সর্বশেষ আপডেট : ১০ মিনিট ২৩ সেকেন্ড আগে
রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

মৌলভীবাজারে সাড়ে ৭ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষ ব্যাহত হওয়ার আশংকা

21550বড়লেখা প্রতিনিধি: :: মৌলভীবাজার জেলার পাঁচ উপজেলার ফসলের মাঠে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষাবাদ করা যাচ্ছে না। ফলে এবার মৌলভীবাজার জেলায় নির্ধারিত আমন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার আশংকা করছে কৃষিবিভাগ। জেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, আরও কিছু দিন এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে প্রায় ৩০ হাজার মেট্রিক টন ধান কম উৎপাদিত হতে পারে। যদিও কৃষক পর্যায়ের হিসাবের মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কেননা কৃষকরা ক্ষতির পরিমাণ আরও কয়েকগুণ বেশি হবে বলে অভিযোগ করছেন। পাহাড়ি ঢল ও ভারত থেকে নেমে আসা পানি বিভিন্ন খাল-বিল ও নদীপথ দিয়ে এসে কাউয়াদীঘি হাওরে পতিত হলে কাসিমপুরে স্থাপিত নিস্কাশন পাম্পগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি নিষ্কাশন করতে না পারায় হাওর থেকে উঠে আসা পানি উজানের আমন ফসলের মাঠকে দীর্ঘদিন ধরে তলিয়ে রেখেছে।

জেলা কৃষিবিভাগের খামারবাড়ির উপ-পরিচালক মোহাম্মদ শাহাজাহান জানান, চলতি মৌসুমে ৯৬ হাজার ৪৭৩ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষাবাদ এবং ২ লাখ ৫৮ হাজার ৪৭২ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অকাল বন্যার কারণে বোরো ফসল ঘরে তুলতে পারেননি মনু প্রকল্পভুক্ত এলাকার কৃষকরা। পরবর্তীতে দীর্ঘস্থায়ী অকাল বন্যায় হাকালুকি এলাকার পাকা ধান পানির নীচে তলিয়ে পচে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ব্যাপক ক্ষতি হয় কৃষকদের। সৃষ্ট জলাবদ্ধতার পানি এখনও নামেনি। এ কারণে সেখানে স্থায়ী ও ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়, এশিয়ার বৃহৎ হাকালুকি হাওরের পানি প্রবাহের মূলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া পানি বের হবার মুখে পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ করে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

গত জুন মাস থেকে রাজনগর উপজেলার ৪টি ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে জলাবদ্ধতা ও বন্যা দেখা দেয়। কাউয়াদীঘি হাওরঘেরা বাঁধের ভেতর পানি আটকে স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। মনু সেচ প্রকল্পের ভিতরের এসব পানি বের করে দিয়ে চাষাবাদের ব্যবস্থা করে দেয়ার কথা থাকলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড সে ব্যবস্থা করে দিতে পারছে না। এখন আমন চাষের ভরা মৌসুম শুরু হয়েছে কিন্তু ওইসব এলাকায় জলাবদ্ধতা থাকায় আমন চাষ এবং চারা লাগানো যাচ্ছে না। বীজতলায় চারা থাকতে ডগা লম্বা হয়ে নতুন শিকড় গজাচ্ছে। আগা লাল হয়ে যাচ্ছে। জমি থেকে পানি সরছে না।

রাজনগর উপজেলার ১নং ফতেপুর ইউনিয়নের কাশিমপুরস্থ মনুসেচ প্রকল্পের পাম্প দিয়ে যা পানি নিষ্কাশন করা হয়, সামান্য বৃষ্টি দিলে তা আগের মতো হয়ে ভরে যায়। পাম্প চালানোর জন্য সবসময় বিদ্যুৎ থাকে না। সরেজমিনে গেলে কামালপুরের সোমারাই গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলামসহ এলাকার লোকজন জানান, মনু প্রকল্প এলাকার জলাবদ্ধতায় মৌলভীবাজার সদর উপজেলার একাটুনা ইউনিয়নের উত্তরমুলাইম, মল্লিকসরাই, কচুয়া, সিংকাপন, দিশালোক, বৈদলং, গন্ডেহরি, উলুয়াইল; আখাইলকুড়া ইউনিয়নের জুমাপুর, রসুলপুরসহ ২০/২৫টি গ্রাম ও আশপাশ এলাকার আমন ফসলি জমিতে ৫ থেকে ৮ ফুট জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

এলাকাবাসী জানান, অকাল বন্যার কারণে বোরো ধান পাইনি। রাজনগর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের ইসলামপুর, অন্তেহরি, কাশিমপুরসহ ৩০/৪০টি গ্রামে জলাবদ্ধতার পানি প্রবেশ করে ফসলিজমি ও বাড়িঘর তলিয়ে গেছে। এখানে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার পানির কারণে বোনা আমন লাগাতে পারিনি। ভরসা ছিলো রোপা আমনের ওপর। বিআর-১১ জাতের চারা লাগানোর সময় চলে যাচ্ছে। একই অবস্থা রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলার অন্তেহরি, কাদিপুর, কান্দিগাঁও, জগৎপুর, পালপুর, চাঁনপুর, জুমাপুরসহ আরও কয়েকটি গ্রামের কৃষকের। কাশিমপুর গ্রামের দৌলত খান (৫০)। জানালেন ৬ কিয়ার জমির জন্য চারা প্রস্তুত। কৃষকরা জানান, এসব জমিতে চাষ না হলে প্রায় ৩০ হাজার মেট্রিক টন ধান কম উৎপাদন হবে। যদিও স্থানীয় কৃষকদের হিসাবমতে এর পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি হবে।

এদিকে রাজনগরের কাউয়াদীঘি হাওর ও উজানের প্রায় দেড় হাজার হেক্টর আমন ফসলের মাঠ পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রতিকূল এ অবস্থার কারণে বিপাকে পড়েছেন উপজেলার ৪০টি গ্রামের অন্তত ৪ হাজার কৃষক। পানি উন্নয়ন বোর্ড সময় মতো হাওরের অতিরিক্ত পানি পাম্পের মাধ্যমে নিষ্কাশন করতে না’পারায় এ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে বলে ভূক্তভোগী কৃষকরা অভিযোগ তুলেছেন। সূত্র জানায়, চলতি বছরে উপজেলায় মোট ১২ হাজার ৫২০ হেক্টর আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, যা গতবারের তুলনায় ৭৭০ হেক্টর কম। এবার আমন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৩৩ হাজার ৫৪৩ মেট্রিক টন চাল, যার বাজারমূল্য ১১৭ কোটি ৪০ লাখ ৫ হাজার টাকা। কিন্তু পাহাড়ি ঢল ও ভারত থেকে নেমে আসা পানি বিভিন্ন খাল-বিল ও নদীপথ দিয়ে এসে কাউয়াদীঘি হাওরে পতিত হয়েছে। ফলে কাসিমপুরে স্থাপিত নিষ্কাশন পাম্পগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি নিষ্কাশন করতে না পারায় হাওর থেকে উঠে আসা পানি উজানের আমন ফসলের মাঠকে দীর্ঘদিন ধরে তলিয়ে রাখায় প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমিতে এবার আমন ফসল আবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট বিভাগ জানায়, পানিতে তলিয়ে যাওয়া দেড় হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষ না হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ হবে প্রায় ২০ কোটি টাকা। উপজেলার মধিপুর গ্রামের আমনচাষী হীরা মিয়া (৬০) জানান, অতীতে সব সময়ই আমরা আমন চাষ করেছি। কিস্তু বিগত ৭/৮ বছর ধরে কাউয়াদীঘির অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন না করার কারণে আমন আবাদ করা যাচ্ছে না। আমন ফসলই এলাকার চাষীদের প্রধান ফসল।

অপরদিকে মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, ১৯৮৩ সালে জেলার বৃহত্তম হাওর কাউয়াদীঘির বোরো ধান নিরাপদে উৎপাদনের লক্ষ্যে পাউবো কাউয়াদীঘি বোরো ক্যাচম্যান্ট এরিয়ার অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য ১২শ কিউসেক ক্ষমতাসম্পন্ন ৮টি পাম্প বিশিষ্ট কাশিমপুর এলাকায় পাম্প হাউজ স্থাপন করে।

এ প্রসঙ্গে মৌলভীবাজার জেলার কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের (খামারবাড়ির) উপ-পরিচালক মোহাম্মদ শাহাজাহান জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ড এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে না। কাশিমপুর পাম্প হাইজের পাম্প বন্ধ থাকায় এ জলাবদ্ধতার মূল কারণ। পানি জমা থাকলে মাছের স্বার্থও জড়িত থাকে।মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের সুপারেন্টেনডেন্ট প্রকৌশলী ধীরেন্দ্র নাথ জানান, বোরো মৌসুম ছাড়া মনুনদী প্রকল্পের কাশিমপুর পাম্প হাউসে পানি সেচ দেয়া হয় না। তাছাড়া কুশিয়ারা নদীর পানি এবং প্রকল্প এলাকার পানির লেভেল সমান থাকায় পানি নামতে বিলম্বিত হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) সামসুল হক জানান, ১৯৮৩ সালে ১২শ কিউসেক ক্ষমতাসম্পন্ন পুরনো এ পাম্পগুলো দিয়ে এখন ৩/৪’শ কিউসেক এর বেশি পানি নিষ্কাশন করা যাচ্ছে না। তারপর বিদ্যুতের ভোল্টেজ সমস্যা তো রয়েছে। এ সমস্যা নিরসনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ডিপিপি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বিগত একনেক সভায় কাশিমপুরের জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ৮টি পাম্প বিশিষ্ট নতুন পাম্প হাউজ স্থাপনের অনমোদন দেয়া হয়। এ পাম্প তৈরি ও ক্রয়ের জন্য জাপানি একটি প্রতিষ্ঠানকে ওয়ার্ক অর্ডার দেয়া হবে। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন এ পাম্প হাউজ স্থাপিত হলে হাওর ক্যাচম্যান্ট এলাকার বাইরের পানিও নিষ্কাশন করা সম্ভব হবে। এটি বাস্তবায়িত হলে আগামীতে কাওয়দীঘি ও এর তীরবর্তী কৃষকদের বোরো এবং আমন আবাদে আর এ সমস্যা থাকবে না।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: