সর্বশেষ আপডেট : ২৪ মিনিট ৫ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ থেকে শ্যামল কান্তি ভক্ত

kakon-priyo-blog-18-05-16_0একজন শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত অপমানিত হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জের একটি স্কুলের এই প্রধান শিক্ষককে কান ধরে উঠবস করানো হয়েছে। আর এই ‘উঠবস অনুষ্ঠান’ এর প্রধান অতিথি ছিলেন একজন ক্ষমতাধর জনপ্রতিনিধি।

আর এ বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো প্রচণ্ড সরব হয়েছে ঘটনার ভিডিও, ছবি ও বর্ণনা প্রচার হবার পরপরই। গণমাধ্যমেও জায়গা করে নিয়েছে সংবাদটি। নিন্দা, প্রতিবাদ, ফেসবুকে কান ধরে ছবি সব মিলিয়ে ঢিঢি পড়ে গিয়েছে চারিদিকে। কিন্তু আখেরে লাভ হয়েছে কী? অপমান আর কষ্টের ভারে ন্যুব্জ সেই প্রধান শিক্ষককে বরখাস্ত করা হয়েছে। স্কুল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে তার দোষ প্রমাণ হওয়ায় তাকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।।

সেই শ্যামল কান্তিকে নিয়ে এক তরুণ সাংবাদিক এবং লিখিয়ের লেখা পড়লাম যোগাযোগ মাধ্যমে। তার আফসোস হলো, হুমায়ুন আজাদের উপর যখন আক্রমণ হলো তখন যদি তার ভাষায় সঠিক প্রতিবাদ হতো তাহলে হয়তো এমন ঘটনা ঘটত না। তার আফসোসকে স্যালুট জানাই। না, শুধু হুমায়ুন আজাদ বিষয়ক কারণে নয় স্যালুট জানাই তার প্রতিবাদ করার স্পৃহাকে। সঠিক সময়ে সঠিক প্রতিবাদ করা হলে অনেক কিছুই হতো না।

তবে সেই তরুণ সাংবাদিক এবং লিখিয়ের পুরো লেখাটি এবং এ বিষয়ে অনেকের লেখা পড়েই আমার ব্যক্তিগত মন্তব্য হচ্ছে লেখাটি বা লেখাগুলো তার এবং তাদের আবেগের ফসল, উপলদ্ধির নয়।

শ্যামল কান্তি একজন শিক্ষক। শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সমাজের একজন ‘সিম্বল’ তিনি। কিন্তু বিশেষ কোনো অবদানের জন্য তিনি আলোচিত, সম্মানিত কিংবা বিখ্যাত নন। শিক্ষক সমাজের আরেকজন ‘আইকন’ হলেন আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ, আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর। মানুষকে বই পড়ায় উদ্বুদ্ধ করার এক অকুতোভয় যোদ্ধা। মানুষকে জ্ঞানের পথে ধাবিত করার এক মুর্তিমান ‘লিজেন্ড’। সেই মানুষটিকেও অসম্মান করা হয়েছে। সেই অসম্মানও করেছেন শ্যামল কান্তি ভক্ত’র অপমানকারীরাই।

আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের জিহ্বা ছিড়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, তাঁর মুখ সেলাই করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর চেয়ে বড় ধৃষ্টতা আর কী হতে পারে! কিন্তু বেদনাদায়ক হলেও সত্যি তখন এত প্রতিবাদ দেখিনি।

যারা আজ সবাই ‘শ্যামল কান্তি’ হতে চাচ্ছেন তাদেরকে সে সময় দেখিনি ‘আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ’ হতে সবার প্রতি আহ্বান জানাতে। সেইসব তরুণ সাংবাদিক ও লিখিয়েদেরও লেখা সেদিন চোখে পড়েনি কোনো গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এটা কী খুব বেশী দিন আগের কথা? তখন কী প্রতিবাদের সঠিক সময় ছিল না?

আমি শ্যামল কান্তিকে ছোট করছি না। শিক্ষক মানেই আমার কাছে শ্রদ্ধেয়। কিন্তু বলতে চাচ্ছি যেখানে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ অপমানিত হন, সেখানে শ্যামল কান্তির অপমান না হবার তো কোনো কারণ নেই।

যখন ষোল বছরের একজন তরুণের চোখ উপড়ে বুলেটে হত্যা করা হয় তখন শুধু ‘দীপেন’ এর জন্য হাহাকার করাটাকে আমি বলি আবেগের, উপলদ্ধির নয়। প্রতিটি সন্তান হারা মায়ের বেদনার রঙ আর বাবা’র হাহাকারের ধ্বনি একই।

শিক্ষক শ্যামল কান্তিকে নিয়ে একটি অনলাইন পোর্টালে খ্যাত সাংবাদিক গোলাম মোর্তোজার লেখা পড়লাম। ‘নীল দানব লাল চোখে তাকিয়ে আছে’ এমন বাক্যে শুরু একটি চমৎকার লেখা। উনি সত্যিই ভালো লেখেন। তবে এই নীল দানবরা লাল চোখে অনেক আগে থেকেই তাকিয়ে ছিল। তখন কারো কারো সেই লাল চোখকেই মনে হয়েছে বিপ্লবের ‘লাল ঝান্ডা’। মঙ্গলবার স্কুল থেকে বরখাস্তের চিঠি পেয়েছেন শিক্ষক শ্যামল কান্তি। তিনি যখন চিঠি পেয়েছেন তখন জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে শিক্ষকদের উপর ছোড়া হয়েছে জলকামান।

কথা একটাই আবেগ নয় সবসময় কথা বলা উচিত উপলদ্ধি থেকে। ‘বিশেষে’ ফুঁসে উঠব আর ‘অবিশেষে’ চুপ থাকব, এমনটি হলে কোনো কিছুই রোধ করা সম্ভব হবে না, হচ্ছে না।

গ্রামে ঝড় নিয়ে প্রচলিত গল্পটি আবার আওরাতে হচ্ছে। গ্রামে যখন ঝড় হয় তখন স্বার্থপররা নিজ ঘরকে নিরাপদ আশ্রয় ভ্রমে বলে, ‘ডানে যা বামে যা’ অর্থাৎ তার ঘরের উপর দিয়ে যেন না যায়। যখন নিজের ঘরের উপর দিয়েই ঝড় বয়ে যায় তখন হতাশ কন্ঠে বলে, ‘যেখান দিয়ে ইচ্ছা সেখান দিয়ে যা’। কিন্তু যারা স্বার্থপর নন, যারা ‘আমার’ শব্দটির চেয়ে ‘আমাদের’ শব্দটির উপর জোর দেন, যারা দেশটাকে নিজের জোত জমিদারি মনে না করে আপামর মানুষের মনে করেন তাদের অন্তত এমন মুহূর্তে যা কিছু করার তা উপলদ্ধি থেকেই করা উচিত।

আমাদের এক স্যার কলেজে বাংলা পড়াতেন, প্রদীপ স্যার। তিনিও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। তাঁকে দেখেছি আবেগ নয় উপলদ্ধির নির্যাস নিংড়ে কথা বলতে। তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন, ‘আবেগ বেড়ে গেলে বিবেক গতিরুদ্ধ হয়’ এমন সত্য কথন। যার সত্যতা এখন আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। পক্ষপাতিত্বের এক চোখা ‘দাজ্জাল’ আজ সব শেষ করে দিচ্ছে। এই ‘দাজ্জাল’দের কারণে আমরা ‘আমার’ থেকে ‘আমাদের’ হতে পারছি না।

মহাত্মা গান্ধীর ‘মহাত্মা’ হয়ে উঠার পেছনের কারণগুলো মধ্যে একটি হলো সমাজের অচ্ছ্যুত অস্পৃশ্যদের তিনি সমাজে সামিল করতে চেয়েছিলেন। কুলীন (?) ব্রাহ্মণদের কাছে অস্পৃশ্য ‘মেথর’দের সম্মানিত করতে, সমাজে সমান্তরালে আনতে তাদের নাম দিয়েছিলেন ‘হরিজন’ ইশ্বরের পুত্র। আর আমাদেরই কেউ কেউ ‘আমার’ শব্দটি ব্যবহার করে অনেককেই অস্পৃশ্য বানানোর যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন তাতে কোন লাভ হয়নি, ভাঙনই বেড়েছে শুধু। ভাঙতে ভাঙতে আত্মমর্যাদা, ঐতিহ্যবোধ, ঐক্য, ভালোবাসা সব উন্মত্ত ক্রোধ আর প্রতিহিংসার ভয়াল নদীতে বিলীন হতে বসেছে।

ইসলাম বলে আত্মশুদ্ধিতে আত্মসমালোচনার চেয়ে ভালো কিছু নেই। অন্যকে দোষারোপ করে কোনো লাভ নেই। এ আমাদের নিজ হাতে রোপিত বিষবৃক্ষের ‘বিষময়’ ফল। অথচ বেদ বলেছে, ‘মানুষ অমৃতের সন্তান।’ কিন্তু আমরা কেন যে জেনেশুনে বিষ পান করছি!

ফুটনোট: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাদের সাহিত্য জগতের একজন বিখ্যাত ব্যক্তি শিক্ষক শ্যামল কান্তি বিষয়ে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। স্যাটায়ার নির্ভর সেই স্ট্যাটাসটি নিয়ে একজন ভদ্রলোকের কমেন্ট পড়ে খুব মজা পেয়েছি। ভদ্রলোকের উক্তিটি ছিল, শ্যামল কান্তি বিষয়ে একই কথা একপক্ষ লিখলে এক রকম অর্থ আর অন্যপক্ষ লিখলে তার অর্থ হবে আরেক রকম। অর্থাৎ এক যাত্রায় ফল দুটো।

একটি গল্প বলার লোভ সামলাতে পারছি না। রাজার এক পেয়াদা আরেক পেয়াদার বিরুদ্ধে আদালতে নালিশ করল যে, সে তার একমাত্র শ্যালিকার মর্যাদাহানি করেছে। তার নালিশ শুনে ওই অভিযুক্ত পেয়াদা তো অবাক। সে অভিযোগকারী পেয়াদাকে প্রশ্ন করল, ‘আমি তো একদিন মাত্র যা করার করেছি কোতোয়াল যে প্রতিরাতেই করে?’

উত্তরে অভিযোগকারী পেয়াদা বললো, ‘কোতোয়াল আর তুই কী এক হলি। তুই হলি সামান্য পেয়াদা উনি হলেন রাজার কোতোয়াল।’

কাকন রেজা: সাংবাদিক।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: