সর্বশেষ আপডেট : ২ মিনিট ৪০ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

হাসিমাখা সেলিনা হোসেন

full_1527486301_1465876120নিউজ ডেস্ক: দুপুর গড়িয়ে বিকেল হচ্ছে, এখনো সূর্যের আলোতে খই ফুটছে। বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ হলরুমটি প্রায় কানায় কানায় পূর্ণ। চলছে চন্দ্রাবতী সাহিত্য পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান। বাংলা একাডেমির প্রধান প্রবেশ ফটক থেকে হলরুম পর্যন্ত লেখক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, প্রকাশকসহ অনেকের উপচেপড়া ভিড়। হঠাৎ তাকিয়ে দেখি, সবার চোখ একই দিকে। নিশ্চয়ই কেউ আসছেন! মাথা উঁচু করে দেখি, সমকালীন বাংলা সাহিত্যের মুকুটহীন সম্রাজ্ঞী কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন।

এই প্রথম সামনে থেকে তাকে দেখা। অন্যরকম এক আনন্দ। সবাই প্রিয় লেখিকার সাথে ছবি তোলার জন্যে একটু সুযোগ খুঁজছে। আমিও খুঁজছিলাম। সেলিনা আপা ঠিক বুঝতে পারেন। বড় মেয়ে মালিহার হাতে মোবাইলটা দিয়ে বলি, মা আমি যাচ্ছি আপার পাশে, তুমি একটা ছবি তুলে দাও। বলেই আপার পাশে গিয়ে দাঁড়াই। আপা বলেন, এত্ত লম্বুর সাথে আমাকে তো পিচ্চি দেখা যাবে, এসো এসো। আমার ছবিটা যেই তোলা হলো, আপা বলেন, অ্যাই মেয়ে তুমি ও আসো। মা মেয়ে দুই লম্বুর মাঝে আমাকে দাও। ছবিটা দেখবে আর হাসবে। সাথে সাথে উপস্থিত সবাই হেসে উঠে। সবার সাথে হাসেন আপাও। আজো ভুলিনি সেই হাসিমাখা মুখ। তিনিই আমাদের প্রিয় কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন।

সেলিনা হোসেনের ৬৯তম জন্মদিন আজ। ১৯৪৭ সালের এইদিনে রাজশাহী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পৈতৃক নিবাস লক্ষ্মীপুর জেলার হাজিরপাড়া গ্রাম। বাবা এ কে মোশাররফ হোসেন এবং মা মরিয়মুন্নেসা বকুল। সাত ভাই-বোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ। এ কে মোশাররফ হোসেনের আদিবাড়ি নোয়াখালী হলেও চাকরিসূত্রে বগুড়া ও পরে রাজশাহী থেকেছেন দীর্ঘকাল। কাজেই সেলিনা হোসেনকে মেয়েবেলায় কিছুদিন নোয়াখালীতে থাকতে হয়।

সেলিনা হোসেনের কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমির গবেষণা সহকারী হিসেবে। বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন ২০০৪ সাল পর্যন্ত। বাংলা একাডেমিতে কর্মরত অবস্থায় তিনি বাংলা একাডেমির ‘অভিধান প্রকল্প’, ‘বিজ্ঞান বিশ্বকোষ প্রকল্প, ‘বিখ্যাত লেখকদের রচনাবলী প্রকাশ’, ‘লেখক অভিধান, ‘চরিতাভিধান’ এবং ‘একশত এক সিরিজের’ গ্রন্থগুলো প্রকাশনার দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও ২০ বছরেরও বেশি সময় ‘ধান শালিকের দেশ’ পত্রিকাটি সম্পাদনা করেন। তিনি ১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমির প্রথম মহিলা পরিচালক নিযুক্ত হন। এতগুলো বছর বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করে বাংলা একাডেমির পরিচালক হিসেবে ২০০৪ সালে চাকরি জীবন থেকে অবসর নেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত পালন করছেন।

কাজ করেছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, উপকূলীয় জীবনযাপনসহ অতি সাধারণ মানুষদের বাস্তবতা নিয়ে। সাহিত্যাঙ্গনে সেলিনা হোসেনের বিচরণের ব্যাপ্তি প্রায় পাঁচ দশক। তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘উৎস থেকে নিরন্তর’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে। ভ্রমণ তার নেশা। তার মোট উপন্যাসের সংখ্যা ৩৯টি, গল্পগ্রন্থ ১৩টি, প্রবন্ধ গ্রন্থ ১২টি, ছোট গল্পগ্রন্থ ২৯টি এবং অনুবাদ গ্রন্থ ৮টি। মৌলিক গ্রন্থ ও সম্পাদনা মিলিয়ে তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে।

তার অনবদ্য সৃষ্টিকর্মের মধ্যে রয়েছে, ‘ভূমি ও কুসুম’, ‘পূর্ণ ছবির মগ্নতা’, ‘নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’, ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’, ‘পোকা মাকড়ের ঘরবসতি’, ‘যাপিত জীবন’, ‘নীল ময়ূরের যৌবন’, ‘কাঁটাতারে প্রজাপতি’, ‘কাঠ কয়লার ছবি’, ‘নুন পান্তার গড়াগড়ি’ ইত্যাদি। তার উপন্যাস ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’ অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।

সেলিনা হোসেন বাংলা সাহিত্যের এমন একজন কথাশিল্পী যার প্রতিটি রচনা এক একটি স্বচ্ছ দর্পণ। যে দর্পণে আমরা এদেশের পুরো সমাজব্যবস্থার আলোকিত বা অন্ধকারাচ্ছন্ন দিকগুলোকে বিম্বিত হতে দেখি। মানবিকতার অর্থ যে শুধু দেশের সীমানায় আবদ্ধ থাকা নয়, সব দেশের সব কালের বিপন্ন মানুষ ও সম্প্রদায়ের প্রতি টান অনুভব করা, তা তিনি তুলে ধরেছেন ‘যমুনা নদীর মুসায়রা’ নামক উপন্যাসের মধ্য দিয়ে। একজন কবির জীবন যে, মানবিকতারই নির্যাসমাত্র। যমুনা নদীর মুশায়রাতে তিনি তারই প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।

তিনি আবার আমাদের স্বাধীন বাংলার লেখক এবং লেখক সমাজের কণ্ঠস্বর। লেখকের দায় মেনে নিয়েই নিজেকে তিনি যুক্ত করেছেন গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক সমতাভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্রভাবনা আর বাংলার সাথেই। লেখা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, লেখকের মৌল দায়িত্ব ভালো লেখা। নিজের প্রতি সৎ থেকে নিজের অনুভবকে শক্ত মেরুদণ্ড দেয়া লেখকের কর্তব্য।

তার রচনায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ গণমানুষের সংগ্রাম হিসেবে চিত্রায়িত হয়েছে। যা মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক ধারণা দেয়। তিনি বাঙালি জীবনের সমাজ-সংকট ও সম্ভাবনার চিত্র , ছিটমহলের মানুষের জীবন, সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনকে উপন্যাসে রূপ দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন ও কর্ম নিয়েও তিনি তৈরি করেছেন অনবদ্য উপন্যাস। সেলিনা হোসেনের উপন্যাস ও গল্পে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণী যেমন উঠে এসেছে, তেমনি বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সুখ-দুঃখের উপাখ্যান হয়ে উঠেছে তার লেখনিতে।

১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর পাকিস্তানি স্বৈরশাসকরা আমাদের ভাষার ওপর আক্রমণ করেছিলো। তারা চেয়েছিলো উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। তারা আমাদের ব্যবহৃত বাংলা ভাষাকে টুঁটি চেপে হত্যা করতে চেয়েছিলো। ‘নীল ময়ূরের যৌবন’ উপন্যাসে মন্ত্রী দেবলভদ্র যেন পাকিস্তানি স্বৈরশাসককেই প্রতিনিধিত্ব করে। বস্তুত ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই স্বাধীনতার স্বপ্ন বিস্তার লাভ করে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনই আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম সোপান। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন ‘নীল ময়ূরের যৌবনে’ সেই বিষয়টিই রূপকের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। সেই সাথে অন্ত্যজ শ্রেণীর সংগ্রাম এবং বাংলা ভাষার শত্রু-মিত্রের আদি-অন্ত ইতিহাসটাকেও আবহমান বাংলার রূপরেখায় এঁকেছেন।

সেলিনা হোসেন উপলব্ধি করেছেন, মানুষের জীবন রাজনীতির বাইরে নয়। আর তাই জীবনযাপনের কূটাভাস হিসেবে সেলিনা হোসেনের উপন্যাসে নির্মিত হয়েছে রাজনীতির অস্থি-মজ্জা-শরীর। ‘নীল ময়ূরের যৌবন’ সেলিনা হোসেনের একটি অসামান্য উপন্যাস। অতীত ও বর্তমানকে এক ভিন্নমাত্রায় বেঁধেছেন। ভাষা আন্দোলনকে রূপকের মোড়কে ঢেকে পৃথিবীর সব ভাষাভাষি মানুষের অস্তিত্বের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি উপন্যাসের মাধ্যমে।ভাষা সংগ্রাম এবং শ্রেণীচেতনা হলো তার উপন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।

তিনি বলেন, আদিবাসীদের নিয়ে আমার বড় একটা উপন্যাস করার ইচ্ছা আছে। আমি অনেক উপাদান সংগ্রহ করছি। যেমন কাপ্তাই বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য যে সব পরিবারকে উচ্ছেদ করা হলো, তারা তো অরুণাচল চলে গেল। যে সব পরিবার উচ্ছেদ হলো তার প্রিয় মাতৃভূমির মায়া, মমতা, ভালোবাসা স্মৃতি স্থাবর-অস্থাবর ত্যাগ করে আরেকটি ভিন্ন দেশে গিয়ে হলো উদ্ধাস্তু ও আশ্রয়হীন। ২৭ বছর পর সেই উদ্ধাস্তু পরিবারের একটি পরিবার আবার তার জন্মভূমিতে অর্থাৎ বাংলাদেশে ফিরে এলো আরেকটি পরিবারের কাছে। এই যে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, স্মৃতিকাতরতা, অনুভূতি, সর্বোপরি মাটির টান ও আন্তঃরাষ্ট্রের সম্পর্কসহ ইত্যাকার বিষয়াদি নিয়ে আমার উপন্যাস লেখার ইচ্ছা আছে। যদিও কাজটি আমি এখনো শুরু করতে পারিনি।

সেলিনা হোসেন ব্যক্তিগত জীবনে তিন সন্তানের জননী। বড় মেয়ে লাজিনা মুনা বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত। ছেলে সাকিব আনোয়ার এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকে কর্মরত। ছোট মেয়ে ফারিয়া লারা বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রশিক্ষক বৈমানিক, যিনি ১৯৯৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর প্রশিক্ষণ বিমান উড্ডয়নকালে মারা যান। সেলিনা হোসেনের স্বামী মো. আনোয়ার হোসেন একজন বৈমানিক কর্মকর্তা।

সাহিত্যের শাখায় শাখায় তিনি যেমন নিজের সৃষ্টি তুলে ধরেছেন, তেমনি পুরস্কারের সংখ্যাও আছে অনেক। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ড. মুহম্মদ এনামুল হক স্বর্ণপদক, ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার, রবীন্দ্রস্মৃতি পুরস্কার, খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার-২০১৪ এবং শিশু সাহিত্যে অবদানের জন্য এ বছর আনন সাহিত্য পুরস্কার-২০১৫ লাভ করেন। ২০১০ সালে কলকাতার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডি-লিট উপাধিতে ভূষিত করে। তিনি ফারিয়া লারা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা।

প্রথম দেখার ঠিক দু’মাস পর জাতীয় জাদুঘরের সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে এবার দেখা আপার সাথে। একটু কথা বলার সুযোগ খুঁজজিলাম। অনেকেই সুযোগ করে একটু কথা বলে নিচ্ছে। আপার পাশে আসতেই আপা বলে বসলেন, এই মেয়ে বসো, লম্বাতো বেশ। আজ মেয়ে আসেনি। আমিতো অবাক আপা ঠিক মনে রেখেছেন, এত লোকের ভিড়ে হয়তো অনেক লম্বা বলেই মনে আছে আপার। বললাম, জি আপা, মেয়েও এসেছে। ওদের ছাড়া তেমন কোথাও যাওয়া হয় না আমার। সামান্য কিছু কথা বলে উঠে গেলাম।

এত উঁচুমানের একজন লেখক সেলিনা হোসেন। তিনি যেমন সহজেই তার চরিত্রকে গল্প উপন্যাসে তুলে দেন আমাদের জন্য, তেমনি তিনি খুব সহজেই সবাইকে আপন করে নেন। আপার জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাই। শুভ জন্মদিন আপা। আপনার দীর্ঘায়ু কামনা করি।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: