সর্বশেষ আপডেট : ১ ঘন্টা আগে
শুক্রবার, ২ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

দ্বৈত নাগরিকত্বে ২য় শ্রেণির নাগরিক ও একটি বিশ্লেষণ

9বাংলাদেশ সরকারের ক্যাবিনেট মিটিং এ গত ১ ফেব্রুয়ারি নতুন নাগরিকত্ব আইন অনুমোদিত হয়েছে। আগামী জুনে সংসদ অধিবেশনে এটি অনুমোদিত আইন হিসেবে গৃহীত হতে পারে। এই আইনটি কার্যকর হলে অস্ট্রেলিয়া ইউএসএ ইউরোপসহ সারাবিশ্বের প্রায় ১৮ লাখ দ্বৈত নাগরিক এক অর্থে স্বদেশে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হবে।

পর্যাপ্ত আইনগত বিশ্লেষণ ও তথ্যের অভাবে এতদিন এর কার্যকরণটা আমারা সঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারিনি। গত বেশ কিছুদিন ধরে এই বিষয়ে বিভিন্ন আলোচনা ও পদক্ষেপগুলো আমারা পর্যবেক্ষণ করছিলাম। এছাড়াও দেশ-বিদেশ পত্রিকার অসংখ্য পাঠক আমাদের কাছে এ ব্যাপারে জানবার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

বৃটেনের ট্রাইবুন্যাল জজ জনাব নজরুল খসরুর কয়েকটি লেখা ও সাক্ষাৎতকার আমাদের গোচরে আসার পর আমরা বিষয়টির গভীরতা উপলব্ধি করতে পারি। নিচে জনাব খসরুর কিছু বিশ্লেষণ তুলে ধরা হল:
১. প্রথম প্রজন্ম দ্বৈত নাগরিক :
ক) বহির্বিশ্বে বসবাসরত দ্বৈত নাগরিকদের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পুনরায় রেজিস্ট্রি করতে হবে। তবে তারা যদি নাম রেজিস্ট্রি না করেন তাহলে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হবেন কি-না তা আইনে পরিষ্কার নয়। তাছাড়া এই রেজিস্ট্রেশন স্থানীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে করা যাবে কি-না তাও আইনে উল্লেখ নেই।

২. বাংলাদেশি নাগরিক (দ্বিতীয় প্রজন্ম) :
ক) তাদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেতে হলে প্রমাণ করতে হবে যে, তাদের পিতা বা মাতা এই আইন কার্যকর হওয়ার পূর্বে বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন।
খ) তাছাড়া এই আইন প্রণয়নের দুই বছরের মধ্যে নিজেদের নাম স্থানীয় হাইকমিশনে রেজিস্ট্রি করতে হবে।

৩. তৃতীয় প্রজন্মের জন্য আইনটি খুবই উদ্বেগজনক :
ক) যেহেতু তাদের পিতামাতা এই আইন কার্যকর হওয়ার পরে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নিয়েছেন সেহেতু তাদের নাগরিক হওয়ার সুযোগ থাকবে না। কারণ আইনে বলা হয়েছে, কেউ বাংলাদেশের নাগরিক হতে হলে প্রমাণ করতে হবে যে, তার পিতা বা মাতা উক্ত আইন হওয়ার পূর্বে বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন। সুতরাং তৃতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশিদের আইনের চোখে বিদেশি হিসেবে গণ্য করা হতে পারে।

৪. যাদের দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকবে তারা (সব প্রজন্ম দ্বৈত নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য) :
ক) বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না।
খ) বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন না।
গ) সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হতে পারবেন না।
ঘ) কোনো সরকারি চাকরি পাবেন না।
ঙ) স্থানীয় সরকার নির্বাচন যেমন: সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না।
চ) তাছাড়া কোনো রাজনৈতিক সংগঠনও করতে পারবেন না। কেউ বিদেশি নাগরিকত্ব ছেড়ে যদি শুধু বাংলাদেশের নাগরিকত্ব রাখে তাহলে কি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। এ ব্যাপারে এই আইনে পরিষ্কার করে কিছু বলা হয়নি। তবে সংবিধানে আছে, বিদেশি নাগরিকত্ব ছেড়ে দিলে তিনি সংসদীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।

৫. বাংলাদেশি রোহিঙ্গা এবং উর্দুভাষী :
বাংলাদেশি রোহিঙ্গা এবং উর্দুভাষী বাংলাদেশিদের নাগরিক হওয়ার ব্যাপারে সীমাবদ্ধতা থাকবে। তাছাড়া বাংলাদেশের কোনো যুদ্ধে যারা বিরোধিতা করেছেন তাদের সন্তানদের নাগরিকত্ব চলে যাবে। তবে কৌতূহলের বিষয় হচ্ছে যে, যারা যুদ্ধে বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছেন তাদের ব্যাপারে আইনে কিছুই বলা হয়নি।

৬. যদি কেউ আইন ভঙ্গ করে :
ক) এটি জামিন অযোগ্য অপরাধ। সাধারণত হত্যা ধর্ষণজনিত অপরাধ জামিন অযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। এবার নাগরিত্ব আইন ভঙ্গ করলে জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে।
খ) যেকোনো থানায় পুলিশ কর্মকর্তা কিংবা কোনো ব্যক্তি বাদী হয়ে প্রবাসীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে।
গ) দেশে রাজনীতি করলে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে।

৭. এই আইনের মাধ্যমে প্রবাসীরা বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে পারেন :
ক) অনেকের জন্য ব্যক্তিগত শত্রুতায় প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে পারে।
খ) পুলিশ যে কারো বিরুদ্ধে মামলার ভয় দেখিয়ে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করতে পারে।
এমনকি আমরা যারা প্রবাসে স্বাভাবিক নিয়মে নাগরিকত্ব গ্রহন করেছি, আমাদের সরকারি চাকরি, ব্যবসায় বাণিজ্যে, ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে শুরু করে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করবারও সম্পূর্ণ সুযোগ রয়েছে। অথচ জন্মসূত্রে আমরা যে দেশের নাগরিক সেখানে আমাদের এসকল সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, যেটি আমাদের প্রতি অবিচারের সামিল।
যাই হোক একটি বিষয়, আগে যেমন উন্নত বিশ্বেও নির্ধারিত কিছু দেশের জন্যই দ্বৈত নাগরিকত্ব উন্মক্ত ছিল। নতুন আইনে কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে এমন সব দেশেই দ্বৈত নগরিত্ব প্রদানের সুযোগ প্রদান করা হয়েছে।

আমরা প্রবাসীরা জীবনে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করেই টিকে আছি। হার-জিত মেনে নিয়েই আমরা প্রতিনিয়ত সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। জীবনের আরো অনেক পরাজয়ের মদো কপালের লিখন বলে মেনে নিবেন? নাকি ধর্ম, মত, দল, রাজনীতি সবকিছুর উর্ধ্বে উঠে একসঙ্গে দাবি করবেন সুবিচারের, সুবিবেচনার? আমাদের সীমিত সামর্থে যে যার স্থান থেকে আসন্ন এই আইনকে পুনর্বিবেচনার দাবি তুলতে পারি।

এছাড়া আমরা প্রত্যেকের স্থানীয় সংসদ সদস্যদের অনুরোধ করতে পরি বিষয়টি নিয়ে সংসদের আলোচনা করার জন্য। সংসদ সদস্যদরে নাম ও ঠিকানার জন্য Bangladesh Parliament এর ওয়েব সাইট ভিজিট করতে পারেন। এজন্য ওয়েব সাইটের হোম পেজ থেকে MPs – Members of Parliament – Current MPs ট্যাব থেকে সংসদ সদস্যদের ঠিকানা পেতে পারেন। নিচে ওয়েব সাইটটি দেয়া হল.. http://www.parliament.gov.bd/index.php/en/mps/members-of-parliament/current-mp-s/list-of-10th-parliament-members-english

পাদটিকা :
বৈষ্ণব কাব্যে শ্রী রাধা কৃষ্ণ বিরহে ‘ঘর কইনু বহির, বাহির কইনু ঘর’ বলে আক্ষেপ করেছিলেন। আমরা ১৮ লাখ প্রবাসী দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছি, তবে অবশ্যই দেশের প্রতি ভালোবাসা ও মমত্ববোধের অভাব থেকে নয়। জীবন জীবিকা ও দায়িত্বের প্রয়োজনে বহু বছর ধরে প্রবাস ছেড়ে ফিরে যেতে পারিনি বরং দুরে থাকি বলে দেশ, মা ও মাটি অহরহ কাছে টানে। অনেকেই অর্ধেক জীবন পাড়ি দিয়েছেন প্রবাসে, নিয়েছেন দ্বৈত নাগরিকত্ব। কিন্তু নিজের দেশ বলতে আমরা পিতা-মাতা ও প্রপিতামহের সেই মাটিকেই বুঝি যেখানে আমরা জন্মেছিলাম। এ কারণেই সেদেশের বিজয়ে উল্লাসিত হই, দুঃখে দুঃখিত হই। আমাদের সন্তানদের গর্বের সঙ্গে বলি, আমরা হচ্ছি সেই জাতি যে জাতি ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে, স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছে। আমরা তাদের অতিযতনে বাংলা শিখাই, কবিতা, গানের মর্মাথ বুঝাই। কিন্তু আজ মনে হয় সবই যেন
অর্থহীন, নতুন আইন যেন ভেংচি কেটে বলছে, এদেশতো তুমি ছেড়ে গেছে বহু আগেই, তাই তোমাকে বানিয়ে দিলাম দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। ঘর এবং বাহির সবখানে তুমি দ্বিতীয় শ্রেণির হয়েই সুখে থাক।

মায়ের কাছে ফিরে আসা মানে মাটির কাছে ফিরে আসা। যেখানে আমার জন্ম, যাকে আমরা দেশ বলি, সেখানে আমরা ফিরে ফিরে আসবই। তবে দুঃখ লাগে হয়তো দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়েই আসতে হবে। তবুও আসব, এটা আমার প্রিয় জন্মভূমি। এখানে আমার নাড়ির টান জন্ম জন্মাতরের ভালোবাসার টান। সেই ভালবাসার দেশটাকে রেখে কোথায় যাব? ফিরে আসতেই হবে।

আমরা যারা দ্বৈত নাগরিক এটা আমাদের আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যত এর জন্য গভীরভাবে প্রভাব রাখার মতো একটি বিষয়। এ বিষয়ে খসড়া আইন এবং তার আইনগত বিস্তারিত ব্যাখ্যা এই লিঙ্কে পড়ুন। http://deshbidesh.com.au/Citizenship%20Bill.pdf

আমরা এ বিষয়ে আমাদের অনলাইন মিডিয়াতে একটি জনমত জরিপের ব্যবস্থা করেছি। আপনারা আপনাদের মূল্যবান মতামত প্রদান করুন। আমরা এই সংগৃহিত মতামতের পরিসংখ্যান মাননীয় সরকারের নজরে আনতে চেষ্টা করব।

লেখক : বদরুল আলম, অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রকাশিত ‘দেশ বিদেশ’ পত্রিকার সম্পাদক।

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: