সর্বশেষ আপডেট : ৪ মিনিট ২৬ সেকেন্ড আগে
বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

সেই রাতের টুকরো টুকরো ঘটনা

photo-1467618487নিউজ ডেস্ক : রাজধানী গুলশানের স্প্যানিশ রেস্তোরাঁ হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার শুরুর পর পরই এর কিছু কর্মী পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তবে মিরাজ নামের এক কর্মী পালাতে পারেননি। রেস্তোরাঁর এক কোনায় আশ্রয় নেন তিনি। এক বন্দুকধারীর চোখে পড়েন মিরাজ। ওই সন্ত্রাসী তাঁকে বলেন, ‘সবাই পালিয়েছে, কিন্তু তুমি পারোনি। এর মানে হলো আল্লাহ তোমার মৃত্যু চান।’

গত শুক্রবার রাত পৌনে ৯টার সময় কয়েক সন্ত্রাসী গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলা চালায়। অনেককে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। রাতভর জঙ্গিদের হাতে জিম্মি ছিলেন বেশকিছু মানুষ। মিরাজের মতো জিম্মিরা জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে সময় কাটাতে থাকেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানায়, মিরাজকে ধরার পর পরই তাঁকে বাইরে এনে চেয়ারে বেঁধে ফেলে সন্ত্রাসীরা। তাঁর সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয় বোমা ও গ্যাসের সিলিন্ডার। মিরাজকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সন্ত্রাসীরা।

মুসলমান ও অমুসলমানদের ভাগ:

অমুসলিমদের মধ্যে থেকে মুসলমানদের আলাদা করে সন্ত্রাসীরা। মুসলমানদের পানি ও খাবার দেওয়া হয়। ভোর হওয়ার আগে মুসলমান জিম্মিদের সেহরি খাওয়ার জন্য হোটেলের কর্মীদের খাবার তৈরির নির্দেশ দেয় সন্ত্রাসীরা। অমুসলিমরা এসব সুযোগ থেকে ছিলেন বঞ্চিত।

মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) সংশ্লিষ্ট কিছু মাধ্যম গুলশানে সন্ত্রাসী হামলা ও জিম্মি সংকট চলাকালেই হলি আর্টিজানের কিছু ছবি দেয়। ছবিতে ছড়িয়ে থাকা চেয়ার টেবিল ও রক্তের মধ্যে কয়েক নারী-পুরুষের প্রাণহীন দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। টেবিলের ওপর রাখা প্লেটে তখনো কিছু খাবার ছিল। আবার এক নারীর গলায় ন্যাপকিন লাগানোই ছিল। এসব ছবির সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি সিএনএন।photo-1467526697

বন্ধুদের ফেলে যেতে চাননি ফারাজ:

হলি আর্টিজানে জিম্মি ফারাজ আইয়াজ হোসেনকে (২০) চলে যাওয়ার সুযোগ দেন সন্ত্রাসীরা। কিন্তু ফারাজের দুই বন্ধু অবিন্তা কবির ও তারিশি জৈনকে ছাড়তে চাননি তাঁরা। বন্ধুদের ছেড়ে যেতে অস্বীকার করেন ফারাজ। পরে অবিন্তা ও তারিশির সঙ্গে ফারাজকেও হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।

ফারাজ আইয়াজ হোসেন যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার ইমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী ছিলেন। আর অবিন্তা কবিরও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ভারতীয় নাগরিক তারিশি বার্কেলেতে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার শিক্ষার্থী ছিলেন।

রেস্টরুমে আটকা আটজন:

হলি আর্টিজানে হামলা শুরুর পর আটজন আশ্রয় নেন দ্বিতীয় তলার বিশ্রামকক্ষে। আটজনের জন্য যথেষ্ট বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা ছিল না সেখানে। বাতাসের স্বল্পতার মধ্যে ভয়ে সিটিয়ে ছিলেন তাঁরা। হামলা শুরুর ঘণ্টাখানেক পর এক বন্দুকধারী বিশ্রামকক্ষের কাছে এসে জোরে বলেন, ‘আপনারা বাঙালি হলে বেরিয়ে আসুন।’ পরে আবার বলেন, ‘আপনারা মুসলমান হলে বেরিয়ে আসুন।’ দুবারই নিশ্চুপ ছিলেন লুকিয়ে থাকা আটজন।

বিশ্রামকক্ষে কেউ নেই ভেবে সেখানকার দরজা বন্ধ করে চলে যায় ওই জঙ্গি। হামলাকারীদের কাছ থেকে নিস্তার পেলেও দম বন্ধ হয়ে মৃত্যুর আশঙ্কায় ছিলেন ওই আটজন। বিশ্রামকক্ষটি অস্থায়ী স্টোর হিসেবেও ব্যবহার হতো। সেখানে থাকা আটা আর ইস্টের কারণে তাপমাত্রাও বাড়ছিল। রেস্টুরেন্টের মালিকের কাছে মোবাইলে বার্তা পাঠিয়ে উদ্ধারের আবেদন জানান তাঁরা। সকালে অভিযানের পর তাঁদের উদ্ধার করা হয়।

এটি ছিল আমাদের সন্তান:

দুই বছর আগে যাত্রা শুরু করে হলি আর্টিজান বেকারি। গড়পড়তা বাংলাদেশিদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে হলেও ধনী ও অবস্থাসম্পন্নদের কাছে জনপ্রিয় ছিল এই রেস্তোরাঁ। হলি আর্টিজান বেকারির অবস্থান ঢাকার অন্যতম অভিজাত এলাকা গুলশানে। কূটনৈতিক এই পাড়ায় আশপাশেই ছিল কয়েকটি দেশের দূতাবাস। দেয়ালঘেরা রেস্তোরাঁয় বসেই দেখা যেত গুলশান লেক। হলি আর্টিজান বেকারির একজন মালিক আলী আরসালান বলেন, ‘এটি ছিল আমাদের সন্তান।’  তিনি আরো বলেন, প্রতিদিন থেকে একটু আলাদা বিনোদনের জন্যই তাঁরা এই রেস্তোরাঁ শুরু করেন।

রেস্তোরাঁয় চলছিল পুনর্মিলনী ও জন্মদিন:

গুলশানে হলি আর্টিজান হামলার সময় সেখানে ২০ জনের মতো গ্রাহক ছিলেন। প্রায় একই সংখ্যক কর্মী ছিলেন সেখানে। দুই বন্ধু অবিন্তা কবির ও তারিশি জৈনের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন ফারাজ আইয়াজ হোসেন। এরা তিনজনই ছিলেন যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। প্রথম দুজন বাংলাদেশে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন আর ভারতীয় তারিশি একটি ব্যাংকে শিক্ষানবিশ ছিলেন।

সন্তান রায়ানের অষ্টম জন্মদিন উপলক্ষে পরিবার নিয়ে হলি আর্টিজানে গিয়েছিলেন হাসনাত করিম।

সম্প্রতি এনগেজমেন্ট হয় জাপানের মাকোটো ওকামুরার। শিগগিরই বিয়ে হওয়ার কথা ছিল তাঁর। অপর ছয় জাপানির সঙ্গে হলি আর্টিজানে গিয়েছিলেন মাকোটো। ইতালির সিমোনা মন্টি ছিলেন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। সন্তান জন্মদানের জন্য ইতালি ফেরার কথা ছিল তাঁর। বিদায় উপলক্ষে বন্ধুদের সঙ্গে হলি আর্টিজানে যান সিমোনা। হাসনাত ও তাঁর পরিবার সকালে মুক্তি পায় কিন্তু অন্যদের ভাগ্যে এমনটি ঘটেনি।

ছাদ থেকে লাফিয়ে পালানো:1467618515-Gulshan-attack-2

শুক্রবার রাত পৌনে ৯টার দিকে গুলশানের রেস্তোরাঁ হলি আর্টিজান বেকারির সদর দরজা দিয়ে ‘আল্লাহু আকবর’ চিৎকার করে সন্ত্রাসীরা ঢোকে। ওই সময় ওয়েটার দিয়েগো রসিনি একটি অর্ডার নেওয়ার জন্য রান্নাঘরে যাচ্ছিলেন। হামলাকারীদের চিৎকারে অনেকের টেবিলের নিচে আশ্রয় নেন।  তবে রসিনিসহ হলি আর্টিজান বেকারির কয়েক কর্মী ছাদের উদ্দেশে দৌড় দেন। ছাদ থেকে লাফিয়ে পাশের ভবনে যান তাঁরা। মেরুদণ্ডে ব্যথা পান রসিনি, তবে প্রাণে তো বেঁচেছেন। অপর ওয়েটার সুমন রেজাও ছাদ থেকে লাফ দেন। তিনি বলেন, কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল আমি বোধহয় মারা গেছি। তিনিও বেঁচে যান।

দুই পুলিশ কর্মকর্তা নিহত:

প্রচণ্ড শব্দ ও গুলিবর্ষণের আওয়াজ পেয়ে হলি আর্টিজান বেকারিতে হাজির হন বানানী থাকার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাহউদ্দিন খান এবং পুলিশের মহানগর গোয়েন্দা শাখার সহকারী কমিশনার (এসি) রবিউল ইসলাম। সন্ত্রাসীদের গুলি ও বিস্ফোরণে আহত হয়ে মৃত্যু হয় তাঁদের। ঈদুল ফিতরে গ্রামে যাওয়ার কথা ছিল রবিউলের। অনাগত সন্তানকেও দেখা হলো না তাঁর।

হামলাকারীরা ছিল সাধারণ :

কোটি মানুষের শহর ঢাকা। তবে এখানকার মানুষদের অনেকেই একে অপরের পরিচিত। সরকার থেকে হামলাকারীদের পরিচয় জানানো হয়নি। তবে অনলাইনে ছবি দেখার পরপরই হামলাকারীদের নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। হামলাকারীদের কেউ ছিল শহরের কারো ছেলের কলেজের বন্ধু, কারো স্বজন। ঢাকাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তা ফয়েজ সোবহান সিএনএনকে বলেন, হামলাকারীদের পরিচয় সত্যিই অবাক করেছে। তারা ছিল খুবই সাধারণ, ক্যাফেতে সময় কাটাত, খেলত এবং তাদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টও ছিল। তিনি আরো বলেন, এটি হয়তো জঙ্গিবাদের নতুন ধারা।

জান্নাতে সবার সঙ্গে দেখা হবে:

গুশলানে রেস্তোরাঁ হামলার শুরুর প্রায় নয় ঘণ্টা পর শনিবার সকালে জিম্মি উদ্ধারে শুরু হয় অপারেশন থান্ডারবোল্ট। আর্মাড যান দেয়াল ভেঙে হলি আর্টিসান বেকারির চত্বরে প্রবেশ করে। টানা ৫০ মিনিট ধরে থেমে থেমে গুলিবর্ষণের আওয়াজ পাওয়া যায়। এই আওয়াজ এতটাই বিকট ছিল যে ওই এলাকায় থাকা অনেক গাড়ির অ্যালার্ম বেজে ওঠে। সন্ত্রাসীরা জানত তাঁদের মৃত্যু অবধারিত। মেঝেতে পড়ে থাকা মৃতদেহের দিকে নির্দেশ করে এক সন্ত্রাসী বলে, ‘দেখ আমরা এখানে কী করেছি। একই জিনিস আমাদের সঙ্গেও ঘটবে এখন। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সন্ত্রাসীরা বলেন, ‘আমরা চলে যাচ্ছি। জান্নাতে দেখা হবে।’-এনটিভি

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: