সর্বশেষ আপডেট : ৬ সেকেন্ড আগে
রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

হজ বর্জন সম্পর্কে ইরানের আলেম ও কর্মকর্তারা কী বলছেন?

Hajj-000-696x435আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান চলতি বছর হজ বর্জনের চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়েছে। এ সম্পর্কে এরই মধ্যে দেশটির শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন আলেম মতামত দিয়েছেন। তারা বলেছেন, সৌদি ওয়াহাবিদের অসম্মান ও অপমানের ভেতরে ইরানের নাগরিকদের এখন হজ করার কোনো প্রয়োজন নেই।

Iran Hajj-2গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ নাসের মাকারেম শিরাজি হচ্ছেন ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের একজন আলেম। যিনি বিভিন্ন ইস্যুতে শরিয়া ভিত্তিক ফতোয়া দিয়ে থাকেন। তিনিও এবারের হজ বর্জন সম্পর্কে মতামত দিয়েছেন।

ইরানের প্রভাবশালী এ আলেম বলেছেন, চলমান বাস্তবতা এ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরানের নাগরিকদের অপমান করাই হলো সৌদি শাসকদের লক্ষ্য। সে কারণে ইরানের জনগণও এ ধরনের অপমানজনক পরিস্থিতির মধ্যে হজ করতে সৌদি আরবে যেতে চান না।

Ayatullah Makarem Shiraziশিরাজি বলেন, ইরানের জনগণের ওপর ইয়েমেন, সিরিয়া ও ইরাকে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে চায় সৌদি আরব। আয়াতুল্লাহ মাকারেম শিরাজি পবিত্র কুরআনের একটি আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, হজের বিষয়ে কুরআন বলছে: মসজিদুল হারামের ওপর সেখানকার বাসিন্দা ও অন্য সব দেশের নাগরিকদের সমান অধিকার রয়েছে। সৌদি শাসকেরা এমন আচরণ করেন যেন তারা পবিত্র মক্কা ও মদিনার মালিক। এই আচরণ ও মনোভাব সবার কাছে অগ্রহণযোগ্য। এ অবস্থা অবসানের জন্য এবং সুষ্ঠুভাবে হজ সম্পাদনের জন্য তিনি ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা বা ওআইসি’র মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলোর প্রতিনিধি নিয়ে একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন।

এ বিষয়ে সারা বিশ্বের মুসলিম চিন্তাবিদদের কাছে পরামর্শ ও প্রস্তাব চেয়েছেন যাতে সহজেই এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায়।

Hajj-000প্রেসিডেন্ট রুহানির বক্তব্য: 

ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি সোমবার বলেছেন, পবিত্র হজে অংশ নেয়ার বিষয়ে ইরানের নাগরিকদের বাধা দিয়ে সৌদি আরব মূলত ইহুদিবাদী ইসরালের স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে। তিনি বলেন, পবিত্র হজ, মক্কা ও মদিনা হচ্ছে সব মুসলমানের এবং মুসলিম বিশ্বের স্বার্থ পূর্ণ করার একটি প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু মক্কা ও মদিনার সেবক দাবি করেন যারা তারাই ইরানের নাগরিকদের আল্লাহর রাস্তায় ও হজে যেতে বাধা দিচ্ছেন। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে দিয়ে ইহুদিবাদী ইসরাইলের স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে।

 President Rouhaniসংস্কৃতি ইসলামি দিকনির্দেশনা বিষয়ক মন্ত্রী:

রোববার ইরানের সংস্কৃতি ও ইসলামি দিকনির্দেশনা বিষয়ক মন্ত্রী আলী জান্নাতি বলেছেন, “সৌদি আরবের সাবোটেজ ও বাধার কারণে চলতি বছর ইরানি নাগরিকদের জন্য কার্যত হজ পালন করা অসম্ভব হয়ে পড়ল।” ইরান থেকে ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সৌদি আরবে সর্বশেষ পর্যায়ের আলোচনা করার পর আলী জান্নাতি এ ঘোষণা দেন। ওই আলোচনা ব্যর্থ ও নিষ্ফল হয়েছে।

Hajj Trgedyসর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা: 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আলী আকবর বেলায়েতি বলেছেন, হাজিদের নিরাপত্তা দেয়ার যোগ্যতা সৌদি সরকারের নেই। অথচ হাজিদের পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়া ও তাদেরকে রক্ষা করা সৌদি সরকারের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। 

ড. আলী আকবর বেলায়েতি জোর দিয়ে বলেন, সৌদি শাসকদের এমনভাবে কাজ করা উচিত যাতে হাজিরা সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে হজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত সম্পন্ন করতে পারে।

হজ বর্জনের সিদ্ধান্ত কেন নিল ইরান: 

 ইরানি গণমাধ্যমের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে দেশটির হজ সংস্থার প্রধান সাঈদ ওহাদি চলতি বছর হজ স্থগিত করার সিদ্ধান্তের কারণ তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর সৌদি সরকার নতুন করে ১১টি অনুচ্ছেদ যোগ করেছে যা গত বছর দু দেশের মধ্যে সই হওয়া সমঝোতার মধ্যে ছিল না।

ওহাদি জানান, নতুন অনুচ্ছেদগুলোর মাধ্যমে সৌদি সরকার ইরানের হজযাত্রীদের ওপর নতুন সীমাবদ্ধতা আরোপ করার চেষ্টা করেছিল। এ কারণেই মূলত ইরানের পক্ষে পুরো সমঝোতা স্মারকটি মেনে নেয়া এবং এ বছর হজে লোক পাঠানো একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এরমধ্যে কয়েকটি শর্ত তুলে ধরেছেন ওহাদি-

সৌদি সরকার ইরানি হাজি গ্রহণে প্রস্তুত নয়: 

সাঈদ ওহাদি বলেন, ইরানের প্রতিনিধিদল সৌদি আরব সফরে গিয়েছিল একটি সমঝোতা স্মারক সই করতে কিন্তু সৌদি শাসকরা তা চান নি। তারা মূলত আলোচনার নামে সময় ব্যয় করতে চেয়েছেন; ইরানি হাজিদের গ্রহণ করতে চান নি।

পতাকা উত্তোলনে বাধা:

ওহাদি জানান, ইরান আরো যেসব কারণে এবারের হজ স্থগিত করেছে তার মধ্যে আরেকটি হলো ইরানের হাজিরা যে ভবনে থাকবেন সেখানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পতাকা উত্তোলন করতে দেবেন না সৌদি শাসকরা। এছাড়া, যেসব নির্দিষ্ট রাস্তায় ব্যাপক ভিড় হয় সেসব রাস্তায়ও গাইডদের জন্য ইরানের পতাকা উত্তোলন নিষিদ্ধ থাকবে।

ইরানি ক্লিনিকের ওপর নিষেধাজ্ঞা:

ইরানের হজ সংস্থার প্রধান কর্মকর্তা ওহাদি জানান, সৌদি আরব ইরানের ওপর আরো যে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে তা হলো, ইরানি ক্লিনিকের সংখ্যা কমিয়ে ফেলা। শুধু তাই নয়, সৌদি আরবে অবস্থানের সময় ইরানি হাজিদের বিভিন্ন রকমের ওষুধ ব্যবহারও সীমিত করে দিয়েছে।

ইলেক্ট্রনিক রিস্টব্যান্ড:

সাঈদ ওহাদি জানান, ইরানি হজযাত্রীদেরকে সৌদি কর্মকর্তারা ইলেক্ট্রনিক রিস্টব্যান্ড ব্যবহারের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইরান নিজেই রিস্টব্যান্ড তৈরি করেছে তারপরও সৌদি আরব বলেছে তারা কোনোভাবেই ইরানের তৈরি রিস্টব্যান্ড ব্যবহারের অনুমতি দেবেন না।

এছাড়া, হজের আরো কিছু আনুষ্ঠানিকতা ও নামাজের সময় এক জায়গায় জড়ো হওয়া নিষিদ্ধ করেছে সৌদি আরব। কিন্তু ইরান সৌদি আরবের এসব শর্ত মেনে নিতে রাজি হয় নি।

রাজনৈতিক শিষ্টাচারের অভাব:

হজে লোক পাঠানো বন্ধ রাখার বিষয়ে আরো যেসব কারণ রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- সৌদি কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক শিষ্টাচারের অভাব। এমনকি আলোচনার সময়ও সৌদি কর্মকর্তারা ইরানি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন নি।

পবিত্র কুরআনের প্রতি অসম্মান:

ইরানের হজ সংস্থার প্রধান জানান, যেসব কুরআন ইরানে ছাপা হয়েছে সেসব কুরআন ইরানি হাজিদের কাছে থাকলে তা সৌদি কর্মকর্তারা কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলেন।

এছাড়া, সৌদি ওয়াহাবি নেতাদের ক্রোধ মেটাতে মিনা ট্রাজেডির নামে হাজি হত্যা, কখনো গুলি, কখনো বা ক্রেন দুর্ঘটনার নামে ইরানি হাজি হত্যা, ইরানি হাজিদের মুখে থাপ্পড়, পুলিশের হাতে আটক, তরুণ হাজীদের সঙ্গে অমানবিক ব্যবহার, কখনো কখনো তাদের কাছে মাদক থাকার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, ইরানি হাজিদের জন্য আবশ্যিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট- এসবই ইরানের হাজিদের জন্য অবমাননাকর বিষয়। এসব অপরাধ ও দুর্ব্যবহারের অবসান না হওয়ায় ইরান এবার হজ স্থগিত করেছে।

এক নজরে হজের যত ট্রাজেডি:

*১৯৭৮ সালে সৌদি পুলিশ ও হাজিদের মধ্যে সংঘর্ষে ৪০০’র বেশি হাজি নিহত যার মধ্যে বেশিরভাগই ইরানি হাজি।

*১৯৯০ সালে মিনা থেকে মসজিদুল হারামে যাওয়ার সুড়ঙ্গ পথে ১,৪২৬ জন হাজির করুণ মৃত্যু।

*১৯৯৪ সালে মক্কার কাছে মিনায় পদদলিত হয়ে ২৭০ জন হাজির মৃত্যু।

*১৯৯৭ সালে হাজিদের তাবুতে আগুন লেগে ৩৪০ হাজির মর্মান্তিক মৃত্যু; ১,৫০০ জন আহত।

*১৯৯৮ সালে মিনায় পদদলিত হয়ে ১৮০ জনের মৃত্যু।

*২০০১ সালে মিনায় পদদলিত হয়ে ৩৫ জনের মৃত্যু।

*২০০৪ সালে মিনায় পদদলিত হয়ে ৩৬০ জনের মৃত্যু।

*২০০৯ সালে মক্কায় আট তলা ভবন ধসে মারা যান আরো ৭৬ জন।

২০১৫ সালে ক্রেন ভেঙে ১০৭ জনের মৃত্যু এবং আহত ২৩৮ জন। এছাড়া, ইরানের হিসাব মতে- মিনায় নিহত হয়েছেন ৭,০০০-এর বেশি হাজি। অবশ্য, বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, গত বছর নিহত হয়েছে ২৫০০ জনের বেশি।

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: