সর্বশেষ আপডেট : ৩ মিনিট ৩০ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

আলিনার জামা থেকে এখনো ওর গায়ের গন্ধ পাচ্ছি

2016_05_21_17_40_03_VGSOowupGEzivM9aemVxF9qOb5LtMe_originalবিনোদন ডেস্ক::মাত্র সতেরদিন বয়সে কন্যা এলিনাকে হারাতে হলো জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী ন্যানসির। কন্যাকে হারানোর ব্যাথা বুকে নিয়ে মা ন্যানসি প্রকাশ করলেন ক্ষণজন্মা মেয়ের সঙ্গে তার কয়েকটি দিনের স্মৃতি। তারিখ দিয়ে অশ্রুমাখা সেইসব স্মৃতি উচ্চারণ করেছেন ন্যানসি। গত ২১ মে কন্যাকে হারানোর ঠিক একদিন পর ন্যানসি ফেসবুকে প্রকাশ করলেন তার মর্মভেদী স্মৃতিটুকু।পাঠকের জন্য তা তুলে ধরা হলো।

১০ মে, ২০১৬

“-হ্যালো, কে বলছেন?
-আমি ন্যানসি বলছি।
-কে?
(মনে পড়ে গেল এখন আর আমি ন্যনসি নই। আমার এখন নতুন পরিচয়)
– আমি NICU 10 এর মা বলছি।
(অপর প্রান্তে নীরবতা। কিছুক্ষণ পরে নতুন একটি কণ্ঠ মোলায়েম স্বরে —– জি আপু বলেন। )
NICU 10, আসল নাম আলিনা জাফরিন। আমার তৃতীয় কন্যা সন্তান। “সেপটিসেমিয়া” তে আক্রান্ত। গতকাল ওকে এই হাসপাতালের NICU তে ভর্তি করা হয়েছে। কতদিন থাকবে জানি না। দিনে কয়েকবার গিয়ে ওকে দেখে আসি। আমার মেয়েটা বেশিরভাগ সময় চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে, আর শুধু কাঁদে। আমি নীরবে তাকিয়ে শুধু দেখি।

১১ মে, ২০১৬
আজ রাত ১০ টায় আলিনার প্রথম অপারেশন হবে। ওর পরিপাকতন্ত্রের কিছুটা অংশে ইনফেকশন এর জন্য পচন ধরেছে। ডাক্তাররা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আক্রান্ত অংশটুকু কেটে ফেলে দিবেন। বাচ্চার সারভাইভ করার চান্স ৭০%। আমরা একসাথে আল্লাহ্‌র কাছে প্রার্থনা করছি। বেশ কিছুক্ষিন পর OT-এর ভিতর থেকে একজন জায়েদ কে ভেতরে ডেকে নিলেন। জায়েদ বের হওার পর জানলাম আলিনার পেটের ভেতরের পচনটা দেখানোর জন্য ওকে ডাকা হয়েছিল। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর অপরেশন সফল ভাবে শেষ হল। আমরা আল্লাহ্‌র কাছে শোকরিয়া আদায় করে বাড়ী ফিরলাম।

১২মে, ২০১৬
আলিনার নাকের ভিতর নল,মাথায় ক্যানোলা, হাতে ক্যনোলা, পেটে বড় একটা ব্যান্ডেজ, ব্যান্ডেজের পাশে মলমূত্র বের হবার জন্য একটা ড্রেন (আলিনার পেটের ভেতরের যে অংশটুকু কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেটা আর জোড়া দেওয়া হয়নি। সব কিছু যদি ঠিক থাকে, তাহলে দেড় মাস পরে আরেকটা অপারেশন করে ড্রেনটা বন্ধ করে দেওয়া হবে। তত দিন পর্যন্ত পেটের পাশের ড্রেন দিয়েই মলমূত্র বের হবে), পায়ে ক্লিপ আটকানো, বুকে একটা নল স্কচটেপ দিয়ে আটকানো। ও কেদেই যাচ্ছে, যথারীতি আমিও দেখছি। মাঝে মাঝে ওর মাথায়, হাতে, পায়ে হাত বুলাচ্ছি।

১৫মে, ২০১৬
আলিনার শরীরের অবস্থা হঠাত করেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। মেডিসিন দিয়ে ওর ইনফেকশন সরানো যাচ্ছে না। ওর চোখ বন্ধ, আমি ওর চোখ খোলার আশায়…………।

১৬মে, ২০১৬
আলিনা এখনো চোখ বন্ধ করে আছে। আমি ওর পিঠে চাপড় দিচ্ছি, হাত ঝাকাচ্ছি, চোখের উপর হাত বুলাচ্ছি, মা মা করে ডাকছি, তবুও ও চোখ খুলছে না।

১৮মে, ২০১৬
সকাল ৯ টা। NICU তে ফোন করে জানলাম, আজ আলিনার মুখে খাবার দেওয়া হবে। আমি আর জায়েদ আনন্দে আত্মহারা। তাড়াতাড়ি ফিডারে দুধ ভরে নিয়ে ছুটলাম হাসপাতালে।
আলিনার সামনে চেয়ারে বসে আছি। ওর মুখে খাবার দেওয়া হয়নি। দায়িত্ব রত ডাক্তাররা পেডিয়াট্রিক সার্জন এর জন্য অপেক্ষা করছেন। কি করতে হবে তা উনি এসে বলবেন। ঘড়িতে তিন টা পনের, আলিনার ব্যন্ডেজের ফাক দিয়ে সবুজ পানি বের হচ্ছে। সবুজ পানিটা যে দিক দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে, সেখানকার চামড়া ঝলসে যাচ্ছে (এসিডে পুড়লে যেমন ঝলসে যায়, সেরকম)। আমি নিচে নেমে আসলাম। আমি যখন NICU এর ভেতরে থাকি, তখন জায়েদ বাইরে অপেক্ষা করে। বের হয়ে ওকে বললাম, ডাক্তার কখন আসে জানি না, চল চলে যাই। ও যেতে রাজী না। একটু পর ডাক্তার আসলেন। আলিনার ব্যন্ডেজ খোলা হল। পেটের যে অংশটুকু সেলাই করা হয়েছিল তার অনেকটাই ঝলসে গিয়ে সেলাই খুলে যাওয়ার উপক্রম।
৪.৩০ বাজে। OT এর ভেতর আলিনা, বাইরে আমরা। এবার সারভাইভ করার সম্ভাবনা ৫০% এরও কম। আবার OT এর ভেতর থেকে জায়েদের ডাক পড়ল। ও তখন রক্ত দিতে গিয়েছে। ভেতরে আমি গেলাম। ডাক্তার আলিনার পেটের ভেতরটা দেখালেন। আমি মনোযোগ দিয়া দেখলাম নাড়ির কতটুকু পচে গেছে, কতটুকু কেটে বাদ দিবে। বাইরে এসে অপেক্ষার পালা। এবারও অপরেশন সফল হল। আমরা এক বুক আশা নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।

১৯মে, ২০১৬
আলিনার চোখ খোলা, আমি নিস্পলক। তখনো জানতাম না শেষবারের মত দুজন দুজন কে দেখছি।

২০মে, ২০১৬
আলিনার যে কোন সময় ভেন্টিলেটর প্রয়োজন হতে পারে। ডাক্তার ইনিয়ে বিনিয়ে জানতে চাচ্ছেন মেশিন এর সাপোর্ট দিবেন কি দিবেন না। জায়েদ ডাক্তার কে বলল, যা যা দরকার, সব করেন, শুধু আমাদের কে ফোন দিয়ে জানাবেন।
রাতে আলিনাকে ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা (সাদা রক্ত) দেয়া হল। এই কয়েক দিনে আলিনাকে বেশ কয়েক দফায় ফ্রেশ রক্ত ও ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা দেয়া হয়েছে। জায়েদ শেষবারের মত মেয়ে কে চোখ খোলা দেখলো। রাতে হাসপাতালে না যাবার কারনে আমার আর দেখা হল না।

২১মে, ২০১৬
সকাল ৮.৩০। আলিনার হার্টবিট রেট ক্রমশ কমছে। বুকের পাঁজরের হার গুলো কৃত্রিম শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে সাথে উঠা নামা করছে। চোখের পাতা একটু খোলা, মনে হচ্ছে যেন চোখ খুলে তাকানোর চেষ্টা করছে। আমি ওকে কোলে নিতে চাইলাম। আজ আর কেও বাধা দিল না। কতক্ষন পর ঠিক জানি না, কিন্তু মনে হল আলিনা মারা গেছে। জায়েদ আমার কাঁধে হাত রেখেছে। আজ আর ওর স্পর্শে ভরসা পাচ্ছি না। মৃত্যুর পরও আলিনার বুকের হাড় কৃত্রিম ভাবে ওঠা নামা করছে।

আলিনার শরীর থেকে সমস্ত নল খুলে নেওয়া হল। এবার ওর সমস্ত শরীর কচি কলাপাতা রঙের পাতলা পেপার দিয়ে মুড়ে দেওয়া হল। শুধু ছোট্ট মুখটা বের হয়ে আছে। আমার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। চিৎকার করে বলছি…… আমি সঙ্গীত শিল্পী ন্যানসি নই, আমি NICU 10 এর মা নই, আমি এই ছোট্ট শিশুটির মা যার নাম আলিনা জাফরিন। ওর বয়স ১৭ দিন। কেও কি ওকে আমার বুকে ফিরিয়ে দেবেন……? আল্লাহ, তুমি কি দয়া করে ওর হায়াত বাড়িয়ে দেবে? কেউ কি আছেন যে এই নিষ্পাপ বাচ্চার জন্য প্রান ভরে দোয়া করবেন। হয়তো আপনাদের দোয়ায় আল্লাহ্‌ ওর প্রান ভিক্ষা দেবেন……………… কেউ আমার চিৎকার শুনতে পাচ্ছে না।

২২ মে, ২০১৬
সকাল ৯.৩০। সব আবার আগের মত। আলিনার বিছানা, বালিশ, কাঁথা, টাওয়েল, দোলনা, খেলনা, জামা সব গোছানো। আলিনার জামা থেকে এখনো ওর গায়ের গন্ধ পাচ্ছি। আমাকে আর প্রতিদিন হাসপাতালে যেতে হয় না, ফোন দিয়ে বলতে হয় না আমি NICU 10 এর মা বলছি। আমি এখন আলিনা জাফরিন এর মা।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: