি আরো বলেন, ‘ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ইত্যকার নানা বিষয় উপেক্ষিত। শিশু-কিশোররা যদি অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বড় হয়, সে কখনো জঙ্গিবাদে ঝুঁকবে না।’ তিনি ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তকে বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সংযোজন এবং পাঠদানের অভিমত দেন। ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে সরকারি নজরদারি বাড়ানোর পক্ষেও মত দেন তিনি।

সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিদরা বলছেন, শিশুদের শিক্ষা হতে হবে আনন্দময় পরিবেশে। শিশুদের জন্য আনন্দ বিনোদনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে। রাখতে হবে স্কুলের সঙ্গে খেলার মাঠ, বিনোদন ব্যবস্থা। অধিকাংশ ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে খেলার মাঠ নেই, বিনোদনের ব্যবস্থাও নেই। বিদেশি কারিকুলামের পাঠপুস্তকের ভেতর আটকে রাখা হয় ওদের। এতে শিশুদের মধ্যে হতাশা, ক্ষোভ ও ক্রোধ তৈরি হয়। পরে এ বিষয়গুলোও ওদের বিপথে ঠেলে দেয়।

মনোরোগ চিকিৎসক মোহিত কামাল বলেন, “কিশোরদের তথা অপেক্ষাকৃত কম বয়সী তরুণদের মন হয় ‘কাঁচা মাটি’র মতো। তাদের ‘রিজনিং পাওয়ার’ খুব কম থাকে। তাদের সহজেই ‘মোটিভেট’ করা যায়।” তিনি বলেন, ‘ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পর্যাপ্ত বিনোদন ব্যবস্থা থাকতে হবে। খেলার মাঠ রাখতে হবে। শিশুদের আনন্দের মধ্য দিয়ে পাঠদান করতে হয়।’

অন্যদিকে অপরাধ বিশ্লেষক ও অপরাধবিজ্ঞানীরা বলছেন, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা জঙ্গি নেতাদের নতুন টার্গেট। কেননা ওরা তথ্যপ্রযুক্তিতে এগিয়ে। বিদেশের জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করতে ওরা অন্যদের চেয়ে বেশি সহায়ক। এ ছাড়া সহজে কেউ ওদের সন্দেহও করে না। এসবের ফলে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের টার্গেট করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. জিয়া রহমান বলেন, ‘মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে তেমন দক্ষ নয়। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ইংরেজি মিডিয়ামের শিক্ষার্থীরা। ছোটবেলা থেকেই তারা তথ্যপ্রযুক্তির নানা কিছু ব্যবহারের সুযোগ পায়। প্রযুক্তি জানা শিক্ষার্থীদের নতুন করে টার্গেট করছে জঙ্গিরা।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, “মাদ্রাসার ছেলেদের পক্ষে অনেক কিছু সম্ভব নয়। তারা সব জায়গায় যাতায়াত করতে পারে না, অনেক কিছু চেনেও না। এ জন্য জঙ্গিরা ইংরেজি ও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি জানা ‘স্মার্ট’ শিক্ষার্থীদের দলে টানছে। কেননা স্মার্ট তরুণরা গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো ভালো চেনে। তারা সেসব জায়গায় গেলে কেউ সন্দেহও করবে না।”-কালের কন্ঠ

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: