সর্বশেষ আপডেট : ৫৪ মিনিট ৫৫ সেকেন্ড আগে
বুধবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

মুক্তিযোদ্ধার নীরব কান্না

imagesনিকিতা জান্নাত::আফজাল সাহেব একজন মুক্তিযোদ্ধা । তিনি নয় নম্বর সেক্টরে ছিলেন । নয় নম্বর সেক্টরের নেতা ক্যাপ্টেন শাহজানের নেতৃত্বে একটি বিশাল দল গড়ে ওঠে । ক্যাপ্টেন শাহজান ছিলেন অসীম সাহসের অধিকারী । বরিশালের বিভিন্ন জায়গায় এ দলটি বেশি কাজ করেছে । মিরার বাবা ছিলেন এ দলের সবার চেয়ে ছোট । দেহ গঠনও তেমনি গায়ের রং কালো,গাঢ় কালো নয় । চিকন দেহের লম্বাটে গড়ন । সব মিলিয়ে এক অপূর্ব সংমিশ্রণ।

বয়সে সবার ছোট বলে আফজাল সাহেব কে সবাই স্নেহ করত । মিরার জন্মের সময় তার মা মারা যান । দূর সম্পর্কের আত্নীয়ের কাছে সে বড় হয় । বাবা-মা কারো আদর স্নেহ পায়নি। এখন সে তার বাবার সাথেই থাকে । মিরা কখনো যুদ্ধ সম্পর্কে জানতে চায় নি। বাবা কিভাবে এক হাত হারালেন তাও কখনো জিজ্ঞেস করেনি । একটি ঘরে দুটি প্রাণীর বসবাস । অথচ তাদের মধ্যে যে দূরত্ব,প্রয়োজনীয় কথার্বাতা ছাড়া অন্য কোন শব্দ ভুলক্রমেও মুখ দিয়ে অতিক্রম হয়না ।

একদিন রাতে খাবার খেতে বসে আফজাল সাহেব জিজ্ঞেস করলেন,
আমাকে কী তোর বাবা ডাকতে ঘৃণা হয়রে মিরা?
মিরা না বাবা এসব কথা কেন বলছ?

আফজাল সাহেব মুখে ভাত দিয়ে বললেন,তুই বোধ হয় এই ২য় বার আমায় বাবা ডাকলি । আজ ছিল আফজাল সাহেবের প্রিয় খাবার,ডাল,শাক আর টেংরা মাছের ঝুল । খুব আয়েস করে খেতে খেতে আবার মিরার দিকে চেয়ে বললেন ১ম যে দিন তোর খালার কাছ থেকে তোকে আনতে যাই,সেদিন বলেছিলে,তুমি আমার বাবা?

মিরা কিছু বলছে না,ভাত তিন আঙ্গুল দিয়ে নাড়াচাড়া করছে । আফজাল সাহেব আবার বলতে শুরু করলেন,তুই কি আমাকে মুখ ভরে বাবা ডাকতে পারিস না?
আমার সাথে বসে গল্প করতে করতে,এই বুড়ো বাবার মাথার পাকা চুল দেখে দিতে?

মিরা বাবার দিকে খানিক তাকিয়ে কোন কথা না বলে চলে গেল। মিরা ক্লাস এইটে পড়ে।

খুব সকালে উঠে বাবার ঘরে গেল সে । আফজাল সাহেব কী লিখছেন । মিরা চুপি চুপি বাবার পাশে গিয়ে বসল ।
বাবা রাস্তায় হাটঁবে ? এখন সবাই ঘুমে ,হাটঁতে ভালো লাগবে । আফজাল সাহেব যেন কিছুই শুনতে পাচ্ছেন না,এমন ভঙ্গিতে লিখা চালিয়ে যাচ্ছেন ।

মিরা মনে মনে বলল,এ যেন কাল রাতে আমি কথা না বলায় আমার প্রতি বাবার অভিমান কিংবা নীরব প্রতিশোধ । মিরা কথা না বলে বাবার এক হাত ধরে টানতে শুরু করল । আফজাল সাহেব রাস্তায় বের হলেন। তারা পাশাপাশি হাটঁছে। হালকা গোলাপি রং এর পাঞ্জাবী পরা আফজাল সাহেবের। ভাঙা একটি হাতের অংশ বাতাসে দুলছে। আর এক হাত মিরার হাতকে ধরে রেখেছে ।

মিরা বলল বাবা তোমার হাতটি কীভাবে হারাল?
তখন কি তোমার জ্ঞান ছিল?
তোমার কি হাতটি ফিরে পেতে ইচ্ছে হয় ?

এক সাথে এত প্রশ্ন করে মিরা নিজে একটু অস্বস্তি বোধ করল। আফজাল সাহেব সামনের দিকে তাকিয়ে হাটঁছেন। চশমা খুলে মিরার দিকে তাকিয়ে বললেন,তোকে একদিন নিয়ে যাব বরিশাল। যেখানে আমি জ্ঞানহীন হয়ে পরেছিলাম। যখন আমার জ্ঞান ফিরেছিল তখন আমার গাড় থেকে গলায় পেছিয়ে একটি ব্যান্ডেজ দেখেছিলাম।

মিরা বলল-তুমি কী তোমার হাতের জন্য কেদেঁছিলে বাবা? আফজাল সাহেব মৃদু হেসেঁ বললেন না মা হাতের জন্য না। কেদেঁছিলাম ক্যাপ্টেন শাহজান আমাকে যে অপারেশনে পাঠিয়ে ছিলেন,এটি আমি কি সফল করতে পেরেছিলাম,না কি নিজেই আহত হয়ে ক্যাম্পের বোঝা হলাম ।

আমরা সেদিন একটি বাড়িতে রাতের খাবার খেয়েছিলাম। গরম ভাত আর ডাল সাথে লেবুও ছিল। সে খাবারটি অমৃতের মত লেগেছিল। শাহজান সেখানে বসেই স্থির করলেন খুব ভোরে সাকোটি পার হয়ে আক্রমন চালাতে হানাদার বাহিনীর ওপর । আমাকে সিলেক্ট করা হল,কারণ আমি খুব সাতারু ছিলাম । যাই হোক,ভোরে আমি সাকো পার হলাম। মাথা তোলে একবার নিঃশ্বাস নিয়ে ছিলাম । এক ডুবে ওপারে গিয়ে পৌছলাম। সাকোর পরেই সরু একটা রাস্তা ধরে পাক হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প । আমি শুয়ে দুই কনুইয়ে ভর করে রাস্তা পার হতে লাগলাম। ঠিক তখনি ঘটল বিস্ফোরণ । রাস্তার দুপাশে যে মাইন পাতা ছিল তা আমি বুঝতেও পারিনি। এরপর আমি,,,,এ কথা বলে থেমে গেলেন ।

মিরা বলল এরপর কী বাবা?আফজাল সাহেব কিছু বললেন না,মিরার হাত চেপে ধরে নীরবে কাদঁতে লাগলেন ।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: