সর্বশেষ আপডেট : ৫ মিনিট ১ সেকেন্ড আগে
সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

শিক্ষক হত্যা চেষ্টা : এরআগে নিখোঁজ হয়েছিল ফাহিম!

fahim Teacherমাদারীপুর সরকারি নাজিমউদ্দিন কলেজের গণিত বিভাগের প্রভাষক রিপন চক্রবর্তীকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় জনতার হাতে আটক গোলাম ফাইজুল্লাহ ফাহিম চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। রাজধানীর উত্তরা হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ফাহিমের শেষ পরীক্ষা ছিল গত ১২ জুন রসায়ন দ্বিতীয় পত্র।

১১ জুন সে দক্ষিণখানের ফায়েদাবাদ এলাকার বাসা থেকে বের হয় টঙ্গীতে এক বন্ধুর বাড়ি যাওয়ার কথা বলে। পরদিন পরীক্ষা থাকলেও সে নিখোঁজ হয়।

এ ঘটনায় ফাহিমের বাবা গোলাম ফারুক রাজধানীর দক্ষিণখান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। সেই ‘নিখোঁজ’ ফাহিম গত বুধবার প্রকাশ্যে এলো জঙ্গি কায়দায় শিক্ষককে খুন করতে গিয়ে ধরা পড়ে। দৈনিক কালের কণ্ঠে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিস্তারিত তথ্য।

রাজধানীর দক্ষিণখানের ফায়দাবাদের টিআইসি কলোনির ১২৯ নম্বর বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে থাকে ফাহিম। তার বাবা গোলাম ফারুক উত্তরার একটি গার্মেন্টের কর্মকর্তা। মা কামরুন্নাহার গৃহিণী। দুই ভাইবোনের মধ্যে ফাহিম বড়। তার ছোট বোন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। ১১ জুন ফাহিম নিখোঁজ হলে তার বাবা দক্ষিণখান থানায় জিডি করেন।

ফাহিমের বাবা গোলাম ফারুক বলেন, ‘আমরা অন্য একটি স্থানে আছি। অনেক চিন্তায় আছি। আমার ছেলে এভাবে নিখোঁজ হয়ে গেল আর কোথায় গিয়ে ধরা পড়ল! আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না।’ তিনি দাবি করেন, ‘ফাহিম মেধাবী ছাত্র। সে এসএসসিতেও এ প্লাস পেয়েছে। সে কোনো গ্রুপের সঙ্গে চলে—এমন কিছু আমরা আগে দেখিনি।;

বৃহস্পতিবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাসার এলাকা ও থানায় গিয়ে ফাহিমের জঙ্গি তৎপরতার প্রকাশ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তার হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এবং টার্গেট কিলিংয়ের চেষ্টার পর আটক হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে এসএসসিতে জিপিএ ৫ পাওয়া মেধাবী এ ছাত্রের চলাফেরা ছিল রহস্যজনক। চুপচাপ ধরনের ফাহিম এলাকায় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কারো সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশত না।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম গতকাল বলেন, ‘মাদারীপুরের ঘটনাটিতে ছদ্মবেশী জামায়াত-শিবিরের সংশ্লিষ্টতা আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জেএমবি, এবিটিও এভাবে কাজ করে। তারা স্থান পরিবর্তন করে হামলা করছে। আমরা এসব বিষয় খতিয়ে দেখছি।’

জানা গেছে, রাজধানীর দক্ষিণখানের ফায়দাবাদের টিআইসি কলোনির ১২৯ নম্বর বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে থাকে ফাহিম। তার বাবা গোলাম ফারুক উত্তরার একটি গার্মেন্টের কর্মকর্তা। মা কামরুন্নাহার গৃহিণী। দুই ভাইবোনের মধ্যে ফাহিম বড়। তার ছোট বোন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। ১১ জুন ফাহিম নিখোঁজ হলে তার বাবা দক্ষিণখান থানায় জিডি করেন। ওই জিডির তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১১ তারিখে তার বাবা জিডি করেন। আমরা বেতার বার্তার মাধ্যমে তা সারা দেশে জানিয়ে দিই। কিন্তু আমরা তার নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারে কিছুই জানতে পারিনি। পরে জানতে পারি মাদারীপুরে সে আটক হয়েছে।’

গতকাল ফায়েদাবাদের টিআইসি কলোনিতে গিয়ে দেখা গেছে, পাঁচতলা ১২৯ নম্বর ভবনের দ্বিতীয় তলায় থাকে ফাহিমের পরিবার। বাসার কলিং বেল টিপেও কারো সাড়া মিলল না। এক প্রতিবেশী জানান, গতকাল দুপুরে ডিবি পুলিশ এসে ফাহিমের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গেছে। এ সময় বাসা থেকে একটি কম্পিউটারও জব্দ করা হয়েছে। ফাহিমের বাবা গোলাম ফারুকের মোবাইল ফোনে কল করলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা অন্য একটি স্থানে আছি। অনেক চিন্তায় আছি। আমার ছেলে এভাবে নিখোঁজ হয়ে গেল আর কোথায় গিয়ে ধরা পড়ল! আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না।’ তিনি দাবি করেন, ‘ফাহিম মেধাবী ছাত্র। সে এসএসসিতেও এ প্লাস পেয়েছে। সে কোনো গ্রুপের সঙ্গে চলে—এমন কিছু আমরা আগে দেখিনি।’

ফাহিমরা যে বাড়িতে থাকে সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো আছে। তবে বাড়ির কেউ ফাহিমের গতিবিধির ব্যাপারে কথা বলতে চাইছে না। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রতিবেশী বলেন, ‘ফাহিমের চলাফেরা রহস্যজনক ছিল। সে এলাকায় কারো সঙ্গে তেমন কথাই বলত না।’ ওই প্রতিবেশী আরো বলেন, ‘নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর শুনেছি ফাহিম নাকি তার বাবার কাছে মেসেজ পাঠিয়ে বলেছে সে বিদেশ চলে যাচ্ছে।’ ওই বাড়ির মালিকের আত্মীয়ও পাঁচ তলার বাসিন্দা মো. রিপন বলেন, ‘দেড় বছর ধরে ওই ফ্যামেলি এখানে আছে। তাদের ব্যাপারে আমি তেমন কিছুই জানি না।’

উত্তরা হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে গিয়ে জানা গেছে, ১১ জুন নিখোঁজ হওয়ার আগে ফাহিম কলেজে নিয়মিতই ছিল। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই পড়ে ফাহিম। সেখানে দু-চারজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছে তার। তবে ক্যাম্পাসেও ভদ্র ছেলে বলেই তাকে জানে সবাই। শ্রেণি শিক্ষক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক আফরিন আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওর খারাপ কিছু কখনোই দেখিনি। কথাও কম বলত। রসায়ন দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষার আগে ওর মা ফোন করে জানান ওকে পাওয়া যাচ্ছে না। পরদিন পরীক্ষার হলে খোঁজ নিয়ে দেখলাম নেই। এরপর ব্যবহারিক পরীক্ষাও অংশ নেয়নি। ফাহিম ছাড়া সব ছাত্রই পরীক্ষা দিয়েছে।’

দক্ষিণখান থানার ওসি লুৎফর রহমান বলেন, ‘আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি এলাকায় সে কারো সঙ্গে মিশত না। তার নিখোঁজ হওয়ার পর আমরা খোঁজ নিয়ে কোনো সূত্র পাইনি।’

এদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, ফাহিমকে নিয়ে মাদারীপুর পুলিশের একটি দল গতকাল ভোরে ঢাকায় আসে। এরপর কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও ডিবি পুলিশের দল তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। ফাহিমের তথ্যের ভিত্তিতে সহযোগীদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। এদিকে তথ্য সংগ্রহ করতে মাঠে নেমেছে র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থাও।

মাদারীপুরে মানববন্ধন-বিক্ষোভ, নিরাপত্তা দাবি : ‘শিক্ষক রিপন চক্রবর্তীর ওপর বর্বর সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই’ শিরোনামে গতকাল সকাল ১১টার দিকে মাদারীপুর-শরীয়তপুর আঞ্চলিক সড়কের কলেজ গেটের সামনে সরকারি নাজিমউদ্দিন কলেজের শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী, কর্মচারীসহ সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়।

ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধনে বক্তব্য দেন কলেজের অধ্যক্ষ হিতেন চন্দ্র মণ্ডল, জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান রুবেল খান, ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর মাহমুদসহ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

একই সময় মাদারীপুর-শরীয়তপুর আঞ্চলিক সড়কের মাদারীপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ মাদারীপুর জেলা শাখার আয়োজনে শিক্ষকের ওপর হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও দ্রুত বিচারের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়।

মাদারীপুর জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান রুবেল খান বলেন, মাদারীপুরে জঙ্গি হামলা মেনে নেওয়া যায় না। জঙ্গিরা পরিকল্পিতভাবে এ হামলা করেছে। জামায়াত-শিবির একের পর এক শিক্ষকদের ওপর হামলা করছে। জামায়াত-শিবির পরিকল্পিতভাবে শিক্ষকদের ওপর হামলা চালিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে।

সরকারি নাজিমউদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ হিতেন চন্দ্র মণ্ডল জানান, শিক্ষকদের ওপর একের পর এক হামলা হচ্ছে। এবার মাদারীপুরে হলো। তবে দেশের বেশ কয়েক জায়গায় হামলা হলেও কোথাও অপরাধীকে হাতেনাতে আটক করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু মাদারীপুরে একজন অপরাধীকে হাতেনাতে আটক করা সম্ভব হয়েছে। তিনি আরো জানান, গতকাল কলেজের শিক্ষকরা এক জরুরি সভায় মিলিত হন। সেখান থেকে তাঁরা জেলা পুলিশ সুপারের সঙ্গে দেখা করে নিরাপত্তা চেয়ে একটি আবেদন করেন।

অন্যদিকে ফাহিমকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া এবং জিজ্ঞাসাবাদের ব্যাপারে মাদারীপুরের কোনো পুলিশ কর্মকর্তা কথা বলতে রাজি হননি। মাদারীপুরের সার্কেল এসপি মো. মনিরুজ্জামান ফকির জানান, এখন অভিযান চলছে।

ফাহিমের চাচাকে জিজ্ঞাসাবাদ : আটককৃত ফাহিমের পৈতৃক বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার দ্বারিয়াপুরে। এ ঘটনায় তার চাচা এমদাদুল হককে গতকাল স্থানীয় থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। জানা গেছে, ফাহিমের পৈতৃক নিবাস দ্বারিয়াপুর হলেও তার ও তার পরিবারের কারো সঙ্গে এলাকার তেমন যোগাযোগ ছিল না। তার বাবা গোলাম ফারুক দুই দশকেরও বেশি সময় আগে কক্সবাজারে বিয়ে করার পর থেকে ঢাকায় বসবাস করেন। গোলাম ফারুকদের ছয় ভাইয়ের মধ্যে এক ভাই মারা গেছেন। শুধু একটা ভাই এমদাদুল হক পৈতৃক বাড়িতে থাকেন। অন্যরা কেউ চাঁপাইনবাবগঞ্জে থাকেন না। ঈদের সময় বা আত্মীয়স্বজন মারা গেলে মাঝেমধ্যে তাঁরা দ্বারিয়াপুরে আসতেন।

দ্বারিয়াপুর গ্রামের বাসিন্দা ও বিআরডিবির চেয়ারম্যান শাহজাহান আলী বলেন, ‘ছেলেটার (ফাহিমের) বাবা বিয়ে করার পর থেকেই ঢাকায় থাকেন। কালেভদ্রে বাড়ি আসতেন। ছেলেটি জন্মেছে ঢাকায়। এলাকার মানুষও তাকে সেভাবে চেনে না’। তিনি বলেন, ‘ফাহিমের বাবা-চাচারা কোন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, এমনটা জানা নেই। প্রকাশ্য কোনো রাজনীতির সঙ্গে দেখা যায়নি।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার বশির আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাড়ির সঙ্গে ফাহিম বা তার পরিবারের যোগাযোগ ছিল না। এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় স্থানীয় অন্য কারো জড়িত থাকার বিষয়টি পাওয়া যায়নি। তবে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: