সর্বশেষ আপডেট : ৫ মিনিট ৫৮ সেকেন্ড আগে
মঙ্গলবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় কল্যাণপুর অভিযান

nn-550x308নিউজ ডেস্ক : কল্যাণপুরের ‘জাহাজ বাড়ি’ বাড়িতে জঙ্গি-বিরোধী অভিযান চালানো হয়। অভিযানে ৯ জঙ্গি নিহত হয়। প্রতিদিনে মতো সোমবার রাতেও কল্যাণপুরে ঐ বাড়ির সামনে পাহারায় ছিলেন নিরাপত্তা কর্মী আবুল কাশেম। তার ও দুজন প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা তুলে ধরা হলো–
আবুল কাশেম নামের একজন নিরাপত্তা কর্মী ঘটনাটি অনেক কাছ থেকে দেখেছেন। তিনি যে বাড়িতে থাকেন সেখান থেকে কয়েকটি বাড়ি পরেই ‘জঙ্গি আস্তানা’। সে বাড়িটির নাম ‘জাহাজ বাড়ি’।
ছয়তলা সে বাড়িতে অনেক ছাত্র এবং চাকুরিজীবীরা মেস ভাড়া করে সেখানে থাকেন বলে জানা গেছে। এই বাড়িটি এলাকার অনেকের কাছেই পরিচিত। কারণ বাড়িটির দেখতে অনেকটা জাহাজের মতো।
রাত দশটা থেকে সাড়ে দশটার মধ্যে আবুল কাশেম হঠাৎ বিপুল সংখ্যক পুলিশের উপস্থিতি লক্ষ্য করেন। তখন তিনি বুঝতে পারেন পুলিশ হয়তো কোন অভিযান রিচালনা করছে। কিন্তু সেটি যে জঙ্গি বিরোধী অভিযান, তা বুঝতে পারেননি কাশেম।
এ সময় তিনি কয়েকজন ছেলেকে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে পালিয়ে যেতে দেখেন।
মি: কাশেম বলেন, “হঠাৎ দেখি ভারি একটা ব্যাগ নিয়া এক ছেলে আমার সামনে এসে উদভ্রান্তের মতো আচরণ করতে লাগল।”
ঢাকার অন্য অনেক এলাকার মতো কল্যাণপুর একটি ঘিঞ্জি এলাকা।
নিরাপত্তা কর্মী কাশেম ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলেন, “ভাই, আপনি কী করেন?” ছেলেটি তখন উত্তর দিয়েছে, “কাগজ কুড়াই।”
তখন সে নিরাপত্তা কর্মী বুঝতে পেরেছেন, ব্যাগের মধ্যে সন্দেহজনক কিছু আছে। কারণ সে তরুণের চেহারা এবং পোশাকের সাথে ‘কাগজ কুড়ানোর’ দাবী সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়নি কাশেমের।
তিনি বলেছেন পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে কিছু তরুণ সেখান থেকে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করে। বাদল নামের আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন পুলিশ আসার পরে কিছু তরুণকে তিনি সে বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে দেখেছেন।
যারা পালিয়ে যাবার চেষ্টা করছিলে তাদের পরনে প্যান্ট ও টি-শার্ট ছিল।
পুলিশের নিরাপত্তা বলয়ের বাইরে কল্যানপুরে উৎসুক মানুষের ভিড়।বাদল বলেন, “এসময় ভিতর থেকে অনেকে সাথে আল্লাহু আকবর বলছিল। আমরা সে শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম।”
তার বর্ণনায় সারারাত ‘টুকটাক গোলাগুলি’ হলেও ভোর পাঁচটা থেকে ব্যাপক গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যায়। ভোরের দিকে তীব্র গুলির শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে উঠে।
এসময় ‘জাহাজ বাড়ির’ থেকেও গুলি করে প্রতিরোধের চেষ্টা হয়েছে, বলেন মি: বাদল। কল্যাণপুর এলাকার অধিকাংশ বাড়ি একটি সাথে আরেকটি প্রায় জড়ানো অবস্থায়। ঢাকা শহরের বহু এলাকার মতো কল্যানপুর এলাকাটিও বেশ ঘিঞ্জি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় পুলিশি অভিযানের সময় ‘জাহাজ বাড়ি’ থেকে অনেকে পালিয়ে যেতে দেখা যায়।
অভিযানের পর কল্যানপুর এলাকায় আরো তল্লাশি চালিয়েছে পুলিশ।
তাদের অনেকে একটি বাড়ির ছাদ থেকে অপর আরেকটি বাড়ির ছাদে লাফিয়ে পালিয়ে গেছে বলে তাদের মনে হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কল্যাণপুরের আরেকজন বাসিন্দা জানান, সকাল ছয়টার দিকে তার এক প্রতিবেশী টেলিফোন করে তাকে পুলিশি অভিযানের কথা জানান।
ঘুম থেকে উঠার কিছুক্ষণ পরে আনুমানিক ভোর ছয়টা দিকে তিনি দুই দফায় ‘বৃষ্টির মতো’ গুলির শব্দ শুনেছেন।
‘আমরা ৪র্থ তলায় থাকি, জঙ্গিরাও ৪র্থ তলায় থাকে। তাই স্বাভাবিকভাবেই জঙ্গিদের রুম থেকে আমাদের রুমের ব্যবধান ৫-১০ হাত। এসময় হঠাৎ পাশের রুম থেকে বড় ভাইয়েরা এসে বললো জঙ্গি হামলা।’
সোমবার রাতে রাজধানীর কল্যাণপুরের ৫ নম্বর রোডের ৫ নম্বর ভবনের চার তলায় জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের এ বর্ণনা দিয়েছেন শামসুল আলম নামে একজন সাংবাদিক। শামসুল রাজধানীর কারওয়ান বাজার থেকে প্রকাশিত ‘ঢাকা প্রতিদিন’ নামের একটি দৈনিকে সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।
সোমবার রাতে জঙ্গি বিরোধী অভিযান শুরুর পর থেকেই সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে একের পর এক স্ট্যাটাসে ঘটনার হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেন তিনি।
সর্বশেষ মঙ্গলবার সকাল সোয়া ৮টায় এক স্ট্যাটাসে শামসুল লেখেন, ‘ঘটনা শুরু রাত সাড়ে ১২টার দিকে। আমাদের বিল্ডিংয়ের তিন তলা থেকে এক নারী ‘চোর চোর’ বলে চিৎকার করতে থাকে। এরপর আমরা এবং আশেপাশের বিল্ডিং থেকেও ‘চোর চোর’ বলে চিৎকার করতে থাকি।
স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, হঠাৎ স্লোগান, ‘নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবার’ ভাবলাম মনে হয়ে চোর ধরা পড়ছে। চোর দেখতে যেতে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এসময় কয়েবার বিকট শব্দ হলো। একজনের বক্তৃতার আওয়াজ পেলাম। ‘দুনিয়া যার আইন চলবে তার’, ‘ইসলামের শত্রুরা নিপাত যাক’, ‘তোমরা কাফের, মুশরিক, ‘তোমরা জাহান্নামি’।
এরপরের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শামসুল আলম লেখেন, ‘আমরা ৪র্থ তলায় থাকি, জঙ্গিরাও ৪র্থ তলায় থাকে। তাই স্বাভাবিকভাবেই জঙ্গিদের রুম থেকে আমাদের রুমের ব্যবধান ৫-১০ হাত। এসময় হঠাৎ পাশের রুম থেকে বড় ভাইয়েরা এসো বললো জঙ্গি হামলা। এরপর সব নিঃস্তব্ধ। শুধু জঙ্গিদের শ্লেগান আর গুলির শব্দ’।
তিনি লেখেন, ‘১০-১৫ মিনিট পর পর জঙ্গিদের শ্লোগান আর গুলির শব্দে রাত পেরিয়ে ভোর ৬টা। এরপর শুরু হলো বৃষ্টির মতো মুহূর্মুহু গুলির শব্দ। জানতে পারলাম ৯ জন জঙ্গিই মারা গেছে। অভিযান সমাপ্ত।
তবে অভিযানের পরেও গুলির শব্দ শোনা যায় বলে দাবি করেন শামসুল। তিনি লেখেন, ‘কিন্তু অভিযান সমাপ্তির আধাঘণ্টা পরও প্রায় ১০-১৫ রাউন্ড গুলির শব্দ পেলাম।’
অভিযানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ভীতিকর পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে তিনি লেখেন, ‘কী যে আতংক আর উদ্বেগের মধ্যে রাতটা গেল আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানে। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা সুস্থ আছি। তবে এঘটনা এখানেই শেষ না। আমাদের বিল্ডিংয়ের সব ফ্লাটেই বাহির থেকে তালা দেয়া। রুম থেকে বের হতে পারছি না। পরবর্তী পরিস্থিতির জন্য আপনাদের দোয়া প্রার্থনা করছি।’
ভবনটির চার তলার আরেক বাসিন্দা ও শ্যামলী আইডিয়াল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ২য় সেমিস্টারের ছাত্র আশিকও সাংবাদিকদের কাছে ঘটনার একই রকম বর্ণনা দিয়েছেন।
আশিক বলেন, ‘জাহাজ বাড়িটি ৬ তলা। প্রতি তলায় ৪টি করে ইউনিট। আমরা থাকি ৪ তলায়। আমাদের রুমে থাকে ৯ জন। রাতে আমাদের রুমে ছিল ৭ জন। রাতে বাইরে ছিল ২ জন। পরপর তিনটি গুলির শব্দের পর আমার ঘুম ভাঙ্গে। ভয়ে তখন থরথর করে কাঁপছিলাম। ঘটনার সময় মনে হচ্ছিল আমাদের পাশের রুমে গোলাগুলি হচ্ছে। ভয়ে আমি এক বড় ভাইয়ের রুমে চলে যাই।’
এদিকে ওই বাড়িতে অভিযানের পরপরই সাংবাদিক শামসুল আলম ফেসবুকে ঘটনার আপডেট দিতে শুরু করেন। সর্ব প্রথম রাত সোয়া ১টায় তিনি লেখেন, ‘ ইয়া আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন। আমরা খুব বিপদে আছি। কল্যাণপুর ৩ নম্বর রোডে। চার পাশে শুধু জঙ্গিদের স্লোগান আর মুহুর মুহুর গুলি’।
সাত মিনিট পর রাত ১টা ২২মিনিটে তিনি আবার লেখেন, ‘আমরা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমরা খুব বিপদে আছি। শুধু গুলি আর গুলি, জঙ্গিদের স্লোগান । কল্যাণপুর ৩ নম্বর রোড। জানি না বাহিরে কি হচ্ছে।
পরে রাত ১টা ৫৪ মিনিটে তিনি লেখেন,‘আল্লাহ আমাদের রক্ষা কর। আমরা প্রশাসনকে একাধিকবার জানাচ্ছি, তারা শুধু বলছে তারাও নাকি অপারেশনে আছে। কিন্তু আমরা শুধু জঙ্গিদেরই আওয়াজ শুনছি।’
এরপর রাত ৪টা ১৮ মিনিটে শামসুল লেখেন, ‘সর্বশেষ ৩.১৭ মিনিটে জঙ্গিদের স্লোগান আর গুলির শব্দ শুনেছি। এখন নিঃশব্দ। প্রশাসন বা জঙ্গি, কোনও পক্ষেই আওয়াজ নেই। সম্ভবত আমাদের বাসার গেট ভেঙে ফেলা হয়েছে। আমাদের বাসায় সম্ভবত প্রশাসন অবস্থান করছে। তবে ১০০% বলতে পারছি না। কিছু সূত্রে জানতে পারলাম সকালে প্রশাসনের অভিযান চলবে। জানি না কি হয়। সবার কাছে দোয়া চাই। আমাদের জন্য দোয়া করুন’।
মঙ্গলবার সকাল ৭টা ১ মিনিটে শামসুল লেখেন, অভিযান চলছে, চলছে প্রশাসন আর জঙ্গিদের মুহুর্মুহু গুলি এবং জঙ্গিদের স্লোগান। সকাল ৭টা ৫৩ মিনিটে তিনি আরও লেখেন, ‘অভিযান সমাপ্তি ঘোষনার পরও মুহুর্মূহু গুলির শব্দ শুনছি। আতঙ্ক কাটছেই না’।
এদিকে মঙ্গলবার সকাল পৌনে ৬টার দিকে ওই ভবনে ওই ভবনে পুলিশ ‘অপারেশন স্টর্ম ২৬’ নামের এই অভিযান চালায় বলে জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মারুফ হাসান।
তিনি জানান, পুলিশের সঙ্গে এ অভিযানে অংশ নেয় স্পেশাল উইপনস অ্যান্ড ট্যাকটিকস (সোয়াট), র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল ও বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল।
এ অভিযানে গোলাগুলিতে নয় ‘জঙ্গি’ নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। অভিযান শেষে সকাল ৮টার দিকে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) শহীদুল হক বলেন, নিহতরা সবাই নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সদস্য।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: