সর্বশেষ আপডেট : ১ ঘন্টা আগে
রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

তারাবির নামাজের রাকাত সংখ্যা ও প্রয়োজনীয় কিছু মাসয়ালা

tarabi-bg20160613200438তারাবির রাকাত সংখ্যা শরিয়তের বিশুদ্ধ দলিল-প্রমাণ দ্বারা প্রমাণিত। গ্রহণযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে বিশ রাকাত তারাবি পড়েছেন। সাহাবায়ে কেরামের আমলও তদ্রূপ ছিল। কেউ কেউ হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিশ রাকাত তারাবি বিষয়ক হাদিসটিকে সূত্রের বিচারে অনির্ভরযোগ্য প্রমাণ করলেও বিশুদ্ধ সূত্রে সাহাবায়ে কেরামের আমলই প্রমাণ করে যে, হরজত রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে সাহাবায়ে কেরাম বিশ রাকাতের শিক্ষা পেয়েছেন। আমিরুল মুমিনীন হজরত উমর ফারুক (রা.)-এর খেলাফতকাল থেকে অবিচ্ছিন্ন কর্মধারায় এখন পর্যন্ত মক্কা শরিফের মসজিদুল হারাম ও মদিনা শরিফের মসজিদে নববীসহ সকল মসজিদে বিশ রাকাত তারাবি পড়া হয়। এ দীর্ঘ সময়ে কোথাও আট রাকাত তারাবির প্রচলন ছিল না।

সর্বপ্রথম ১২৮৪ সালে ভারতবর্ষের আহলে হাদিস আলেম আট রাকাতের ফতোয়া দিয়ে উম্মাহের ঐক্যমত্যপূর্ণ মাসয়ালায় বিভক্তি সৃষ্টি করেন। তখন অন্যান্য আহলে হাদিসরাও তার বিরোধিতা করেছে। অতঃপর আরবের কতিপয় বিচ্ছিন্ন আলেমও তার সঙ্গে একমত পোষণ করেন। কিন্তু আরববিশ্বের আলেমদের বেশিরভাগই বিশ রাকাত তারাবির অাদায় করেন।

হজরত উমর (রা.)-এর যুগে সাহাবিদের আমল
এক. ইয়াজিদ ইবনে খুসাইফা (রহ.) বলেন, সাহাবি সায়েব ইবনে ইয়াজিদ (রা.) বলেছেন, সাহাবায়ে কেরাম হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর যুগে রমজান মাসে বিশ রাকাত তারাবি পড়তেন। তিনি আরো বলেন যে, তারা নামাজে শতাধিক আয়াতবিশিষ্ট সূরাসমূহ পড়তেন এবং হজরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর যুগে দীর্ঘ নামাজের কারণে তাদের (কেউ কেউ) লাঠিসমূহে ভর দিয়ে দাঁড়াতেন। -আস সুনানুল কুবরা ও বাইহাকি, ২/৪৯৬/৪২৮৮

অপর সূত্রে সাহাবি সায়েব ইবনে ইয়াজিদ (রা.) বলেন, আমরা হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর যুগে বিশ রাকাত এবং বিতর পড়তাম। -আস সুনানুল কুবরা, বাইহাকি- ১/২৬৭-২৬৮

দুই. তাবেঈ ইবনে আবি যুবাব (রহ.) বলেন, হজরত উমর (রা.)-এর যুগে রমজানের কিয়াম তথা তারাবি ছিল ২৩ রাকাত। -মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস: ৭৭৩৩

হাদিসটির সূত্র বিশুদ্ধ। এতে ২৩ রাকাত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, ২০ রাকাত তারাবি ও তিন রাকাত বিতর।

তিন. তাবেঈ আবদুল আজিজ ইবনে রুফাই (রহ.) বলেন, উবাই ইবনে কাব (রা.) রমজানে মদিনায় লোকদের নিয়ে বিশ রাকাত তারাবি এবং তিন রাকাত বিতর পড়তেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ২/২৮৫/৭৭৬৬

চার. তাবেঈ ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আনসারি (রহ.) বলেন, উমর (রা.) এক ব্যক্তিকে আদেশ করেন, তিনি যেন লোকদের নিয়ে বিশ রাকাত পড়েন। -মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ২/২৮৫/৭৭৬৪

পাঁচ. তাবেঈ ইয়াজিদ ইবনে রুমান (রহ.) বলেন, হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর যুগে লোকেরা রমজানে তেইশ রাকাত পড়তেন। -মুয়াত্তা মালিক, হাদিস: ৩৮০

হজরত আলী (রা.)-এর যুগে সাহাবিদের আমল
বিখ্যাত তাবেঈ ইমাম আবু আবদুর রহমান সুলামি (রহ.) বলেন, আলী (রা.) রমজানে হাফেজদের ডাকেন এবং তাদের একজনকে লোকদেরকে নিয়ে বিশ রাকাত পড়ার নির্দেশ দিলেন। তিনি বলেন, আলী (রা.) তাদের নিয়ে বিতর পড়তেন। -সুনানুল বাইহাকি: ২/৪৯৬-৪৯৭/৪২৯১

তাবেঈ আবুল হাসনা (রহ.) বলেন, আলী (রা.) এক ব্যক্তিকে আদেশ করেন, তিনি যেন লোকদের নিয়ে বিশ রাকাত তারাবি পড়েন।-মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ২/২৮৫/৭৭৬৩

উপরোক্ত বর্ণনাগুলোসহ আরও অন্যান্য বর্ণনাসমূহ এবং সাহাবি-তাবেঈনের সর্বসম্মতিক্রমে আমলের ভিত্তিতে এবং যুগ যুগ ধরে চলে আসা সম্মিলিত অবিচ্ছিন্ন কর্মের ভিত্তিতে আলেমদের অভিমত হলো বিশ রাকাত তারাবি সুন্নতে মোয়াক্কাদা। বিনা ওজরে এর কম পড়লে সুন্নতে মোয়াক্কাদা ছেড়ে দেওয়ার গোনাহ হবে।

যারা বর্তমানে আট রাকাত তারাবির প্রচার করছে, তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল হলো বোখারি শরিফের একটি হাদিস, যা আসলে তারাবি সম্বন্ধে নয়, বরং ওই হাদিসটি হলো তাহাজ্জুদ সংক্রান্ত একটি হাদিস। তাতে বর্ণিত হয়েছে, রমজানে ও রমজানের বাইরে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) চার রাকাত করে আট রাকাত পড়তেন। অথচ আমরা জানি, রমজানের বাইরে কোনো তারাবি নেই এবং তারাবির নামাজ হলো দু’রাকাত করে। যদি হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে আট রাকাতই প্রমাণিত হতো, তাহলে সাহাবায়ে কেরাম হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিরুদ্ধাচরণ করে বিশ রাকাত পড়তেন না। নাউজুবিল্লাহ!

তারাবির মাসায়ালা
মাসয়ালা: বিশ রাকাত তারাবির নামাজ বালেগ পুরষ-মহিলা সবার ওপর সুন্নতে মোয়াক্কাদা। অসুস্থ ও রুগী ব্যক্তির ওপর তারাবি জরুরি নয়, তবে কোনো কষ্ট না হলে তাদেরও পড়া মুস্তাহাব। -রদ্দুল মুহতার: ১/৭৪২

মাসয়ালা: তারাবির নামাজ জামাতে আদায় করা মুস্তাহাব, একাকি আদায় করলেও আদায় হয়ে যাবে। -বাদায়েউস সানায়ে: ১/২৯০

মাসয়ালা: কারো যদি তারাবির জামাত থেকে কিছু রাকাত ছুটে যায় তাহলে বেতরের নামাজের পর তা পড়ে নিবে। -রদ্দুল মুহতার: ২/৪৪

মাসয়ালা: নাবালেগ হাফেজের পিছনে বালেগ পুরুষ মহিলা কারো জন্যই ইক্তিদা করা বৈধ নয়। -মাজমাউল আনহুর: ১/১৬৭, হেদায়া: ১/২৩৮, আল বাহরুর রায়েক: ১/৩৫৯

খতমে কোরআনের কতিপয় মাসয়ালা
মাসয়ালা: ফরজ, নফল বা তারাবি যে নামাজেই প্রত্যেক সূরার শুরুতে বিসমিল্লাহ নিঃসন্দেহে পড়া সুন্নত। তবে বিসমিল্লাহ নিঃশব্দে পড়া সুন্নত। তাই তারাবির নামাজেও খতমে কোরআনের সময় প্রত্যেক সূরার শুরুতে নিঃশব্দে পড়া সুন্নত। তবে যেহেতু বিসমিল্লাহর রাহমানির রাহিমও কোরআনের একটি আয়াত; তাই মুসল্লিদের খতম পূর্ণ হওয়ার জন্য যেকোনো সূরার শুরুতে বিসমিল্লাহ স্বশব্দে পড়ে নিলে সবার খতম পূর্ণ হয়ে যাবে। প্রতি সূরার শুরুতে বিসমিল্লাহ স্বশব্দে পড়লেও কোনো সমস্যা নেই। উভয়ের ওপর আমল করার অবকাশ আছে। -রদ্দুল মুহতার: ১/৪৯০

মাসয়ালা: ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে নামাজের ভেতর লোকমা দেওয়ার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো না করা উচিত এবং ইমাম সাহেবের জন্য লোকমার অপেক্ষা না করে অন্য আয়াত পড়ে নামাজ শেষ করা উচিত। লোকমা দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি হলো- প্রথমে ইমাম সাহেবকে আয়াত পুনরাবৃত্তির সুযোগ দেওয়া, এতদসত্ত্বেও ইমাম সাহেব শুধরে নিতে না পারলে সেক্ষেত্রে মুক্তাদি লোকমা দিলে কোনো ক্ষতি হবে না। তারাবি নামাজে খতমে কোরআনে যদি হাফেজ সাহেব লোকমার অপেক্ষা না করে, তাহলে লোকমা না দিলে কোনো অসুবিধা হবে না। তবে ভুলে যাওয়া আয়াত পরবর্তীতে সূরা ফাতেহার পর পড়ে নিতে হবে। -রদ্দুল মুহতার: ১/৬২৩

তারাবির নামাজে ভুল করলে
তারাবির নামাজে দ্বিতীয় রাকাতে না বসে দাঁড়িয়ে গেলে তৃতীয় রাকাতে সিজদা করার পূর্বে স্মরণ হলে বসে তাশাহহুদ ও সেজদায়ে সাহু আদায় করলে তেলাওয়াত ও নামাজ শুদ্ধ হয়ে যাবে। যদি তৃতীয় রাকাতে সিজদা করে ফেলে, তবে চতুর্থ রাকাত মিলিয়ে নিবে। এতে শেষের দুই রাকাত তারাবির নামাজ হিসেবে ধর্তব্য হবে এবং শেষ বৈঠক না করার কারণে প্রথম দুই রাকাত তারাবি হিসেবে গণ্য না হওয়ায় তেলাওয়াতসহ পুনরায় পড়তে হবে। -বাদায়েউস সানায়ে: ১/২৮৯, রদ্দুল মুহতার: ২/৩৫, ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/১১৮

যদি কোনো ব্যক্তি তারাবির নামাজ চার রাকাতের নিয়ত করে শুরু করে এবং ভুলে দুই রাকাতের পর বৈঠক না করে চার রাকাত শেষ করেই বৈঠক করে, তাহলে সে যদি নামাজ শেষে সেজদায়ে সাহু করে থাকে, তবে শুধু শেষের দুই রাকাত তারাবি হিসেবে গণ্য হবে। -আল বাহরুর রায়েক: ২/১১৭

বসে তারাবির নামাজ
মাটিতে বসে রুকু-সেজদার মাধ্যমে তারাবি নামাজ বৈধ। অনুরূপ তারাবির কেরাতের সময় চেয়ারে বসে রুকু সেজদা নামাজের নিয়মমাফিক আদায় করলে তাও বৈধ। কিন্তু বিনা ওজরে এরূপ করলে নামাজের পূর্ণ সওয়াব পাবে না, বরং অর্ধেক সওয়াব পাবে। তবে হ্যাঁ, নিয়মমাফিক রুকু সেজদায় সক্ষম ব্যক্তি চেয়ারে বসে ইশারায় রুকু সেজদার মাধ্যমে নামাজ পড়লে নামাজ শুদ্ধ হবে না। -ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/১১৮

লেখক : ফতোয়া গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা ঢাকা

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: