সর্বশেষ আপডেট : ৪২ মিনিট ৩৮ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

রোজার পরেই ‘ফিতরা’ গুরুত্বপূর্ণ; ইসলামের দৃষ্টিতে এর প্রয়োজনীয়তা

fitraew ডেইলি সিলেট ডটকম :: ফিতরা বা ফেতরা (فطرة) আরবী শব্দ, যা ইসলামে যাকাতুল ফিতর (ফিতরের যাকাত) বা সাদাকাতুল ফিতর (ফিতরের সদকা) নামে পরিচিত। ফিতর বা ফাতুর বলতে খাদ্যদ্রব্য বোঝানো হয় যা দ্বারা রোজাদারগণ রোজা ভঙ্গ করেন। যাকাতুল ফিতর বলা হয় ঈদুল ফিতর উপলক্ষে গরীব দুঃস্থদের মাঝে রোজাদারদের বিতরণ করা দানকে। রোজা বা উপবাস পালনের পর সন্ধ্যায় ইফতার বা খাদ্য গ্রহন করা হয়। সেজন্য রমজান মাস শেষে এই দানকে যাকাতুল ফিতর বা আহারের যাকাত বলা হয়।

নারী-পুরুষ, স্বাধীন-পরাধীন, শিশু-বৃদ্ধ, ছোট-বড় সকল মুসলিমের জন্য ফিতরা প্রদান করা ওয়াজিব। ইবনে উমর (রাঃ) থেকে জানা যায়ঃ
فرض رسول الله صلى الله عليه وسلم- زكاة الفطر صاعاً من تمر أو صاعاً من شعير، على الذكر والأنثى والصغير والكبير والحر والعبد من المسلمين، وأمر أن تؤدى قبل خروج الناس للصلاة” متفق عليه “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেক স্বাধীন-ক্রিতদাস, নারী-পুরুষ, ছোট-বড় মুসলমানের যাকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন এক ‘সা’ পরিমাণ খেজুর বা যব। তিনি লোকদেরকে ঈদের নামাযে বের হওয়ার পূর্বেই তা আদায় করার আদেশ দিয়েছেন।”

কে ফিতরা দেবে এবং কে পাবেঃ- ইসলাম ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব। ফিতরা দেয়ার সামর্থ্য আছে (একদিন ও এক রাতের খাদ্যের অতিরিক্ত পরিমাণ সম্পদ থাকলে) এরকম প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিজের ও পরিবারের সমস্ত সদস্যদের পক্ষ থেকে ফিতরা প্রদান করা ফরজ, যাদের লালন-পালনের দায়িত্ব শরীয়ত কর্তৃক তার উপরে অর্পিত হয়েছে। নাবালক ছেলেমেয়ের পক্ষ থেকে তাদের বাবাকে এই ফিতরা দিতে হয়। আর তা দিতে হয় ঈদুল ফিতরের নামাজের আগেই। যার নিকট এক দুই বেলার খাবার ব্যতীত অন্য কিছু অবশিষ্ট নেই তার ফিতরা দেওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। সাধারন ভাবে গরীব, দুঃস্থ, অসহায় ও অভাবগ্রস্থ ব্যক্তিকে ফিতরা প্রদান করা যাবে। উল্লেখ্য যে, নিজের বেতনভুক্ত কাজের ব্যক্তি বা কর্মচারির পক্ষে ফিতরা প্রদান করা মালিকের উপর আবশ্যক নয়। তবে মালিক ইচ্ছে করলে নিজের কাজের লোককে ফিতরা প্রদান করতে পারবেন। তবে এক্ষেত্রে তিনি বেতন বা পারিশ্রমিক হিসেবে ফিতরা প্রদান করতে পারবেন না।

যা দিয়ে ফিতরা দেয়া যাবেঃ- আবু সাঈদ খুদরী (রাযিঃ) বলেন: “আমরা-নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে যাকাতুল ফিতর বের করতাম এক সা খাদ্য দ্রব্য কিংবা এক সা যব কিংবা এক সা খেজুর কিংবা এক সা পনীর কিংবা এক সা কিশমিশ এর মাধ্যমে”। এই হাদীসে খেজুর ও যব ছাড়া আরও যে কয়েকটি বস্তুর নাম পাওয়া গেল তা হল; কিশমিশ, পনীর এবং খাদ্য দ্রব্য। উল্লেখ থাকে যে, নবীজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর ইন্তেকালের পরে হযরত মুআবীয়া (রাযিঃ)-এর খেলাফতে অনেকে গম দ্বারাও ফিতরা আদায় করতেন। সাহাবী আবু সাঈদ খুদরী (রাযিঃ) এর বর্ণিত হাদিস থেকে খাদ্য দ্রব্য দিয়ে ফিতরা প্রদানের কথাও জানা যায়। যেহেতু চাল বাংলাদেশ সহ ভারতীয় উপমহাদেশের প্রধান খাদ্য, সেহেতু চাল দিয়েও ফিতরা প্রদান করা যাবে। চালের বদলে ধান দিয়ে ফিতরা দিতে হলে, ওজনের ব্যাপারটা সবথেকে বেশি মাথায় রাখতে হবে। কারণ এক সা ধান কখনো এক সা চালের সম মূল্যের হবে না। কুরআন থেকে জানা যায়ঃ
و لا تيمموا الخبيث منه تنفقون و لستم بآخذيه إلآ أن تغمضوا فيه “তোমরা খাদ্যের খবিস (নিকৃষ্ট) অংশ দ্বারা আল্লাহর পথে খরচ করার সংকল্প করিও না। অথচ তোমরা স্বয়ং উহা গ্রহণ করিতে প্রস্তুত নও।”

তবে ধানের থেকে চাল দিয়ে ফিতরা প্রদান করা উত্তম। নিম্নোক্ত কিয়াস থেকে এই ব্যাপারে ধারণা পাওয়া যায়ঃ যবের উপর কেয়াস (অনুমান) খাটাইয়া ধানের ফিতরা জায়েয হইবে না, কারণ ধান আদৌ আহার্য সামগ্রী ‘তাআম’ নয়। আহার্য বস্তুর উপর কিয়াস করিয়া যব বা খুর্মার ফিতরা দেওয়া হয় না, মনসূস ( কুরআন বা হাদীসে স্পষ্ট ভাবে উল্লেখিত) বলিয়াই দেওয়া হইয়া থাকে। তাআম বা আহার্য সামগ্রীরূপে ফিতরা দিতে হইলে উপমহাদেশীয়দের জন্য এক সা চাউল দিতে হইবে এবং ফিতরা আদায়ে তাহাই উত্তম।

মুদ্রার মাধ্যমে ফিতরা প্রদান করা প্রসঙ্গেঃ- মুহাম্মদ (সঃ) এর যুগে মুদ্রা হিসেবে দিরহাম প্রচলিত ছিলো। দিরহামের দ্বারা কেনা কাটা, দান খয়রাত করা হতো। তবু সাহাবী খুদরী (রাযিঃ) এর বর্ণিত হাদিস থেকে জানা যায়, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) খাদ্য বস্তু দিয়েই ফিতরা প্রদান করতেন। এজন্য মুসলমান পন্ডিতদের বড় অংশ টাকা দিয়ে ফিতরা প্রদানের ব্যাপারে ভিন্নমত পোষন করেন। ইমাম আহমদ (রঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নতের বরখেলাফ হওয়ার কারণে আমার আশংকা হচ্ছে যে, তা যথেষ্ট হবে না।

তবে প্রয়োজনে টাকা দিয়েও ফিতরা আদায় করা বৈধ। বাংলাদেশের মুসলিমগণ টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় করতে চাইলে ২.৪০ (দুই কেজি চল্লিশ গ্রাম) মধ্য মানের চাউলের মূল্য পরিশোধ করতে হবে। অবশ্য বাংলাদেশ যাকাত বোর্ড প্রতিবছর শহর ও গ্রাম এলাকার জন্য ফিতরার মূল্য নির্ধারণ করে দেন। তবে সম্ভব হলে ধান-চাউল বা খাদ্যবস্তু দিয়ে ফিতরা প্রদান করা উচিত।

সা এবং অর্ধ সাঃ- ফিতরা প্রদানের পরিমাপ সংক্রান্ত আলোচনায় ‘সা’ বহুল আলোচিত একটি শব্দ। সা হচ্ছে আরবদেশে ওজন বা পরিমাপে ব্যবহৃত পাত্র। বাংলাদেশে যেমন ধান পরিমাপের জন্য একসময় কাঠা ব্যবহৃত হত তেমনি! একজন মাঝামাঝি শারীরিক গঠনের মানুষ অর্থাৎ অধিক লম্বা নয় এবং বেঁটেও নয়, এই রকম মানুষ তার দুই হাত একত্রে করলে যে অঞ্জলি গঠিত হয়, ঐরকম পূর্ণ চার অঞ্জলি সমান হচ্ছে এক ‘সা’।

হাদিস থেকে সুস্পষ্ট জানা যায়, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কর্তৃক এক সা পরিমাণ ফিতরা প্রদানের কথা। মুহাম্মদ (সঃ) এবং চার খলিফার মৃত্যুর পরে মুআবিয়া (রাঃ) ইসলামী রাষ্ট্রের খলিফা নির্বাচিত হন এবং ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানী মদিনা থেকে দামেস্ক স্থানান্তরিত করেন, তখন তারা গমের সাথে পরিচিত হন। সে কালে সিরিয়ার গমের মূল্য খেঁজুরের দ্বিগুণ ছিল। তাই খলিফা মুয়াবিয়া একদা হজ্জ বা উমরা করার সময় মদীনায় আসলে মসজিদের মিম্বরে দাড়িয়ে বলেন; আমি অর্ধ সা গমকে এক সা খেজুরের সমতুল্য মনে করি। লোকেরা তার এই কথা মেনে নেয়। এর পর থেকে মুসলিম জনগনের মধ্যে অর্ধ সা ফিতরার প্রচলন শুরু হয়।

এ বছরের ফিতরার পরিমানঃ গতবছরের তুলনায় পাঁচ টাকা বাড়িয়ে এ বছর সর্বনিম্ন ফিতরা নির্ধারণ করা হয়েছে জনপ্রতি ৬৫ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬৫০ টাকা । গত ঈদুল ফিতরের আগের ইদুল ফিতরেও এ পরিমাণ ফিতরা ছিল।

আজ বুধবার (১৫ জুন) ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে ফিতরা নির্ধারণী সভার পর এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

ফাউন্ডেশনের পরিচালক আবদুস সালাম জানান, ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম গম বা আটা অথবা খেঁজুর, কিসমিস, পনির বা যবের মধ্যে যে কোনো একটি পণ্যের ৩ কেজি ৩০০ গ্রামের বাজার মূল্য ফিতরা হিসাবে গরিবদের মধ্যে বিতরণ করা যায়। এই হিসাবে এবার সর্বনিম্ন ৬৫ টাকা থেকে ১ হাজার ৬৫০ টাকা ফিতরা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ইসলাম ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব। নাবালক ছেলেমেয়ের পক্ষ থেকে বাবাকে এই ফিতরা দিতে হয়। আর তা দিতে হয় ঈদুল ফিতরের নামাজের আগেই।

আবদুস সালামের সভাপতিত্বে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে ওই সভায় ফিতরা নির্ধারণী কমিটির সদস্য ও বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।


নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: