সর্বশেষ আপডেট : ১ মিনিট ৩৭ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় : শিক্ষার মানোন্নয়নে বাধা

primari-220150509141612মাসরুরুল হক তানভীর ::
দেশে সরকারি-বেসরকারি অসংখ্য মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে যেগুলোর সাথে প্রাথমিক বিদ্যালয় সংযুক্ত রয়েছে। এ সকল মাধ্যমিক বিদ্যালয় কোনো কোনোটি প্রথম শ্রেণি হতে দশম শ্রেণি পর্যন্ত আবার কোনোটি ৩য়/৪র্থ শ্রেণি হতে দশম শ্রেণি পর্যন্ত। এ সকল সংযুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক স্তরের জন্য সরকারিভাবে শিক্ষক নিয়োগের কোনো ব্যবস্থা নেই। কেননা মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা পরিচালনা ও ফলাফল প্রকাশের নিয়ন্ত্রণে থাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাউশি এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড।

অপর দিকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এ বিষয়গুলো দেখভাল করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর ও নেপ। ফলে যে সকল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে সেখানে অতিরিক্ত এ পাঁচটি শ্রেণির জন্য কোনো শিক্ষক নিয়োগ করা হচ্ছে না। ষষ্ঠ হতে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক প্যাটার্ন অনুযায়ী যে শিক্ষক থাকেন তাদেরকেই এ অতিরিক্ত পাঁচটি শ্রেণির চাপ সামলাতে হচ্ছে।

সাধারণত জেলা ও বিভাগীয় শহরের নামি-দামি প্রতিষ্ঠানগুলোতেই সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এ সকল প্রতিষ্ঠানে প্রতি শ্রেণিতে ২-৩টি করে শাখা আছে। অল্প সংখ্যক বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছাড়া সকল সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়েই ২৫ জনের ওপর শিক্ষক নেই। এই ২৫ জন শিক্ষক হচ্ছেন ষষ্ঠ হতে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ক্লাস নেওয়ার জন্য। কিন্তু এই পঁচিশ জনের ওপর যখন আরো ৮-১০টি ক্লাসের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন সহজেই অনুমান করা যায় শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কার্যক্রম কতটুকু সফল হচ্ছে।

এ ছাড়াও এ পাঁচটি শ্রেণির জন্য রয়েছে প্রশ্ন প্রণয়ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের কাজ। এ সকল প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিকভাবেই ভর্তির চাপ যেমন বেশি থাকে, তেমনি প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষার্থীও থাকে বেশি এবং শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতিও থাকে প্রায় শতভাগ। এতে একজন শিক্ষকের ওপর যখন প্রতিদিন ৫-৬টি ক্লাস রুটিনে থাকে তখন ঐ শিক্ষকের পক্ষে কীভাবে ফলপ্রসূ ক্লাস নেওয়া সম্ভব? অপরদিকে শিক্ষক প্রশিক্ষণের বিষয়টিও বেশ গুরুত্বের দাবি রাখে। কেননা ষষ্ঠ হতে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিষয় ভিত্তিক শিক্ষকদের জন্য TQI কর্তৃক প্রশিক্ষণসহ B.ED ও M.ED প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। অপরদিকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য রয়েছে নেপ কর্তৃক বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং PTI ট্র্রেনিং। যা প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য প্রযোজ্য। ৫-৬ বছরের শিশুদের নার্সিংয়ের জন্য যে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন সাধারণত মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের এ ধরনের প্রশিক্ষণ থাকে না। তাই সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা এ সেবা হতে বঞ্চিত হয়ে অনেক ক্ষেত্রেই রূঢ় আচরণের শিকারে পড়ে। এ ছাড়া ব্রিটিশ আমল হতে এ পর্যন্ত যতগুলো শিক্ষা রিপোর্ট, শিক্ষা কমিশন ও জাতীয় শিক্ষানীতি রয়েছে তার কোনোটিতেই প্রথম শ্রেণি হতে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থার নজির নেই। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক এ দু স্তরের প্রশ্ন প্রণয়নেও কিছু পার্থক্য রয়েছে।

বয়স ও সিলেবাস উপযোগী প্রশ্নের ধরনেও ভিন্নতা রয়েছে। এক্ষেত্রে সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অধিক চাপে থাকে। এ সকল নামী-দামী প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের উপর অতিরিক্ত বইয়ের বোঝা এবং জটিল ও কঠিন প্রশ্ন প্রণয়নের মাধ্যমে নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য ধরে রাখার অপপ্রয়াস চালায়। সেই সাথে আর্থিক সংশ্লিষ্টতাও এর সাথে জড়িত। কেন না এ ধরনের প্রশ্ন সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের শিক্ষকের নিকট প্রাইভেট বা কোচিং-এর বিকল্প নেই বলে ধারণা থাকে অভিভাবকদের। এভাবে অসহায় অভিভাবকগণও এক প্রকার জিম্মি হয়ে থাকেন। এ সকল প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ইংরেজি সিলেবাসে যা রয়েছে NCTB এর পাঠ্যপুস্তকে তা নেই। এ সকল বিষয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ৫ম শ্রেণিতে পড়ানো হয়। তাহলে ৬+ বয়সের একজন শিক্ষার্থীকে এ ধরনের চাপ প্রয়োগ করা কতটুকু বাস্তব সঙ্গত হচ্ছে তা ভাবা প্রয়োজন। এছাড়া সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে ২য়/৩য়/৪র্থ শ্রেণিতে ভর্তিযুদ্ধের যে প্রস্তুতি চলে তা এ সকল ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের উপর একপ্রকার অমানুষিক নির্যাতনের শামিল।

ভর্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অনেক শিক্ষার্থীর সাথে সাথে তাদের মায়েদেরও অসুস্থ হয়ে পড়ার নজির রয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষায় কৃতকার্য না হয়ে অনেক শিক্ষার্থী ৩য় বারে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার অসংখ্য নজির রয়েছে। এতে শ্রেণিকক্ষে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সাথে বয়সের দিক দিয়ে ৩/৪ বছরের পার্থক্য থাকায় অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় ফলাফল ও সহপাঠক্রমিক বিভিন্ন কার্যক্রমে বৈষম্য সৃষ্টিসহ মানসিক দিক দিয়েও অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সাথে এক প্রকার দূরত্ব সৃষ্টি হয় এ সকল শিক্ষার্থীদের সাথে। তাই এ বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনার দাবি রাখে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এর আলোকে প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ যদিও পাঁচ বছর থেকে বৃদ্ধি করে আট বছর অর্থাত্ ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত করা হবে বলে উল্লেখ রয়েছে। তথাপি আমাদের দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যে ভৌত অবকাঠামো তাতে এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে হয়ত আরো কয়েক বছর সময় প্রয়োজন হতে পারে।

তাই আপাতত মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো হতে সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়কে বিচ্ছিন্ন করে স্বতন্ত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাথে সংযুক্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে অথবা প্রাথমিক স্তরের জন্য পৃথকভাবে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করে শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিত করতে হবে। সেই সাথে নতুন শিক্ষানীতির আলোকে তথাকথিত নোট বই, প্রাইভেট-টিউশনির মত অনাকাঙ্ক্ষিত আপদ হতে শিক্ষার্থীদের মুক্তি দিতে হবে এবং জোর জবর দস্তি করে শিক্ষাদানের পরিবর্তে শিক্ষাজীবনকে আকর্ষণীয়, নিরাপদ ও আনন্দময় করে তুলতে হবে। পরীক্ষাকে আনন্দময় উত্সব হিসেবে গ্রহণ করবে শিক্ষার্থীরা। এ সুন্দর দিনের অপেক্ষায় আছে শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সমগ্র দেশবাসী।

লেখক :পি-এইচ.ডি (গবেষক), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: