সর্বশেষ আপডেট : ৪ ঘন্টা আগে
শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

দেশের প্রাচীন ঐতিহ্যের নিদর্শন সিলেটের শাহী ঈদগাহ


Shahi Edgah_Maruf Hasanমারুফ হাসান ::

দেশের প্রাচীনতম নিদর্শনের অন্যতম সিলেটের শাহী ঈদগাহ। নগরীর মধ্যবর্তী সাপ্লাই এলাকায় অবস্থিত শাহী আমেজে তৈরী এই ঈদগাহে প্রতিবছর ঈদের জামায়াতে প্রায় ২লক্ষ মুসল্লির সমাগম ঘটে।

এবারের ঈদকে সামনে রেখে শাহী ঈদগাহকে নতুন রঙে রাঙ্গিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা, পার্কিং এবং নিরাপত্তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

১৭৮২ সালে এই ঈদগাহ মাঠে ভারত উপমহাদেশের প্রথম ইংরেজ বিরোধী অভ্যূত্থান হয়েছে। ভারতের অহিংস আন্দোলনের নেতা মহাত্মা গান্ধী থেকে শুরু করে কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, মাওলানা মোহাম্মদ আলী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের মতো নেতাদের পদস্পর্শে ধন্য এ স্থানটি। অতীতে সিলেটের বড় বড় সমাবেশের স্থানও ছিল এটি।

শাহী ঈদগাহ সপ্তদশ শতাব্দীর সত্তর দশকে নির্মিত দেশের প্রাচীন ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন। সিলেটের ঐতিহ্যের সাক্ষী। ছোট্ট টিলার উপর মনোমুগ্ধকর কারুকার্য খচিত রাজার মতো আসীন এই শাহী ঈদগাহ সম্রাট আওরঙ্গজে নিয়োজিত তদানীন্তন মোগল ফৌজদার ফরহাদ খাঁ নির্মাণ করেন।

ঈদগাহ’র উত্তরে ছোট সবুজ টিলায় রয়েছে বনবিভাগের কর্মকর্তার বাসা, দক্ষিণে বাংলাদেশ টেলিভিশনের সিলেট কেন্দ্র, পূর্বে সহানীয় মসজিদ ও হযরত শাহজালালের অন্যতম সাথী শাহমীর (রঃ) এর মাজার এবং পশ্চিমে রয়েছে বাসা-বাড়ি এবং পাশের টিলায় অবস্থিত আবহাওয়া বিভাগের সিলেট অফিস।

দূর থেকে দেখলেই অনুভব করা যায়, শাহী আমেজে দাঁড়িয়ে আছে এই শাহী ঈদগাহ। পাহাড় ঘেরা পরিবেশে সবুজ ঘাসের গালিচা পাতা, দেয়াল ঘেরা ঈদগাহটি পর্যটকদেরও মুগ্ধ করে। অবাক বিস্ময়ে তারা চেয়ে দেখে বাংলাদেশের প্রান্তিক জেলা সিলেটের সপ্তদশ শতাব্দির একটি অপূর্ব স্থাপত্য শিল্পকে।

শাহী ঈদগাহের মূল ভূখন্ডে ২২টি বৃহৎ সিঁড়ি রয়েছে। ১৫টি গম্বুজ সজ্জিত ঈদগাহ। বাউন্ডারির চারপাশে রয়েছে বড় ৩টি ও ছোট ৭টি গেইট। ঈদগাহের সামনে রয়েছে অযুর জন্য বিশাল পুকুর। এই নির্দশনের সাথে এবার যুক্ত হচ্ছে দুই শ’ ফুট উচ্চতার নান্দনিক মিনার। যার কাজ প্রায় ৯৫ ভাগ শেষ হয়েছে।

প্রতিবছর দুই ঈদের জামায়াতে এই ঈদগাহে নামাজ পড়তে সিলেট শহর ও বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছুঁটে আসেন লক্ষাধিক ধর্মপ্রাণ মুসল্লি।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, দেশ বিভাগের পূর্বে স্বাধীনতার স্বপক্ষে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, শওকত আলী, মাওলানা মোহাম্মদ আলী, শের-ই-বাংলা, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ অগণিত রাজনীতিবিদ এ ঈদগাহ ময়দানে বক্তৃতা করেছেন।

১৭৮২ খ্রীষ্টাব্দে এখানে সৈয়দ মোহাম্মদ হাদী ও সৈয়দ মোহাম্মদ মেহেদী ভ্রাতৃদ্বয়ের নেতৃত্বে উপমহাদেশে ইংরেজ বিরোধী প্রথম অভ্যূত্থান সংঘটিত হয়। ইংরেজদের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয় শহীদ হন। এই ঈদগাহে পবিত্র কাবা শরীফের ইমামকে হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসায় বরণ করেছিল এই ঈদগাহে।

সিলেটের দেশবরেণ্য আলেম-ওলামা ও রাজনীতিবিদদের জানাজাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এ ঈদগাহে অনুষ্ঠিত হয়। সাবেক অর্থমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমানের জানাযাও এই ঈদগাহে অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এবং বড় জামায়াতে স্থান সংকুলান না হলে এ ঈদগাহকে বেঁেছ নেয়া হয়।

প্রতিটি ঈদে মুসলমানদের কলরবে মুখর হয়ে ওঠে এই ঈদগাহ প্রাঙ্গন। ধ্বনিত হয় মানবতার বাণী। ঈদ-উল-আযহা ও ঈদ-উল-ফিতরে এখানে মুসল্লিরা ঈদের জামায়াতে জড়ো হন। সময়ের পরিক্রমায় বিশাল এই ঈদগাহে লক্ষাধিক মুসল্লির জায়গা সংকুলান হয় না। ফলে মুসল্লিরা মূল ঈদগাহে স্থান না পেয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন।

এবারও ঈদ উপলক্ষে ব্যাপক লোকসমাগম হবে বলে আশাপ্রকাশ করেছেন ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির সভাপতি জহির বখত। তিনি বলেছেন, প্রতিবছর বিশাল মানুষের সমাগম ঘটে। মূল ঈদগাহের বাইরে রাস্তায় দাড়িয়ে লোকজন নামাজ আদায় করে। মূল ঈদগাহে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ নামাজ আদায় করতে পারে জানান তিনি।

এবারের ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকে ঈদগাহের সৌন্দর্য্য বর্ধন এবং সার্বিক ধূূয়ামোছার কাজ শুরু হয়। এবার গুলশানে হামলার পর থেকে সিলেটেও সিকিউরিটি বাড়ানো হয়েছে।

শাহী ঈদগাহে মুসল্লিদের নিরাপত্তায় ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা, স্পাই ক্যামেরা, আর্চওয়ে মেশিন, মেটাল ডিটেক্টর মেশিন ব্যবহার করবে আইনশৃংখলা বাহিনী। মুসল্লিদের কেবল জায়নামাজ ছাড়া অন্য কিছু সাথে নিয়ে ঈদগাহে না আসার অনুরোধ করেছেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার কামরুল আহসান।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৭৮২ সালে আশুরা দিন ধর্মীয় নেতা সৈয়দ মোহাম্মদ হাদী ও সৈয়দ মোহাম্মদ মেহেদী- এ দুই ভাইয়ের নেতৃত্বে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা হয় এই ঈদগাহ ময়দানে। এর আগে এখানে লাটি খেলা হতো এবং প্রচুর লোক জমায়েত হতো।

তখন সিলেটে ইংরেজদের কালেক্টর ছিলেন রবার্ট লিগুসে। বিদ্রোহের খবর পেয়ে লিগুসে ঈদগাহ ময়দানে ছুঁটে আসেন। বিদ্রোহ দমনের জন্য তিনি ঈদগাহ ময়দানে গুলি করলে এ দুই ভাই শহীদ হন। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে তখনো তিতুমীরের নেতৃত্বে বাঁশের কেল্লা বিদ্রোহ সংঘঠিত হয়নি।

তাদের এই বিদ্রোহ উদ্বুদ্ধ করেছিল ভারত উপমহাদেশে ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনকে। আজো সেই মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয় মুসলমানরা। এরই পথ ধরে এই সিলেটে এসে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন মাহাত্মাগান্ধি থেকে শুরু করে উপমহাদেশের ভাগাভাগা নেতারা।

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: