সর্বশেষ আপডেট : ১৪ মিনিট ২৯ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

প্রধানমন্ত্রী শুনবেন কি বাবুল আক্তারের অব্যক্ত কথা?

26দুঃখিত বাবুল ভাই, নিশ্চুপ থাকা সম্ভব হলো না। রোববার সকাল থেকে হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে, মধ্যরাতে বাসায় ফিরে তা যেন আরো বাড়ছিল। গভীর রাত পর্যন্ত চেষ্টা করেও ঘুমোতে পারছিলাম না, শুধুই কান্না পাচ্ছিল। চোখের সামনে বার বার ভেসে উঠছিল চমেক হাসপাতালে একজন পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আখতারের বুকফাটা আর্তনাদ।

ঘনিষ্টজনদের মতো আমার কাছেও জানতে চাওয়া ‘দিদার তোর ভাবি কই? তোর ভাবিরে আইনা দে।’ ঘুমোতে যাওয়ার চেষ্টার সঙ্গে কর্ণকুহুর প্রকম্পিত হচ্ছিল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীর এ শীর্ষ এ কর্মকর্তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে হারানোর অভিব্যক্তি।

একজন সংবাদকর্মী হিসেবে বাবুল আক্তারের সঙ্গে পরিচয় বেশ ক’বছরের। পরিচয়ের সূত্রে বেশ কাছাকাছি আসার সুযোগও হয়েছে আমার। অনেক বিষয়ে কথাও হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্যও পেয়েছি, যা দিয়ে দেশে, বিদেশে আলোচনায় আসার মতো ‘বড় সংবাদ’ হতে পারতো। বিশ্বাস করে জানালেও বারণ করেছিলেন সংবাদ করতে। আজ কেন যেন আর নিজেকে ওই বারণের গণ্ডিতে আটকে রাখতে পারলাম না।

কথাগুলো বলা দরকার, জানানো দরকার কাউকে না কাউকে। আমি চাইলেও সেটা তো আর সম্ভব নয়। সেজন্য পত্রিকার ‘মুক্তমতে’ দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা আপনার।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুকে বর্বরোচিত কায়দায় খুনের মাধ্যমে শুধু একজন মা, স্ত্রী কিংবা পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারকে আক্রমণ করা হয়নি। এটি রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের জন্য একটি ক্লিয়ার ম্যাসেজ! সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনাকেই! দেশ কোন দিকে যাবে? রাজনৈতিক যোগসুত্র খুঁজে সময় ব্যয় নাকি জঙ্গিবাদের মূল উৎপাটন?

জঙ্গিবাদের মূল উৎপাটনে চাই সাহসী, মেধাবী ও নির্লোভ কিছু কর্মকর্তা। সেরকমই একজন কর্মকর্তা এসপি বাবুল আক্তার। সম্প্রতি জঙ্গি বিরোধী অভিযানে নানা সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি প্রতিকূল পরিস্থিতে কাজ করেছেন পুলিশের এ কর্মকর্তা। ওইসব অভিযানে বৈরি পরিস্থিতি সম্পর্কে তার টিমের সদস্যরা বুঝেছেন সরেজমিনে সঙ্গে থেকে। দূরে থেকে একজন সংবাদকর্মী হিসেবে কিছুটা অবগত হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমারও।

জঙ্গিবিরোধী অভিযানে এ পুলিশ কর্মকর্তাকে নানাভাবে আটকানোর চেষ্টা হয়েছে। সব বাধা পেরিয়ে নির্ভীক এ পুলিশ কর্মকর্তা এগিয়েছেন। দেশকে জঙ্গিমুক্ত করতে না পারলে দেশকে এগিয়ে নেয়া কঠিন। উন্নয়নের ও প্রগতির পথে জঙ্গিরা বাধা প্রাচীর গড়ে তুলতে চায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার ক্ষমতার মেয়াদের গত ৮ বছরে তা অনুধাবনও করেছেন। আপনার নেতৃত্বে দেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে আপনার সরকারের প্রতিনিধি হয়ে জঙ্গি নির্মূলের অন্যতম সৈনিক হিসেবে কাজ করে চলেছেন পুলিশের অকুতোভয় এ কর্মকর্তা।

গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর হাটহাজারীর আমানবাজারে আস্তানায় হানা দিয়ে জঙ্গিদের ব্যবহৃত বিশেষ কিছু পোশাকসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। ওই অভিযানে নেতৃত্ব দেন বাবুল আক্তার। ‘উপরের মহলের’ কথা বলে পরে তাকে নিরুৎসাহিত করা হয়। এরপর বেশ ক’দফায় পদক্ষেপ নিয়েও চট্টগ্রামে জঙ্গিবিরোধী কোনো অভিযানই করতে পারেননি তিনি। কারণটি খুঁজে বের করা দরকার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, প্রকৃত কারণ আপনার জানা দরকার। অবশ্য এটি পুরোপুরি বলতে পারবেন বাবুল আক্তার।

আমানবাজারের ঘটনায় নানামুখি চাপের মধ্যেও ওই জঙ্গি আস্তানায় পাওয়া আলামত ও জঙ্গিদের সঙ্গে মোবাইলে কথোপকথনের তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে কিছু ব্যক্তির নামের একটি তালিকা আইজিপিকে দিয়েছিলেন বাবুল আক্তার।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার সঙ্গে কথা বলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তড়িৎ ব্যবস্থা নেয়া হবে আইজিপি তাকে আশ্বস্তও করেছিলেন। কিন্তু এরপর একটি বিশেষ অভিযান হয়েছে জানলেও মূল জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

চলতি বছরের শুরু থেকে বাবুল আক্তারেরই দেয়া সূত্র ব্যবহার করে দেশের উত্তরাঞ্চলে একাধিক জঙ্গি ধরেছে আইনশৃংখলা বাহিনী। এমনকি শেরপুরে জঙ্গি আস্তানায় বোমা বানাতে গিয়ে নিহত দুই জনের মধ্যে একজনের পরিচয় মিললেও অজ্ঞাতনামা যাকে দাফন করা হয়েছে সেই জঙ্গিই যে জেএমবি চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান ফারদিন সেটি নিশ্চিত করেছেন এই বাবুল আক্তারই। কেননা ফারদিনকে বাংলাদেশ পুলিশের আর কেউ চিনতেন না।

দুই মাস আগে দেশের উত্তরাঞ্চলের এক জেলায় জেএমি সদস্যদের কাছ থেকে উদ্ধার করা একটি চিঠিতেও চট্টগ্রামে অভিযানের সময় গ্রেনেড বিস্ফোরণে নিহত জাবেদের ‘হত্যার প্রতিশোধ’ নেয়াকে ঈমানি দায়িত্ব উল্লেখ করে জঙ্গিরা। ওই চিঠিতে চট্টগ্রামে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে অংশগ্রহণকারীদের হত্যা করার আদেশ দেয়া হয়। পুলিশ সদর দপ্তর হয়ে ওই চিঠি সিএমপিতে আসলেও কেন নিরাপত্তা দেয়া হল না হুমকিতে থাকা বাবুল আক্তারের পরিবারকে?

পদোন্নতি পেয়ে চট্টগ্রামে জঙ্গি দমন এবং চট্টগ্রামের প্রতি বিশেষ ভালাবাসার কারণে সিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (ডিসি-উত্তর) পদে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করলেও বাবুল আক্তারকে ঢাকা সদরদপ্তে সংযুক্ত করা হয়। কেন এ বদলি তাও জানা দরকার। তিনি নিজ এবং পরিবার নিয়ে সব সময় জঙ্গি আক্রমণের আশঙ্কা করতেন। তবে দেশ ও বাহিনীতে দায়িত্বরত সহকর্মীদের স্বার্থেই সেটি কখনো প্রকাশ করেন নি।

গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় যাওয়ার আগে স্থানীয় পাঁচলাইশ থানার ওসিকে মৌখিকভাবে পরিবারের সদস্যদের প্রতি নজর রাখতে বললেও কেন তা প্রতিপালন হল না জানা দরকার। যেটি চমেক হাসপাতালে স্ত্রীর মৃতদেহ দেখতে এসে বাবুল আক্তার পাঁচলাইশের ওসিকে খোঁজ করে জানতে চেয়েছেন। এসপির পরিবারের নিরাপত্তায় থানায় জিডি করলেই কি তার পরিবার সুরক্ষা পেতেন? আর সেটি কি তখন দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে চলমান সমালোচনাকে আরো উসকে দিত না?

আর হ্যাঁ যেটি বলতে চেয়েছিলাম। দেশের জঙ্গিবাদের প্রাথমিক লেভেল নিজের এন্টিনায় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বাবুল আক্তার দ্বিতীয় স্তরে পৌঁছে গেছেন। এখন প্রাণপ্রিয় স্ত্রীকে হারিয়ে তার মানসিক অবস্থা কীরকম সেটি বুঝে নেয়া কষ্টকর নয়। তবে তার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে বলতে পারি তিনি হারবেন না, ভাঙবেনও না। শুধু দ্বিতীয় স্তর নয়! কারা এই জঙ্গিবাদের মদদদাতা? কারা অর্থদাতা? কোন দেশের গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত সেটিও হয়তো তার কাছে অজানা নয়!

তবে তিনি বারবার বলেছেন, সব জায়গায় আমার পক্ষে হাত দেয়া সম্ভব নয়! অনেককে আমি ধরলেও রাখতে পারব না! হয়তো উপরের মহলও বিস্মিত হয়ে যাবে তাদের মুখ দেখে! তবে কোন উপরের মহল সেটি কখনও পরিষ্কার করেননি তিনি।

এ পুলিশ কর্মকর্তাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, পুরোদেশ থেকে জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে আপনাকে যদি বিশেষ ক্ষমতা দিয়ে মাঠে নামাতে হয়। যখন যাকে তাকে গ্রেপ্তার, যেখানে, সেখানে অভিযানের অনুমতি ও সব ধরনের লজিস্টিক সাপোর্ট দেয়া হয়। আর বিষয়গুলো সরাসরি পুলিশ প্রধানের সঙ্গে সমন্বয় করা ছাড়া অন্য কোনো মাধ্যম থাকবে না। তাহলেই ভালো একটি আউটপুট আসবে মনে হয়। জবাবে বাবুল ভাই বলতেন, ‘এটি সিনেমায় না হয় বিদেশে সম্ভব।’

জঙ্গি দমন করতে গিয়ে যিনি নিজের প্রিয়তমাকে হারিয়েছেন এসপি বাবুল আক্তার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সদ্য স্ত্রী হারানো এ পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলা দরকার আপনার। জঙ্গি দমন করতে গিয়ে পদে পদে বাধার অজানা সব তথ্যও আপনার জানা দরকার। জঙ্গি দমন চাইলে সে অনুয়ায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে আপনার সরকারকে। প্রয়োজনে বিশেষ ক্ষমতা দিয়ে এ পুলিশ কর্মকর্তাকে মাঠে নামান। আমার বিশ্বাস, জঙ্গি নির্মূলে সফলতা আসবে।

আমি জানি না, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমার এ আবেদন আপনার দৃষ্টিতে আনবে কি না। তবে আজকে সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেয়ার, দেশ কাদের? জঙ্গিদের না আমার কিংবা আমাদের?

লেখক : আলম দিদার ,সাংবাদিক।

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: