সর্বশেষ আপডেট : ৫ মিনিট ১৩ সেকেন্ড আগে
বুধবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

ছাত্র পরিচয় দিয়ে বাসা ভাড়া নেয় ৫ জঙ্গি

44নিউজ ডেস্ক :: কিশোরগঞ্জের স্থানীয় গুরুদয়াল কলেজের ছাত্র পরিচয়ে ঈদের ৫ দিন আগে শহরের নীলগঞ্জ রোডে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে জঙ্গিরা শোলাকিয়া ঈদগায় হামলার পরিকল্পনা আঁটে। এক অবসরপ্রাপ্ত খাদ্য কর্মকর্তার ডাবল ইউনিটের তিনতলা ভবনের নিচতলার পশ্চিম পাশের দুই কামড়ার ইউনিটটি ছাত্র পরিচয়ে পাঁচজন মাসে ৬ হাজার টাকায় ভাড়া নিয়ে ২ জুলাই বাসায় ওঠে। কিন্তু ঈদের দিন সকালে শোলাকিয়া ঈদগায় নামাজ পড়ে গ্রামের বাড়ি চলে যাবার কথা বলে মালিককে চাবি বুঝিয়ে দিয়ে তারা বেরিয়ে যায়।
ঈদের পরদিন ফিরে আসবে বলে জানালেও তারা আর ফিরে আসেনি। অন্যদিকে বাড়িওয়ালার ছেলে নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন বলে তার বাবা জানিয়েছেন। এ বিষয়টি নিয়েও কৌতুহল তৈরি হয়েছে। শোলাকিয়া ঈদগা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে উত্তর-পশ্চিম দিকে নীলগঞ্জ রোডে রয়েছে ‘পরশমনি’ নামে ৪৩২ নম্বর হোল্ডিংয়ের একটি ডাবল ইউনিটের তিনতলা ভবন।
গতকাল সকালে বাসায় গিয়ে দেখা গেছে এর নিচতলার পশ্চিম পাশের ইউনিটের দরজায় তালা। দরজার বাইরে আইনশৃংখলা বাহিনী নিরাপত্তা ফিতা টানিয়ে বাসাটি সংরক্ষিত করে রেখেছে। এর পূর্ব পাশের ইউনিটে মাসে ৬ হাজার টাকা ভাড়ায় ২০১৪ সালের মার্চ মাস থেকে সপরিবারে ভাড়া থাকেন তাড়াইল উপজেলার তালজাঙ্গা আকবপুর এলাকার বাসিন্দা দিদারুল ইসলাম। তিনি এলাকার কুন্দ্রাটি সরকারি প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেছেন।
দোতলায় পূর্ব পাশের ইউনিটে মালিক আবদুস সাত্তার নিজেই পরিবার নিয়ে থাকেন। ভবনটি তিন তলা হলেও দোতলা পর্যন্ত নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। তৃতীয় তলা এখনও নির্মাণাধীন। মালিকের বাসায় গিয়ে তিনি ও তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়। মালিক নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে ২০১০ সালের জুন মাসে অবসর নিয়েছেন। তার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার ধুলদিয়া-সহশ্রাম ইউনিয়নের রায়খলা গ্রামে। তবে চাকরি থেকে অবসর নেবার পর পেনশন ও সঞ্চিত টাকা দিয়ে এই বাসাটি নির্মাণ করেছেন।
তার ভবনের প্রতিটি ইউনিটে ফ্যামিলি ভাড়া দিয়েছেন। নিচতলার পশ্চিম পাশের ইউনিটেও একটি ফ্যামিলি ছিল। কিন্তু ইউনিটটি দুই কামড়ার হওয়ায় তাদের স্থান সঙ্কুলান হয় না বলে জুন মাস পর্যন্ত থেকে তারা বাসা ছেড়ে দিয়েছেন বলে মালিক আবদুস সাত্তার জানিয়েছেন। তিনি জানান, বাসার সামনে ‘টু-লেট’ সাইনবোর্ড দেখে গত ১ জুলাই জয়নাল আবেদীন নামে এক ছেলে এসে কিশোরগঞ্জ শহরের গুরুদয়াল কলেজে অর্থনীতিতে পড়েন বলে পরিচয় দিয়ে চার ছাত্র মিলে বাসা ভাড়া নিতে চান।
দু’জন অর্থনীতিতে আর দু’জন ইংরেজিতে অনার্স পড়ছেন বলে ছাত্র জয়নাল মালিককে জানিয়েছিলেন। তবে ভাড়া নিয়ে কথা বলার সময় জয়নাল একাই ছিলেন। তিনি নিজেকে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার আসিমবাজার এলাকার ধান-চালের একজন স্টক ব্যবসায়ীর ছেলে বলে জানান। বাবার নামও বলেছেন, তবে মালিকের নামটি মনে নেই। এর আগে তারা কলেজের পাশে একটি মেসে থাকতেন। কিন্তু সেখানে পড়াশোনার পরিবেশ নেই বলে এখানে বাসা নিতে চান। মাসে ৬ হাজার টাকা ভাড়া স্থির হলে জয়নাল দুই হাজার টাকা অগ্রীম পরিশোধ করেন। পরদিন ২ জুলাই দুপুরে পিঠে একটি স্কুল ব্যাগের মতো ব্যাগ ঝুলিয়ে জয়নাল আবেদীন বাসায় ওঠেন। অন্যরা তখন আসেননি।
এদিকে ৩ জুলাই গ্রামের বাড়িতে মালিক আবদুস সাত্তারের চাচা অছরউদ্দিন মারা যাওয়ায় মালিক গ্রামে চলে যান। এসব ব্যস্ততার কারণে ছাত্ররা চারজন বাসায় উঠেছেন বললেও মালিক কখনও অন্য ছাত্রদের দেখেননি বলে জানান। মালিক আবদুস সাত্তার ৫ জুলাই দুপুরে জয়নালকে তার মোবাইলে ফোন করে ঈদ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে জয়নাল জানান, তারা এবার শোলাকিয়ায় ঈদের নামাজ পড়ে বাড়ি যাবেন। ঈদের দিন সকাল ৮টার দিকে মালিক ছাত্রদের বাসায় সেমাই নিয়ে গেলে দরজা একটু ফাঁক করে জয়নাল সেমাইয়ের থালাটি নিয়ে দরজা লাগিয়ে দেন। তবে ভেতরের রুমগুলোতে কেউ আছেন কিনা, তা বাইরে থেকে দেখা যায় না। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে জয়নাল দোতলায় উঠে মালিককে চাবি বুঝিয়ে দিয়ে বলেন, তারা শোলাকিয়ায় নামাজ পড়তে যাচ্ছেন।
সেখান থেকেই বাড়ি চলে যাবেন, ঈদের পরদিন চলে আসবেন। মালিক আবদুস সাত্তার বলেন, কিছুক্ষণ পরই শোলাকিয়া ঈদগার কাছে জঙ্গি হামলার খবর পাই। কিন্তু আমার মাথায় কখনও ভাড়াটিয়া ছাত্রদের ব্যাপারে সন্দেহ ঢোকেনি। এদিকে সংঘর্ষকালে আটক গুলিবিদ্ধ জঙ্গি শরীফুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদে র‌্যাব জানতে পারে, আবদুস সাত্তারের বাসা পাঁচ জঙ্গি ভাড়া নিয়েছিল। এই বাসা থেকে বেরিয়েই তারা মিশনে যায়। ফলে ঈদের দিন রাত ৮টার দিকে র‌্যাব সদস্যরা ওই বাসায় গিয়ে বই, বিছানাপত্র ও হাড়িপাতিল দেখতে পায় এবং ঘর থেকে বই জব্দ করে নিয়ে যায় বলে মালিক আমাদের কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন। আর রাতেই মালিককে র‌্যাব-১৪ কিশোরগঞ্জ কার্যালয়ে নিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করে আবার বাসায় দিয়ে গেছে।
আর ঈদের পরদিন শুক্রবার বিকেলে পুলিশ এসে ছাত্রদের বাসার দরজার বাইরে নিরাপত্তা ফিতা টানিয়ে দিয়ে গেছে। মালিক আরো জানান, জয়নালের গায়ের রং শ্যামলা, বয়স আনুমানিক ১৮ থেকে ২০ বছর, উচ্চতা আনুমানিক ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি। তার পরনে ছিল প্যান্ট-শার্ট। সংঘর্ষের ঘটনায় জঙ্গি হিসেবে যাদের ছবি দেখা গেছে, এদের মধ্যে তিনি জয়নালকে দেখতে পাননি। মালিক আবদুস সাত্তার জানান, তার দুই মেয়ে এক ছেলে। বড় মেয়ে কিশোরগঞ্জের একটি কলেজে শিক্ষকতা করেন। দ্বিতীয় মেয়েও মাস্টার্স পাস। তিনি ঢাকার মীরপুরে কালসি এলাকায় স্বামীর সঙ্গে নিজস্ব বাসায় থাকেন। ছেলে সারোয়ার জাহান সায়েম সবার ছোট। তিনি ঢাকার নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রথম বর্ষে পড়ছেন। ছেলে বসুন্ধরা এলাকায় আরও কয়েক ছাত্র মিলে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। মাঝে মাঝে মীরপুর কালসি এলাকায় তার বোনের বাসায়ও থাকেন বলে বাবা আবদুস সাত্তার জানান। ছেলে ঈদের দু’দিন আগে কিশোরগঞ্জ এসেছেন।
এখন তিনি গ্রামের বাড়ি আছেন।এদিকে ঈদের দিন সংঘর্ষকালে নিহত জঙ্গি আবীর রহমানও (২৩) নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বলে জানা গেছে। আবীরও সপরিবারে বসুন্ধরা এলাকায় থাকতো। ফলে এই বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের আওতায় আসবে বলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সৈয়দ আবু সায়েম জানিয়েছেন। অন্যদিকে র‌্যাব-১৪’র কমান্ডিং অফিসার ল্যাফটেনেন্ট কর্নেল মো. শরীফুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বাসা নেয়া জঙ্গি তার নাম জয়নাল আবেদীন ওরফে আকাশ ব্যবহার করলেও এটি তার ছদ্মনাম।
আর আবদুস সাত্তারের বাসাটি পাঁচ জঙ্গি ভাড়া নিয়েছিল। ঈদের দিন সকাল সাড়ে ৭টার দিকে প্রথমে বাসা থেকে দু’জন বের হয়, তিনজন বের হয় পরে। ঈদগায় হামলার মিশনে অংশ নেয়ার দায়িত্ব ছিল মূলত নিহত আবীর রহমান এবং গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আটক শরীফুল ইসলামের। অন্য তিনজন ছিল মাস্টারমাইন্ড। তাদের দায়িত্ব ছিল অপারেশন তদারকি করার। তিনি জানান, জঙ্গিদের সঙ্গে স্থানীয় যোগসূত্র উড়িয়ে দেয়া হচ্ছে না। মালিকের ছেলের বিষয়টিও উড়িয়ে দেয়া হচ্ছে না। তিনি আরও জানান, ওই বাসায় গিয়ে চারটি কভার ছাড়া বালিশ এবং মেঝেতে কম্বল পাতা দেখা গেছে। হাঁড়ি-পাতিলও দেখা গেছে। বই জব্দ করা হলেও সেগুলি জঙ্গিবাদী বই নয় বলেও তিনি জানান।এদিকে গতকাল দুপুরের দিকে সিআইডির একটি বিশেষজ্ঞ দল ওই বাসায় গিয়ে আলামত সংগ্রহ করেছে। এ সময় বাসার সামনে পুলিশ প্রহরা দেখা গেছে।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: