সর্বশেষ আপডেট : ১৩ মিনিট ৫৫ সেকেন্ড আগে
শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

এক আধুনিক দাসত্বের গল্প

18983_103ডেইলি সিলেট ডেস্ক:
মধ্যযুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগেও যে দাসপ্রথার প্রচলন ছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে সব দেশেই। কিন্তু দাসত্ব নির্মূল হয়নি। এখনও অনেক দেশেই হাজার হাজার মানুষ দাসত্বের জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে এই দাসত্বের রূপ বদলেছে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তেমনই এক আধুনিক দাসত্বের গল্প। এই গল্পটি অস্ট্রেলিয়ার। গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন আধুনিক দাসে পরিণত হওয়া সুসান (ছদ্মনাম)। পূর্ব আফ্রিকায় একটি পরিবারের সঙ্গে পরিচারিকা হিসেবে ছিলেন তিনি। ওই পরিবারটি এক সময় চলে আসে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে। পরিবারটির সঙ্গে সুসানের জানাশোনা ছিল আগে থেকেই। তিনি সজ্জন, উদার, দয়ালু বলেই জ্ঞান করতেন ওই পরিবারের সদস্যদের। আর ওই পরিবার থেকে সুসানকে পর্যাপ্ত বেতন দেয়ারও অঙ্গিকার করা হয়। সুসান ভেবেছিলেন, এই অর্থ তার রেখে যাওয়া সন্তানদের লালন-পালনে যথেষ্টই সহায়ক হবে।

তিন সন্তানের মা সুসান তাই তাদের সঙ্গে সিডনির পথে পা বাড়াতে দ্বিধাবোধ করেননি। সুসান যেদিন সিডনি এসে পৌঁছান সেদিন তাপমাত্রা একটু বেশিই ছিল। বাতাসে আর্দ্রতাও ছিল বেশি। ফলে ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছিলেন তিনি। আর প্রথম দিনেই তার সঙ্গে করা আচরণ ভবিষ্যৎ নিয়ে অশুভ ইঙ্গিতই দিয়েছিল। প্রথম দিনেই তাকে শুতে বলা হয়েছিল ডাইনিং রুমে, টেবিলের নিচে এবং একটি কুকুরের সঙ্গে। সুসান অবাক হয়ে যান। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে এটা ছিল অমানবিক। একটি টেবিলের নিচে তারা আমাকে শোয়ার জন্য বলে। আমার সঙ্গে এর আগে কখনোই এমন অসম্মানমূলক ব্যবহার তারা করেনি।’ ক্রমেই যে তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ওই পরিবার নাক গলাতে শুরু করবে এবং তার নিয়ন্ত্রণ নিতে থাকবে, তখনও ভাবতে পারেননি সুসান। সুসানকে মূলত অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে আসা হয়েছিল অবৈধ উপায়ে। তিনি বলেন, ‘আমি প্রথমে বুঝতেই পারিনি আমাকে পাচার করে নিয়ে আসা হয়েছে।’ প্রকৃতপক্ষে তাকে বন্দি করেই রাখা হয়েছিল। ধীরে ধীরে তার কাছে পরিস্থিতি স্পষ্ট হতে শুরু করে।

তিনি বলেন, ‘একদিন তারা কেউ বাড়িতে ছিল না। আমি ভাবলাম বাইরে গিয়ে গাছগুলোতে পানি দিই। ঘর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করতেই দেখলাম বাইরে থেকে তালাবন্ধ। পরের দিনও একই ঘটনা ঘটলো।’ বেশ কয়েকদিন যাওয়ার পর তার বেতনের কথা তুললে আরো বাজে ব্যবহারের মুখে পড়েন তিনি। সুসান বলেন, ‘গৃহকর্ত্রী আমাকে বলছিল, তুমি আমাদের বাড়িতে থাকছো, আমাদের দেয়া খাবার খাচ্ছো এবং আমাদের বাথরুমই ব্যবহার করছো। কাজেই তুমি কোনো বেতন পাবে না।’ এমন অসহনীয় অবস্থায় দুই মাস কাটানোর পর আর সহ্য করতে পারেননি সুসান। একদিন রাতের বেলায় শেষ পর্যন্ত মারামারিতে লিপ্ত হন তিনি। পরে সবার অগোচরে একটি গেট খোলা পেয়ে তা দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে আসেন তিনি। তখন মধ্যরাত। দ্রুত পাশের একটি বাড়িতে গিয়ে সাহায্য চান সুসান। তিনি বলেন, ‘আমি তৎক্ষণাৎ পাশের বাড়ির বেল চাপতে থাকি। তখন মধ্যরাত। আমি খুব দ্রুত বেল চাপছিলাম। কারণ, কেউ হয়তো নিশ্চয় জানালা দিয়ে দেখেছে আমি পালিয়ে এসেছি।’ প্রতিবেশী বেলের শব্দ শুনে বেরিয়ে এলে তার কাছে সংক্ষেপে সবকিছু খুলে বলেন সুসান। তাকে বলেন পুলিশ ডাকতে। পুলিশও এলো। তখনও সুসান জানেন না তার আধুনিক দাসত্বের গল্প এখানেই শেষ নয়। এটা গল্পের নতুন এক মোড় মাত্র। সুসানের ঠাঁই মেলে স্যালভেশন আর্মির গড়ে তোলা একটি সেফ হাউজে। পাচার হওয়াদের জন্য এটাই অস্ট্রেলিয়ার প্রথম সেফ হাউজ। একটা সময় গিয়ে অস্ট্রেলিয়ার শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি পান তিনি।

কিন্তু নিজ দেশে ফিরতে পারেননি তিনি। সন্তানদেরও নিজের কাছে আনতে দীর্ঘ প্রক্রিয়া পাড়ি দিতে হয় তাকে। শেষ পর্যন্ত সন্তানদের যখন কাছে ফিরে পান, ততদিনে কয়েকটি বছর হারিয়ে গিয়েছে সুসানের জীবন থেকে। তারপরও সন্তানদের ফিরে পেয়ে উচ্ছ্বসিত তিনি। তার কাছে এটা অনেকটা ‘পুনর্জন্মে’র মতো। তিনি বলেন, ‘আমার মনে আছে আমি যখন চলে আসি, আমার ছেলে কাঁদছিল। সেটা আমার হৃদয়কে ভেঙেচুরে দিয়েছিল। কারণ, সে ছিল খুবই ছোট। এখন তো অনেকটাই বড় হয়েছে। আমার মেয়েও তখন ছোট ছিল। কিন্তু এখন সে একজন কিশোরী।’ যে পরিবারটি সুসানকে নিয়ে এসেছিল তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো নিয়ে কোনো মামলা দায়ের হয়নি। ফলে নিজের ওপর চালানো অত্যাচারের বিচারও পাননি সুসান। তারপরও সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে জীবন কাটাতে পারছেন, তাতেই সন্তুষ্ট তিনি। সুসানের মতোই দাসত্বের অভিযোগ নিয়ে খুব কমই মামলা দায়ের করা হয়। অস্ট্রেলিয়ার কর্মকর্তাদের বক্তব্য, এটা মানবাধিকারের লঙ্ঘন।

একই সঙ্গে এটা অত্যন্ত জটিল একটি অপরাধ। স্যালভেশন আর্মির একটি প্রকল্পের ম্যানেজার লরা ভিদাল বলেন, ‘বৈশ্বিক দাসত্ব সূচক জানিয়েছে, অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় তিন হাজার মানুষ দাসত্বের শিকার। এটা মানুষকে সম্পত্তিতে পরিণত করে।’ তিনি জানান, অনেক ক্ষেত্রেই দাসত্বের শিকার যারা তারা নিজেদের ওপর করা অত্যাচারের কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেন না। দাসত্বের শিকার অনেকেই এই বিষয়ে মুখও খুলতে চান না ভয়ে। ২০০৪ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত দাসত্ব বিষয়ক মাত্র ১৭টি ঘটনার বিচার হয়েছে অস্ট্রেলিয়ায়। তাদের বেশিরভাগই আবার দেহব্যবসায় জড়িত। দেশটিতে জোর করে শ্রম বা বিয়েকেও আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে তিন বছর হলো। অনেক খাতে দাসত্বের শিকার ব্যক্তিদের জন্য সহায়ক এই আইন।

কিন্তু তাতে বদলাচ্ছে না দৃশ্যপট। অ্যান্টি-স্লেভারি অস্ট্রেলিয়ার পরিচালক ও সিডনির ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির আইনের অধ্যাপক জেনিফার বার্ন বলেন, ‘দাসত্বের রূপ ও জোরপূর্বক শ্রমের ধরন স্পষ্টতই বদলাচ্ছে। ফেডারেল পুলিশের কাছ থেকে যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তাতে গত কয়েক বছরের বেশিরভাগ ঘটনাতেই দেখা গেছে, যৌন ব্যবসার বাইরের খাতগুলোতেই জোরপূর্বক শ্রমের ঘটনা বাড়ছে।’ দেশটিতে ২০০৩ সালেই মানব পাচারবিরোধী কৌশল নেয়া হয়েছে। ২০১৩ সালে জোরপূর্বক শ্রমবিষয়ক একটি আইনও প্রণয়ন করা হয়েছে; এতে দাসত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধকেও বিবেচনায় নেয়ার কথা বলা হয়েছে। অধিকার কর্মীরা বলছেন, এই আইনের যথাযথ প্রয়োগ দেশটিতে দাসত্বরোধে ভূমিকা রাখতে পারে।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: