সর্বশেষ আপডেট : ৩২ সেকেন্ড আগে
মঙ্গলবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

মালয়েশিয়ায় বন্দি বাংলাদেশে মুক্তিপণ

23836_f1নিউজ ডেস্ক:
মুক্তিপণের টাকা নিচ্ছে লিয়ন ও তার সঙ্গী ১৬ই জুলাই বিকাল সাড়ে ৫টা। রাজধানীর মতিঝিল টয়েনবি সার্কুলার রোডে অপেক্ষা করছিলেন গ্রাম থেকে আসা দুই যুবক। চেহারায় উদ্বেগের ছাপ। হাতে বাজারের থলে। এদের একজনের নাম আফজাল হোসেন, অপরজন সানোয়ার। বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ থানার কমলাপুর গ্রামে। আফজাল সেখানে দাঁড়িয়েই ফোন দিচ্ছেন কাউকে। আবার মাঝে মাঝে রিসিভও করছেন। ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তির সঙ্গে আগে কখনো দেখা হয়নি তাদের। এরই মধ্যে রিকশা করে সেখানে পৌঁছলেন আনুমানিক ৩০ বছরে এক সুদর্শন যুবক। সঙ্গে আরো একজন। ফোন করেই অপেক্ষায় থাকা গ্রামের দুই যুবকের ব্যাপারে নিশ্চিত হলেন। সুদর্শন যুুবকটি লিয়ন বলে নিজের পরিচয় দিলেন। এরপর আফজাল-সানোয়ারকে সোজা নিয়ে গেলেন ডি বাদশা রেস্টুরেন্টে। টেবিলে বসেই জিজ্ঞেস করলেন কত টাকা এনেছেন? গ্রাম থেকে আসা যুবক আফজাল বললেন আড়াই লাখ। তারপর এখানে সেখানে লিয়ন ফোন দিলেন। ফোনের অপর প্রান্তের লোকটির সঙ্গে কথা বলিয়ে দিলেন। নিশ্চিত হলেন টাকাটা তার হাতেই দিতে হবে। এরপর বাজারের সেই থলে থেকে লুঙ্গিতে মোড়ানো ছোট-বড় নোটের কয়েকটি বান্ডিল বের করলেন। সেখানে ছিল আড়াই লাখ টাকা।

জানা গেলো, গ্রাম থেকে আসা যুবক আফজালের ছোট ভাই উজ্জ্বল মালয়েশিয়ায় বন্দি রয়েছেন। কৌশলে লিয়নদের গ্যাং তাকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মালয়েশিয়া পাঠিয়েছিল। এই বাবদ এই চক্রের সদস্যদের হাতে আগেই ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা দিয়েছিলেন উজ্জ্বল। কিন্তু সে টাকা কোনো কাজেই লাগেনি। এখন তাকে বন্দি করে রাখা হয়েছে মালয়েশিয়ায়। মুক্তিপণ হিসেবে দাবি করা হয়েছে আরো আড়াই লাখ টাকা। এই টাকা হাতে পেলেই মেসেজ চলে যাবে মালয়েশিয়ায়। ছাড়া পাবেন বন্দিদশা থেকে। মুক্তিপণের এই টাকা লেনদেন হয়েছে গত ১৬ই জুলাই। আর বন্দি উজ্জ্বল মুক্তি পেয়েছেন ১৮ই জুলাই। ঢাকার ওই রেস্তরাঁয় পরিচয় গোপন রেখে টাকা লেনদেনের সময় মুক্তিপণদাতা ও মুক্তিপণ গ্রহীতা উভয়ের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। পরে বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বুধবার কথা হয় উজ্জ্বলের সঙ্গেও। বেরিয়ে আসে ভয়ঙ্কর এক প্রতারক চক্র। যে চক্রের সদস্য ছড়িয়ে রয়েছে দেশে ও বিদেশে। উজ্জ্বল জানান, তার সঙ্গে সেখানে প্রায় ১৫০ জনের মতো বন্দি ছিলেন। ইতিমধ্যে একজন ছাড়া তাদের সবাই মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পেয়েছেন। এখনো বন্দি রয়েছেন মেহেরপুরের এক হতভাগা যুবক। তার পরিবার এখনো মুক্তিপণের টাকা যোগাড় করতে পারেনি।

মুক্তিপণ দিতে আসা আফজাল ও বন্দিদশা থেকে ছাড়া পাওয়া উজ্জ্বল জানান, তার গ্রামের একটি পরিবারের আত্মীয় কোকিলা নামে এক মহিলার সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়। সেই মহিলা তাকে মোটা বেতনে ইরাক পাঠানোর প্রলোভন দেন। কোকিলার পিতার বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার খেড়াসিং গ্রামে। বিয়ে হয়েছে মুন্সিগঞ্জের তিতিল্লা বাজার এলাকার ফুলচাঁদের সঙ্গে। দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে সোহাগের তিতিল্লা বাজারে খান টেইলার্স নামে একটি কাপড়ের দোকান রয়েছে। উজ্জ্বল জানান, গত বছর রমজানে কোকিলার পরিবারকে তিন কিস্তিতে তিনি মোট তিন লাখ ২৪ হাজার টাকা দিয়েছেন। টাকা লেনদেনের কোনো ডকুমেন্টস আছে কিনা জানতে চাইলে আফজাল ও উজ্জ্বল জানান লিখিত নেই, তবে এলাকার অনেকেই সাক্ষী ছিলেন। এ ছাড়া বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে আরো প্রায় ৪ হাজার টাকা তার কাছ থেকে আদায় করেছে ওই পরিবার।

উজ্জ্বল জানান, ওই টাকা দেয়ার কিছুদিন পর তাকে দ্রুত ইরাক পাঠিয়ে দেয়া হবে বলে ঢাকায় আসতে বলে। কিন্তু আজকাল করতে করতে দীর্ঘদিনেও সে ইরাক পাঠাতে পারেনি। ওই সময় তিনি মিরপুরের এশিয়া নামে একটি আবাসিক হোটেলে ছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ ১০ মাসেও ইরাক যেতে না পেরে তিনি গ্রামের ফিরে যান। এই বছর ২৪ রমজানে কোকিলা তাকে ফোন করে বিদেশ যাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে জানিয়ে দ্রুত ঢাকায় চলে আসতে বলে। সেই মোতাবেক গত ২৯শে জুন ঢাকা আসেন। ঢাকায় আসার পর কোকিলার স্বামী ফুলচাঁদ তাকে মতিঝিলের শাপলা চত্বরের ওভার ব্রিজের পূর্বদিকে ৭ তলা ভবনের একটি অফিসে নিয়ে যায়। সেখানে শান্ত নামে এক ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করে। ওইদিন রাতেই তাকে ইন্দোনেশিয়ার টুরিস্ট ভিসায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে সিঙ্গাপুর নিয়ে যায়। উজ্জ্বলের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকার ৮ যুবকও ছিল। সিঙ্গাপুর থেকে আরেকটি ফ্লাইটে করে তাদের ইন্দোনেশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেদেশের বিমানবন্দর থেকে তাদের রিসিভ করে সেদেশের দুই দালাল।

দেশটিতে একটি রুমে ঘণ্টাখানেক রাখে। সেই রুমে ছিল আরো ৯ বাংলাদেশি। সেখান থেকে ১৭ জনকে নিয়ে সাগর পথে স্পিডবোটে করে তাদের একটি দ্বীপে নিয়ে যায়। সেই দ্বীপ থেকে আরেকটি স্পিডবোটে করে তাদের মালয়েশিয়ার একটি জঙ্গলে নিয়ে যায়। এই সময় স্পিডবোটের চালক ছাড়া কোনো দালাল ছিল না। উজ্জ্বল বলেন, তারা টানা ১৪ ঘণ্টা স্পিডবোটে ছিলেন। ওই জঙ্গলে তাদের রিসিভ করেন দুই তামিল ব্যক্তি। তারা এই ১৭ জনকে নিয়ে মালয়েশিয়ার পাম বাগানের ভেতরে একটি জঙ্গলে আধা ঘণ্টা আটকে রাখে। পরে সামাদ ও নুরুল নামে দুই বাংলাদেশি তাদেরকে কুয়ালালামপুর শহরের একটি বাড়িতে নিয়ে যায়। ওই দুই ব্যক্তির বাড়ি সাতক্ষীরা। উজ্জ্বল জানান, ওই বাড়িতে আরো প্রায় দেড় শ’ মানুষ ছিল। যারা সবাই একই ভাগ্যবরণ করে দেশটিতে গেছেন। ওই বাড়িতে ছিল ৪টি কক্ষ এবং বিরাট বড় বারান্দা। একেকটি কক্ষে ২৫-৩০ জনকে গাদাগাদি করে রাখা হতো। এ ছাড়া বারান্দায়ও রাখতো। উজ্জ্বল জানান, তাদেরকে দিনে এক বেলা করে আতপ চালের দুই চামচ ভাত খেতে দিতো। কোনোদিন সকালে আবার কোনোদিন বিকালে সামান্য এই খাবার দিতো তারা। বন্দিশালায় তাদের দেখাশোনা করতো নুরুল ও সামাদ। বলতো- তিন লাখ টাকা দিলেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে। পরে টাকা পেলে ১৮ই জুলাই তাকে ছেড়ে দেয়।

উজ্জ্বলের প্রতিবেশী শাহিন দীর্ঘদিন মালয়েশিয়া অবস্থান করছে। ছেড়ে দেয়ার পর তিনিই উজ্জ্বলকে তার নিজের কাছে নিয়ে গেছেন। শাহিন জানান, তাকে দুই ব্যক্তি কুয়ালালামপুরের শাহ আলম এলাকার বাচোটিকা পাম্প এলাকার ২২নং সেক্টরে রেখে যায়। সেখান থেকেই তাকে নিয়ে এসেছি। তবে কোন বাড়িতে উজ্জ্বল আটকা ছিল তার কিছুই তিনি জানাতে পারেননি। এর আগে গত ১৬ই জুলাই উজ্জ্বলের ভাই আফজাল মতিঝিল থানার পাশেই অবস্থিত ডি বাদশা রেস্টুরেন্টে লায়ন পরিচয় দেয়া এক ব্যক্তিকে মুক্তিপণের আড়াই লাখ টাকা দেন। তবে এই টাকাকে মুক্তিপণ বলতে নারাজ লিয়ন। বলেন, এটা পাওনা টাকা। আমরা তাকে মালয়েশিয়া পাঠিয়ে এক টাকাও পাইনি। টাকা না পেয়ে বিদেশ পাঠিয়েছেন কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা এভাবেই লোক পাঠাই। গত কয়েকদিনের মধ্যে প্রায় ৪০ জনকে এইভাবে পাঠিয়েছেন বলেও তিনি জানান। পরে তিনি আড়াই লাখ ঠিকঠাক আছে কিনা গুনে নেন। টাকা বুঝে পেয়েছে- এই মর্মে লিখিত চাইলে রেগে গিয়ে বলেন, কোনো কিছু লাগবে না। মেসেজ চলে যাবে।

উজ্জ্বল কিভাবে তার কাছে এলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার বন্ধু শান্ত তাকে তার কাছে নিয়ে আসছিল। তাদের অফিসের নাম জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এটা তো আপনার জানার দরকার নেই। আপনার লোক ছাড়া পাইলেই হইছে। এ সময় তিনি নিজেকে অনেক বড় মাপের লোক বলে পরিচয় দেন। বলেন, আমরা এই ব্যবসা করি। প্রভাবশালী না হলে এটা করা যায় না। তিনি বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও পরিচয় দেন। কি ধরনের ভিসায় তাকে পাঠানো হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, টুরিস্ট ভিসায়। মেয়াদ একমাস। সেতো ওখানে গিয়ে কিছুই করতে পারবে না- এই কথার জবাবে তিনি বলেন, সেখানে যারা আছে অধিকাংশই অবৈধ। সেও সেভাবে কাজ করবে। কোনো সমস্যা হবে না। তিনি স্টুডেন্টস ভিসায়ও লোক পঠান বলে জানান। এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখালে তিনি একটি মোবাইল নাম্বার দেন। তবে ওই নাম্বারের সঙ্গে উজ্জ্বলের ভাইয়ের কাছে থাকা নাম্বারের কোনো মিল ছিল না। গতকাল ফোনে তার সঙ্গে উজ্জ্বলের ব্যাপারে কথা বলতে চাইলে প্রথমে আগ্রহ দেখান। পরে সাংবাদিক পরিচয়ে মুক্তিপণের বিষয়টি জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আপনার কথার কিছু বুঝতে পারছি না। বলেন, আপনি তার ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেন। এদিকে কোকিলা বলেন, উজ্জ্বলকে চিনি, তবে তিনিও তার কাছ থেকে টাকা নেয়ার কথা অস্বীকার করেন।

এদিকে একটি সূত্র জানিয়েছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ায়ও এমন একটির চক্র বেশ কয়েকজনকে সেখানে আটকে রেখে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করছে। কিন্তু ছেলের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ওই পরিবার মুখ খুলছে না।মানবজমিন

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: