সর্বশেষ আপডেট : ১ মিনিট ১৫ সেকেন্ড আগে
বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

পিতা

unprecedented-view-of-the-g-Bengalসোহরাব শান্ত ::

মেঘনা নদীর চাতলপাড় ঘাট। ঘাটের পল্টুনটিতে বছরের প্রায় পুরোটাজুড়েই বারোয়ারী লোকের আনাগোনা থাকে। ছোটবেলা থেকে এমনটা দেখে এসেছেন আবুল কাশেম। অথচ এখন অনেকটা জনশূণ্য। বৈশাখ মাস চলছে। আশেপাশের হারওে ধুমছে ধানকাটা চলছে। পল্টুনে তথা এই ঘাটে এখন জনসমাগম কম থাকার প্রধান কারণ।
প্রখর রোদে পুরো পল্টুনে তালসেদ্ধ গরম। যেন একটা কামারশালা। হালকা বাতাস আছে বলে কিছুটা রক্ষা। ছোট একটা কাঠের টেবিল পেতে খালি গায়ে বসে আছে পল্টুনের সুপারভাইজার। পল্টুনের মাঝামাঝি বিভিন্ন কোম্পানীর কোমল পানীয়ের ক্যান স্তুপ করে রাখা। কয়েকজন কুলি ক্যানগুলো নিয়ে যাচ্ছে চাতলপাড় বাজারের কয়েকটা পাইকারী দোকানে। সহকর্মী কুলির মাথায় কোমলপানীয়র ক্যান উঠিয়ে দিতে দিতে দরকারি নির্দেশনা দিয়ে দিচ্ছে অপর এক কুলি। ফাঁকে ফাঁকে কৌতুকও করছে তারা। এসব কৌতুকের বেশিরভাগই আদিরসপূর্ণ।

আবুল কাশেমের সেই দিকে মনযোগ নাই। ছাতা মাথায় নদীর দিকে মুখ করে পল্টুনে দাঁড়াতেই তার বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠলো। চেপে রাখা কান্নাটা গলা পর্যন্ত দলা পাকিয়ে আছে। চশমার গ্লাস গলে সামনের সবকিছু ঝাঁপসা দেখতে পান তিনি। নিজেকে সামলে নিতে নদী ও নদীর ওপাড়ের দৃশ্যগুলোয় মনযোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন।
নদীতে ¯্রােতের সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে দু’য়েকটা কচুরি পানা। কোথাও কোথাও ভাসছে কোমল পানীয়ের ছোট ছোট বোতল।
আচ্ছা মানুষ কোমল পানীয় আর এনার্জি ড্রিংকসের নামে যা খাচ্ছে, তা কি সত্যিই কোনো উপকারে আসে? শরীর ও মনকে ঠান্ডা করে? আবুল কাশেম নিজের মনকেই প্রশ্ন করেন।

নদীর উত্তরপাড়ের হাওরগুলোতে দেখা যাচ্ছে ধানকাটার দৃশ্য। কাঁঠফাটা এ রোদে ধানের ভার কাঁধে করে সারবেধে গ্রামের দিকে যাচ্ছেন কৃষি শ্রমিকরা। হাওরে বেশিরভাগ জমির ধান কাটা শেষ। বাকী ধানগুলো দ্রুত কেটে নিয়ে যেতে হবে। বৃষ্টি-বাদল শুরু হওয়ার আগেই ধানগুলো শুকিয়ে ফেলতে পারলে সুবিধা। এখন যা রোদ, ধান মাড়াই করার পর একদিনেই শুকিয়ে গোলায় ভরা সম্ভব। এসময় নিতান্ত জরুরী কাজ না থাকলে কোনো কৃষক চাতলপাড় বাজারে আসে না।
আশেপাশের দশ বাজারে দূর্লভ, এমন একটা ওষুধ কিনতে চাতলপাড় বাজারে এসেছিলেন তিনি। হার্টের রোগের ওষুদ। ব্যাংকের চাকুরির সময়ই দুইবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে তার। অসময়ে চাকরি ছেড়ে স্থায়ীভাবে গ্রামে ফিরে আসার কারণও এটাই। এখন নিয়মিত ওষুদ খেয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে তাকে। এই বেঁচে থাকায় কোনো আনন্দ নাই। অসুস্থতায় যতটা কষ্ট, তারচেয়ে শতগুণ বেশি কষ্ট বড় ছেলের জ্বালাতন। দুইবারের হার্ট অ্যাটাকও যার জীবন কেড়ে নিতে পারে নি, সেই প্রাক্তন ব্যাংক কর্মকর্তা আবুল কাশেম প্রতিরাতে ঘুমাতে যান নেশাগ্রস্থ ছেলের হাতে মৃত্যুর আশঙ্কা নিয়ে! ক্ষমতাসীন দলের এক রাজনৈতিক নেতার প্রশ্রয়ে থাকায় ছেলের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থাও নিতে পারছেন না তিনি।

আবুল কাশেমের নিজের বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলা সরু নদীটা এই মেঘনাতে এসে মিশেছে। সেই সকাল ১০টায় নৌকায় চেপে চাতলপাড় এসেছেন তিনি। তার গ্রাম থেকে চাতলপাড় আসতে সময় লেগেছে সোয়া এক ঘন্টা। অথচ দূরত্ব চার কিলোমিটারও হবে না। সড়ক যোগাযোগ না থাকায় হাওর ও হাওরঘেষা গ্রামগুলোর মানুষকে এভাবেই সময় নষ্ট করে নদীপথে চলাফেরা করতে হয়।

পল্টুনের দক্ষিণ পাশেই নদীর পাড়ে চাতলপাড় বাজার। ছোটখাট একটা নদীবন্দর। আর দশটা বাজার থেকে আলাদা। হাজারো ব্যবসার কেন্দ্রস্থল। এই পল্টুনে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত লঞ্চ ও নৌকা এসে ভিড়ে। আশেপাশের গ্রামগুলোর লোকজন তো আসেই, দূর দূরান্তের উপজেলা ও জেলাগুলো থেকেও নানা কাজে লোকজন আসে। ভৈরব বাজার, কুলিয়ারচর, মিটামইন, অস্ট্রগ্রাম, ইটনা, আজমেরীগঞ্জ, লাখাই, নাসিরনগর, আশুগঞ্জ সহ নানা জায়গা থেকে জলযানগুলো আসে। মালবাহী কার্গোও আসে। তবে তা পল্টুনে ভিড়ে না। নদীর মাঝখানে নোঙর করে ছোট ছোট নৌকায় মাল খালাস করে চলে যায়।
জলযানগুলোর ধরণ, রঙ ও আকারে যেমন পার্থক্য, তেমনি পার্থক্য এসবে আসা মানুষগুলোর চেহারা, আচরণ, পোশাক, ভাষা ও বর্ণে। তারা আসে ব্যবসায়িক কাজে। কেউ আসে এটা-সেটা বেঁচতে। কেউ কিনতে।
নানা কারণেই এখানে লোকজন আসে। এই পল্টুন হয়ে ডাঙায় যেতে হয়। ডাঙা থেকে নৌকা বা লঞ্চে উঠতেও পল্টুনে পা রাখা ছাড়া উপায় নাই।

ওষুদ কিনে বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে পল্টুনে এসেছেন আবুল কাশেম। তিনি যে ট্রলারে করে বাড়ি ফিরবেন সেটা ছেড়ে আসে কুলিয়ারচর থেকে। চাতলপাড় ঘাটে তিনটার পর এসে ভিড়বে। সাড়ে তিনটায় পল্টুন থেকে ট্রলার ছেড়ে যাওয়ার কথা। এই রোদ-গরমে এত লম্বা সময় এখানে বসে থাকা কঠিন। গল্প করার মতো কাউকে পেলে ভাল হতো।

দুই.
তিনটা বাজার কিছুক্ষণ আগে দু’জন যাত্রী এসেছে পল্টুনে। তারা সাড়ে তিনটার ট্রলার ধরতে এসেছে। একজন মহিলা যাত্রী আবুল কাশেমের চেনা। পাশের গ্রামে বাড়ি। কথাবলে জানা গেল চাতলপাড়ের ইউনিয়নের এক গ্রামে  আত্মীয়র বাড়িতে গেছিলেন। কথায় কথায় অনেক কথা হয়। সম্প্রতি শেষ হওয়া শেষ হওয়া ইউনিয়ন পরিষদে কে কাকে ভোট দিয়েছে- আলাপচারিতায় তা ওঠে আসে। চেয়ারম্যান প্রার্থীদেও মধ্যে কে কতটা ভাল বা মন্দ, কে কোন কারণে ভোট বেশি পেল, কেন কোন প্রার্থী ভোট কম পেল- আলাপচারীতায় ওঠে আসে সে প্রসঙ্গও।

আবুল কাশেমের কথার ছন্দপতন হয় তরুণ এক যাত্রীর আগমনে। পরিপাটি নীল রঙের প্যান্টের সঙ্গে ফকফকা সাদা ফলোশার্ট। পায়ের জুতা, হাতের ঘড়ি, এমনকি চোখের সানগ্লাসটাও নজড়কাড়া। মনে হচ্ছে শহরের ছেলে। গ্রামের ছেলে হওয়াও অসম্ভব না। তরুণ যাত্রীটির গায়ের রঙ কালো। গ্রামের মানুষ হওয়ার পক্ষে এই একটা যুক্তিই আবুল কাশেমের মাথায় আসে।
‘হুমম, গ্রামের ছেলে হলেও নিশ্চিত সে শহরে থাকে’- অস্ফুট স্বরে বলে আবুল কাশেম। পাশে দাঁড়ানো মহিলা যাত্রী আবুল কাশেমের এই অস্ফুট কথা শুনলো কিনা বোঝা গেল না। তিনি আবুল কাশেমের পরিবার-পরিজনের খবর জানতে চান। আবুল কাশের এবার কিছুটা বিরক্ত হন।
একটু আগেই না বললাম, বছরখানেক আগে আমার স্ত্রী মারা গেছে। মেয়েটা হাইস্কুলে পড়ে। ছোট ছেলেরে বিয়া করাইছি। আর বড় ছেলের কথা কওয়ার কি আছে। কিছু তো মনে হয় তোমাদেও গ্রামের লোকজনও জানে।
মহিলা জানায়, তিনি এসবের কিছু জানে না।
আবুল কাশেম তার কথায় বিরক্ত হন। এই হঠাৎ বিরক্তির কারণ ধরতে পারেন না মহিলা। তিনি আস্তে করে দূরে সরে যান। তিনি পল্টুনের পশ্চিম পাশের বিশ্রামকক্ষে ঢুকে যাওয়া পর্যন্ত নদীর দিকে তাঁকিয়ে তাকেন আবুল কাশেম।

লোহার তৈরী পল্টুনে পায়ে হাঁটার শব্দে ঘাড় ঘুরিয়ে তাঁকিয়ে আবুল কাশেম দেখলেন সেই তরুণকে।  ডাঙা থেকে কাঁঠের সিঁিড় যে ভঙ্গিতে পল্টুনে উঠেছিল, সেই ভঙ্গিতে বিশ্রামাগার থেকে বেরিয়ে এসে কোমল পানীয়র একটা কেসের উপড় বসলো সে। সুতি রুমালে বারবার মুখ-ঘাড় মুছছে। প্রখর রোদে বিশ্রামাগারের ভেতরে রুটিবানানোর তাওয়ার মতো গরম। গরম সহ্য না হওয়ায় বাইরে বেরিয়ে এসেছে তরুন।

আবুল কাশেম এবার তরুণের দিকে ঘুরে বসেন। এ কথা-ও কথায় তরুণের পরিচয় জানেন। যা ভেবেছিলেন তাই। গ্রামের ছেলেই। তবে ছোটবেলা থেকে ঢাকায় থাকে। পড়াশোনা করতে শহরমুখী হয়েছিল। চাকরিসূত্রে শহরেই থাকতে হচ্ছে তাকে। মুগদা হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট তরুণটি এবার তিনদিনের ছুটিতে গ্রামে এসেছে।

কথায় কথায় ছেলেটাকে মনে ধরে যায় আবুল কাশেমের। নিজের ছেলেদের কথা মনে হয়। ওদের বয়স এই তরুণ থেকে বড়জোর ৫/৭ বছর বেশি হতে পারে। ছোট ছেলেটা ভাল। নষ্ট হয়ে গেছে বড়টা। নেশা করে। গাজা-মদ ছেড়ে আজকাল নাকি ইয়াবা ধরেছে। মাদকের খোঁজে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ছেড়ে আখাউড়া পর্যন্ত চলে যায়। ছেলেকে সুপথে ফেরাতে অনেক চেষ্টা করেছেন তিনি। কিন্তু সফল হন নি।

ক্ষমতাসীন দলের ইউনিয়ন পর্যায়ের এক নেতার প্রশ্রয়ে ছেলে তার আরো বেপরোয়া উঠেছে। পেনশনের টাকায় বড় সখ করে বড় ছেলেকে গ্রামের বাজারে দোকান করে দিয়েছিলেন। আনন্দ-উৎসাহের মধ্য দিয়ে বিয়ে করিয়েছেন লক্ষ্মী মেয়ে দেখে। আবুল কাশেম এখন অসহায় হয়ে দেখেন প্রিয় বৌ-মাকে দিনের পর দিন নির্যাতন করে যাচ্ছে নেশাগ্রস্থ ছেলে। শাসন করতে গিয়ে তিনি নিজেও দু’য়েকবার ছেলের হাতের মার খেয়েছেন। লজ্জায় কাউকে বলতেও পারেন নি সে কথা।
অবশ্য মানুষ এমনিতেও বুঝে গেছে অনেক কিছু। ঘটনা আবুল কাশেমের স্ত্রী বেঁচে থাকতে ঘটেছিল। অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসার প্রয়োজনে ঘরে থাকা একমাত্র বকনা গরুটা বিক্রি করার উদ্যোগ নেন তিনি। দামদর ঠিক হওয়ায় গরু নিতে বাড়িতে আসেন ব্যাপরী। তখনই ভয়ংকর চেহারা নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় নেশাগ্রস্থ বড় ছেলে।

‘খবরদার গরু বেচবা না। ভালা অইবো না কইয়া দিলাম।’ –ব্যাপারীর সামনেই চেচিয়ে ওঠে ছেলে।
আবুল কাশেম হতভম্ব হয়ে যান ছেলের এমন আচরণে। মুখের উপড় অপমান। এত বছরের কামানো মান-সম্মান এক নিমিষেই মাঠিতে মিশে যাচ্ছে। লোকজন জমে গেছে। পিতা-পুত্রের ঝগড়া দেখার খায়েশ। সব বুঝেও আবুল কাশেম দৃঢ় স্বরে বলেন, ‘আমার গরু আমি বেঁচুম তোর কি? তুই বের হ আমার বাড়ি থেকে।’
‘আমি বেরুমো ক্যান। তুই বের হ। এই বাড়ির কিছু বেচতে পারবি না তুই।’ –মুখের উপর তুই-তুকারি শুরু করে ছেলে।
আবুল কাশেমও জেদ দেখান, ‘অমানুষ, তুই পাইছিস কি? বের হ আমার বাড়ি থেকে। গরু না বেঁচলে তোর মা’র চিকিৎসা কি হাওয়ায় অইবো?’
‘মা-বাবা কিচ্ছু বুঝি না। সামনে আমার টেহা লাগবো। গরু বেঁচতে পারবি না। গরুর হাত দিলে খবর আছে।’
‘ কি করবি তুই? কি করবি তুই।’ চিৎকার কওে কথাগুলো বলতে বলতে গরুর দিকে এগিয়ে যান আবুল কাশেম।

ছেলেও এগিয়ে আসে গলা টিপে ধরতে। গলা টেপার আগেই উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেলেন দুইবার হার্ট অ্যাটাক করা আবুল কাশেম। মজা নিতে আসা লোকজনের মধ্যে কেউ কেউ পানি ঢেলে আবুল কাশেমকে সুস্থ করে তুলে। চোখ মেলে নেশাগ্রস্থ ছেলেকে বাড়িতে দেখেন নি তিনি। গরুর ব্যপারীর নাই। এরকম ঝামেলার মাল কে কেনে!
বছর দুয়েক ধরেই এমন দুঃসহ যন্ত্রনা বুকে নিয়ে বেঁচে আছেন আবুল কাশেম। মাঝখানে স্ত্রীও মারা গেছেন। অবাধ্য ছেলে দিনের পরদিন বাড়ি ফেরে না। যখন ফেওে টাকা পয়সা নিতেই ফেরে। টাকা না দিলেও তুলকালাম কান্ড ঘটিয়ে যায়। তিনি জানেন, ছেলে ক্ষমতাসীন নেতার চ্যালা হিসেবে সারাক্ষণ এখানে ওখানে যায়। প্রয়োজনের সময় মাদক কিনতেও যায়। শহরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ আছে। নেতার মোটর সাইকেল স্টার্ট দিলেই হলো। মাদকের অলিগলি তাদের চেনা। একবার নাকি ইয়াবাসহ পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিল। নেতাসহই ধরা পড়েছিল। অনেক টাকা ঢেলে সে যাত্রায় নিজের সম্মান বাঁচান নেতা।

ট্রলার চলে আসার পর নতুন পরিচয় হওয়া তরুণকে নিয়ে ওঠলেন আবুল কাশেম। ট্রলারের ছাদে ছাতা মাথায় বসে মেলে ধরেন নিজের দুঃখের ঢালী। নিজের হার্ট-অ্যাটাক, ক্যান্সারে স্ত্রীর মৃত্যু, ছেলের অত্যাচার সবকিছু সয়ে স্কুলপড়–য়া মেয়েটার ভবিষ্যৎ চিন্তা করে তাঁকে বাঁচতে হচ্ছে- এই সত্য প্রকাশ হয় বারবার।

আবুল কাশেমের দুঃখে তরুণের চেহারায়ও দুঃখ ফুটে ওঠে। সাধ্যমত স্বান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করে তরুণ। আবুল কাশেম ওষুধের ব্যাগ থেকে একটা কম্পিউটার কম্পোজ করা দরখাস্ত বের করেন। এই দরখাস্ত নিয়ে বেশ কয়েকবার থানার সামনে গেছেন তিনি। অবাধ্য ছেলের বিরুদ্ধে জিডি নিতে থানার ওসি বরাবর লেখা দরখাস্ত। কিন্তু প্রতিবারই থানায় না ঢুকে বাড়ি ফিরে এসেছেন আবুল কাশেম। নিজের ছেলের বিরুদ্ধে জিডি!
পুলিশ যদি সত্যিই ব্যবস্থা নেয়। ছেলেকে যদি জেলে যেতে হয়- কষ্টে আবুল কাশেমের বুক ফেটে যাবে। এই এক চিন্তাই আবুল কাশেমকে থানার সামনে থেকে ফিরে আসতে বাধ্য করে।

তুরুণের কথায় নতুন ভাবনার খোঁড়াক পান আবুল কাশেম। পায়ের দিকে তাঁকিয়ে বলেন, ‘দোয়া তো করিই বাবা। কিন্তু ছেল তো ঠিক হচ্ছে না।’
‘ধৈর্য্য হারাবেন না কাকা মিয়া। আল্লাহ একদিন অসহায় বাবার ডাক শুনবেনই।  আপনার সন্তান একদিন ভাল হবেই।’
‘তাই হোক বাবা। আপনারাও দোয়া কইরেন। জানেন আপনার মতো করে আরেক ভদ্রলোকও পরামর্শ দিয়েছিল আমাকে।’
‘কে?’
‘তাঁকে আপনি চিনবেন না। আমার স্ত্রী তখন হাসপাতালে। এদিকে ছেলের উচ্ছন্নে যাওয়া। সবমিলিয়ে আমার ভেতওে উতাল-পাতাল সমূদ্র। হাসপাতালেই পরিচয় হয় এক সম্মানী ব্যক্তির সঙ্গে। অসুস্থ অবস্থায়ও তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। ছেলের প্রসঙ্গে একদিন সব খুলে বললাম। আইনী আশ্রয় নেওয়ার চিন্তা করছি তাও জানালাম। তখন আমাকে বললেন, আল্লাহ নাকি আমাকে পরীক্ষা করছেন।’

‘হয়তো ঠিকই বলেছেন।’

‘হুমম। আমারও মাঝে মাঝে তাই মনে হয়। ছেলের অন্যায়-অপরাধে অসহ্য হয়ে কতকিছু করার কথাই ভাবি। কিন্তু নিরবে বসলে মনে হয়, আল্লাহ আমাকে যে পরীক্ষায় ফেলেছেন তা উতরে যেতে হবে।’

‘সেটাই কাকা। আপনি কার বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেবেন। ছেলের শাস্তি দেখে আপনারই তো খারাপ লাগবে।

তরুণের মুখে কথাটা শুনেই খপ করে ওর হাতটা ধরে ফেলেন আবুল কাশেম। তার চোখ ভিজে আসে। তিনি এবার বর্ণনা করেন কয়েক মাস আগে দেখা তার একটি স্বপ্নের কথা।

মাদকাসক্ত ছেলের কথা ভেবে কান্নাকাটি করে শেষরাতে ঘুমিয়েছেন আবুল কাশেম। সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পরদিন থানায় যাবেন। ছেলেকে এবার পুলিশে না দিলেই নয়। চোখটা একটু লেগে আসতেই তিনি স্বপ্নে দেখতে থাকেন।

গ্রামের সরদার-মাতব্বররা ছেলেকে বেঁধে পেটাচ্ছেন। মাদকাসক্তি ও পরিবারে শান্তি সৃষ্টির দায়ে সামাজিক বিচার। কিন্তু সরদার-মাতব্বরদের চেহারা চেনা যাচ্ছে না। মারের চোটে ছেলে চিৎকার করছে। বিচার দেখতে দলবেঁধে ছুটে এসেছে গ্রামের মানুষ। আবুল কাশেম দাঁতে-দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে আছেন। মারের চোটে ‘বাবা গো, বাবা গো’ বলে চিৎকার করছে। আবুল কাশেম আর স্থির থাকতে পারলেন না। দৌঁড়ে গিয়ে ছেলের উপড়ে পড়লেন।
আপনাদের আল্লাহর দোহায় লাগে। আমার ছেলেডারে আর মাইরেন না। ক্ষুব্ধ সরদাররা এবার আবুল কাশেমকে গালাগালি শুরু করেন।

ফজরের আজান হয়ে গেছে। প্রচন্ড পানির তৃষ্ণা নিয়ে ঘুম ভাঙ্গে আবুল কাশেমের। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, সকালে থানায় যাবেন না। ছেলেকে পুলিশে দেবেন না। চোখে জল নিয়ে মসজিদের দিকে ছুটেন।

ট্রলার এগিয়ে চলছে। সদ্য পরিচিত এক তরুণের হাত ধরে নিজের বুকের ভেতর চেপে রাখা কষ্ট উগড়ে দিয়ে চোখের পানি ফেলছেন আবুল কাশেম। শান্ত মেঘনার বুকে তখন মেঘছায়া পড়েছে।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: