সর্বশেষ আপডেট : ২ মিনিট ২৪ সেকেন্ড আগে
রবিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

সাগরের পানি, ঝিনুক খেয়ে বেঁচে ছিলেন সুনামগঞ্জের দেবাংশু- কেউ প্রস্রাব খেয়ে বেঁচে ছিল

Debangshu20160526103202প্রবাস ডেস্ক: মালয়েশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলে নৌকায় তোলা হয়েছিল দেবাংশুকে। এরপর দু মাস সাগরে এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে সে মালয়েশিয়ায় পৌঁছে বৃহস্পতিবার এ প্রতিবেদকের কথা হয় দেবাংশুর সঙ্গে।

সুনামগঞ্জের গৌরারং ইউনিয়নের ইসবপুর গ্রামের শ্রী বিরেন্দ্র চন্দ্র পালের ছেলে দেবাংশু পাল। সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ ইউনিয়নের নূরপুর গ্রামের দালাল নূরুল ইসলামের প্ররোচনায় পড়েই মালয়েশিয়ায় আসা। আনন্দে বিভোর হয়ে মালয়েশিয়ার পথে যাত্রা, শেষ পর্যন্ত সাগর পাড়ি, তারপর স্বপ্নের দেশ।

দেবাংশু ভয়ংকর নৌ পথের অভিজ্ঞতার কথা বলেন এ প্রতিবেদককে।

তিনি বর্ণনায় জানান, দুমাসের বেশি সময় ধরে আমি সাগরে ছিলাম। এই কয়েক মাস কিভাবে ছিলাম, বলে বোঝাতে পারবো না। আমাদের নৌকায় খাবার ছিল না, পানি ছিল না। আমাদের ওপর প্রতিদিন নির্যাতন চলতো। আমাদের গালি-গালাজ করা হতো। পানিতে ফেলে দিয়ে ডুবিয়ে মারতে চেয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি ও আমার বন্ধু তৌহিদুল রক্ষা পেয়েছি।

গত বছরের ১৯ জুন রাত ৮টায় আমরা বঙ্গোপসাগর থেকে যখন রওনা হই, তখন প্রথমে ছোট নৌকায় তোলা হয়। অনেকগুলো নৌকা ছিল। এই সব ছোট ছোট নৌকার মানুষ সব একদিন একটা বড় নৌকায় তোলা হলো। প্রায় এক হাজার লোক। বার্মার লোক, বাংলাদেশের লোক, দুই দেশের লোকই ছিল। পাচারকারীরা বললো, তোমাদের এবার মালয়েশিয়ায় নিয়ে যাব। তোমরা মালয়েশিয়ায় ঢুকে যাবা।

প্রায় ৭২ ঘণ্টা ধরে আমাদের নৌকা চলেছিল। কিন্তু যেদিন আমরা রওনা হই, সেদিন নৌকায় ভয়ংকর মারামারি শুরু হলো। পাচারকারীরা একটা লোককে গুলি করে মেরে ফেললো। নৌকায় সবাই ভয় পেয়ে গেল।

তিন দিন চলার পর নৌকাটা সাগরের যেখানে এসে থামলো, সেখানে একটা স্পীড বোট আসলো। আমাদের নৌকার ক্যাপ্টেন আর তাদের সব লোকজন সেই স্পীড বোটে পালিয়ে গেল। সাগরের মাঝখানে আমাদের এই অবস্থায় ফেলে রেখে। এরপর আমাদের তো খুব অসহায় অবস্থা। নৌকায় তেল নাই। ইঞ্জিন নষ্ট। পানি নাই। খাবার নাই। তারপর বার্মার লোকরা জাহাজের দায়িত্ব নিল। এরপর তারা টর্চার শুরু করলো আমাদের বাংলাদেশিদের ওপর। যখন খুশি আমাদের মারধোর করে।

আমাদের নৌকা কোথায় কোনদিকে যাচ্ছে, কিছুই আমরা বুঝতে পারি না। কিছুদিন পর আমাদের বাংলাদেশি লোক সবাই অসুস্থ হয়ে পড়লাম।

ইন্দোনেশিয়ান নেভি আমাদের নৌকাটা মালয়েশিয়ার সীমানায় এনে ফেলে দিয়ে চলে যায়। এরপর আমরা পড়ি বিপদে। এরপর আসলো মালয়েশিয়ান নেভি। ওরা নুডলস আর পানি দিল খাবার জন্য। আমাদের নৌকা টেনে নিয়ে তারাও দূর সমুদ্রে ফেলে দিয়ে চলে গেল।

এরপর আমরা কষ্টে আছি। বিশ দিন ধরে সাগরে ভাসছি। সাগরের পানি খেয়ে আছি। সবার ডায়রিয়া। কেউ দাঁড়াতে পারে না। এই বিশ দিন একবার ইন্দোনেশিয়ান নেভি আসছে, একবার মালয়েশিয়ান নেভি আসছে। সবাই খাবার দিয়ে চলে গেছে। কেউ সাহায্য করেনি।

সাগরের পানি, ঝিনুক খেয়ে বেঁচে ছিলাম। কেউ প্রস্রাব খেয়ে বেঁচে ছিল।

জাহাজে একদিন মারামারি লাগলো বার্মা আর বাংলাদেশিদের মধ্যে। বাংলাদেশের মানুষকে পানিতে ফেলে ওরা মারলো।

একদিন নৌকা ফুটো হয়ে গেল। পানি উঠতে লাগলো। তখন ইন্দোনেশিয়ার যে ফিশিং বোটগুলো আছে, ওরা এসে আমাদের উদ্ধার করলো। সারারাত ধরে চালিয়ে একদিন ভোরে, সেদিন ছিল শুক্রবার ওরা আমাদের মালয়েশিয়ায় নিয়ে আসে। এর মধ্যে দেড়শো লোক মারা গেছে পানিতে পড়ে। যারা বুড়ো ছিল, যারা ডায়রিয়ায় দুর্বল হয়ে পড়েছিল, ওরা বাঁচেনি।

মালয়েশিয়া জহুর বারুতে একটি জঙ্গলে ফেলে চলে গেলো পাচারকারীরা। জঙ্গলে হাঁটছি আমরা দুই বন্ধু। হঠাৎ রাতে একটি জিপ গাড়ি দেখতে পেলাম। ওরা আমাদেরকে ফলো করছিল। গাড়িতে বার্মা ও মালয়েশিয়ান সহ তারা চার জন ছিল । তারা আমাদের গাড়িতে উঠালো। আমাদের নিয়ে এখন কি করবে জানি না। এক বাসায় নিয়ে রাখলো। পরের দিন থেকে শুরু হলো আমাদের দু জনের উপর শারীরিক অত্যাচার। দেশের মোবাইল নাম্বার নিয়ে ওরাই ফোন করলো। আমাদের অভিভাবকেরা টাকা পাঠালেন, জন প্রতি চার লাখ করে মোট ৮ লাখ টাকা পরিশোধ করা হলো। টাকা পেয়ে জহুর বারু লাড়কিন বাস ষ্ট্যান্ডে আমাদের নিয়ে আসলো বার্মার ওই লোকটি। লোকটি কুয়ালালামপুর গাড়িতে তুলে দিল । কুয়ালালামপুর কোতারায়া বাংলা মার্কেটে আসলাম। পরিচয় হলো এক বাঙ্গালী ভাইয়ের সাথে। কাজ ঠিক করে দিল ক্লাংএ। মাসে এক হাজার রিঙ্গিত। আট মাস কাজ করে এক টাকাও পাইনি। বরং ওই বাঙ্গালী সুপার ভাইজার বেতনের কথা বললে বলতো, তোমরা অবৈধ বেশি কথা বললে পুলিশের হাতে তুলে দিব। উপায় না দেখে রাতের আধারে সেখান থেকে পালিয়ে আসলাম। তিন দিন না খেয়ে ছিলাম । কুয়ালালামপুর থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আবার চলে গেলাম সেই জহুর বারু। পরিচয় হলো আমাদের এলাকার এক জনের সঙ্গে। সেও নৌকায় এসেছে। গত তিন মাস ধরে এক সঙ্গে একটি কন্সট্রাকশন সাইডে কাজ করছি কিন্তু অবৈধ হওয়ার কারণে বেতন কম।

তবুও বেচে থাকার তাগিদে পড়ে রয়েছি। জানিনা ভাগ্যে কি আছে। এই এক বছরে বাড়িতে মাত্র ৫০ হাজার টাকা পাঠিয়েছি। তবুও ভেঙ্গে পড়েননি দেবাংশু । তার ভয় শুধু পুলিশের। দিনে প্রজেক্টেও কাজ আর জঙ্গলে রাত কাটে দেবাংশুর।

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: