সর্বশেষ আপডেট : ২৩ মিনিট ৫৪ সেকেন্ড আগে
বুধবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

‘এমন জঘণ্য হত্যাকাণ্ড ইতিহাসে নগণ্য’

145064_1ডেইলি সিলেট ডেস্ক: আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক এমপি আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলায় বিএনপি নেতা নুরল ইসলাম সরকারসহ ছয় জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে হাইকোর্ট।

এছাড়া আরো সাতজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। রায়ে হাইকোর্ট ১৩ জনকে বেকসুর খালাস দিয়েছে।

আহসান উল্লাহ মাস্টার ছিলেন তৎকালীন গাজীপুরের জনপ্রিয় একজন নেতা। তার হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে জাতি একজন মেধাবী নেতাকে হারিয়েছে।

আদালত রায় পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, ‘এই হত্যাকাণ্ড ইতিহসের জঘণ্যতম ঘটনা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন হত্যাকাণ্ড খুব কমই ঘটেছে।’

আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যাকাণ্ড কীভাবে সংঘটিত হয়েছিল?

আহসানউল্লাহ মাস্টার হত্যাকাণ্ড নিঃসন্দেহে একটি জঘন্যতম ঘটনা। এ ধরনের হত্যাকাণ্ড অতীতে খুব কমই ঘটেছে। এ হত্যার মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয় রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বুধবার এ হত্যাকাণ্ডের করা মামলার আপিলের রায়ে হাইকোর্ট এই পর্যবেক্ষন দেন।

আদালত বলেন, যে হত্যাকাণ্ডটিকে কেন্দ্র করে এই ডেথ রেফারেন্স আমাদের কাছে পাঠানো হয়েছে নিঃসন্দেহে এটি জঘন্যতম ঘটনা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড খুব কমই সংঘটিত হয়েছে। রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে তা টংগীর নোয়াগাঁও এম এ মজিদ স্কুলে সংঘটিত ঘটনা প্রবাহ থেকে সম্যক উপলব্ধি করা যায়।’

বুধবার বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। রায়টি লিখেছেন বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ।

দুপুর একটায় রায় পড়া শুরু হয়। শুরুতে কিছু অবজারভেশন দেন বেঞ্চের সিনিয়র বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। এরপর রায়ের অপারেটিভ অংশ পড়ে শুনান অপর বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ।

আদালত বলে, নুরুল ইসলাম সরকারের সঙ্গে তখনকার সময়ের সদ্য ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন এবং আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা জনাব মাহফুজুর রহামন মহলের সঙ্গে যতোটুকু রাজনৈতিক বৈরিতা ছিল তার চেয়েও বেশি ছিল অর্থনৈতিক সংঘাত।

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে দেখা যায়, উভয়ের মধ্যে স্থানীয়ভাবে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের একটি প্রতিযোগিতা চলছিল। মহলের রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগ ক্ষমতাচ্যুত হলেও যেহেতু নুরুল ইসলাম সরকারের বিচ্ছিন্ন মাদক ব্যবসায় বাধা সৃষ্টি করেছিলেন, সেহেতু নুরুল ইসলাম সরকার ও সঙ্গীগণ মহলকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন।

আহসান উল্লাহ মাস্টারকে পরিকল্পিতভাবেই হত্যা করা হয়েছে উল্লেখ করে আদালত বলেন, এটা পরিস্কার অভিযুক্তরা সভাটি করছিলেন তখনই তারা জানতেন নিকট ভবিষ্যতে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে এবং সেখানে মাহফুজুর রহমান মহলসহ অনেকেই আসবেন এবং মহলকে সেখানেই হত্যা করা হবে।

এটি বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এরকম সম্মেলনে স্থানীয় সংসদ সদস্য আহসান উল্লাহ মাস্টারসহ আরো নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকবেন এটি ষড়যন্ত্রকারীরা ভালোভাবেই জানতেন।

আদালত আরো বলেন, ওই জনসভায় যেখানে আহসান উল্লাহ মাস্টার এমপিসহ টঙ্গী পৌরসভার মেয়র ও অন্যান্য আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দসহ শত শত আওয়ামীলীগ দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ উপস্থিত থাকবেন তা জেনেও সাজাপ্রাপ্ত অভিযুক্তরা মাহফুজুর রহমান মহলকে মারার জন্য ঐ স্থানটিকেই কেন বেছে নেয়। কারণ সাজাপ্রাপ্ত অভিযুক্তগণের মধ্যে কোনো দ্বিধা কাজ করেনি যে এই সভায় বিক্ষিপ্তভাবে গোলাগুলি করলে প্রচুর লোক মারা যেতে পারে। এমনকি তারা প্রকাশ্য দিবালোকে সংগঠিত এই ঘটনার সময় কোনোরকম মুখাবরণ (মাস্ক) পর্যন্ত ব্যবহার করেননি।

এর কারণ হিসেবে আদালত উল্লেখ করেন তারা এতোটাই বেপরোয়া ছিলেন এবং ভেবেছিলেন যে তাদের চেহারা অনাবৃত থাকার কারণে কেউ যদি তাদেরকে চিনেও ফেলে তথাপিও তাদের কিছু হবে না। তাদের এই ধরনের ভাবনার কারণ হল তাদের পেছনে এমন একটি শক্তি রয়েছে যে বা যারা তাদেরকে সকল প্রকার ভবিষ্যত সম্ভাব্য ঝামলা থেকে রক্ষা করার শক্তি রাখেন।

স্থানীয় বেপরোয়া উশৃঙ্খল রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা এ ধরনের চিন্তা করতে পারে। কারণ আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ ধরনের উশৃঙ্খল কর্মীদেরকে পরিহার করার প্রবণতা দেখা যায় না এবং অনেকাংশে তারা এদের উপর নির্ভরশীল, যা কিনা দেশে সুষ্ঠু রাজনীতি বিকাশের ক্ষেত্রে এক বিরাট অন্তরায়।

সুষ্ঠু রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ না ঘটলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। মুখ থুবড়ে পড়বে গণতন্ত্র।

প্রকাশ্য জনসভায় এ ধরনের হত্যাকাণ্ডকে মাস কিলিং উল্লেখ করে আদালত বলেন, যে স্থানে ও যেভাবে এই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে এইরুপ হত্যাকাণ্ডকে এক কথায় বলা চলে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড বা মাসকিলিং।

যেখানে কোনো অপরাধমূলক কার্যক্রম দ্বারা হত্যার উদ্দেশ্যে এক নিরস্ত্র বা বৃহৎ সমাবেশে আক্রমন করা হয় এবং যেখানে অসংখ্য লোক নিহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যদি সেখানে একজন লোকও নিহত হন এই ধরনের হত্যাকাণ্ডকে বলা যায় ব্যাপক হত্যাকাণ্ড বা মাস কিলিং।

আহসান উল্লাহ মাস্টারকে আদর্শবান রাজনৈতিক উল্লেখ করে আদালত বলেন, আহসান উল্লাহ মাস্টার জীবনের শুরুতে ছিলেন একজন শিক্ষক পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষক এবং নির্বাচিত প্রতিনিধি। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং সবশেষ জাতীয় সংসদের একজন সদস্য হিসেবে একাধিকবার নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন দলমত নির্বিশেষে সকলের শ্রদ্ধাভাজন।

তার হত্যাকাণ্ডে পরিবার ও জনগণ তার সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে আদালত উল্লেখ করেন।

আদালত বলেন, ‘আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যার মধ্য দিয়ে তার স্ত্রীকে স্বামীর ভালোবাসা ও পুত্র সন্তানদেরকে পিতার স্নেহ প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করা হল। নিহত ওমর ফারুক রতনকে হত্যার মধ্য দিয়ে হত্যা করার হল একটি নিস্পাপ তরুণকে। আহসান উল্লাহ মাস্টারের মতো একজন আদর্শবান সংসদ সদস্য হিসেবে বেচে থাকলে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে জনগণের কল্যাণে তিনি আরো অনেক ভাল কাজ করতে পারেতন যা থেকে জাতি উপকৃত হতো।’

দীর্ঘদিন পর হওয়া এই রায়ের ব্যাপারে আদালত বলেন, আজ আহসান উল্লাহ মাস্টারের স্ত্রী, পুত্র, কন্যাগণ এই হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার যেমন চান। অন্যদিকে ২০০৫ সালের এপ্রিল দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ কর্তৃক রায় প্রদান করার দিন থেকে বা তার পর থেকে যারা কারাগারে আছেন তারাও ন্যায়বিচারপ্রার্থী। প্রত্যেক সাজাপ্রাপ্ত অভিযুক্তের ঘটনার সহিত তার সম্পৃক্ততা সাক্ষ্য পর্যালোচান করে অপরাধের গভীরতা ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ে বিবেচনা নিয়ে আমরা এই রায় প্রদান করলাম।

আসামিদের সাজা প্রদানের ভিত্তি সম্পর্কে আদালত বলেন, এই মামলায় অভিযুক্তদের সাজা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট বিবেচনা এবং প্রয়োজনীয় উপাদান হিসেবে অভিযুক্ত ব্রক্তিগণের সামাজিক অবস্থান, ঘটনার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা এবং সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও আনুষঙ্গিক সংশ্লিষ্টবিষয়াদী বিবেচনায় নিয়ে মাননীয় বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ যে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছেন এর সাথেও আমি সম্পূর্ণ একমত পোষণ করছি।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: