সর্বশেষ আপডেট : ১ ঘন্টা আগে
বুধবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

একজন সীতেশ রঞ্জন, বন্যপ্রাণিদের সাথেই যার বাস

d8ac9639-2a40-4776-ae0f-673a0f412d0bজালাল আহমদ ::
পুরো নাম সীতেশ রঞ্জন দেব। তেয়াত্তর ছুঁই ছুঁই বয়স। তিনি শিকারি সীতেশ বাবু নামেই সর্বাধিক পরিচিত। বিভিন্ন সময় সরকারি টোকেন নিয়ে সিলেটের বনে-জঙ্গলে শিকার করতেন। ধীরে ধীরে তিনি সবার কাছে প্রাণি সংরক্ষণবিদ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। শিকার করতে করতে একসময় তিনি নিজে চিড়িয়াখানা স্থাপন করেন। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শহরের রামকৃষ্ণ মিশন রোডে ছিলো তাঁর চিড়িয়াখানা।

বর্তমানে হাইল হাওরঘেঁষা নিজের জমিতে স্থানান্তর করেছেন এটি। বন্যপ্রাণিদের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা। এরাই তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। দিবানিশি বন্যপ্রাণিদের নিয়েই বসবাস। দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর ধরে মানুষের হাতে ধরা পড়া প্রাণিগুলো উদ্ধার করে সেবা দিয়ে আসছেন তিনি। এখন শুধু নিজ এলাকায় নয়, দেশে-বিদেশে সকলের কাছে তিনি প্রিয়মুখ। তাঁর হাতে গড়া চিড়িয়াখানাটি দেশবাসী ‘সীতেশ দেব’র মিনি চিড়িয়াখানা’ বলেই চিনেন। বর্তমানে এটি সরকারি অনুমোদনের মাধ্যমে বন্যপ্রাণি সেবা ফাউন্ডেশনে রূপ নিয়েছে।

সীতেশ রঞ্জন দেব প্রাণিদের ভালোবেসে তাঁর বাগান বাড়িতে গড়ে তুলেছেন ‘বাংলাদেশ বন্যপ্রাণি সেবা ফাউন্ডেশন।’ এ ফাউন্ডেশনে বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধারকৃত ও আহত বন্যপ্রাণিদের সেবা-শুশ্রুষা করে বনে ফিরিয়ে দেবার মহান দায়িত্ব পালন করা হয়ে থাকে।
কিভাবে বন্যপ্রাণিদের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা জন্ম নিলো-এ প্রসঙ্গে সীতেশ দেব জানান, তাঁর পিতা প্রয়াত শিরিষ রঞ্জন দেব একসময় দুর্র্ধষ শিকারি ছিলেন। শিকারের নেশায় তিনি মাসের পর মাস কাটিয়ে দিয়েছেন বনে-জঙ্গলে। তিনি সব ধরণের পশু ও পাখি চিনতেন এবং তাদের অনেকের ভাষাই তিনি বুঝতেন। প্রকৃতিপাগল শিরিষ রঞ্জন সখের বশে প্রকৃতিকে ভালোবেসে স্বাধীনতার পূর্বে শহরতলীর ইছবপুরস্থ বাড়ির আঙিনায় গড়ে তুলেন একটি মিনি চিড়িয়াখানা।

hasras80-1440407344-606cc3b_xlargeপ্রয়াত পিতার সাথে সীতেশ দেবও পশু-পাখিদের লালন-পালনের কাজ শুরু করেন। পিতার সাথে শিকারেও যেতেন তিনি। ১৯৮৬ সালে পিতার মৃত্যু হওয়ায় পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে সীতেশ দেবও শিকারে মত্ত হয়ে ওঠেন। বন্যপ্রাণি সংরক্ষণ অধ্যাদেশ-১৯৭৩ সনের পিও নং-২৩ এর শর্তাবলী মেনে সীতেশ দেব সংসারত্যাগী এক শিকারিতে পরিণত হন। তিনি তাঁর শহরের মিশন রোডস্থ বাসভবনের আঙিনায় গড়ে তুলেন একটি মিনি চিড়িয়াখানা। এ চিড়িয়াখানা দেখতে দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক আসতে থাকেন তাঁর বাসায়। পরবর্তীকালে তাঁর ভাড়াউড়া এলাকায় অবস্থিত বাগান বাড়িতে এটিকে স্থানান্তর করেন। সরকারের বন্যপ্রাণি আইনানুযায়ী এটিকে রূপান্তর করেন বাংলাদেশ বন্যপ্রাণি সেবা ফাউন্ডেশনে।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণি সেবা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সীতেশ রঞ্জন দেব জানান, সখের বশে একসময় শিকার করলেও এখন প্রাণি সংরক্ষণে প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বন্যপ্রাণি রক্ষা করতে হবে আগামী প্রজন্মের জন্য।
শিকার জীবনের স্মরণীয় ঘটনা সম্পর্কে সীতেশ দেব জানান, ১৯৯১ সালের জানুয়ারি মাসে জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে বন্য শুকরের অত্যাচারে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। এলাকাবাসী বন্য শুকরের হাত থেকে তাদের রক্ষায় সীতেশ দেব’র সহায়তা কামনা করেন। ওই বছরের ১৪ জানুয়ারি ভোররাতে সীতেশ দেব শুকরের খুঁজে পাত্রখোলা চা বাগানের গভীর ছনবাগানে প্রবেশ করেন। ওই সময়ে ছনবাগানে শুয়েছিলো একটি মানুষখেকো প্রায় ৮ ফুট লম্বা বিশালাকৃতির ভাল্লুক। গভীর ছনবাগানে ভাল্লুকের উপস্থিতি বুঝতে পারেননি সীতেশ দেব। অলক্ষ্যে তাঁর পা পড়ে ভাল্লুকের গায়ের উপর। সাথে সাথে ঘুম ভাঙ্গা ভাল্লুক সীতেশ দেবকে আক্রমণ করে বসে। ঘটনার আকষ্মিকতায় বিহ্বল সীতেশ হাত দিয়ে প্রথমে ভাল্লুকের আক্রমণ প্রতিহত করেন। সাথে সাথেই ভাল্লুকটি সীতেশ দেব’র  চোখে-মুখে থাবা বসিয়ে দেয়। থাবায় তাঁর মুখের ডান পাশের চোখ ও পুরো অংশ চোয়ালসহ ঝুলে পড়ে। এরপরও ভাল্লুুকটি গুরুতর আহত সীতেশ দেব’র ওপর আক্রমণ চালানোর চেষ্টা করে। রক্তাক্ত ও মারাত্মক আহতাবস্থায় সীতেশ দেব জ্ঞান হারাবার পূর্বেই ভাল্লুকের গায়ে গুলি করেন। গুলিতে ভাল্লুকটি প্রাণ হারায়। পরে বাগান কর্তৃপক্ষ গুরুতর আহতাবস্থায় সীতেশ দেবকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকে ঢাকাস্থ সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে প্রায় এক মাস চিকিৎসা গ্রহণ করেন তিনি। এ সময়ে তাঁর মুখে ৭ বার অপারেশন করা হয় এবং মোট ২৯ ব্যাগ রক্ত দিতে হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে বিদেশে পাঠানো হয়। এ স্মৃতি মনে হলে এখনও মনের অজান্তে আঁতকে উঠেন তিনি।

বর্তমানে সীতেশ দেব’র বাগান বাড়িতে গড়ে উঠা বাংলাদেশ বন্যপ্রাণি সেবা ফাউন্ডেশনের কথা বলতে গিয়ে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর ড. আতিয়ার রহমানের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। তিনি জানান, ড. আতিয়ার রহমান তাঁর ব্যক্তিগত তহবিল থেকে বিভিন্ন অনুদান প্রদান করে এ কর্মকে সামনে এগিয়ে দেন। তিনি দেশের আগামী প্রজন্মের স্বার্থে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণি সেবা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে প্রাণিদের সেবা প্রদানের মধ্য দিয়ে বন্যপ্রাণিদের বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াস চালিয়ে যেতে চান আমৃত্যু পর্যন্ত। যেভাবে যেতে হবে : শ্রীমঙ্গল-মৌলভীবাজার সড়ক ধরে কালাপুর বাজার থেকে একটু সামনে এগোলেই বরুনা-হাজীপুর পাকা রাস্তার দেখা মিলবে। এ রাস্তায় প্রবেশ করে যেতে হবে হাজীপুর বাজারে। স্থানীয়দের কাছে এ বাজারটি ঘাটেরবাজার নামে পরিচিত। সেখান থেকে মোটর সাইকেলে বা পায়ে হেঁটে প্রায় ৩/৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হাইল হাওর। হাজীপুর বাজারে বেশ ক’জন গাইড রয়েছে। আপনি চাইলে গাইডের সাহায্য নিয়েও যেতে পারেন সীতেশ বাবুর মিনি চিড়িয়াখানায়।

চিড়িয়াখানায় প্রবেশের জন্য কোনো ফি’র প্রয়োজন নেই। তবে যাওয়ার সময় যদি ইচ্ছে করেন চিড়িয়াখানার পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা বয়দের কিছু বখশিশ দিতে পারেন। আর পশু-পাখির খাবারের জন্য যদি কোনো সাহায্য দিতে চান তাহলে সীতেশ বাবু তা সাদরে গ্রহণ করবেন। হাতে যদি আরও সময় থাকে তাহলে কথা বলে যেতে পারেন চিড়িয়াখানার পরিচালক সীতেশ বাবুর সাথে। জানতে পারবেন তাঁর দুর্দান্ত শিকারি জীবনের কাহিনী।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: