সর্বশেষ আপডেট : ২ মিনিট ২৯ সেকেন্ড আগে
মঙ্গলবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

রোয়ানুর সঙ্গে লড়াই, কী ঘটেছিল সেদিন বাংলার শিখায়?

full_826453327_1464412284নিউজ ডেস্ক:: ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর তাণ্ডব শুরু হওয়ার আগেই সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ২১ মে সকাল থেকেই চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় থাকা জাহাজের ক্যাপ্টেনরা প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলার। বড় বড় ঢেউ আর তীব্র বাতাসে জাহাজের নিয়ন্ত্রণ রাখতে সবাই ইঞ্জিন চালু করে রেখেছেন। সাগরে তখন জাহাজের সংখ্যা ১৪৩।

২০ মে থেকে পালাক্রমে জেটি থেকে সব জাহাজ বের করে দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। ঘূর্ণিঝড়ের সময় জেটিতে থাকলে জেটি ভেঙে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হতে পারে বা বন্দর চ্যানেলে জাহাজ ডুবে বন্দরে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষ ঘূর্ণিঝড়ের সময় এ ব্যবস্থা নেয়।

সকাল থেকেই চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের চারতলার বেতার নিয়ন্ত্রণকক্ষে থাকা কম্পিউটারে পর্দার দিকেই সবার তীক্ষ্ণদৃষ্টি। সরাসরি ভিডিও দেখা যাচ্ছে। পর্দায় ভেসে উঠছে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর তাণ্ডব। পতেঙ্গায় সাগরতীরে রেডকিন পয়েন্টে উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে। তীরে ধাক্কা খেয়ে গাছের ওপরেও আছড়ে পড়ছে জলরাশি। তীব্র বাতাসে গাছগুলো নুইয়ে গেছে।

এক জাহাজ থেকে আরেক জাহাজ নিরাপদে রাখার জন্য নিয়ন্ত্রণকক্ষের অপারেটররা বেতারবার্তায় নানা নির্দেশনা দিচ্ছেন। হঠাৎ করে ‘এমভি বাংলার শিখা’ জাহাজ থেকে ভেসে এল এক নারীকণ্ঠ, ‘বাংলার শিখা জাহাজের পাওয়ার ফেইলিওর। পোর্ট কন্ট্রোল, আমাদের হেল্প করুন। টাগবোট পাঠান। আমাদের বাঁচান।’ নিয়ন্ত্রণকক্ষের কর্মরত ব্যক্তিরা উদ্বিগ্ন। এই উত্তাল সাগরে কীভাবে উদ্ধার করা হবে জাহাজের নাবিকদের।

জাহাজে প্রকৌশলীদের সঙ্গে মাহবুবুর রশীদ (বাঁ দিক থেকে তৃতীয়)

কী ঘটেছিল সেদিন বাংলার শিখায়?

বন্দরের নির্দেশনা মেনে সেদিন এমভি বাংলার শিখা জাহাজটিও সাগরে অবস্থান করছিল এবং ইঞ্জিন চালু রাখা হয়েছিল জাহাজটির। প্রায় ২৫ বছরের পুরোনো কনটেইনার ও সাধারণ পণ্য পরিবহনের সমুদ্রগামী এই জাহাজটি রাষ্ট্রায়ত্ত জাহাজ কোম্পানি বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি)। জাহাজে সেদিন অবস্থান করছিলেন ৪২ জন নাবিক ও কর্মকর্তা।

জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন রুহুল হাসনাত। এই জাহাজে ক্যাডেট হিসেবে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন মেরিন একাডেমি থেকে সদ্য বের হওয়া ছয়জন মেয়ে ক্যাডেটও। ইঞ্জিন রুমের দলনেতা বা প্রধান প্রকৌশলী মাহবুবুর রশীদ। তখনো জানা ছিল না কী ভয়ংকর অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। ২০ মে থেকেই ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে দফায় দফায় কর্মপরিকল্পনা ঠিক করেছিলেন বন্দর কর্মকর্তারা। এসব প্রস্তুতি তদারক করছিলেন বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম খালেদ ইকবাল। বন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরিকল্পনা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কি না তা নজরদারিতে ব্যস্ত।

সাগরে থাকা ১৪৩টি জাহাজের প্রতিটির মতো এমভি বাংলার শিখাও ভোর থেকে ইঞ্জিন চালু করে রাখে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাগরে ঢেউও বাড়তে থাকে। ১১টা ৩৫ থেকে ৪০ মিনিটের দিকে হঠাৎ করে প্রচণ্ড বাতাস আরও তীব্র ঢেউয়ে জাহাজটি দুলতে থাকে। আচমকা বন্ধ হয়ে যায় জাহাজের জেনারেটর। দ্বিতীয় জেনারেটরটিও চালুর পর বন্ধ হয়ে যায়। জেনারেটর বন্ধ হয়ে গেলে জাহাজের মূল ইঞ্জিন বন্ধ না করলে বিকল হয়ে আরও বড় বিপদ হতে পারে। প্রকৌশলীরা তাই দেরি না করে জাহাজের মূল ইঞ্জিন বন্ধ করে দেন।

জেনারেটর ও ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রচণ্ড বাতাস আর ঢেউয়ে দুলতে থাকে জাহাজ। জাহাজের নোঙরও মাটি আঁকড়ে রাখতে পারছিল না। ঢেউ আর বাতাসে জাহাজ ভেসে যাচ্ছে। কীভাবে এই উত্তাল সাগরে জাহাজটি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে? এমন চিন্তায় নবীন ক্যাডেটরাও ভয় পেয়ে যান।
ঝড়ের পর ফেসবুকে এই ছবিটি দেন জাহাজের কর্মকর্তারা। ইনসেটে ক্যাপ্টেন রুহুল হাসনাত

জাহাজ তখন দুলছে। যেকোনো মুহূর্তে কাত হয়ে ডুবে যাওয়ার শঙ্কাও আছে। কারণ, ইঞ্জিন চালু না থাকলে উত্তাল সাগরে জাহাজ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ক্যাপ্টেনের নির্দেশে এগিয়ে আসেন প্রধান প্রকৌশলী মাহবুবুর রশীদ। তিনিসহ আটজন প্রকৌশলী কাজ শুরু করে দেন। মাহবুবুর রশীদ নানা নির্দেশনা দিচ্ছিলেন দলকে।

সেই নির্দেশনা মেনে জাহাজের তৃতীয় প্রকৌশলী আরিফ আহমেদ মুরশিদ খান, সাজ্জাদ হোসেন ও তারিকুল ইসলাম, চতুর্থ প্রকৌশলী গোলাম সাদিক ইঞ্জিনকক্ষে ব্যস্ত। এই পরিস্থিতিতে মাহবুবুর রশীদ নবীন তিন ইঞ্জিন ক্যাডেট পিয়াল সাহা, তামান্না ও সুস্মিতা সেনকে জাহাজের ওপরে ডেকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তারা ডেকে ফিরে আসেন। তারাও জীবন বাজি রেখে নেমে যান জেনারেটর সচল রাখার মিশনে।

জাহাজের প্রকৌশলীরা যখন ব্যস্ত জেনারেটর ঠিক করতে, তখনই জাহাজের ওপরের ডেকে ঢেউ আছড়ে পড়ছে। এই বুঝি ডুবে যাবে জাহাজটি। বেতারবার্তায় জাহাজ থেকে ক্যাপ্টেন রুহুল হাসনাত সাহায্য চাইলেন। এই বার্তা পাওয়ার পর বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর হাবিবুর রহমান ভূঁইয়াও জাহাজটি উদ্ধারে সব জায়গায় সহায়তার অনুরোধ জানাতে থাকেন। একটু পর পর যোগাযোগ করে জাহাজের ক্যাপ্টেন ও প্রকৌশলীদের সাহস দিতে থাকেন। ক্যাপ্টেনের সহায়তা চাওয়ার পর জাহাজ থেকে বেতারবার্তায় একজন মেয়ে ক্যাডেটের কণ্ঠ শোনা গেল নিয়ন্ত্রণকক্ষে—‘পোর্ট কন্ট্রোল-এমভি বাংলার শিখার ইঞ্জিন ফেইলিওর…।’

উত্তাল সাগরে টাগবোটও পাঠানো হলো। কিন্তু কর্ণফুলীর মোহনা পর্যন্ত গিয়ে আর সাগরে যাওয়ার সাহস পায়নি টাগবোটের চালকেরা। কারণ, প্রতিকূল আবহাওয়ায় টাগবোটও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। কর্ণফুলীর মোহনা থেকেই ফিরে আসেন তারা।

এমভি বাংলার শিখার প্রকৌশলীরা ব্যস্ত তখনো ইঞ্জিন রুমে। জরুরি জেনারেটর চালু করে তারা শনাক্ত করলেন মূল দুটি জেনারেটর বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ। জাহাজ দুলতে থাকার সময় জাহাজের নিয়ন্ত্রণকক্ষে দেয়ালে আটকানো কার্বন ডাই-অক্সাইড এক্সটিংগুইশারের বোতল পড়ে গিয়ে ‘কন্ট্রোল সেফটি সিস্টেম’-এর সরবরাহ লাইন নষ্ট হয়ে যায়। এটি শনাক্ত হওয়ার পরই দ্রুত মেরামত করে জেনারেটর চালুর চেষ্টা করছিলেন সবাই। এরই মধ্যে জাহাজটি দুলতে দুলতে ১০-১১ কিলোমিটার দূরে পতেঙ্গা সৈকতের কাছে চলে গেছে। হঠাৎ বিকট শব্দ। আরেকটি জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় এমভি বাংলার শিখার। এমটি গাগাসন জহর নামের জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা খায় বাংলার শিখা। জাহাজের পেছনে বাম দিকের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়।

জাহাজের তৃতীয় প্রকৌশলী আরিফ আহমেদ মুরশিদ খান নিজের ফেসবুকে এ নিয়ে লিখেছেন, ‘আমরা শব্দ শুনেছি। কিন্তু বের হয়ে যেতে পারিনি। …একটাই আশা, জেনারেটর লোড নেবে, আমরা ইঞ্জিন দিতে পারব। …মুন্না স্যার (মাহবুবুর রশীদ) শক্ত ছিলেন। তাই আমরাও দমে যাইনি।’
এমভি বাংলার শিখা

এমটি গাগাসান জহরের সঙ্গে ধাক্কা খাওয়ার পর দুই জাহাজ তখন পতেঙ্গার অদূরে ভাসছিল। বিকেল সাড়ে পাঁচটার মধ্যে জাহাজটিতে জেনারেটর চালু করেন প্রকৌশলীরা। ইঞ্জিনও চালু করা হয়। ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব শেষ হলেও উত্তাল ঢেউয়ের মাত্রা তখনো কমেনি। ক্যাপ্টেন রুহুল হাসনাতের নির্দেশে নয়টার দিকে জাহাজটিকে তীরের কাছাকাছি থেকে নিরাপদ দূরত্বে নেওয়া হয়।

মাহবুবুর রশীদ বলেন, ‘জাহাজ বাঁচানো গেলে সবাই বাঁচবে। এ কারণে আমরা সমস্যা শনাক্ত করে ইঞ্জিন চালু রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালকও আমাদের ফোন করে সাহস দিয়েছেন। আর ক্যাপ্টেন তো ছিলেনই। আমরাও মনোবল হারাইনি। পুরো টিমওয়ার্কই আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে।’

দুর্ঘটনা থেকে ফিরে আসার পরদিন ফেসবুকে বাংলার শিখা জাহাজের প্রকৌশলীরা এই ঘটনা তুলে ধরেন। কীভাবে এই ভয়াবহ বিপদ থেকে তারা রক্ষা পেলেন। জাহাজের প্রকৌশলীরা তুলে ধরেন সেদিনের কাহিনি। সেই কাহিনির কমেন্টে দূরদূরান্ত থেকে অন্য জাহাজের প্রকৌশলীরা বাহবা দিচ্ছিলেন মাহবুবুর রশীদকে। একজন লিখেছেন ‘ব্র্যাভো স্যার’। সূত্র: প্রথম আলো

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: