সর্বশেষ আপডেট : ৪০ মিনিট ২১ সেকেন্ড আগে
সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

তনুর খুনিরা গ্রেফতার না হলে আমার বুকের আগুন নিভবে না

Comilla-Tanu-mother20160625061055 copyনিউজ ডেস্ক:
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনুর মা আনোয়ারা বেগম বলেছেন, ‘তনুর বাবার চাকরির সুবাধে সেনানিবাসের ভেতরই আমাদের চলাফেরা, সেনাবাহিনীকেই আমরা আপন করে নিয়েছি, আমরা তো তাদের বিরুদ্ধে কথা বলি না, আমার মেয়েটা তো সেখানে মারা গেছে, তাই ঘাতকদের বিরুদ্ধে কথা বলি।’

তিনি বলেন, ‘মেয়েটাকেই যখন হারিয়েছি, এখন আর কাউকে ভয় করি না, মেয়ের হত্যাকারীরা গ্রেফতার না হলে আমার বুকের আগুন নিভবে না।’ ঘটনাবহুল তনু হত্যাকাণ্ডের পর বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে বক্তব্য দিয়ে এখন আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন তনুর মা আনোয়ারা বেগম।

সন্তানহারা তনুর মায়ের বুক ফাটা কান্না আর নানা প্রশ্নবানে জর্জরিত ছিলেন ‘কখনো সেনাবাহিনী, কখনো সিআইডি, পুলিশ কিংবা ডাক্তার’। এসব বিষয় নিয়ে বার বার গণমাধ্যমের মুখোমুখিও হয়েছেন তিনি। গত বুধবার জেলার মুরাদনগর উপজেলার কামাল্লা গ্রামে এক নিকটাত্মীয়ের মৃত্যুর খবরে সেখানে ছুটে যান তনুর মা আনোয়ারা বেগম ও বড় ভাই আনোয়ার হোসেন রুবেল। সেখানে একান্ত সাক্ষাৎকারে তনুর মা হত্যাকাণ্ডের আদ্যপান্ত তুলে ধরেন।

তনুর মায়ের সঙ্গে আলাপচারিতার উল্লেখযোগ্য অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

: কেন আসামি চিহ্নিত ও গ্রেফতার হচ্ছে না বলে মনে করেন?
তনুর মা : আসামিরা প্রভাবশালী, নয়তো সিআইডি তাদের চিহ্নিত ও গ্রেফতার করছে না কেন?

: আপনি তো তনু হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী নন, তাহলে আপনার সন্দেহ সেনাবাহিনীকে নিয়ে কেন?
তনুর মা : মায়ের মন সব বুঝে। তাহলে আমার তনুর ঘাতক কে? আমার মেয়েটা তো ক্যান্টনমেন্টের ভেতরেই মারা গেছে।
ঘাতক কারা তাতো সেনাবাহিনীকেই খুঁজে দিতে হবে।
: তনুর ঘাতক তো বাইরের কেউ হতে পারে?
তনুর মা : না। ওই এলাকায় বাইরের লোকজন যেতে পারে না।

: ডাক্তাররা তো বলেছেন তনুর শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল না।
তনুর মা : ডাক্তাররা ভুল বলেছেন। আমার মেয়ের গোটা শরীরে রক্তাক্ত আঘাতের চিহ্ন, কাপড়গুলো ছেঁড়া ছিল, চুলগুলো কেটে দেয়া হয়েছে, কান দিয়ে তাজা রক্ত ঝড়ছিল, হাত এবং পায়ে বুটের আঘাতের চিহ্ন আমি নিজের চোখে দেখেছি। কেউ না মারলে তনু মরলো ক্যামনে?

: তাহলে দুটি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন কি ভুল ছিল?
তনুর মা : হ্যাঁ ভুল ছিল। ডাক্তার কামদা ও শারমিনকে ধরলে তারাই বলে দিতে পারবেন তনুর হত্যাকারী কারা। তারা হত্যাকারীদের সঙ্গে আলাপ করেই তাদের বাঁচাতে আমার মেয়ের হত্যার আলামত লুকিয়েছেন এবং মিথ্যা রিপোর্ট দিয়েছেন।

: তনুর শূন্যতা এখন কীভাবে অনুভব করেন?
তনুর মা : আমরা তনুকে সোহাগী বলে ডাকতাম। বাসায় একটু সময় পেলেই সে আমাকে জড়িয়ে ধরতো, চুমু খেতো। তাকে হারিয়ে এখন বুকে আগুন জ্বলছে। সে যে খাটে ঘুমাতো এখন সেই খাটে আমি, তনুর বাবা ও তার চাচাতো বোন লাইজুকে নিয়ে থাকি। গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়, এই বুঝি আমার সোহাগী দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। বিচার না পেলে আমার বুকের আগুন নিভবে না।

: তনুর হত্যাকারীরা তো এখনো চিহ্নিত হয়নি। এ বিষয়ে তদন্ত সংস্থার ভূমিকা কি সঠিক পথেই আছে বলে মনে করেন?
তনুর মা : তনু হত্যার পর থেকে সিআইডিসহ সবাই তো আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কোথাও ভরসা পাচ্ছি না। সর্বশেষ গত বুধবার বিকালে সিআইডির এসপি ডা. নাজমুলসহ অন্য কর্মকর্তারা বাসায় গিয়ে আবারো তনুর বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। তারা (সিআইডি) বলেছেন, তনুর বিচার হবেই, ময়নাতদন্ত রিপোর্টে মৃত্যুর কারণ না থাকলেও ডিএনএ প্রতিবেদন দিয়েই বিচার সম্ভব বলে সিআইডি আমাদের বলেছে। এখন অপেক্ষায় আছি দেখি কি হয়।

: বাসার ডিশলাইন কি এখনো বন্ধ?
তনুর মা : না। আমি লোক ডেকে এনে লাইন চালু করেছি।

: তনুর কারো সাথে প্রেম ছিল?
তনুর মা : মেয়েটা এমন হতেই পারে না, সারাক্ষণ মাথায় হিজাব পরে থাকতো।

: কত বছর বয়সে তনুকে নিয়ে সেনানিবাসের বাসায় আসেন?
তনুর মা : দুই বছর বয়সে।
: তনু কি টাকার বিনিময়ে সেনাবাহিনীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যেত?
তনুর মা : না। মগ আর গ্লাস ছাড়া জীবনে সে কিছুই পায়নি। ছোটবেলায় কিছু বুঝতো না। কিন্তু যখন বড় হয়েছে, তখন বুঝতো অনুষ্ঠানে যেতে একটু মেকআপ প্রয়োজন। তার যে মেকআপের দরকার হতো, অনেক সময় কষ্ট করে সেই টাকা জোগাড় করে মেকআপ করতো।

: হত্যাকাণ্ডের রাতে কি ঘটেছিল ?
তনুর মা : তনুর বাসায় ফিরতে দেরি হলে তনু আমাকে মোবাইলে কল করতো, রাতে তনু বাসায় না ফেরায় বুকটা কেঁপে উঠছিল, আমি বাসার ভেতরই অজ্ঞানের মতো হয়ে যাই। অনেক খোঁজাখুঁজির পর যখন ঝোপের ভেতর তার লাশ পাই, তখন আমার স্বামী মিলিটারি পুলিশের সহযোগিতায় মেয়ের লাশ উদ্ধার করে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যায়, হাসপাতালে নেয়ার পর থেকেই আমাদের তনুর লাশের পাশে থাকতে দেয়নি।

: সিএমএইচে পুলিশ সুরতহালে বলেছে তনুর শরীরে কোনো আঘাত ছিল না।
তনুর মা : আমার মেয়ের গোটা শরীরে রক্তাক্ত আঘাতের চিহ্ন ছিল, সেখানে পুলিশ-ডাক্তার মিলে যে সুরতহাল করেছে, তাতে কিছু লেখার আগেই আমাদের স্বাক্ষর নেয়া হয়।

: এখন কি কারো চাপে আছেন?
তনুর মা : চাপে তো আছিই। ঘটনার পর থেকে খুব চাপে ছিলাম। কয়েকদিন পর সদর আসনের এমপি হাজি বাহার সেনানিবাসের বাসায় যান এবং ক্যান্টনমেন্ট রেস্ট হাউজে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার পর কিছুটা ভরসা পাই। আমি যখনই মিডিয়ায় কথা বলি, চাপ দেয়া হয় তনুর বাবাকে।

সেনানিবাসে আসার পর থেকে যাদের সঙ্গে চলাফেরা করে আপনজনের মতো ঘনিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলাম হুমকির মুখে তারাই এখন আর আমাদের সঙ্গে কথা বলে না। এখন মেয়ে হারানোর শোকে অনেকটাই পাথর হয়ে একাকি জীবনযাপন করছি। বাসা থেকে বের হয়ে কোথাও যেতে হলে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়।

পেছনে পেছনে ফলো করা হয়। আমি এসব ভয় করি না, মেয়েকে যখন হারিয়েছি, তখন আর ভয় কিসের? ভয় হয় তনুর বাবাকে নিয়ে। তাকে গাড়ি চাপা দিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে, এখন সন্ধ্যার পর ভয়ে সে বাসা থেকে বের হয় না।

: সেনাবাহিনী তো আপনাদের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।
তনুর মা : ঘটনার কয়েকদিন পর সেনাবাহিনীর প্রধান বাসায় এসে বিচারের আশ্বাস দিয়েছিলেন। আমরা সেনাবাহিনীকে ভালোবাসি, তারা দেশের সম্পদ, আমাদের শত্রু নয়। আমরা তো সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কিছু বলছি না, তনুর হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে কথা বলছি, দু-একজন ঘাতকের জন্য অন্যরা কলংকিত হতে পারে না। হত্যাকারীদের চিহ্নিত ও গ্রেফতারে আমরা সেনাবাহিনীর সহায়তা চাই।

: এখন সরকারের নিকট আপনার দাবি কি?
তনুর মা : তনু হত্যার পর প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে সবাই তো বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন, কিন্তু এখনো কোনো লক্ষণ দেখছি না। আমি আমার মেয়ের ন্যায়বিচারের জন্য প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সেনাবাহিনীর প্রধানের নিকট দাবি জানাচ্ছি।

উল্লেখ্য, গত ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা সেনানিবাসের একটি জঙ্গল থেকে তনুর লাশ উদ্ধার করা হয়। গত ৪ এপ্রিল ও ১২ জুন যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তনুর মৃত্যুর কারণ উল্লেখ না করেই প্রতিবেদন দেয় কুমেকের ফরেনসিক বিভাগ। গত ১৬ মে তনুর ভেজাইনাল সোয়াবে তিন পুরুষের শুক্রাণু পাওয়া যাওয়ার খবর গণমাধ্যমকর্মীদের জানায় সিআইডি।

গত ১২ জুন ফরেনসিক বিভাগ ও দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত বোর্ডের প্রধান ডা.কেপি সাহা তনুর দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তনুর মৃত্যুর কারণ উল্লেখ না করলেও মৃত্যুর আগে তনুর সঙ্গে ‘সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স’ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। তনুর পরিবার ওই দুটি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনই প্রত্যাখ্যান করে চিকিৎসকদের বিচার দাবি করেছেন।

হত্যাকাণ্ডের তিন মাস পার হলেও এখনো তনুর ঘাতকদের চিহ্নিত ও গ্রেফতার করতে পারেনি তদন্ত সংস্থা সিআইডি।সূত্র: জাগো নিউজ

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: