সর্বশেষ আপডেট : ৪ ঘন্টা আগে
মঙ্গলবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

জননেত্রী, লেখাটি পড়বেন আশা করি

full_246483357_1464149689আবেদ খান: এই লেখাটি লেখার জন্য আমি কয়েকটা দিন অপেক্ষা করেছি। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার বিদেশ সফর শেষ করে দেশে ফেরার পর বাংলাদেশে তাঁর অবস্থানকালেই এটি লিখব বলে। আমি চাই তিনি আমার লেখাটি পাঠ করুন এবং এর ভেতরকার বার্তা অনুধাবনের চেষ্টা করুন।

আমি জানি এবং শুনেছি শেখ হাসিনা শিক্ষক সমাজের প্রতি কতখানি শ্রদ্ধাশীল। আনিস স্যার, রফিক স্যার, কিংবা প্রয়াত মনিরুজ্জামান স্যার ছাড়াও আমার বন্ধু সৈয়দ আকরাম হোসেনের সঙ্গে বিভিন্ন সময় কথা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনার কথা উঠলেই তাঁরা শতমুখে তাদের এই ছাত্রীর প্রশংসা করেন। এই বিজয়ী মানুষটির সাহচর্যে আসার একটু আধটু সুযোগ আমারও হয়েছে এবং কখনও তাঁর ভেতরে সামান্যতম অসৌজন্যের লেশমাত্র দেখিনি।

কাজেই আমি চাই– আমি, আমরা যারা সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করি তাঁর সাহসী দূরদর্শী পদক্ষেপ বাংলাদেশকে নিয়ে চলেছে অমরাবতীর পথে– তারা সবাই চায় তিনি আমাদের অন্তরের ভাষা অনুধাবন করুন– হৃদয়ের অনুচ্চারিত ক্রন্দন শ্রবণ করুন।

জননেত্রী, আপনি কি কখনও কল্পনা করতে পারবেন আপনি যেসব শিক্ষকের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন সেই সব শিক্ষককে কোনো এক রাজনীতিজীবী তাদের ছাত্রছাত্রীদের সামনে অপমানজনক শাস্তিবরণে বাধ্য করছেন! আপনি কি ভাবতে পারবেন সেই রাজনীতিজীবী বানোয়াট কাহিনি সাজিয়ে তাদেরকে অধিকতর লাঞ্ছনায় জর্জরিত করছেন! আপনি কি বিশ্বাস করতে পারেন যে, আপনার অনুগ্রহে লালিত এইসব রাজনীতিজীবী শুধু শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করেন না, সাংবাদিকদের দিকে তর্জনী নির্দেশ করে ধমক দেন! আপনার কি চিন্তার মধ্যে কখনও আসতে পারে এই কথাটি যে, সেই রাজনীতিজীবী চৌদ্দ দলীয় জোটের মুখপাত্রের বক্তব্য তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে সংবাদ সম্মেলন করতে একটুকু কুণ্ঠিত বোধ করেন না!

আপনি নিশ্চয়ই জানেন, উক্ত রাজনীতিজীবীর অপকর্মের সমর্থনে কারা হেফাজতিদের আবার মাঠে নামিয়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল এই ইস্যু কেন্দ্র করে?

মাননীয় নেত্রী, আমরা সুনিশ্চিতভাবে জানি শিক্ষামন্ত্রীর সিদ্ধান্ত, আইনমন্ত্রীর সুস্পষ্ট ঘোষণা কিংবা চৌদ্দ দলীয় জোটের মুখপাত্রের প্রতিক্রিয়া, এর প্রতিটি ক্ষেত্রে অপনার পরিপক্ব সমর্থন এবং নির্দেশনা আছে। আপনি এটাও নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে, কোন পরিস্থিতির কারণে হতভাগ্য প্রধান শিক্ষককে ঢাকায় আনা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো আপনার নির্দেশ ছাড়া তাঁকে বিশেষ ব্যবস্থাধীনে ঢাকায় এনে হাসপাতালে ভর্তি করাতে পারতেন না। অতএব আপনি এটাও অবগত আছেন যে, শ্যামল কান্তি নামের ঐ শিক্ষককে কী বলা হয়েছিল যে কারণে তিনি এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা প্রচণ্ডভাবে নিরাপত্তার অভাব বোধ করছিলেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার নিশ্চয়ই নখদর্পণে আছে যে, নারায়ণগঞ্জ নামক অঞ্চলটি যা ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা এবং যা ছিল পাকিস্তান আমলে আওয়ামী লীগের অন্যতম দুর্গ, কীভাবে ধীরে ধীরে সেই দুর্গের এক একটি ইট খসে পড়তে থাকল, এত সমৃদ্ধ ও সচেতন অঞ্চল অর্থ এবং পেশির কাছে জিম্মি হয়ে রইল, কীভাবে সরকারের অভ্যন্তরে অদৃশ্য সরকার আইনের বাইরে অলিখিত আইন দ্বারা শাসিত হতে থাকল এই নদীমেখলা অঞ্চল।

শ্রদ্ধেয় প্রজ্ঞাবান জননেত্রী, আপনি নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে একমত হবেন যে, দৃশ্যমান প্রতিপক্ষের চেয়ে অদৃশ্য এবং অন্দরের প্রতিপক্ষ অনেক বেশি প্রাণঘাতী, ভয়ঙ্কর ও প্রগতি-সংহারক।

সম্মানিত প্রধানমন্ত্রী, এই ভারতবর্ষের ইতিহাস যদি আমরা পাঠ করি তাহলে দেখব– পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে কিশোর আকবর বাদশাহের প্রধান সেনাপতি বৈরাম খাঁর অসম সাহসিকতার কারণে মহাবীর হিমু পরাজিত ও নিহত হয়েছিলেন। তের বছরের কিশোর বাদশাহ যদি সেদিন পরাস্ত হতেন, তাহলে ভারতবর্ষের ইতিহাস বদলে যেত।

তারপরও, সেই মহাযোদ্ধা বৈরাম খাঁর কর্তৃত্ব ক্রমশ আকবর শাহ্কে ছাপিয়ে উঠছিল। তিন বছরের মাথায় তিনি বৈরাম খাঁকে কৌশলে অপসারণ করতে পারলেন বলে মোঘলশাহী শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে পেরেছিল।

নারায়ণগঞ্জের যে সর্বজনশ্রদ্ধেয় রাজনীতিক আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখেছিলেন তিনি নিশ্চয়ই তাঁর উত্তরাধিকারীদের জন্য রাজনীতি করেননি। তিনি যে ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে তাঁর উত্তরাধিকারীরা বংশপরম্পরায় তার ননী সেবন করবেন তা কি কখনও হয়? এই যদি রাজনীতির নীতি হত, তাহলে তো দিল্লি বৈরাম শাহীর অধীনস্থ থাকত, মুঘল-শাহীর অস্তিত্ব থাকত না সেখানে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি কোনো পরিসংখ্যান পরিবেশন করব না। আপনি নিজেই সব জানেন, সব বিশ্লেষণ করে রাজনীতির ছকে পা ফেলেন। নারায়ণগঞ্জের পরিসংখ্যান নিয়ে দেখুন– গত পঞ্চাশ বছরের লাভক্ষতির হিসাব কী বলে? নিশ্চয়ই আপনার কাছে তথ্য আছে, সেখানে আওয়ামী লীগের রাজনীতি; সেখানকার ব্যবসা-বাণিজ্য, সেখানকার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি কিংবা শিক্ষিত মানুষদের কণ্ঠস্বর কোন্ লোমশ হাতের মুঠোয় আটকানো!

বিজ্ঞ নেত্রী, আমরা সবাই জানি, দেশ, মানুষ এবং দল আপনার কাছে সবচাইতে পবিত্র। সে ক্ষেত্রে আপনি আপনার দলের কোনো কোনো নেতার অবিমৃষ্যকারিতায় প্রশ্রয় দেননি। আকবরের নবরত্ন সভার অন্যতম রত্ন টোডরমলকেও এক সময় সম্রাটের রোষাগ্নিতে ভস্ম হতে হয়েছে। ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা ট্রটস্কিকেও সরে যেতে হয়েছে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে। অধুনা মার্কিন প্রেসিডেন্ট-প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পও কিন্তু থাকতে পারেননি ডেমোক্রেট দলে।

অর্থাৎ যে বিষয়টি প্রণিধানযোগ্য তা হল, স্বার্থকেন্দ্রিক, অহঙ্কারী, দস্যু মানসিকতার অধিকারীদের জন্য ইতিহাসে কিংবা ধর্মে স্থান নির্ধারিত হয়েই আছে।

একটি গল্পের কথা মনে পড়ল প্রিয় নেত্রী। সেই গল্পটি ছোট করে বলে এই লেখার ইতি টানব।

এক সফল ব্যবসায়ীকে কর্মব্যোপদ্দেশে বিভিন্ন সময়ে বিমানে ভ্রমণ করতে হয়। একদিন সকালের ফ্লাইটে ভিনদেশে যাওয়ার জন্য তিনি যখন বেরুতে যাবেন সেই সময় সালাম দিয়ে বাড়ির প্রহরী সামনে দাঁড়িয়ে করজোড়ে বলল, ‘‘স্যার, একটা অনুরোধ করি, আপনি কি অনুরোধটি রাখবেন?’’

তিনি ভ্রুকুঞ্চন করে বললেন, ‘‘বল, কী বলতে চাও?’’

‘‘স্যার, আপনি আজ প্লেনে কোথাও যাবেন না। আজকের প্রোগ্রামটা বাতিল করুন।’’

তিনি রেগে বললেন, ‘‘কী বলছ বোকার মতো! আমার অত্যন্ত জরুরি মিটিং আছে, জান? আমাকে যেতেই হবে।’’

কথাটি বলেই তিনি গাড়িতে উঠে বিমানবন্দরের দিকে রওনা দিলেন। সারাটা পথ অবশ্য তাঁর মনে একটা কাঁটা খচখচ করতে লাগল। কেন বাড়ির দারোয়ানটি এ কথা বলল! শেষ পর্যন্ত বিমানবন্দরের কাছাকাছি থেকে তিনি ফিরে এলেন।

বাড়ি এসে কাপড় বদলাতে বদলাতে তিনি টিভির সুইচটা অন করলেন। ব্রেকিং নিউজে জানতে পারলেন, একটি বিমান উড্ডয়ন-মুহূর্তে বিধ্বস্ত হয়েছে এবং তার সকল যাত্রী ও ক্রু নিহত হয়েছে। চমকে উঠে তিনি দেখলেন, সেই বিমানটিই বিধ্বস্ত হয়েছে যেটাতে তিনি যাত্রা করতে গিয়েও করেননি।

তখন ভদ্রলোক দারোয়ানকে ডাকলেন এবং পুরস্কার হিসেবে বিশাল অঙ্কের একটি চেক দিলেন। একই সঙ্গে দিলেন একটি চিঠি– দারোয়ানটিকে চাকরি থেকে বরখাস্তের নির্দেশ। তাকে বললেন, ‘‘এই অর্থ হচ্ছে আমার জীবন রক্ষার জন্য, তুমি যে পরামর্শ দিয়েছ তার জন্য আমার কৃতজ্ঞতার নিদর্শন। আর ঐ চিঠিটি হচ্ছে তোমার কর্তব্যে অবহেলার পরিণাম। ডিউটি দেওয়ার সময় ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখা যে রীতিমতো গাফিলতি তা তুমি নিশ্চয়ই জান।’’

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার জন্য, সাম্প্রদায়িক শক্তিকে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়ার জন্য, হেফাজতিদের হেফাজত করার জন্য, মিত্রের মুখোশ পরে প্রগতি এবং গণতন্ত্রের বধ্যভূমি সৃষ্টি করার জন্য যারা সঙ্গোপনে সক্রিয়– তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব আপনার। আমরা আপনার দিকেই তাকিয়ে আছি।

আবেদ খান, কলামিস্ট।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: