সর্বশেষ আপডেট : ৪ মিনিট ১৯ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

নিখোঁজ তরুণেরা কোথায় যায়?

full_1016279470_1468900782নিউজ ডেস্ক: বর্তমানে নিখোঁজ তরুণের সংখ্যা আসলে কত? গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলার পর এ প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। পুলিশের হিসাবে এখন পর্যন্ত ২৭ জনের নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে পুলিশ বলছে, তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে, এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

‘আমি নিবরাসের সঙ্গে যাচ্ছি’—চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি ধানমন্ডির বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় এই ছিল তাওসিফ হোসেনের শেষ কথা। গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলা চালিয়ে নিহত হন নিবরাস ইসলাম। কিন্তু তাওসিফ এখনো নিখোঁজ। একই দিনে ঘরছাড়া শেহজাদ ওরফে অর্কেরও কোনো খোঁজ মিলছে না।

পুলিশ ও র‍্যাব সাম্প্রতিক সময়ে নিখোঁজ ১৫-৩০ বছর বয়সী কিশোর-তরুণ ও যুবকদের তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে। এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ তথ্য কোনো বাহিনীর কাছে নেই। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আটটি বিভাগ থেকে গতকাল পর্যন্ত সন্দেহভাজন ২৪ তরুণের নিখোঁজ বা নিরুদ্দেশের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে রমনা বিভাগে ১৪ জন, গুলশান বিভাগে ৫ জন, মিরপুর বিভাগে ২ জন ও উত্তরা বিভাগে ৩ জন রয়েছেন।

এই তালিকার অন্তত তিনজন ইতিমধ্যে নিহত হয়েছেন। এদের একজন বিডিআর বিদ্রোহে নিহত এক সেনা কর্মকর্তার ছেলে মো. আশিকুর রহমান (২১) নিহত হয়েছেন সিরিয়ায়। বাকি দুজন হলেন গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলাকারী ও নিহত মীর সামেহ মোবাশ্বের এবং মাদারীপুরে কলেজ শিক্ষককে হত্যাচেষ্টায় আটক ও পরে ক্রসফায়ারে নিহত গোলাম ফয়জুল্লাহ ফাহিম। এই তিনজনকে বাদ দিলে এখনো নিখোঁজ যারা জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকতে পারেন বলে অনুমান করা হচ্ছে, তাদের সংখ্যা ডিএমপির হিসাবে ২১।

পুলিশের এই তালিকায় নাম নেই, এমন আরও ছয়জনের নিখোঁজ হওয়ার কথা জানা গেছে অনুসন্ধানে। তাদের মধ্যে পাঁচজন একই পরিবারের এবং একজন সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) কর্মকর্তা। এ ছয়জনসহ এখন পর্যন্ত ঢাকায় নিখোঁজ ২৭ জনের হিসাব পাওয়া গেছে। এর বাইরে হলি আর্টিজানের ঘটনায় নিহত তিন জঙ্গির পরিবারের সঙ্গে কথা বললে তারা তাদের পরিচিত মহলে ভিন্ন তিনটি পরিবারের তিন তরুণের নিখোঁজ থাকার তথ্য জানায়। তবে ওই তিন তরুণের পরিবারগুলো এ ব্যাপারে মুখ খুলছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএমপির চারজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, স্বজন নিখোঁজ এমন পরিবারগুলোকে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এতে তদন্ত বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।

নিখোঁজ থাকা এক তরুণের বোনের স্বামী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যারা হামলা করে মারা গেছে, তারা তো গেছেই। আমরা এখন সারাক্ষণ চিন্তায় আছি, আমাদের ছেলেরা কোথায় কী ঘটায় তা নিয়ে।’

পুলিশ বলছে, থানায় জিডির বাইরে আরও অনেকে নিখোঁজ থাকতে পারেন। অনেক পরিবারই জিডি করেনি। ডিএমপির মিডিয়া ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, ‘প্রেমঘটিত, ব্যবসায়িক, পারিবারিক সংকটসহ নানা কারণে মানুষ নিখোঁজ হয়। এদের মধ্যে কতজন জঙ্গিবাদে জড়িয়ে নিখোঁজ, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাইনি। তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই চলছে।’

আর র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান জানান, র‍্যাবের ১৪টি ব্যাটালিয়নকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো বাহিনীর কাছেই পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই।

কলাবাগান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইকবাল বলেন, তার থানা এলাকায় তিনজন নিখোঁজ হওয়ার খবর তিনি পেয়েছেন। তাদের পরিবার থানায় জিডি করেনি। তাদের মধ্যে সৈয়দ মো. গালিব ও সৈয়দ মো. রাজীব নামের দুই ভাই বছর দেড়েক ধরে নিখোঁজ। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ নেই বলে তাদের স্বজনেরা দাবি করেছেন। অপর ব্যক্তি হলেন আশরাফ মো. ইসলাম, তিনি ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী। তার বাবা পেশায় আইনজীবী।

জানা গেছে, সৈয়দ মো. গালিব নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তার ভাই ছিলেন স্কলাসটিকা স্কুলের শিক্ষক। তাদের বাবা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ছিলেন। ফেনীর গ্রামের বাড়িতে যোগাযোগ করা হলে জানা যায়, পরিবারের কেউ গত ছয় বছরে ফেনীতে যাননি। পরশুরাম থানার ওসি আবদুল কাশেম চৌধুরী বলেছেন, গালিব হিযবুত তাহ্‌রীরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগে ঢাকায় একবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বলে তাদের কাছে তথ্য আছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল থেকে পাস করা তাওসিফ মালয়েশিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে দেশ ছাড়েন ২০১১ সালে। এ বছরের শুরুর দিকে ছুটিতে তিনি বাড়িতে এসেছিলেন। ১৩ ফেব্রুয়ারি তার মালয়েশিয়ায় ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। তার আগেই ৩ ফেব্রুয়ারি বাড়ি ছেড়ে যান তিনি। তাওসিফের চিকিৎসক বাবা ধানমন্ডি থানায় ৫ ফেব্রুয়ারি জিডি করেন। ধানমন্ডি অঞ্চলের সহকারী কমিশনার রুহুল আমিন বলেন, ‘বাড়ি ছাড়ার পর থেকে তাওসিফের মুঠোফোন বন্ধ। জিডি করার পরপরই সব বিমানবন্দর ও সীমান্তে খবর দেওয়া হয়েছিল।’

একই দিনে নিখোঁজ শেহজাদ রউফ অর্ক নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। মার্কিন পাসপোর্টধারী শেহজাদের নিখোঁজ থাকার খবর দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতো এফবিআইকে জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন তার এক স্বজন। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র বলেন, ‘ভালো ড্রামার হিসেবে শেহজাদের পরিচিতি ছিল। বছর তিনেক আগে তার মা মারা যান। তখন থেকেই সে কিছুটা চুপচাপ হয়ে যায়। শেহজাদ, নিবরাস ও তাওসিফ পরস্পরের বন্ধু ছিল। তাদের সঙ্গে মাঝে মাঝে ওয়াবি নামের আফ্রিকান বংশোদ্ভূত এক বিদেশি তরুণকে দেখা গেছে।’ এ বছরের শুরুর দিকে ওয়াবি সিরিয়ায় মারা যান বলে তারা শুনেছেন।

গত ১ মার্চ বিকেল সাড়ে চারটায় বই কেনার জন্য গুলশান ১ নম্বরের বাসা থেকে বাইরে যাচ্ছে বলে মাকে জানিয়েছিল একাদশ শ্রেণির ছাত্র আহমেদ আজওয়াজ ইমতিয়াজ তালুকদার। রাত আটটায় বাড়ি ফিরবে বলে জানিয়েছিল। কিন্তু এখনো বাড়ি ফেরেনি। এ বিষয়ে পরিবারের করা জিডির তদন্ত করছিলেন গুলশান থানার উপপরিদর্শক মাহবুব আলম। তিনি এখন মহাখালী থানায় কর্মরত। তিনি বলেন, ‘আজওয়াজের বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা। আমি কিছুদিন খোঁজাখুঁজি করেছি, কিন্তু কোনো সন্ধান পাইনি।’

আরেক নিখোঁজ সন্দেহভাজন আশরাফুল মো. ইসলাম কবে থেকে অন্তর্ধান হয়েছেন, সে বিষয়ে জানতে গত শুক্রবার তাদের বাসায় গেলে পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, তার বাবা ঘুমাচ্ছেন, তাই কথা বলতে পারবেন না। ফ্ল্যাট মালিকদের সভাপতি বলেন, ‘ওরা সপরিবারে বছরে কয়েকবার যুক্তরাজ্যে যাওয়া-আসা করে। শুনেছি সে এ লেভেলের পর যুক্তরাজ্যে পড়ালেখা করত। ছেলেটিকে স্বাভাবিকই মনে হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় ছবি প্রচারের পর আমরা জানতে পারি আশরাফুল নিখোঁজ।’

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেছেন, পেশাগত অভিজ্ঞতায় তারা দেখেছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই জঙ্গিবাদের সূচনা হচ্ছে।

স্বজন নিখোঁজ আছেন বা ছিলেন এমন কয়েকটি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা হলে তারা দাবি করেছেন, সন্তানের আচরণে কোনো দৃষ্টিগ্রাহ্য পরিবর্তন তাদের চোখে পড়েনি। কারা সন্তানদের এভাবে বিপথগামী করছে, তারা জানতে চান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মানবাধিকারকর্মী ও টিআইবির চেয়ারপারসন সুলতানা কামাল বলেন, ‘অবশ্যই এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের। তবে আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে খুব একটা আশ্চর্য হয়েছি, এমন না। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে এমন সংবাদ আসছিল।’ তিনি বলেন, অবশ্যই বিষয়টি নিয়ে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে চিন্তা করতে হবে। খুঁজে বের করতে হবে কোন কোন মূল্যবোধ সন্তানদের সঠিক পথে রাখবে। সূত্র: প্রথম আলো

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: