সর্বশেষ আপডেট : ১৯ মিনিট ৫৯ সেকেন্ড আগে
মঙ্গলবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ৪ আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ভোলাগঞ্জ কোয়ারিতে পাঁচ বছরে ৮ খুন

30ডেইলি সিলেট ডেস্ক:
দেশের বৃহৎ পাথরের কোয়ারি কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ কোয়ারিতে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিগত পাঁচ বছরে আটটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। একটি হত্যাকান্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই ঘটছে আরেকটি খুন। পাথর কোয়ারি কেন্দ্রিক খুনের তালিকায় এবার যুক্ত হলেন ঢোলাখাল গ্রামের পাথর ব্যবসায়ী ফয়সল আহমদ (৩২)।

গত বুধবার সকাল ৯টার দিকে ভোলাগঞ্জ কাস্টমস্ ঘাট এলাকায় প্রতিপক্ষের হামলায় আহত হন ফয়সল। আশঙ্কাজনক অবস্থায় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর তার মৃত্যু হয়। নিহত ফয়সল ঢোলাখাল গ্রামের তোতা মিয়ার পুত্র। এ নিয়ে গত পাঁচ বছরে ভোলাগঞ্জ কোয়ারিতে ৮টি খুনের ঘটনা ঘটলো।

এদিকে, ফয়ছল খুনের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা হলো- ভোলাগঞ্জের আফতাব আলীর পুত্র আফজাল হোসেন (২০), মৃত আব্দুল হান্নানের পুত্র মজনু (২২) ও নুরুল ইসলামের পুত্র মোহাম্মদ আলী (২২)।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় লোকজন এবং পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোলাগঞ্জ কোয়ারির ভূমির কমিশন নিয়ে ফয়সল ও ভোলাগঞ্জের দুলা মেম্বারের লোকজনের বিরোধ ছিল। গত বুধবার এ নিয়ে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে ফয়সলকে মারধর করে দুলা মেম্বারের লোকজন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর তার মৃত্যু হয়। তবে, যোগাযোগ করা হলে খুনের সাথে নিজের এবং তার কেউ জড়িত নয় বলে দাবি করেন দুলা মেম্বার। এদিকে ফয়সলের আত্মীয় ও পাড়ুয়া গ্রামের বিলাল আহমদ জানান, ফয়সল আমার সমন্ধির ছেলে। সে একজন ব্যবসায়ী। বুধবার ট্রাক্টর নিয়ে কোয়ারি থেকে মাল (পাথর) আনতে গেলে কমিশন (কোয়ারীর জায়গার) দাবি করে দুলা মেম্বারের লোকজন। এ সময় টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফয়সলকে মারধর শুরু করে তারা। সানুর আলী (৩২) নামের একজন ছাতা দিয়ে ফয়সলের পেটে উপর্যুপরি ঘা মারে বলেও জানান বিলাল।

স্থানীয় কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি একদল পাথরখেকো সিন্ডিকেট ধলাই সেতু ঘেঁষে ‘নিষিদ্ধ’ বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন শুরু করে। এ বোমা সিন্ডিকেট বোমা মালিকদের কাছ থেকে প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকা কমিশন (চাঁদা) আদায় করে। উত্তোলিত এ সব চাঁদার টাকা ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে তারা প্রায়ই ঝগড়াবিবাদে জড়িয়ে পড়ে। এর সূত্র ধরেই গত বছরের ৩১ অক্টোবর কলেজ ছাত্র শামীম আহমদ ছোটন হত্যাকান্ড ঘটে। এর মাত্র ৮ মাসের মাথায় একই এলাকায় আবারও খুনের ঘটনা ঘটলো। নিহত ফয়সল ৭ ভাই-বোনের মধ্যে ছিলেন সবার বড় এবং একমাত্র উপার্জনক্ষম।

কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি বায়েছ আলম জানান, ভোলাগঞ্জে সংঘর্ষের খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায় এবং ঘটনাস্থল থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি জানান, সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজে ফয়সলের লাশ ময়না তদন্তের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। ফয়সল হত্যাকান্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন ওসি। নিহতের স্বজন এখলাছুর রহমান মেম্বার জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় ফয়সলের ময়না তদন্ত সম্পন্ন হয়।

কোয়ারি নিয়ে এ পর্যন্ত ৮ খুন : ভোলাগঞ্জ কোয়ারিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ৫/৬টি বাহিনী গত কয়েক বছর ধরে একে অন্যের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে আসছে। গত ৪/৫ বছরে আধিপত্য বিস্তার ও কোয়ারির টাকা ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে ৮টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ঘটনার শিকার হলেন ঢোলাখাল গ্রামের ফয়সল। ২০১৩ সালের ১১ নভেম্বর আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষে নুরুল আমিন ও হরমুজ আলী নামের দুই ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ২০১২ সালে কোয়ারি সংলগ্ন দয়ারবাজারের আরেক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা জৈন উদ্দিন খুন হন। কোয়ারিতে আধিপত্য বিস্তার নিয়েই তেলিখাল ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আলফু মিয়ার ছোট ভাই জলফু মিয়া খুন হন। ২০১৪ সালের ২৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা যুবলীগ নেতা ও ব্যবসায়ী আবদুল আলী। গত বছরের ৩১ অক্টোবর কলাবাড়ীর সাহাবুদ্দিন গ্রুপের হাতে খুন হন কলেজ ছাত্র শামীম আহমদ ছোটন। ঘটনার একদিন পর এ ঘটনায় আহত আবুল মিয়া (৫০) নামে আরো একজন মারা যান। তবে, পুলিশ এটিকে স্বাভাবিক মৃত্যু বলে চালিয়ে দেয়। এর বাইরেও আরো অনেক খুনোখুনির ঘটনা ঘটেছে।

ভোলাগঞ্জে ছোটন হত্যার একদিনের মাথায় দুলাইন বিলে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রতিপক্ষের গুলিতে মারা যান বতুমারা গ্রামের আব্দুল খালিক (৫০) ও বিলের চৌকিদার সালদিঘি গ্রামের শেখ ফরিদ (৫৫)। গত বছরের ২৮ আগস্ট পাওনা টাকা চাওয়ায় বিনাম হোসেন নামে এক কিশোরকে নির্মমভাবে খুন করা হয়। এর কিছুদিন পর উপজেলার রাজনগর গ্রামের দুলাল মিয়া নামে আকিজ গ্রুপের এক বিক্রয় প্রতিনিধিকে হত্যা করা হয়। এসব ঘটনার বাইরেও গত কয়েক বছরে আরো বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে সেখানে। নৃশংস এসব খুনের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। দু-একটি ঘটনায় খুনিদের কেউ কেউ গ্রেপ্তার হলেও অধরাই থাকছে নেপথ্যে থাকা লোকজন। প্রতিটি ঘটনা ঘটার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর হয়ে ওঠে। গ্রেপ্তার হয় কিছু আসামিও। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এসব ঘটনা চাপা পড়ে যায়। একটি ঘটনার সুরাহা হতে না হতেই ঘটে আরেকটি ঘটনা। আর এভাবেই বেড়ে চলেছে খুনের মিছিল। সেই ক্রমবর্ধমান খুনের তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হলো ফয়সল।

স্থানীয়দের ধারণা, ভোলাগঞ্জ কোয়ারিকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন গ্রুপের সৃষ্টি হচ্ছে এবং তারা দিনদিন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আগে বিভিন্ন বাহিনী পাথর কোয়ারি নিয়ে তৎপরতা চালালেও নতুন সৃষ্ট বাহিনীগুলো উপজেলায় ডাকাতি, ছিনতাই, লুটপাট, চাঁদাবাজি ও মাদক চোরাচালানসহ বিভিন্ন ধরণের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

স্থানীয় একাধিক সূত্রের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ভোলাগঞ্জে প্রতিদিন চলে লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজি। মৌসুম (পাথর উত্তোলনের সিজন) শুরু হলেই এই চাঁদাবাজির পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। যে যার মতো ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এই চাঁদাবাজি করে। কোয়ারির গর্তের মালিক-শ্রমিকেরাও বাধ্য হন চাঁদা দিতে। প্রকাশ্যে এমন চাঁদাবাজি চললেও যেন দেখার কেউ নেই। বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি ভোলাগঞ্জ ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে।

এদিকে, কিছুদিন বিরতি দিয়ে কোম্পানীগঞ্জে মানুষের লাশ পড়লেও কোনো হত্যাকান্ডেরই চূড়ান্ত বিচার ও মামলাগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। কোনো মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বদল হয়, কোনোটির চার্জশিট প্রদান, আবার কোনোটির তাও হয় না। অধিকাংশ মামলার আসামীই জামিনে মুক্ত। অনেকে খুন করেও প্রকাশ্যে দিব্যি ঘুরে বেড়ায়। আবার অনেক ঘটনারই প্রকৃত অপরাধীরা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

তবে দোষীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলেও তাদের শাস্তির অপেক্ষায় প্রহর গুণেন নিহতদের স্বজন। খুনিদের শাস্তির জন্য নিশ্চয়ই অপেক্ষা করবেন ফয়সলের বাবা তোতা মিয়াও। যেমন স্বামী হারিয়ে হালিমা বেগমের আকুতি ‘আমি কী হারিয়েছি-তা শুধু আমিই জানি।’

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: