সর্বশেষ আপডেট : ১০ মিনিট ১৮ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

বাংলাদেশিদের সব হয়েছে, ঘোর অন্ধকারে ভারতীয়রা

160731163149_enclave_women_daily_chores_640x360_bbcbangla_nocreditনিউজ ডেস্ক: ঠিক এক বছর আগে, ৩১শে জুলাই আর পয়লা অগাস্টের মাঝ রাতে ভারত আর বাংলাদেশের মধ্যে ১৬২টি ছিটমহল বিনিময় সম্পন্ন হয়েছিল। ৫১টি বাংলাদেশী ছিটমহল মিশে গিয়েছিল ভারতের সঙ্গে আর ১১১টি ভারতীয় গ্রাম হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের অঙ্গ।

সেই সাবেক ছিটমহলের মানুষ বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে শুরু করেন তখন থেকে।

কিন্তু এই এক বছরে সাবেক ছিটমহলগুলোতে কি পরিবর্তন এসেছে, সেখানকার মানুষের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলেছে সেই পরিবর্তন আর তাদের প্রত্যাশার কতখানি পূরণ হয়েছে?

কালিরহাট নিম্ন বালিকা বিদ্যালয়ে সকাল দশটার ক্লাস শুরুর ঘণ্টা। এই ঘণ্টার শব্দ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় শিক্ষার্থীদের কাছে পরিচিত হলেও দাশিয়ারছড়ার মানুষ- সে শব্দ কখনো শোনেনি। এখন এখানে এই স্কুলের মত আরো তিনটি প্রাথমিক স্কুলের নির্মাণ কাজ চলছে।

কালিরহাট বালিকা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহজাদী খাতুন শাহানা বলেন, ”এখানে আগে কোন শিক্ষার আলো ছিল না। এখন এখানে চারটি স্কুল আছে”।

২০১৫ সালের আজকের দিনে ভারতের ১১১টি ছিটমহল যুক্ত হয় বাংলাদেশের ভূখণ্ডের সাথে। এই এক বছরে কি পরিবর্তন হল এইসব সাবেক ছিটমহলগুলোতে?

'বাংলাদেশের মানুষ যে সুবিধা পায় আমরা সেই সুবিধা পাচ্ছি'

বড় একটি পরিবর্তন এক কথায় অনেকেই উত্তর দিলেন সেটা-বিদ্যুৎ। প্রতিটি ঘরে ঘরে চলছে বৈদ্যুতিক বাতি যেটা ছিল একসময় তাদের কল্পনায়।

কল্পনা আক্তার তার বাড়িতে বসে বলছিলেন, ”এখন আমার প্রত্যেক ঘরে কারেন্টের আলো আসছে, এটাই বড় পাওয়া। আগে যাদের একটু সামর্থ্য ছিল তারা সোলার ব্যবহার করতো। আমাদেরতো সে সামর্থ্য ছিল না”।

কুড়িগ্রামের দাশিয়ারছড়াতে ঢোকার আগের সেই মাটি-কাদার রাস্তার পরিবর্তে ইট বিছানো রাস্তা সেখানে। তবে তিন কিলোমিটারের ইট বিছানো রাস্তা ছাড়া বাকি এলাকা সেই আগের মতই মাটি-কাদার। বাংলাদেশের সাথে যুক্ত হওয়া সাবেক এই ছিটমহলটি আয়তন ও জনসংখ্যার দিক দিয়ে ছিল সবচেয়ে বড়। তাই এলাকাবাসীর দাবি ছিল আলাদা একটি ইউনিয়ন করার। তবে সেই দাবি থাকলেও সাবেক এই ছিটমহলটি এখন পাশের তিনটি উপজেলার অংশ হয়েছে।

সেখানে ছিল না কোন স্কুল, হাসপাতাল বা প্রশাসন। এখন কমিউনিটি ক্লিনিক হয়েছে তিনটি। সপ্তাহে ছয়দিন সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা পাচ্ছেন এখানকার মানুষ।

তবে এই যে স্বল্প পরিসরের পরিবর্তন সেটা কতটা প্রভাব ফেলেছে এখানকার মানুষের জীবনে?

লোকমান আলী নামে একজন বলছিলেন, ”আমরা যাবতীয় বিদ্যুৎ, শিক্ষা, চিকিৎসা সুবিধা পাচ্ছি এখন।বাংলাদেশের মানুষ যে সুবিধা পায় আমরা সে সুবিধা পাচ্ছি”।

”তিন কিলোমিটার পাকা রাস্তা হয়েছে বাজার পর্যন্ত এটা খুব সুবিধা হয়েছে। যাতায়াতটা সুবিধা হয়েছে অনেক” বলছিলেন একজন।

দাশিয়ারছড়া ঢোকার পথেই যে কালির হাট বাজার সেটা আগের মতই আছে। নতুন কোন দোকান বা ক্রেতা বিক্রেতার ভিড় চোখে পরছে না আমার।

মনে হচ্ছে যেন এক বছর আগে যেমন ছিল তেমনটাই আছে, শুধু অস্থায়ী পুলিশের একটি ক্যাম্প চোখে পরলো আমার কালিরহাট বাজারের পাশেই যেটা আগে ছিল না।

সেই অর্থে বড় কোন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চোখে পড়েনি আমার পুরে দাশিয়ারছড়া ঘুরে। এক বছর আগে যে প্রত্যাশা নিয়ে এখানকার মানুষ বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তাদের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে?

লোকমান হোসেন বলছিলেন, ”আগে ইন্ডিয়ার জিনিস ব্ল্যাক হয়তো কেউ দেখার ছিল না। এখন পুলিশ আছে এখানে। অনেকটা সেফ মনে করি”।

পরিবর্তন হচ্ছে আস্তে ধীরে। নাগরিক সুযোগ-সুবিধার অনেক কিছুই এখানে এখনো এসে পৌঁছায়নি।

তবে ব্যাহিক পরিবর্তনের চেয়ে সবচেয়ে যেটা চোখে পড়েছে সেটা এখানকার মানুষের আত্মবিশ্বাস। ৬৮ বছর পর একটি দেশের নাগরিক হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে পেরেই যেন এক বছর ধরে স্বস্তিতে রয়েছেন এখানকার মানুষ।

এবার দেখা যাক কেমন আছে ভারতীয় অংশের লোকেরা-

ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ছিটমহল বিনিময়ের পরে যে নয়শোর কিছু বেশি মানুষ ভারতীয় ছিটমহলগুলো থেকে মূল ভূখন্ডে চলে গিয়েছিলেন- তাদের একটা বড় অংশ এখন ভাবছেন ভারতে চলে আসার সেই সিদ্ধান্ত হয়তো ভুল ছিল।

তাদের অভিযোগ, যেসব প্রতিশ্রুতি ভারত দিয়েছিল তার প্রায় কিছুই পূরণ করা হয়নি।

আবার বাংলাদেশী ছিটমহলগুলোর সব মানুষই ভারতের নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন। তারা নাগরিকত্বের পরিচয়পত্র পেয়েছেন ঠিকই; তবে না পেয়েছেন জমির দলিল, না হয়েছে রাস্তা, আসেনি বিদ্যুৎ! উল্টো স্থানীয় রাজনীতি ঢুকে পড়ে বাড়িয়েছে অশান্তি।

পূর্বতন ভারতীয় ছিটমহলগুলো থেকে প্রায় সাড়ে নয়শো মানুষ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ভারতের মূল ভূখন্ডে চলে আসার। তাদের স্থায়ী বাসস্থান তৈরী না হওয়া অবধি রাখা হয়েছে কয়েকটি অস্থায়ী শিবিরে।

সারি দেওয়া টিনের ঘর– খুব গরম বা বেশী ঠান্ডায় ঘরে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কয়েকজন বৃদ্ধ গত শীতকালে ঠান্ডায় কাবু হয়ে মারাও গেছেন। ওই অস্থায়ী শিবিরগুলিতে যা রেশন দেওয়া হয়, তাতে পরিবারগুলোর চালানো প্রায় অসম্ভব।

অন্যদিকে নেই রোজগার – তাই বাংলাদেশের ভেতরে ভারতীয় ছিটমহল থেকে চলে আসার আগে জমি জায়গা বা গবাদি পশু বেচে দিয়ে যে টাকা আনতে পেরেছিলেন, ব্যাঙ্ক থেকে সেই টাকা তুলেই সংসার চলছে এদের।

পূর্বতন ভারতীয় ছিটমহল দহলা খাগড়াবাড়ীর লক্ষ্মী বর্মন বলছিলেন, ”ওখানে সাজানো সংসার নষ্ট করে দিয়ে চলে এলাম। অনেক আশা নিয়ে এসেছিলাম, কিন্তু কিছুইতো পেলাম না এখনও পর্যন্ত। যদি সরকার কিছু না দিতে পারে, তাহলে ফেরত পাঠিয়ে দিক আমাদের”।

temporary_shades_enclave_dwellers

লক্ষ্মী বর্মনেরই কথার প্রতিধ্বনি শুনতে পেলাম হলদিবাড়ি শিবির অথবা দিনহাটা শহরের আরেকটি অস্থায়ী শিবিরের আরও অনেকের কাছেই।

হলদিবাড়ির হরি বর্মন, সন্তোষ রায়, মানিক হেমব্রম অথবা দিনহাটার মুহম্মদ উমর ফারুক, কাচুয়া বর্মনরা বলছিলেন যদি প্রতিশ্রুতি পালন না করতে পারে ভারত সরকার, তাহলে যেন ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয় বাংলাদেশে।

সেখানে নাগরিকত্ব যদি না-ও পাওয়া যায়, কোনও মতে জীবিকা নির্বাহ করে নেবেন তারা। ভারতের মূল ভূখন্ডে চলে আসার সিদ্ধান্তটা হয়তো ভুলই ছিল বলে মনে হতে শুরু করেছে তাদের।

অস্থায়ী শিবির থেকে কবে স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে, সেটাও বুঝতে পারছেন না এরা। আর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাই বা কি হবে, সেটাও অজানা।

পশ্চিমবঙ্গ সরকার সাবেক ছিটমহলগুলোর বাসিন্দাদের ভোটার পরিচয়পত্র দিয়েছে, নাগরিক পরিচয় আধার কার্ড দিয়েছে আর ৩১ অগাস্ট থেকে রেশন কার্ড বিলি করা শুরু করেছে।

পূর্বতন বাংলাদেশী ছিটমহল কিসমাত বাত্রিগাছের বাসিন্দা আঞ্জুয়ারা বিবির কথায়, ”সরকার মুরগির বাচ্চা দিয়েছে। ভোটের কার্ড দিয়েছে প্রায় সবাইকে – কিন্তু তাতে আমার বাবার নামের জায়গায় স্বামীর নাম লেখা হয়েছে। এরকম ভুল প্রায় সবার কার্ডেই। আধার কার্ডও দিয়েছে। কিন্তু রাস্তা, বিদ্যুৎ, স্কুল, স্বাস্থ্য কেন্দ্র, সেচের ব্যবস্থা কিছুই করে উঠতে পারেনি এখনও সরকার”।

enclave_women_daily_chores

একই কথা বলছিলেন ওই গ্রামেরই বাসিন্দা অনিল বর্মন, অনন্ত বর্মনরা।

অথচ ঠিক এক বছর আগের এই দিনে কতই না আনন্দ – হুল্লোড় হয়েছিল সাবেক বাংলাদেশী ছিটমহল এই গ্রামে। ৩১শে জুলাই আর পয়লা অগাস্টের মাঝরাতে জাতীয় পতাকা উঠেছিল, ঘরে ঘরে মোমবাতি জ্বালানো হয়েছিল – মিষ্টি বিতরণ হয়েছিল।

”সেদিন আনন্দ করেছিলাম আর এখন তো নিরানন্দ। আগে পরিচয়পত্র ছিল না, কিন্তু গ্রামে শান্তি ছিল। এখন রাজনীতি ঢুকে পড়ে তো আমাদের হয়েছে জ্বালা,” বলছিলেন পোয়াতুরকুঠি ছিটমহলের কয়েকজন বাসিন্দা নজরুল শেখ, হাশেম আলি মুনাব আলি নিরঞ্জন সরকার আর হেমন্ত বর্মনরা।

সাবেক ছিটমহলগুলোতে এখনও শুরু হয়নি জমি জরিপ। আর তার ফলে ছিটমহলগুলোর জমির মালিকানা এখন কারোরই নেই– সব জমিই স্থল সীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী সরকারের হয়ে গেছে। আগে অর্থের প্রয়োজনে অন্তত জমি বন্ধক রাখা যেত, এখন সেটাও বন্ধ।

ভারতে যোগ দেওয়া সাবেক বাংলাদেশী ছিটমহলগুলো থেকে কেন এত অভিযোগ উঠছে?

এ বিষয়ে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী এবং কোচবিহার জেলায় তৃণমূল কংগ্রেস দলের সর্বোচ্চ নেতা রবীন্দ্রনাথ ঘোষ বলেন, ”অভিযোগ তোলার জন্যই অভিযোগ করা হচ্ছে। বাইরের কিছু লোক গিয়ে ওদের উস্কাচ্ছে। সবে তো একবছর হয়েছে – তার মধ্যে ওরা ভোটাধিকার তো পেয়েছে, ১০০ দিনের কর্ম সুনিশ্চিতকরণ প্রকল্পের কার্ড পেয়েছে। আর কাজ করা সম্ভব কিভাবে হবে? তিনমাস ভোটের জন্য রাস্তা –বিদ্যুৎ – অঙ্গনওয়াড়ি কিছু করা যায়নি। তারপর চারমাস ধরে বর্ষা চলছে। কেন্দ্র থেকে ১৭০ কোটি টাকা এসেছে। বর্ষার পরেই কাজ শুরু হবে”।

সূত্র: বিবিসি

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: