সর্বশেষ আপডেট : ৯ মিনিট ১৫ সেকেন্ড আগে
সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর নারী গুপ্তচর যিনি

full_2011791663_1469955277নিউজ ডেস্ক: ক্ষমতা ও শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে বিশ্বের বড় বড় দেশগুলো একে অন্যের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি করে থাকে। শুরুর দিকে কেবল তথ্য পাচার বা খোঁজখবর রাখাই ছিল গোয়েন্দাদের প্রধান কাজ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গোয়েন্দাদের কাজের ধরন ও দায়িত্বে পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে শীতল যুদ্ধচলাকালীন এ বিষয়টি ভয়ঙ্কর পর্যায়ে চলে যায়।

বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর গোয়েন্দা সংস্থা মনে করা হয় ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদকে। মোসাদই প্রথমবারের মতো তাদের গোয়েন্দাদের ধ্বংসাত্মক কাজে ব্যবহার করা শুরু করে। ১৯৭২ সালের অলিম্পিককেন্দ্রিক এক হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে পরবর্তী ২০ বছর ধারাবাহিক অসংখ্য গুপ্তহত্যাই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের অনেক দেশে গুপ্তচর বৃত্তির কাজে কর্মীদের নিয়োজিত রাখে।

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও বহির্বিশ্বের ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচতে প্রত্যেক দেশেরই নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা রয়েছে। আর সেসব গুপ্তচর সংস্থায় কাজ করেন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দুঃসাহসী সব এজেন্ট। শোষণকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই মূলত গুপ্তচরদের সৃষ্টি। প্রথমদিকে প্রাসাদের অভ্যন্তরে রাজা-বাদশাহর শত্রুদের গোপনে হত্যার কাজ করত তারা। পরবর্তী সময়ে নির্দিষ্ট রাষ্ট্র বা সংস্থার হয়ে গোপনীয়তা বজায় রেখে অন্যের গোপনীয়তা নষ্ট করে দিত তারা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শীতল যুদ্ধের সময় গুপ্তচরদের দৌরাত্ম্য দেখা যায় দেশে দেশে। বিশ্বব্যাপী নারী গোয়েন্দাদের অনেক শিহরণজাগানিয়া গল্প শোনা গেছে। তবে সব গল্পকে ছাড়িয়ে গেছে কদিন আগে প্রকাশিত এক নারী গোয়েন্দার কীর্তি।

সম্প্রতি মতি কাফির নামের এক লেখক ইতিহাসবিখ্যাত ইসরায়েলি গুপ্তচর সিলভিয়া রাফায়েলের ওপর একটি বই লিখেছেন। আর এই বইতেই উঠে এসেছে সেই গোয়েন্দা নারীর অবিশ্বাস্য ভয়ঙ্কর সব গল্প। মোসাদ বাহিনীতে একজন নারী হিসেবে যোগদান, অতঃপর উত্থান ও মৃত্যু পর্যন্ত পুরো ঘটনাপ্রবাহ এ বইয়ে উল্লেখ করা আছে। সিলভিয়া রাফায়েলকে এখনো বিশ্বের গুপ্তচরদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বলে উল্লেখ করা হয়। বইয়ে বিখ্যাত একটি ঘটনার উল্লেখ আছে।

৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৭২। বেলা সাড়ে ৪টা। হালকা অস্ত্রে সজ্জিত আটজনের একটি বাহিনী অতর্কিতে আক্রমণ চালায় এক গ্রামে। ইসরায়েলি কোয়ার্টার ভেঙে মিউনিখ অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করতে আসা তিন অলিম্পিক ক্রীড়াবিদকে বের করে আনা হয়। দুজনকে হত্যা করা হয়, একজনকে করা হয় জিম্মি। আক্রমণকারী বাহিনীর অন্য দুই সদস্য আলী সালামেহ এবং আবু দাউদ বেড়ার বাইরে থেকে হামলার দৃশ্য দেখছিলেন। যখন তারা গুলির শব্দ শুনতে পায়, তখনই বুঝতে পারেন যে অপারেশন সফল হয়েছে, এবার পালাতে হবে। নিকটবর্তী অপেক্ষারত গাড়িতে করে তারা কাছের বিমানবন্দরে চলে যান। সেখান থেকে তারা ভুয়া পাসপোর্টে সোজা চলে যান রোমে। রোম থেকে সালামেহ চলে যান বৈরুতে এবং আবু দাউদ চলে যান বেলগ্রেডে। ওদিকে জার্মান নিরাপত্তারক্ষীরা গুলির শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গে পুরো গ্রামটিকে ঘিরে ফেলে। কিন্তু তারা বুঝে উঠতে পারছিল না, ঠিক কি ঘটছে সেখানে। তারা কোনো পদক্ষেপও নিতে পারছিল না, কারণ তাতে যদি জিম্মি ইসরায়েলিদের কেউ আহত হন।

এ অবস্থায় সন্ত্রাসীদের সঙ্গে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করেন তারা। মোসাদের প্রধান জাভি জামির দ্রুত মিউনিখে চলে আসেন এবং সন্ত্রাসীদের সঙ্গে জার্মানির মধ্যস্থতা ইস্যুতে ভূমিকা পালন করতে চান। যুদ্ধে জামিরের অনেক অভিজ্ঞতা থাকলেও সন্ত্রাসীদের সঙ্গে মধ্যস্থতা করার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। জামিরের এই প্রস্তাবে জার্মানি সোজা তাকে জানিয়ে দেয়, বাইরের কারও হস্তক্ষেপ তারা আশা করছে না। মধ্যস্থতার এক পর্যায়ে জার্মানি কর্তৃপক্ষ সন্ত্রাসী দলটিকে প্রস্তাব দেন, ইসরায়েলি জিম্মি ক্রীড়াবিদকে ছেড়ে দিতে হবে এবং বিনিময়ে তাদের একটি বিমানযোগে নির্বিঘ্নে উড়ে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। দলটি সেই প্রস্তাব গ্রহণ করে।

তারা বিমানে ওঠার পর জিম্মিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। সঙ্গে সঙ্গে জার্মান বাহিনী তাদের দিকে গুলি ছুড়তে শুরু করে। পুরে বিষয়টিই ছিল তাদের পরিকল্পনার অংশ। জার্মান বাহিনীর গুলিতে দলটির পাঁচজন মারা যায়, একজনকে আহত অবস্থায় গ্রেফতার করা হয়। সালামেহ ততক্ষণে বৈরুতে অবস্থিত ফিলিস্তিনি গুপ্তচর সংস্থা ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরের সদর দফতরে পৌঁছে গেছেন। সেখানে পৌঁছে জানতে পারেন জার্মান বাহিনী কীভাবে তার দলের অন্য সদস্যদের হত্যা করেছে। সে দিন রাতেই ইসরায়েলি ক্রীড়াবিদদের হত্যা করার আনন্দ উদযাপন করছিল ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবির।

পুরো বিষয়টি প্যারিসের একটি ফ্ল্যাটে বসে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন কেউ। তিনি হলেন ইসরায়েলি গুপ্তচর সিলভিয়া রাফায়েল। টেলিভিশনের পর্দায় মুখোশধারী সন্ত্রাসী ও জার্মান বাহিনীর নৃশংসতা দেখছিলেন তিনি। ইসরায়েলের অভ্যন্তরে কিংবা বাইরে কোনো নাগরিকের ওপর হামলাকে সবচেয়ে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। এর আগে আরও অনেক হামলার পরিকল্পনা মোসাদ নষ্ট করে দিয়েছিল। কিন্তু অলিম্পিকের মতো একটি অনুষ্ঠানে ইসরায়েলি ক্রীড়াবিদদের ওপর হামলা হবে এটা মোসাদ ঘুনাক্ষরেও ভাবতে পারেনি।

হামলার পর দিন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম হেরাল্ড ট্রিবিউনের শিরোনামে ছাপা হয়, আলী সালামেহর নেতৃত্বে এ ঘটনা ঘটিয়েছে ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর। প্যারিসে নিজের পরিচয় সুরক্ষিত রাখতে গিয়ে অন্য কোনো মোসাদ এজেন্টের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না সিলভিয়ার। শুধু তার ঊর্ধ্বতন এজেন্ট ডেভিডের সঙ্গে তার অল্প যোগাযোগ ছিল। কিন্তু ওই ঘটনার পর ডেভিডও ইসরায়েল চলে যান। তারপরও সিলভিয়া ডেভিডকে ফোন করে দেখা করতে চান। দুজনের দেখা হলেও তারা তেমন কোনো উদ্যোগ নিতে পারেননি। এ ক্ষেত্রে ডেভিড পদস্থ কর্মকর্তাদের সাড়া পেতে ব্যর্থ হলেও বসে থাকেননি সিলভিয়া।

তার কাছে থাকা তথ্যদি তিনি তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ারকে সরবরাহ করেন। এরপর গোল্ডা মেয়ারের তত্ত্বাবধানে মোসাদের একটি বিশেষ বাহিনীকে ‘ঈশ্বরের ক্রোধ’ নামের একটি অপারেশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আর এই পুরো অপারেশনটির নকশা করেন সিলভিয়া। আর মোসাদের ওই গোপন দলের প্রধান হিসেবে কাজ করেন মাইক হারিরি।

মোট পাঁচটি স্কোয়াডে ভাগ করা হয় দলটিকে। প্রতি স্কোয়াডে ছিল ১৫ জন সদস্য। অপারেশনের অংশ হিসেবে ১৯৭২ সালের ১৬ অক্টোবর মোসাদ বাহিনী রোমে ফিলিস্তিনের একজন অনুবাদক ও পিএলওর প্রতিনিধি আতিয়ারকে হত্যা করে। আতিয়ার যখন রাতের খাবার শেষ করে বাসায় ফিরছিল তখন তার ওপর অতর্কিতে হামলা চালানো হয়। গুনে গুনে বারোটি গুলি করা হয় তাকে। এরপর একই বছরের ৮ ডিসেম্বর ফ্রান্সে ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরের সদস্য মাহমুদ হামশারিকে টেলিফোন বোমায় হত্যা করে মোসাদ। অপারেশনের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৩ সালের ২৪ জানুয়ারি ফাতাহর প্রতিনিধি হুসেইন আর বশিরকে হত্যা করা হয় সাইপ্রাসে।

একই বছরের ৬ এপ্রিলে বৈরুতে বাসিল আল কুবাসিকেও আতিয়ারের মতো ১২বার গুলি করে হত্যা করা হয়। টানা ২০ বছর এই অভিযান চালিয়ে যায় ইসরায়েল। অপারেশন চলাকালীন সময় ‘রেড প্রিন্স’ নামে খ্যাত আলী সালামেহকে হত্যা করার জন্য কয়েকবার চেষ্টা চালান সিলভিয়া। কিন্তু ভুল তথ্যের কারণে তা সম্ভব হয়নি। তবে সালামেহ ভেবে আহমেদ বুশিকি নামের এক মরক্কোর নাগরিককে হত্যা করেন সিলভিয়া।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে নরওয়ে আদালত তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন। যদিও ১১ মাস কারাদণ্ড ভোগ করার পর তিনি মুক্ত হয়ে যান। যে আইনজীবী তাকে কারাগার থেকে মুক্ত হতে সহায়তা করেছিল সেই আইনজীবীকেই বিয়ে করে চলে যান দক্ষিণ আফ্রিকায়। মোসাদের পক্ষে পরিচালিত এমন আরও অসংখ্য অপারেশনের পরিকল্পনা করেছেন এই গুপ্তচর নারী। ২০০৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় মারা যান।

এক নজরে সিলভিয়া রাফায়েল

জন্ম : ১ এপ্রিল ১৯৩৭

জন্মস্থান : কেপটাউন, দক্ষিণ আফ্রিকা

মৃত্যু : ৯ ফেব্রুয়ারি ২০০৫ [৬৭ বছর বয়সে]

মৃত্যুস্থান : প্রিটোরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা

অভিযোগ : খুন, গুপ্তচরবৃত্তি ও তথ্য পাচার

সাজা : সাড়ে পাঁচ বছর কারাদণ্ড

দণ্ড রেকর্ড : মুক্তিপ্রাপ্ত এবং ১৯৭৫ সালে নরওয়ে থেকে বিতাড়িত

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: